বিশ্বে সবচেয়ে বেশি বৃষ্টি হয় যেসব জায়গায়

প্রকৃতির এক অদ্ভুত ও বিস্ময়কর রূপ হলো বৃষ্টিপাত। ঋতুভেদে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন সময় বৃষ্টি হয়ে থাকে। তবে বিশ্বের এমন কিছু অঞ্চল রয়েছে, যেখানে বৃষ্টি কোনো সাময়িক আবহাওয়া নয়, বরং প্রাত্যহিক জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। আধুনিক আবহাওয়ার ইতিহাসে এমন কিছু নির্দিষ্ট জায়গার রেকর্ড রয়েছে, যেখানে মেঘেদের স্থায়ী বসবাস এবং বৃষ্টিপাতের বার্ষিক ও দৈনিক পরিমাণ সাধারণ মানুষের কল্পনারও অতীত। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (WMO) ও গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, নির্দিষ্ট কিছু ভৌগোলিক অবস্থান ও বায়ুপ্রবাহের কারণে এই অঞ্চলগুলো বৈশ্বিক অতিবৃষ্টির সব রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে। পৃথিবীর বুকে সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিপ্রবণ ও সর্বোচ্চ রেকর্ডের অধিকারী সেইসব অঞ্চল ও তাদের আবহাওয়ার রোমাঞ্চকর খতিয়ান নিয়ে এই প্রতিবেদন। মৌসিনরাম (ভারত): মেঘেদের চিরস্থায়ী ঠিকানা বৃষ্টিতে মেঘালয়ের মৌসিনরাম গ্রাম/ ছবি: দ্য আটলান্টিক গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসের পাতায় বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে ‘আর্দ্র’ বা ‘ভেজা’ স্থান হিসেবে জ্বলজ্বল করছে ভারতের মেঘালয় রাজ্যের পাহাড়ি গ্রাম ‘মৌসিনরাম’-এর নাম। খাসি পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত এই গ্রামে বছর

বিশ্বে সবচেয়ে বেশি বৃষ্টি হয় যেসব জায়গায়

প্রকৃতির এক অদ্ভুত ও বিস্ময়কর রূপ হলো বৃষ্টিপাত। ঋতুভেদে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন সময় বৃষ্টি হয়ে থাকে। তবে বিশ্বের এমন কিছু অঞ্চল রয়েছে, যেখানে বৃষ্টি কোনো সাময়িক আবহাওয়া নয়, বরং প্রাত্যহিক জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। আধুনিক আবহাওয়ার ইতিহাসে এমন কিছু নির্দিষ্ট জায়গার রেকর্ড রয়েছে, যেখানে মেঘেদের স্থায়ী বসবাস এবং বৃষ্টিপাতের বার্ষিক ও দৈনিক পরিমাণ সাধারণ মানুষের কল্পনারও অতীত।

বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (WMO) ও গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, নির্দিষ্ট কিছু ভৌগোলিক অবস্থান ও বায়ুপ্রবাহের কারণে এই অঞ্চলগুলো বৈশ্বিক অতিবৃষ্টির সব রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে। পৃথিবীর বুকে সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিপ্রবণ ও সর্বোচ্চ রেকর্ডের অধিকারী সেইসব অঞ্চল ও তাদের আবহাওয়ার রোমাঞ্চকর খতিয়ান নিয়ে এই প্রতিবেদন।

মৌসিনরাম (ভারত): মেঘেদের চিরস্থায়ী ঠিকানা

বৃষ্টিতে মেঘালয়ের মৌসিনরাম গ্রাম/ ছবি: দ্য আটলান্টিক

গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসের পাতায় বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে ‘আর্দ্র’ বা ‘ভেজা’ স্থান হিসেবে জ্বলজ্বল করছে ভারতের মেঘালয় রাজ্যের পাহাড়ি গ্রাম ‘মৌসিনরাম’-এর নাম। খাসি পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত এই গ্রামে বছরে গড় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ প্রায় ১১ হাজার ৮৭১ মিলিমিটার (৪৬৭ ইঞ্চি বা প্রায় ৩৯ ফুট)।

বঙ্গোপসাগর থেকে উঠে আসা তীব্র জলীয় বাষ্পপূর্ণ বায়ু খাসি পাহাড়ের দেয়ালে এসে বাধা পায়। পাহাড়ের আকৃতির কারণে এই বাতাস বাধ্য হয়ে ওপরের দিকে উঠে যায় এবং দ্রুত ঘনীভূত হয়ে মৌসিনরামে অবিরাম ধারায় ঝরে পড়ে। এখানকার বাসিন্দারা ঘরের বাইরে বের হলেই বাঁশ ও কলার পাতা দিয়ে তৈরি বিশেষ এক ধরনের ছাতা (স্থানীয় ভাষায় ‘কনুপ’) ব্যবহার করেন, যা পিঠসহ পুরো শরীরকে ঢেকে রাখে। এখানে বৃষ্টি কোনো সাময়িক দুর্যোগ নয়, বরং জীবনযাত্রারই অংশ।

