বিশ্বকাপে বয়সের জয়গান, নাকি তারকাখ্যাতির প্রভাব
নাহিদ হোসাইন বিশ্বকাপ মানেই নতুন নায়কের জন্ম, তরুণ প্রতিভার উত্থান এবং ভবিষ্যতের তারকাদের মঞ্চ। কিন্তু ২০২৬ বিশ্বকাপের শুরুতেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে ভিন্ন এক বাস্তবতা এবারের আসরটি যেন অভিজ্ঞতারও এক মহোৎসব। ধারণা করা হয়েছিল, ২০২২ সালে কাতারে ট্রফি জয়ের মধ্য দিয়েই আন্তর্জাতিক ফুটবলে লিওনেল মেসির বিশ্বকাপ অধ্যায়ের ইতি ঘটবে। কিন্তু সেই গল্পের শেষ অধ্যায় তখনো লেখা হয়নি। ৩৯ বছর বয়সে আর্জেন্টিনার জার্সিতে আবারও বিশ্বকাপ মঞ্চে দেখা যাচ্ছে তাকে। সাম্প্রতিক সময়ে চোট নিয়ে কিছু শঙ্কা তৈরি হলেও আর্জেন্টিনার সমর্থকদের আশা-ভরসার বড় অংশ এখনো তার কাঁধেই। ৪০ পেরিয়ে বিশ্বকাপ খেলবেন যারা মেসির পাশাপাশি আরও কয়েকজন কিংবদন্তিও এবারের বিশ্বকাপে নিজেদের উপস্থিতি জানান দিচ্ছেন। ৪১ বছর বয়সী ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো, ৪০ বছর বয়সী লুকা মদরিচ ও এদিন জেকো, অভিজ্ঞ গোলরক্ষক ম্যানুয়েল নয়্যার, গিয়ের্মো ওচোয়া ও ভোজিনহা সবাই রয়েছেন এই তালিকায়। স্কটল্যান্ডের ক্রেইগ গর্ডনের বয়স ৪৩, আর জাপানের ডিফেন্ডার ইউতো নাগাতোমোর বয়স ৩৯। সংখ্যাটা অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে। কারণ বিশ্বকাপের আগের ২২টি আসর মিলিয়ে ৪০ বছর বা তার বেশি বয়
নাহিদ হোসাইন
বিশ্বকাপ মানেই নতুন নায়কের জন্ম, তরুণ প্রতিভার উত্থান এবং ভবিষ্যতের তারকাদের মঞ্চ। কিন্তু ২০২৬ বিশ্বকাপের শুরুতেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে ভিন্ন এক বাস্তবতা এবারের আসরটি যেন অভিজ্ঞতারও এক মহোৎসব।
ধারণা করা হয়েছিল, ২০২২ সালে কাতারে ট্রফি জয়ের মধ্য দিয়েই আন্তর্জাতিক ফুটবলে লিওনেল মেসির বিশ্বকাপ অধ্যায়ের ইতি ঘটবে। কিন্তু সেই গল্পের শেষ অধ্যায় তখনো লেখা হয়নি। ৩৯ বছর বয়সে আর্জেন্টিনার জার্সিতে আবারও বিশ্বকাপ মঞ্চে দেখা যাচ্ছে তাকে। সাম্প্রতিক সময়ে চোট নিয়ে কিছু শঙ্কা তৈরি হলেও আর্জেন্টিনার সমর্থকদের আশা-ভরসার বড় অংশ এখনো তার কাঁধেই।
৪০ পেরিয়ে বিশ্বকাপ খেলবেন যারা
মেসির পাশাপাশি আরও কয়েকজন কিংবদন্তিও এবারের বিশ্বকাপে নিজেদের উপস্থিতি জানান দিচ্ছেন। ৪১ বছর বয়সী ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো, ৪০ বছর বয়সী লুকা মদরিচ ও এদিন জেকো, অভিজ্ঞ গোলরক্ষক ম্যানুয়েল নয়্যার, গিয়ের্মো ওচোয়া ও ভোজিনহা সবাই রয়েছেন এই তালিকায়। স্কটল্যান্ডের ক্রেইগ গর্ডনের বয়স ৪৩, আর জাপানের ডিফেন্ডার ইউতো নাগাতোমোর বয়স ৩৯।
সংখ্যাটা অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে। কারণ বিশ্বকাপের আগের ২২টি আসর মিলিয়ে ৪০ বছর বা তার বেশি বয়সে খেলেছেন মাত্র সাতজন ফুটবলার। অথচ এবারের আসরেই সেই সংখ্যা স্পর্শ করতে পারে নতুন উচ্চতা।
বিশ্বকাপের সবচেয়ে প্রবীণ খেলোয়াড়
বিশ্বকাপের সবচেয়ে প্রবীণ খেলোয়াড় হিসেবে এখনো শীর্ষে আছেন মিশরের গোলরক্ষক এসাম এল হাদারি। ২০১৮ সালে সৌদি আরবের বিপক্ষে মাঠে নামার সময় তার বয়স ছিল ৪৫ বছর ১৬১ দিন। অনেকে ভেবেছিলেন সেটি ছিল আবেগের সিদ্ধান্ত। কিন্তু সেই ম্যাচে একটি পেনাল্টি ঠেকিয়ে তিনি প্রমাণ করেছিলেন, জায়গাটি তিনি যোগ্যতাতেই অর্জন করেছিলেন।
অবশ্য দীর্ঘ ক্যারিয়ার গড়ার ক্ষেত্রে গোলরক্ষকদের সুবিধা সবসময়ই কিছুটা বেশি। ফারিদ মন্দ্রাগন, প্যাট জেনিংস, পিটার শিলটন, আলি বুমনিজেল কিংবা দিনো জফ সবাই তার উদাহরণ। বিশেষ করে ১৯৮২ সালে ইতালিকে বিশ্বকাপ জেতানোর পথে জফের অবদান আজও ইতিহাসের অংশ। এই তালিকায় ব্যতিক্রম ছিলেন ক্যামেরুনের রজার মিলা। ৪২ বছর বয়সে তিনি বিশ্বকাপে গোল করে প্রমাণ করেছিলেন, বয়স কখনো কখনো কেবল একটি সংখ্যা মাত্র।
তবে কেন হঠাৎ এত বেশি বয়সী ফুটবলার বিশ্বকাপে?
