বোরোর উৎপাদন ব্যয়ের চড়া মূল্যে দিশাহারা কৃষক
দেশের অন্যতম শস্য ভান্ডার হিসেবে পরিচিত নওগাঁ জেলা। ধান-চাল উৎপাদনে উত্তরাঞ্চলের এ জেলা বরাবরই গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে আসছে। আবার শস্য ভান্ডার খ্যাত উত্তরের এ জেলার প্রধান পেশা কৃষি। অনেকটা কৃষির ওপর নির্ভর করেই চলে তাদের জীবিকার চাকা। কাজেই চলতি বোরো মৌসুমেও মাঠ ভরা সোনালী ধানের সমারোহে আশাবাদী ছিলেন জেলার কৃষকরা। কিন্তু ভালো ফলনের আনন্দ হতাশায় পরিণত হয়েছে বাজারে ধানের কম দামে। উৎপাদন ব্যয় ক্রমাগত বেড়ে যাওয়ায় বর্তমান বাজারদরে ধান বিক্রি করে আশানুরূপ লাভ তো দূরের কথা, অনেক কৃষকই খরচ তুলতে হিমশিম খাচ্ছেন। যার কারণে ভরা মৌসুমে মাঠে সোনালি ধানের হাসি ফুটলেও কৃষকের মুখে নেই সেই হাসি। ভালো ফলনের পরও ন্যায্য দাম না পাওয়ার আক্ষেপ যেন কৃষকের হতাশার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে এ জেলার কৃষকদের প্রত্যাশা, তাদের ঘামঝরা শ্রমের যথাযথ মূল্য নিশ্চিত করতে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। নওগাঁ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে নওগাঁয় ১ লাখ ৯২ হাজার ৪৭৭ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। এসব জমি থেকে প্রায় ৮ লাখ ৭০ হাজার ৬৫ টন ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা
দেশের অন্যতম শস্য ভান্ডার হিসেবে পরিচিত নওগাঁ জেলা। ধান-চাল উৎপাদনে উত্তরাঞ্চলের এ জেলা বরাবরই গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে আসছে। আবার শস্য ভান্ডার খ্যাত উত্তরের এ জেলার প্রধান পেশা কৃষি। অনেকটা কৃষির ওপর নির্ভর করেই চলে তাদের জীবিকার চাকা।
কাজেই চলতি বোরো মৌসুমেও মাঠ ভরা সোনালী ধানের সমারোহে আশাবাদী ছিলেন জেলার কৃষকরা। কিন্তু ভালো ফলনের আনন্দ হতাশায় পরিণত হয়েছে বাজারে ধানের কম দামে। উৎপাদন ব্যয় ক্রমাগত বেড়ে যাওয়ায় বর্তমান বাজারদরে ধান বিক্রি করে আশানুরূপ লাভ তো দূরের কথা, অনেক কৃষকই খরচ তুলতে হিমশিম খাচ্ছেন।
যার কারণে ভরা মৌসুমে মাঠে সোনালি ধানের হাসি ফুটলেও কৃষকের মুখে নেই সেই হাসি। ভালো ফলনের পরও ন্যায্য দাম না পাওয়ার আক্ষেপ যেন কৃষকের হতাশার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে এ জেলার কৃষকদের প্রত্যাশা, তাদের ঘামঝরা শ্রমের যথাযথ মূল্য নিশ্চিত করতে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
নওগাঁ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে নওগাঁয় ১ লাখ ৯২ হাজার ৪৭৭ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। এসব জমি থেকে প্রায় ৮ লাখ ৭০ হাজার ৬৫ টন ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। কৃষকরা জানান, এবার প্রতি বিঘায় ২২ থেকে ২৪ মণ পর্যন্ত ধান উৎপাদন হয়েছে। তবে ফলন ভালো হলেও বাজারমূল্য প্রত্যাশার তুলনায় অনেক কম।
জেলার কৃষকের তথ্যমতে, বোরো আবাদে প্রতি বিঘা জমিতে এ বছর চাষ বাবদ ১ হাজার ৬০০ টাকা, ধানের চারা রোপণ বাবদ ২ হাজার ৫০০ টাকা, সেচ খরচ বাবদ এলাকা ভেদে ২ হাজার থেকে ২৫০০ টাকা। আবার একাধিক জায়গায় বিঘা প্রতি তিন ভাগের এক ভাগ ধান দিয়ে পানির মূল্য দিতে হয়। ৩৫-৪৫ কেজি ইউরিয়া সার বাবদ ১ হাজার ২০০ টাকা, ২০ কেজি ডিএপি সার বাবদ ৬০০, ১৫ কেজি এমওপি সার বাবদ ৩০০ টাকা, ৪ ডোজ কীটনাশক প্রয়োগ বাবদ ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার, দেড় থেকে ২ কেজি জিংক বাবদ ৩৭৫ টাকা থেকে ৫০০, ধান কাটা বাবদ মাড়াই মেশিনে ৫ হাজার থেকে ৬ হাজার টাকা এবং শ্রমিক দিয়ে সাড়ে ৭ হাজার থেকে ৮ হাজার টাকা, সেই হিসাবে মোট খরচের পরিমাণ ১৮ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকার মতো খরচ হয়।
সরেজমিনে জেলার বিভিন্ন হাটবাজার ঘুরে দেখা গেছে, রাণীনগর উপজেলার আবাদপুকুর হাটে গুটি স্বর্ণা ধান প্রতি মণ ১ হাজার ১৬০ টাকা, স্বর্ণা-৫ ধান ১ হাজার ২১০ টাকা, মিনিকেট ১ হাজার ৬০০ টাকা এবং কাটারি ধান ১ হাজার ৫০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। অন্যদিকে জেলার মহাদেবপুর উপজেলার চকগৌরি হাটে জিরাশাইল ধান বিক্রি হচ্ছে প্রতি মণ ১ হাজার ৩০০ থেকে ১ হাজার ৩৫০ টাকা এবং সুবর্নলতা ধান ১ হাজার ২৬০ থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকায়।
কৃষকদের অভিযোগ, মাত্র কিছুদিনের ব্যবধানে ধানের দাম মণপ্রতি ৮০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত কমে গেছে। বর্তমান বাজারদরে তাদের লাভের সম্ভাবনা প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে।
নওগাঁ সদর উপজেলার বর্ষাইল গ্রামের কৃষক রুবেল হোসেন বলেন, ৬ বিঘা জমিতে এবার জিরাশাইল জাতের ধানের আবাদ করেছিলাম। এবার প্রতি বিঘায় ২২ মণ হারে ধান পেয়েছি। ধানের দাম কম হওয়ায় সামান্য কিছু ধান বিক্রি করেছি আর বাকি ধানগুলো সংরক্ষণ করে রেখেছি। বরাবর কৃষকরাই ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হয়। সরকারের বিশেষ দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন কৃষিখাতে ও কৃষকদের উন্নয়নে।
মান্দা উপজেলার তুলসিরামপুর এলকার কৃষক হামিদুর রহমান বলেন, প্রতি বিঘায় সার, সেচ, কাটা-মাড়াই, কীটনাশক, শ্রমিকসহ উৎপাদন খরচ ১৮ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকা পড়ে যায়। এবার ৫ বিঘা জমিতে স্বর্ণা-৫ জাতের ধানের আবাদ করেছিলাম। ২২ মণ হারে প্রতি বিঘায় ধান পেয়েছি। বাজারে বর্তমানে ধানের দাম ১ হাজার ২০০ টাকা মণ। ২২ মণ ধান বিক্রি করে টাকা পেয়েছি ২৬ হাজার ৬২০ টাকা। এই লাভ দিয়ে কীভাবে আবার আমন আবাদ করবো আর পরিবার চালাবো।
জেলার রাণীনগর উপজেলার একাধিক কৃষক বলেন, বর্তমানে সব ধরনের ধানের দাম ৮০ থেকে ১০০ টাকা কমেছে। অথচ ধান উৎপাদনের জন্য উপকরণের দাম বেশি হওয়ায় খরচ বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রতি বিঘায় উৎপাদন খরচ ১৮ থেকে ২০ হাজার। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, মণপ্রতি ১৮০০ থেকে ২ হাজার টাকা প্রকারভেদে ধানের দাম হলে আমরা পুষিয়ে নিতে পারতাম। হিসাব করতে গেলে প্রতি বিঘায় সব খরচ বাদ দিয়ে ৭ থেকে ৮ হাজার টাকা লাভ হয়। এই লাভে ধানের আবাদ পোষাচ্ছে না। নিজের জমি হলে কোনোমতে চলতে পারবে। আর জমা নিয়ে যারা ধান চাষ করেছে, তাদের এবার মাথায় হাত। কারণ জমা বাবদ তাদের আলাদা করে বিঘা প্রতি ১০ হাজার টাকা দিতে হয় জমির মালিককে। আর এসব কারণে মনে হয় আগামীতে অন্য কিছু ভাবতে হবে।
কৃষকদের দাবি, সব খরচ বাদ দিয়ে প্রতি বিঘায় ৬ থেকে ৮ হাজার টাকার মতো লাভ হয়। এটা দিয়ে সংসার চালানো আর ধানের আবাদ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। কাজেই উৎপাদন খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সরকারিভাবে ধানের ক্রয়মূল্য নির্ধারণ এবং সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ধান সংগ্রহের উদ্যোগ বাড়ানো প্রয়োজন। অন্যথায় ভবিষ্যতে অনেক কৃষক ধান চাষে আগ্রহ হারিয়ে ফেলতে পারেন।
জেলা চালকল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ফরহাদ হোসেন চকদার বলেন, নওগাঁর বাজারগুলোতে সব ধরনের ধানের দাম কিছুটা কম। সপ্তাহের ব্যবধানে দাম কিছুটা কমেছে। যে হাটে আমদানি বেশি, সে হাটে দাম কম হয় ধানের। আবার যে হাটে আমদানি কম হয়, সে হাটে দাম কিছুটা বৃদ্ধি পায়। বর্তমানে কৃষকরা আউশ চাষের প্রস্তুতি নিচ্ছে। তাই হয়তো খরচ যোগাতে বেশি পরিমাণে হাটে ধান বিক্রি করছে। তবে আগামীতে ধানের দাম বৃদ্ধি পেতে পারে।
সিপিবির নওগাঁ সদর উপজেলার সাধারণ সম্পাদক আলিমুর রেজা রানা কালবেলাকে বলেন, নওগাঁ কৃষিপ্রধান জেলা। এখানে প্রচুর পরিমাণে ধান উৎপাদন হয়ে থাকে। কিন্তু বর্তমানে ধানের দাম কম। কৃষকরা ধানের ন্যায্যমূল্য থেকে বরাবরই বঞ্চিত হয়ে থাকে। আমরা বরাবরই কৃষকদের জন্য কথা বলে আসছি। আমি মনে করি কৃষকদের বাঁচাতে সরকারকে ইউনিয়ন পর্যায়ে ক্রয়কেন্দ্র করতে হবে এবং সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে নায্যমূল্যে ধান কিনতে হবে। কারণ বেশির ভাগ কৃষকই সারসহ বিভিন্ন উপকরণ বাকিতে ক্রয় করে থাকে। এই কারণে ধান কাটার সঙ্গে সঙ্গে বিক্রি করে দিয়ে তাদের ধার শোধ করতে হবে। আর এই সুযোগটা নিচ্ছে বিভিন্ন ব্যবসায়ীরা। এছাড়া সরকারের উচিত হবে উৎপাদনের শুরুতেই কৃষকদের কথা বিবেচনা করে সারসহ, পানির মূল্য কমানো, অথবা কৃষকদের ভর্তুকি দেওয়া। তা না হলে ধানের আবাদ থেকে অনেক প্রান্তিক কৃষকরা মুখ ফিরিয়ে নেবেন। এর ফলে খাদ্য সংকট দেখা দিতে পারে।
এ বিষয়ে নওগাঁ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. মনজুর রহমান বলেন, অনেক কৃষক ধান কাটার পরপরই বিক্রি করে দেন, ফলে কাঙ্খিত মূল্য পান না। বাজারে ভালো দাম পেতে হলে সংরক্ষণের ব্যবস্থা থাকতে হবে। ধানগুলো কিছুদিন নিজ সংরক্ষণে রেখে যদি বিক্রি করে, তবে দাম ভালো পাবে। কৃষকদের স্বার্থ রক্ষায় জেলা প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে কৃষি বিভাগ বাজার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে।
What's Your Reaction?