বিশ্বজুড়ে হঠাৎ সোনার দাম কমার কারণ কী?
বিশ্বে বড় কোনো যুদ্ধ, ভূরাজনৈতিক সংকট বা অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা দেখা দিলে সাধারণত সোনার দাম বেড়ে যায়। কারণ বিনিয়োগকারীরা তখন মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি থেকে বাঁচতে সোনাকে নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে বেছে নেন। কিন্তু এবার চিত্রটি ভিন্ন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান ও পরবর্তী কয়েক মাসের যুদ্ধ চলার পরও আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দাম ঊর্ধ্বমুখী না হয়ে বরং নিম্নমুখী হয়েছে। চলতি বছরের ২৮ জানুয়ারি প্রতি ট্রয় আউন্স (৩১.১ গ্রাম) সোনার দাম ৫ হাজার ৩০৩ ডলারে পৌঁছেছিল (১ ট্রয় আউন্স= ২.৪৩ ভরি)। কিন্তু শুক্রবার (১২ জুন) তা নেমে এসেছে ৪ হাজার ২৩৫ ডলারে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, যুদ্ধ ও অস্থিরতার মধ্যেও কেন সোনার দাম কমছে? বিশ্লেষকদের মতে, এর প্রধান কারণ হলো বিশ্বজুড়ে দ্রুত বাড়তে থাকা মূল্যস্ফীতি। মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়ায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সুদের হার কমানোর পথে না গিয়ে তা অপরিবর্তিত রাখতে বা আরও বাড়াতে পারে- এমন আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। আর এই শঙ্কাই সোনার বাজারে চাপ সৃষ্টি করছে। বর্তমান মূল্যস্ফীতির উল্লম্ফনের পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে হরমুজ প্রণালি। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া হিসেবে যুদ্ধ শ
বিশ্বে বড় কোনো যুদ্ধ, ভূরাজনৈতিক সংকট বা অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা দেখা দিলে সাধারণত সোনার দাম বেড়ে যায়। কারণ বিনিয়োগকারীরা তখন মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি থেকে বাঁচতে সোনাকে নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে বেছে নেন। কিন্তু এবার চিত্রটি ভিন্ন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান ও পরবর্তী কয়েক মাসের যুদ্ধ চলার পরও আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দাম ঊর্ধ্বমুখী না হয়ে বরং নিম্নমুখী হয়েছে।
চলতি বছরের ২৮ জানুয়ারি প্রতি ট্রয় আউন্স (৩১.১ গ্রাম) সোনার দাম ৫ হাজার ৩০৩ ডলারে পৌঁছেছিল (১ ট্রয় আউন্স= ২.৪৩ ভরি)। কিন্তু শুক্রবার (১২ জুন) তা নেমে এসেছে ৪ হাজার ২৩৫ ডলারে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, যুদ্ধ ও অস্থিরতার মধ্যেও কেন সোনার দাম কমছে?
বিশ্লেষকদের মতে, এর প্রধান কারণ হলো বিশ্বজুড়ে দ্রুত বাড়তে থাকা মূল্যস্ফীতি। মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়ায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সুদের হার কমানোর পথে না গিয়ে তা অপরিবর্তিত রাখতে বা আরও বাড়াতে পারে- এমন আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। আর এই শঙ্কাই সোনার বাজারে চাপ সৃষ্টি করছে।
বর্তমান মূল্যস্ফীতির উল্লম্ফনের পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে হরমুজ প্রণালি। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া হিসেবে যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই ইরান এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথে জাহাজ চলাচলে বাধা দিয়ে আসছে। ফলে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল ও গ্যাস পরিবহন রুটে বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে।
এর প্রভাব সরাসরি পড়েছে জ্বালানি বাজারে। তেল ও গ্যাসের দাম বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয়ও বৃদ্ধি পেয়েছে। সেই সঙ্গে বেড়েছে পণ্য ও সেবার দাম, যা সামগ্রিক মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রে বর্তমানে মূল্যস্ফীতির হার তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। দেশটিতে এটি এখন ৪.২ শতাংশ। একই সময়ে শ্রমবাজারও শক্ত অবস্থানে রয়েছে। ফলে ফেডারেল রিজার্ভ দ্রুত সুদের হার কমাবে- এমন প্রত্যাশা অনেকটাই ম্লান হয়ে গেছে।
সাধারণভাবে মূল্যস্ফীতির বিরুদ্ধে সুরক্ষা হিসেবে সোনা জনপ্রিয় হলেও সুদের হার বেশি হলে সেটি সোনার জন্য নেতিবাচক হয়ে দাঁড়ায়। কারণ সোনা এমন একটি সম্পদ, যা নিজে থেকে কোনো সুদ বা লভ্যাংশ দেয় না।
আর্থিক ওয়েবসাইট অপশনস্প্রেডার্স ডটকমের প্রধান অপশন বিশ্লেষক জাস্টিন কার্ডওয়েল আল জাজিরাকে বলেন, সোনা এমন একটি সম্পদ, যা প্রকৃত অর্থের সবচেয়ে কাছাকাছি। এটি কোনো লভ্যাংশ দেয় না, আবার দাম না বাড়া পর্যন্ত কোনো আয়ও দেয় না। মানুষ মূলত সোনার মূল্যবৃদ্ধির আশায় এটি কিনে থাকে।
তিনি বলেন, সুদের হার বেশি হলে সোনা বিনিয়োগ হিসেবে তার আকর্ষণ হারাতে শুরু করে। তখন বিনিয়োগকারীরা ডলারের মতো সুদবাহী সম্পদের দিকে ঝুঁকে পড়ে।
এ কারণে সুদের হার এবং সোনার মধ্যে সরাসরি প্রতিযোগিতা তৈরি হয়। সুদের হার বাড়লে সোনার চাহিদা কমে যায় এবং দামও চাপের মুখে পড়ে।
ইরান যুদ্ধের আরেকটি বড় প্রভাব পড়েছে মার্কিন ডলারের ওপর। যুদ্ধকালীন অনিশ্চয়তার মধ্যে ডলারের অবস্থান শক্তিশালী হয়েছে। যেহেতু আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দাম ডলারে নির্ধারিত হয়, তাই ডলার ও সোনার দামের মধ্যে সাধারণত উল্টো সম্পর্ক দেখা যায়।
নোবেল গোল্ড ইনভেস্টমেন্টসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা কলিন প্লুম আল জাজিরাকে বলেন, ডলার শক্তিশালী হলে সোনা চাপের মুখে পড়ে। আর ডলার দুর্বল হলে সোনার দাম বাড়তে থাকে। বর্তমানে ডলার শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে ও সোনা সেই চাপ অনুভব করছে।
তবে তিনি মনে করেন, ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি এখনো অনিশ্চিত। তার ভাষায়, এ বছরের বাকি সময় এবং সম্ভবত আগামী কয়েক বছরের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো- এরপর কী ঘটবে?
তিনি বলেন, কয়েক মাস আগেও সবাই মনে করছিল সুদের হার কমবে। তাই প্রায় সব ধরনের সম্পদের দাম বাড়ছিল। কিন্তু এখন পরিস্থিতি বদলে গেছে। এখন সুদের হার বাড়ার বাস্তব সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এই পরিবর্তনের প্রভাব সব ধরনের সম্পদের ওপর পড়ে, তবে সোনা সুদের হারের প্রতি বিশেষভাবে সংবেদনশীল।
ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরুর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভকে সুদের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমানোর আহ্বান জানিয়েছিলেন।
কিন্তু সুদের হার নিয়ে পূর্বাভাস প্রদানকারী সিএমই ফেডওয়াচ টুল এখন বলছে, ডিসেম্বরের মধ্যে সুদের হার বাড়ার সম্ভাবনা ৫০ শতাংশেরও বেশি।
প্লুমের মতে, এই পরিস্থিতি সোনার দামের ওপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। তিনি বলেন, সুদের হার ও মূল্যস্ফীতি যেন দোলনার দুই পাশ, আর মাঝখানে বসে আছে সোনা।
তিনি আরও বলেন, ২০২৬ সালের বিশেষ চ্যালেঞ্জ হলো -একই সময়ে মূল্যস্ফীতি ও উচ্চ সুদের ঝুঁকি দুটোই বিদ্যমান। তবে বর্তমানে সুদের হারের প্রভাবই বেশি শক্তিশালী। এ কারণেই সোনা চাপের মুখে রয়েছে।
শুক্রবার (১২ জুন) যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্ভাব্য একটি চুক্তির খবর প্রকাশের পর সোনার দাম আগের দিনের তুলনায় সামান্য বেড়ে দিন শেষ করে।
জাস্টিন কার্ডওয়েলের মতে, যুদ্ধ শেষ হওয়ার সম্ভাবনার খবর সোনার জন্য ইতিবাচক। কারণ তখন ধারণা করা হয় মূল্যস্ফীতি কমে আসবে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, যুদ্ধ শেষ হলেও এর ইতিবাচক প্রভাব বাজারে পুরোপুরি দেখা দিতে কয়েক মাস সময় লাগতে পারে।
কার্ডওয়েল বলেন, বর্তমানে সোনা যে দামের সীমার মধ্যে রয়েছে, সেটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সমর্থন অঞ্চল বলে মনে হচ্ছে। কিন্তু যুদ্ধ শেষ হলেও আরও অনেক কারণ থাকবে, যা সোনার দামের বড় উত্থানকে সীমিত রাখতে পারে।
অর্থাৎ বিশ্বজুড়ে সোনার দাম কমার পেছনে একক কোনো কারণ নয়, বরং একাধিক অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক কারণ একসঙ্গে কাজ করছে। ইরান যুদ্ধের কারণে জ্বালানির দাম ও মূল্যস্ফীতি বেড়েছে, মূল্যস্ফীতির কারণে সুদের হার কমার সম্ভাবনা কমেছে, শক্তিশালী হয়েছে মার্কিন ডলার- আর এই তিনটি কারণ মিলেই আপাতত সোনার বাজারকে নিম্নমুখী করে রেখেছে।
সূত্র: আল-জাজিরা
এসএএইচ
What's Your Reaction?