এর পেছনে রয়েছে একাধিক কারণ। প্রথমত, বিশ্বকাপ এখন ৪৮ দলের আসর। ফলে আগের তুলনায় আরও বেশি দেশ অংশগ্রহণের সুযোগ পাচ্ছে। এর ফলে অভিজ্ঞ খেলোয়াড়দেরও বিশ্বমঞ্চে দেখা যাওয়ার সম্ভাবনা বেড়েছে।
দ্বিতীয়ত, আধুনিক ক্রীড়া বিজ্ঞান ফুটবলারদের ক্যারিয়ার দীর্ঘায়িত করেছে। উন্নত চিকিৎসা, পুষ্টি পরিকল্পনা, পুনর্বাসন পদ্ধতি এবং ফিটনেস ব্যবস্থাপনার কারণে এখন এমন অনেক চোট থেকে ফিরে আসা সম্ভব, যা একসময় ক্যারিয়ার শেষ করে দিত। ফলে ফুটবলাররা আগের তুলনায় অনেক বেশি সময় ধরে প্রতিযোগিতামূলক পর্যায়ে খেলতে পারছেন।
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পারফরম্যান্সের প্রশ্নও আসে
লুকা মদরিচ কিংবা এদিন জেকোর ক্ষেত্রে বয়সের ছাপ দৃশ্যমান হলেও নিজেদের দলের জন্য তারা এখনো গুরুত্বপূর্ণ। মেসির ক্ষেত্রেও একই আলোচনা রয়েছে। ইউরোপের সর্বোচ্চ পর্যায়ের ফুটবলে আগের মতো আধিপত্য না থাকলেও একটি মুহূর্তেই ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা এখনো তার রয়েছে। তাই আর্জেন্টিনা তাকে ঘিরেই স্বপ্ন দেখে।
ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোকে ঘিরে অবশ্য বিতর্ক বেশি। তার গোল করার ক্ষমতা এখনো প্রশংসিত, কিন্তু আগের সেই গতি ও বিস্ফোরণশক্তি আর নেই। সমালোচকদের মতে, তার উপস্থিতি কখনো কখনো পর্তুগালের তরুণ ও সৃজনশীল ফুটবলারদের স্বাধীনভাবে নিজেদের প্রকাশের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
২০২২ বিশ্বকাপেই এর আভাস দেখা গিয়েছিল। সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে রোনালদোকে বেঞ্চে রেখে খেলানো হলে পর্তুগাল ছয় গোল করে এবং গনসালো রামোস হ্যাটট্রিক করেন। তারপরও গ্যালারির অধিকাংশ সমর্থকের মনোযোগ ছিল রোনালদোকেই ঘিরে। আধুনিক ফুটবলে তারকা-সংস্কৃতির শক্তি কতটা প্রবল, সেটিরও একটি উদাহরণ এটি।

যুদ্ধের যুগে ফুটবলের বিশ্বমেলা
বিশ্বকাপের এই আসর তাই কেবল তরুণদের উত্থানের গল্প নয়। এটি এমন এক টুর্নামেন্ট, যেখানে অভিজ্ঞতা, বিজ্ঞান, পেশাদারিত্ব এবং তারকাখ্যাতি-সবকিছু একসঙ্গে উপস্থিত। পরিচিত মুখগুলোর দীর্ঘ যাত্রা নিঃসন্দেহে ফুটবলের অগ্রগতির প্রতীক। তবে একই সঙ্গে এটি সেই প্রশ্নও সামনে আনে কোনো খেলোয়াড় কি শুধুই পারফরম্যান্সের কারণে টিকে আছেন, নাকি তার নাম ও জনপ্রিয়তাও ভূমিকা রাখছে?
লেখক: শিক্ষক, ব্লু বার্ড স্কুল
কেএসকে
What's Your Reaction?

