মেঘাচ্ছন্ন দিনেও মিরপুরে অনুশীলনে ব্যস্ত জাতীয় দলের ক্যাম্পের ক্রিকেটাররা। কিন্তু সাংবাদিকদের ক্যামেরা তীক্ষ্ণ নজর রাখছে বিসিবির অফিস কক্ষের দিকে। কখন আসবেন প্রেসিডেন্ট আমিনুল ইসলাম বুলবুল? লম্বা ছুটি কাটিয়ে অস্ট্রেলিয়া থেকে জাপান হয়ে শনিবার রাতেই দেশে ফিরেছেন তিনি। সম্প্রতি তার সঙ্গে নতুন সরকারের দূরত্বের আভাস পাওয়া যাচ্ছে; বিভিন্ন সংবাদে দ্বন্দ্বের গুঞ্জনও দেখা দিয়েছে। সর্বশেষ বোর্ড নির্বাচনের প্রসঙ্গেও সরকারের পক্ষ থেকে চলছে অনুসন্ধান। সবমিলিয়ে এই পরিস্থিতি নিয়ে কী ভাবছেন বুলবুল—এসব নিয়ে কালবেলার সঙ্গে তিনি খোলামেলা আলাপ করেছেন।
প্রশ্ন: তদন্ত নিয়ে গণমাধ্যমে দেওয়া বিসিবির বিবৃতি প্রসঙ্গে
বুলবুল: আমার কাছে মনে হয় আমার সেই বিবৃতির ব্যাখ্যায় একটু ভুল ছিল। বলা হচ্ছে, বিসিবি-সরকার মুখোমুখি, যা কি না সঠিক নয়। বিসিবি একটি স্বায়ত্তশাসিত সংগঠন। এ ধরনের সংগঠন যখন স্বাধীনভাবে কাজ করে, তখন মনে হচ্ছিল সরকারি সেই তদন্ত আইসিসির পক্ষ থেকে হয়তো কিছু একটা হতে পারে। বিবৃতিটি ভালো করে দেখলে দেখা যাবে, সেখানে বলা হয়েছে ‘হতে পারে’। তার মানে এই নয় যে আইসিসির পক্ষ থেকে শাস্তি দেওয়া হবে। যদি আমাদের ওপর কোনো হস্তক্ষেপ প্রসঙ্গে কোনো আন্তর্জাতিক ক্রীড়া সংস্থা জানতে চায়, পূর্ব সতর্কতা হিসেবে বিসিবির পক্ষ থেকে সেই বিবৃতিটি দেওয়া হয়েছে। গত পাঁচ মাস হলো বিসিবি স্বাভাবিক কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে চলছে। এর মাঝে আমরা সিরিজ খেলছি, ঘরোয়া ক্রিকেট চলছে—সবকিছুই হচ্ছে। তারপর আমাদের যারা সরকারে আছেন তারা আমাদের ক্রীড়াঙ্গনের অভিভাবক। শুধু ক্রিকেট না, সব খেলার অভিভাবক। আমরা সরকারের এই অবস্থানকে সম্মান করি।
প্রশ্ন: বিবৃতির একটা অংশে তদন্ত বন্ধ করতে বলা হয়েছে, বিষয়টি কি এমন?
বুলবুল: না ওটা না, ওটা ভুল। যখন কোনো শব্দকে অনুবাদ করা হয়, তখন অনেক কিছু মনে হতে পারে। কিন্তু বাস্তবে ওরকম কিছু ঘটেনি। সত্যি বলতে, আমরা তো ক্রিকেট খেলাই। অবশ্যই আইসিসি আছে, এসিসি তার একটি অঙ্গসংগঠন, আর দিনশেষে আমরা বাংলাদেশ সরকারের অধীনে কাজ করি।
প্রশ্ন: বিবৃতি না দিয়ে দেশে ফিরে আলোচনা করা যেত কি না…
বুলবুল: তদন্ত কমিটি গঠন সিদ্ধান্তটি তো তখনই হয়ে গিয়েছিল। তাই আমরা বিবৃতি দিয়েছি। এটা তো কোনো বিবাদ নয়, এটা পেশাদারিত্বের ব্যাপার। আমরা আমাদের অবস্থান পরিষ্কার করেছি এবং সেটি আমাদের সবার ভালোর জন্য।
প্রশ্ন: তদন্ত কমিটি কি আপনাকে ডেকেছে?