চেরাপুঞ্জি (ভারত): ইতিহাসের অবিশ্বাস্য সব রেকর্ডধারী

চেরাপুঞ্জির একটি রাস্তায় দাঁড়িয়ে পাহাড়ে বৃষ্টির ছবি তুলছেন এক তরুণী/ ছবি: পেক্সেলস

বর্তমানে গড় বৃষ্টিপাতে মৌসিনরামের চেয়ে সামান্য পিছিয়ে থাকলেও, আধুনিক আবহাওয়ার ইতিহাসে এক মাসে ও এক বছরে সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাতের সর্বকালের রেকর্ডটি কিন্তু চেরাপুঞ্জির দখলেই রয়েছে। ১৮৬০ ও ১৮৬১ সালের দিকে চেরাপুঞ্জি প্রকৃতির এক চরম রূপ দেখেছিল।

এক বছরের রেকর্ড: ১৮৬০ সালের ১ আগস্ট থেকে ১৮৬১ সালের ৩১ জুলাই পর্যন্ত মাত্র ১২ মাসে চেরাপুঞ্জিতে রেকর্ড ২৬ হাজার ৪৭০ মিলিমিটার (১ হাজার ৪২ ইঞ্চি বা ৮৬ ফুট) বৃষ্টিপাত হয়েছিল! এই পরিমাণ বৃষ্টি পৃথিবীর আর কোথাও কোনোদিন দেখা যায়নি।

এক মাসের রেকর্ড: একই সময়ে অর্থাৎ ১৮৬১ সালের জুলাই মাসে একক কোনো মাস হিসেবে এখানে সর্বোচ্চ ৯ হাজার ৩০০ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়। অর্থাৎ মাত্র এক মাসেই প্রায় সাড়ে ৯ মিটার বা ৩১ ফুট পানির স্তর!

যদিও চেরাপুঞ্জিতে এখন বনায়ন হ্রাস ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বৃষ্টির পরিমাণ কিছুটা কমেছে, তবুও ইতিহাসের পাতায় এর রেকর্ড আজও অক্ষুণ্ন।

রেউনিওঁ দ্বীপ (ফ্রান্স): ১ দিনে সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত

ভারত মহাসাগরে অবস্থিত ফরাসি দ্বীপে বৃষ্টি ও বাতাস/ ২০২৫ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি তোলা ছবি/ এএফপি

যদি প্রশ্ন করা হয়, মাত্র ১ দিনে বা ২৪ ঘণ্টায় পৃথিবীর বুকে সবচেয়ে বেশি বৃষ্টি হয়েছিল কোথায়? তবে চোখ ফেরাতে হবে ভারত মহাসাগরের বুকে অবস্থিত ফরাসি দ্বীপ রেউনিওঁ (Réunion Island)-এর দিকে।

মাদাগাস্কারের পূর্বে অবস্থিত এই পাহাড়ি দ্বীপে ক্রান্তীয় ঘূর্ণিঝড় বা সাইক্লোনের প্রলেপ যখন লাগে, তখন আকাশ যেন আক্ষরিক অর্থেই ভেঙে পড়ে। ১৯৬৬ সালের ৭ থেকে ৮ জানুয়ারি এই দ্বীপে আঘাত হেনেছিল ঘূর্ণিঝড় ‘ডেনিস’। সেসময় দ্বীপের ফক-ফক (Foc-Foc) স্থানটিতে মাত্র ২৪ ঘণ্টায় রেকর্ড ১ হাজার ৮২৫ মিলিমিটার (৭১.৮ ইঞ্চি বা প্রায় ৬ ফুট) বৃষ্টিপাত হয়েছিল!

শুধু ২৪ ঘণ্টা নয়, টানা কয়েকদিনের অতিবৃষ্টির রেকর্ডও এই দ্বীপের দখলে। ১৯৮০ সালের জানুয়ারিতে ঘূর্ণিঝড় ‘হাইসিনথ’-এর প্রভাবে রেউনিওঁর কমরসন (Commerson) নামক স্থানে মাত্র ১৫ দিনে ৬ হাজার ৪৩৩ মিলিমিটার বা ২১ ফুট বৃষ্টি হয়েছিল, যা বিশ্ব আবহাওয়া বিজ্ঞানের ইতিহাসে একটি মাইলফলক।

ললো ও লোপেজ ডি মিকাই (কলম্বিয়া): লাতিন আমেরিকার বৃষ্টির স্বর্গ

লাতিন আমেরিকার দেশ কলম্বিয়ার চোকো (Chocó) ডিপার্টমেন্টের অন্তর্গত ললো (Lloró) ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূলের লোপেজ ডি মিকাই (López de Micay) অঞ্চল দুটিকে মৌসিনরামের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বলা চলে।

ললো অঞ্চলে বছরে গড় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ প্রায় ১২ হাজার ৭১৮ মিলিমিটার বা প্রায় ৪২ ফুট। এখানকার আবহাওয়া এতটাই আর্দ্র যে, আন্দিজ পর্বতমালার আর্দ্র বায়ু প্রশান্ত মহাসাগরের বাতাসকে আটকে দিয়ে এখানে প্রায় প্রতিদিনই দুপুরের পর বা রাতে প্রবল বৃষ্টিপাত ঘটায়।

তবে এখানে মৌসিনরামের মতো আধুনিক স্বয়ংক্রিয় আবহাওয়া পরিমাপক যন্ত্রের অভাব থাকায় অনেক রেকর্ড আনুষ্ঠানিকভাবে বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা পুরোপুরি স্বীকৃতি দিতে পারে না। তাসত্ত্বেও, এই অঞ্চলের ক্রান্তীয় রেইনফরেস্ট বা বৃষ্টিঅরণ্য পৃথিবীর অন্যতম প্রধান বৃষ্টিবহুল অঞ্চল হিসেবে স্বীকৃত।

মাউন্ট ওয়ায়ালেয়ালে (হাওয়াই, যুক্তরাষ্ট্র): প্রশান্ত মহাসাগরের মেঘের বাড়ি

মাউন্ট ওয়ায়ালেয়ালে/ছবি: কানাডিয়ান জিওগ্রাফিক

প্রশান্ত মহাসাগরের মাঝে অবস্থিত কাউয়াই দ্বীপের একটি আগ্নেয় পর্বত হলো মাউন্ট ওয়ায়ালেয়ালে (Mount Waialeale)। স্থানীয় ভাষায় ওয়ায়ালেয়ালে শব্দের অর্থ হলো ‘উতলে ওঠে পানি’।

নামের স্বার্থকতা প্রমাণ করতেই যেন এই পাহাড়ি অঞ্চলে বছরে গড়ে প্রায় ১১ হাজার ৫০০ মিলিমিটার প্রায় ৩৮ ফুট বৃষ্টিপাত হয়। আগ্নেয়গিরির খাড়া ঢাল ও সমুদ্রের আর্দ্র বায়ুর মিলনে এখানে প্রায় সারাবছরই মেঘ থমথম করে। বছরের ৩৬৫ দিনের মধ্যে প্রায় ৩৫০ দিনই এখানে বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়ে থাকে।

বাংলাদেশের সঙ্গে তুলনামূলক চিত্র: আকাশ ও পাতাল তফাত!

আমাদের চিরচেনা বাংলাদেশে বর্ষাকালে যখন টানা তিন-চারদিন বৃষ্টি হয়, তাতেই চারপাশ পানিতে থৈ থৈ করে। অথচ আমাদের দেশের গড় বৃষ্টিপাতের সঙ্গে এই বৈশ্বিক রেকর্ডগুলোর তুলনা করলে অবাক হতে হয়।

বাংলাদেশে বছরে গড়ে বৃষ্টিপাত হয় প্রায় ২ হাজার ৩০০ মিলিমিটার। দেশের সবচেয়ে বৃষ্টিপ্রবণ এলাকা সিলেটের লালাখালে বার্ষিক গড় বৃষ্টিপাত প্রায় ৪ হাজার ১৮০ মিলিমিটার বা প্রায় ১৪ ফুট। অর্থাৎ, বিশ্বের সবচেয়ে বৃষ্টিবহুল অঞ্চল মৌসিনরামের তুলনায় তা অর্ধেকেরও কম!

আর রেউনিওঁ দ্বীপে মাত্র ১ দিনে যে পরিমাণ বৃষ্টি (১ হাজার ৮২৫ মি.মি.) হয়েছিল, তা বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার পুরো ১ বছরের গড় বৃষ্টিপাতের প্রায় কাছাকাছি।

প্রকৃতির এই চরম রূপগুলো প্রমাণ করে যে, পৃথিবী কতটা বৈচিত্র্যময়। যেখানে বিশ্বের এক প্রান্তে সাহারা বা আতাকামা মরুভূমিতে বছরের পর বছর এক ফোঁটা পানির জন্য হাহাকার থাকে, সেখানে অন্য প্রান্তে চেরাপুঞ্জি বা মৌসিনরামে আকাশ যেন অবিরাম ধারায় নিজেকে বিলিয়ে দেয়।

সূত্র: guinnessworldrecordsguinnessworldrecords, World Meteorological Organization

এসএএইচ

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow