বেকারত্বের চাপেই কি নষ্ট হবে তারুণ্যের সম্ভাবনা?
১২ আগস্ট আন্তর্জাতিক যুব দিবস। তারুণ্যের বিকাশ ও উন্নয়নে ১৯৯৮ সালে পর্তুগালের রাজধানী লিসবনে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের ‘ওয়ার্ল্ড কনফারেন্স অব মিনিস্টার রেসপনসিবল ফর ইয়ুথ’ ১২ আগস্টকে ‘আন্তর্জাতিক যুব দিবস’ হিসেবে উদযাপনের প্রস্তাব করে। পরের বছর ১৯৯৯ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে দিনটিকে ‘আন্তর্জাতিক যুব দিবস’ হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সেই থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দিনটি পালন করা হচ্ছে। এদিকে দেশে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য ও বিভিন্ন প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, বাংলাদেশে বেকারের সংখ্যা প্রায় ২৬ লাখ ২৪ হাজার থেকে ৩৫ লাখ। এছাড়া উচ্চশিক্ষিত ও নারীদের মধ্যে বেকারত্বের হার তুলনামূলকভাবে বেশি। পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) জরিপ ও আইএলও-র পূর্বাভাস অনুযায়ী, দেশের কর্মক্ষম জনসংখ্যার একটি বড় অংশ এখনো মানসম্মত কর্মসংস্থানের বাইরে এবং বেকারত্বের হার প্রায় ৪.৮ শতাংশ থেকে ৫.০ শতাংশ। উচ্চশিক্ষিত বেকার যুবকদের ৩২ শতাংশ। দেশে প্রায় ১৯ লাখ ৪০ হাজার যুবক বেকার। স্নাতক পর্যায়েই বেকারত্বের হার ১৩.৫ শতাংশ। বাংলাদেশ শ্রমশক্তি জরিপের প্রতিবেদনে জানা গেছে, ১
১২ আগস্ট আন্তর্জাতিক যুব দিবস। তারুণ্যের বিকাশ ও উন্নয়নে ১৯৯৮ সালে পর্তুগালের রাজধানী লিসবনে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের ‘ওয়ার্ল্ড কনফারেন্স অব মিনিস্টার রেসপনসিবল ফর ইয়ুথ’ ১২ আগস্টকে ‘আন্তর্জাতিক যুব দিবস’ হিসেবে উদযাপনের প্রস্তাব করে। পরের বছর ১৯৯৯ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে দিনটিকে ‘আন্তর্জাতিক যুব দিবস’ হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সেই থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দিনটি পালন করা হচ্ছে।
এদিকে দেশে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য ও বিভিন্ন প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, বাংলাদেশে বেকারের সংখ্যা প্রায় ২৬ লাখ ২৪ হাজার থেকে ৩৫ লাখ। এছাড়া উচ্চশিক্ষিত ও নারীদের মধ্যে বেকারত্বের হার তুলনামূলকভাবে বেশি। পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) জরিপ ও আইএলও-র পূর্বাভাস অনুযায়ী, দেশের কর্মক্ষম জনসংখ্যার একটি বড় অংশ এখনো মানসম্মত কর্মসংস্থানের বাইরে এবং বেকারত্বের হার প্রায় ৪.৮ শতাংশ থেকে ৫.০ শতাংশ। উচ্চশিক্ষিত বেকার যুবকদের ৩২ শতাংশ। দেশে প্রায় ১৯ লাখ ৪০ হাজার যুবক বেকার। স্নাতক পর্যায়েই বেকারত্বের হার ১৩.৫ শতাংশ।
বাংলাদেশ শ্রমশক্তি জরিপের প্রতিবেদনে জানা গেছে, ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের মধ্যে বেকারের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। এই বয়সসীমার মধ্যে স্নাতক ডিগ্রি নিয়ে ২ বছরের বেশি সময় ধরে বেকার থাকেন ১৭ শতাংশের বেশি তরুণ। এই হার অন্য ডিগ্রিধারীর চেয়ে বেশি। উচ্চমাধ্যমিক পাস করে ২ বছরের বেশি সময় বেকার থাকেন ৮ শতাংশের বেশি। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেই এমন তরুণদের মধ্যে বেকারের হার ১ শতাংশের মতো। এদিকে জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের (ইউএনএফপিএ) স্টেট অব ওয়ার্ল্ড পপুলেশন ২০২৫ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে প্রায় ১১ কোটি ৫০ লাখ কর্মক্ষম মানুষ রয়েছে (১৫-৬৪ বছর বয়সী), যা মোট জনসংখ্যার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ। অর্থনীতির ভাষায় এটি ‘জনমিতিক মুনাফা’-যা সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারলে দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব।

যুবশক্তির জাগরণেই বদলায় সমাজ
চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর ও ভিয়েতনামের মতো দেশগুলো দক্ষতা উন্নয়ন ও উৎপাদনশীল কর্মসংস্থানের মাধ্যমে এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে উন্নয়নের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। বাংলাদেশও বর্তমানে একই সম্ভাবনার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে। বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যা প্রায় ১৭ কোটি ৫৭ লাখ। জনসংখ্যার দিক থেকে বিশ্বে সপ্তম হলেও আয়তনে ৯১তম অবস্থানে থাকা দেশটি বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ রাষ্ট্র। ১৯৪৭ সালে পূর্ব পাকিস্তানের জনসংখ্যা ছিল প্রায় চার কোটি ৪০ লাখ; ১৯৭১ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় সাত কোটিতে।
স্বাধীনতার পর গত পাঁচ দশকে জনসংখ্যা বেড়ে প্রায় ১৮ কোটিতে পৌঁছেছে। কিন্তু এই বিপুল জনসংখ্যার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কর্মসংস্থান তৈরি না হওয়ায় বেকারত্ব ক্রমেই উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ ত্রৈমাসিক শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে (অক্টোবর-ডিসেম্বর) দেশে বেকারত্বের হার বেড়ে ৪.৬৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছিল। যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৩.৯৫ শতাংশ। একই অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই- সেপ্টেম্বর) এই হার ছিল ৪.৪৯ শতাংশ।
রাজনৈতিক অস্থিরতা, গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী পরিস্থিতি এবং শিল্পাঞ্চলে শ্রমিক অসন্তোষের কারণে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে স্থবিরতা তৈরি হওয়াও এই বৃদ্ধির একটি কারণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে বেকারের সংখ্যা ছিল ২৫ লাখ ৫০ হাজার, যা ২০২৪ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৭ লাখে। একই সময়ে সামগ্রিক বেকারত্বের হার ৪.১৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪.৪৮ শতাংশ হয়েছে। আরও উদ্বেগজনক হলো-শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের হারও কমছে। ২০২৪ সালের অক্টোবর-ডিসেম্বর প্রান্তিকে এটি ৫০.২৭ শতাংশ থেকে কমে ৪৮.৪১ শতাংশে নেমে এসেছে, যার প্রধান কারণ নারী শ্রমশক্তির অংশগ্রহণ হ্রাস। ২০২৪ সালের শেষ প্রান্তিকে মোট পাঁচ কোটি ৮৯ লাখ ৩০ হাজার শ্রমশক্তির মধ্যে কর্মসংস্থানে ছিল পাঁচ কোটি ৬২ লাখ মানুষ- যা আগের বছরের তুলনায় কম।
অর্থাৎ কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগোতে পারছে না। বিশেষভাবে উদ্বেগজনক হলো যুব বেকারত্ব। বিবিএসের তথ্যানুযায়ী, ২০২৩ সালে প্রায় ১৯ লাখ ৪০ হাজার যুবক বেকার ছিল, যা যুব শ্রমশক্তির ৭.২ শতাংশ। এর মধ্যে ৩১.৫ শতাংশই উচ্চশিক্ষিত। ২০২৪ সালে স্নাতক পর্যায়ের বেকারত্বের হার দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৩.৫ শতাংশ- যা প্রমাণ করে, উচ্চশিক্ষা অর্জন করেও কর্মসংস্থান নিশ্চিত হচ্ছে না। বাস্তবতা হলো-শিক্ষার স্তর যত বাড়ছে, বেকার থাকার ঝুঁকিও তত বাড়ছে। গত তিন দশকে সরকার ও উন্নয়ন অংশীদাররা কর্মসংস্থান সৃষ্টি, কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা সম্প্রসারণ এবং দক্ষতা উন্নয়নে নানা কর্মসূচি গ্রহণ করেছে।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা, জাতিসংঘ, বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের সহায়তায় বিপুল অর্থ ব্যয় হলেও প্রত্যাশিত ফল এখনো অর্জিত হয়নি। তবে যথাযথ পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন না হলে এই সম্ভাবনা বেকারত্বের চাপেই নষ্ট হয়ে যেতে পারে। এই প্রেক্ষাপটে সরকার মানবশক্তিকে মানবসম্পদে রূপান্তরের লক্ষ্য নিয়ে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। সরকারি শূন্য পদে নিয়োগ, বেসরকারি চাকরিজীবীদের জন্য সার্ভিস রুল, পেনশন ব্যবস্থা এবং বেকারভাতা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
তথ্যপ্রযুক্তি খাতে ১০ লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, পাশাপাশি হাইটেক পার্ক ও আইসিটি অবকাঠামো সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। এ ছাড়া আগামী পাঁচ বছরে দুই লাখ ফ্রিল্যান্সারকে আইডি কার্ড প্রদান, হাজার হাজার তরুণকে আইটি প্রশিক্ষণ, এআই, ডাটা অ্যানালাইটিক্স ও সাইবার সিকিউরিটি বিষয়ে দক্ষতা উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
অনলাইন পেমেন্ট গেটওয়ে ‘পেপ্যাল’ চালুর উদ্যোগও ফ্রিল্যান্সিং খাতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। স্বাস্থ্য খাতে এক লাখ কর্মী নিয়োগ, কৃষিতে ভর্তুকি, সহজ ঋণ ও কৃষি বীমা চালু, কৃষিভিত্তিক শিল্পায়ন এবং উত্তরাঞ্চলে শিল্প স্থাপনের উদ্যোগ কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে সহায়ক হতে পারে। পাশাপাশি ক্রীড়া ও উদ্যোক্তা উন্নয়নকেও কর্মসংস্থানের বিকল্প খাত হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। সব মিলিয়ে, বাংলাদেশের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, বিপুল জনসংখ্যাকে বোঝা নয়, সম্পদে রূপান্তর করা। এজন্য প্রয়োজন বাস্তবমুখী শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন, শিল্পায়ন এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা। অন্যথায় জনমিতিক মুনাফার এই সুবর্ণ সুযোগ হাতছাড়া হওয়ার ঝুঁকি থেকেই যাবে।
কেএসকে
What's Your Reaction?