বুলবুল: এটা যেহেতু একটা স্বাধীন কমিটি, এখানে কিছু আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা যাবে না। আমি এখানে কিছু বলব না।
প্রশ্ন: অল্প সময়ে দুই পরিচালকের পদত্যাগ কীভাবে দেখেন
বুলবুল: এটাও সম্পূর্ণ তাদের ব্যক্তিগত। আমি নিজেও কিন্তু একজন পরিচালক। হ্যাঁ, এটা যার যার ব্যক্তিগত ব্যাপার, সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত। তবে তারা পদত্যাগ করেছেন, আমরা তো এখনো গ্রহণ করিনি। তাদের সঙ্গে কথা বলব। তা ছাড়া মিডিয়া কমিটির চেয়ারম্যানকে তো সরিয়ে দেওয়া হয়নি। এটা আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
প্রশ্ন: টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে না খেলার সিদ্ধান্তটি কি ভুল ছিল?
বুলবুল: বিশ্বকাপে খেলার জন্য খুব চেষ্টা করেছি। দিন শেষে আমিও তো একজন ক্রিকেটার। এর বেশি কিছু বলতে চাই না।
প্রশ্ন: আইসিসির সঙ্গে সম্পর্কের উন্নতি কি হয়েছে?
বুলবুল: আলহামদুলিল্লাহ, বিষয়টি এখন পুরোপুরি সমাধান হয়ে গেছে। আপনারা জানেন, মাঝখানে অনেক কিছু ঘটেছে, যার সবকিছু হয়তো গণমাধ্যমে আসে না। সে সময়কার সরকারের যে সিদ্ধান্ত ছিল, তা আমাকে মেনে নিতে হয়েছে। আর এখন যে সরকার দায়িত্বে আছে, তাদের সিদ্ধান্তও আমাদের মানতে হবে। শুরু থেকেই আমি বলে আসছি, আমরা সরকারের অধীনেই কাজ করি।
প্রশ্ন: বিশ্বকাপ নিয়েও তদন্তের কথা বলেছেন ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী, কী ভাবছেন?
বুলবুল: সেটি নিয়ে আমার আসলে ধারণা নেই, আমি কিছু শুনিনি। সবই আমি পত্রিকার মাধ্যমে জানতে পেরেছি। অনুসন্ধান তো সরকার করতেই পারে। তাদের কথা তো আমরা শুনব, শুনছি। আবারও বলছি, ফাহিম ভাইসহ সংশ্লিষ্টরা বিশ্বকাপে খেলার জন্য জাতীয় দলের স্কোয়াড চূড়ান্ত করেছিল। আমাদের দলের যাওয়ার প্রস্তুতিও ছিল, কোথায় খেলবে, না খেলবে—সবই নির্ধারিত ছিল। তবে শেষ পর্যন্ত আমাদের সরকারের সিদ্ধান্তকে মানতে হয়েছে।
প্রশ্ন: বর্তমানে বিসিবিতে কি দ্বন্দ্ব কাজ করছে? সেসব কাটিয়ে ওঠা কি সহজ হবে?
বুলবুল: আমি কোথাও কোনো মতবিরোধ বা দ্বন্দ্ব দেখছি না। বোর্ড তার নিজস্ব নিয়মে স্বাভাবিকভাবেই পরিচালিত হচ্ছে। আমাদের জাতীয় দল খেলছে, আর মেয়েদের দল শ্রীলংকার বিপক্ষে খেলার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। সামগ্রিকভাবে আমাদের সব কার্যক্রম স্বাভাবিকভাবেই চলছে। কোথাও কোনো মতবিরোধের লক্ষণ নেই। এটা তো নির্বাচিত একটা কমিটি। সাড়ে পাঁচ মাস ধরে বোর্ড চলছে। আসলে এ ধরনের প্রশ্ন আমরা আশা করি না।
প্রশ্ন: বিসিবির নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট হিসেবে নতুন মেয়াদে চ্যালেঞ্জ কেমন…
বুলবুল: প্রথম চার মাস এবং পরের পাঁচ মাস—দুটি ভিন্ন ধাপের মধ্য দিয়ে আমি যাচ্ছি এবং অনেক ক্ষেত্রেই নির্বাচিত অংশটুকুই বেশ চ্যালেঞ্জিং মনে হচ্ছে। এই মুহূর্তে আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, আমরা জেলা পর্যায়ে ক্রিকেট কার্যক্রম শুরু করতে পেরেছি এবং সেখানে নিয়মিত খেলা চলছে। তবে আমাদের মূল আয়োজন, অর্থাৎ অন্তত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইভেন্ট হলো ৫০ ওভারের ঢাকা প্রিমিয়ার লিগ। থার্ড ডিভিশন শিগগির শুরু হবে। প্রথম ও দ্বিতীয় বিভাগ লিগ এরই মধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। এখন প্রিমিয়ার লিগ আয়োজনের জন্য আমরা পুরোপুরি প্রস্তুত। ক্রিকেট বোর্ডের অনুদান রয়েছে, আম্পায়ার প্রস্তুত, মাঠ প্রস্তুত, স্কোরারও প্রস্তুত, খেলোয়াড়রাও প্রস্তুত। আমরা শুধু ক্লাবের জন্য অপেক্ষা করছি। তারপরও এমন বিলম্ব খেলোয়াড়দের মতো আমাদের মর্মাহত করছে। আপনাদের কাছেই প্রশ্ন, ‘এরপর আমরা আর কী করতে পারি?’
প্রশ্ন: লিগ হয়েও তো হলো না?
বুলবুল: আমি এটাই বলতে চাচ্ছিলাম। তারপর ওই যে আরেকটা সিসিডিএম কাপ করতে হলো। এটা কি বিসিসিআই বা পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড বা ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া করে? ক্রিকেটারদের জন্য আমরা করেছি। আমাদের একটা জায়গায় দাঁড়াতে হবে তো। মেয়েদের লিগগুলোও তো হচ্ছে না।
প্রশ্ন: বিসিবি এখন কী কী কাজ করছে?
বুলবুল: আমরা এরই মধ্যে আঞ্চলিক ক্রিকেটের হেড নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষ করেছি এবং শিগগির চূড়ান্ত করা হবে। বিভিন্ন আঞ্চলিক সংস্থাগুলো শক্তিশালী করতে ব্যাটিং, ফিল্ডিং, উইকেটকিপিং, স্পিন ও ফাস্ট বোলিংয়ে প্রায় ২০ জন বিশেষজ্ঞ কোচ আমরা তালিকাভুক্ত করেছি। তারা নতুন প্রতিভা খুঁজে বের করতে এবং সব রিজিওনকে সমর্থন দিতে কাজ করবে। লেভেল ১, ২ ও ৩ কোর্সে মৌলিক বিষয় শেখানো হয়। এখন আমরা বিশেষভাবে স্পেশালাইজেশনের ওপর জোর দিচ্ছি, যাতে কোচরা নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে দক্ষ হয়ে উঠতে পারেন। এরই মধ্যে ব্যাটিংয়ে প্রায় ২০ জন কোচ প্রস্তুত; অন্যান্য ক্ষেত্রে প্রস্তুত হলে তারা স্পেশালিস্ট হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবেন।