ব্যাংক ও আর্থিক খাত পুনর্গঠনই নতুন সরকারের বড় পরীক্ষা

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়লাভ করে সরকার গঠন করতে যাচ্ছে বিএনপি ও তাদের জোটসঙ্গীরা। তবে আগের যে কোনো সময়ের তুলনায় এবার পরিস্থিতি অনেক বেশি জটিল। বিশ্লেষকদের মতে, নতুন সরকারের সামনে আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, খেলাপি ঋণ কমানো ও বিনিয়োগে আস্থা ফেরানোর মতো কঠিন কাজ অপেক্ষা করছে। সব মিলিয়ে ব্যাংক ও আর্থিক খাত পুনর্গঠন এখন আগামী সরকারের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। শক্তিশালী আইনি কাঠামো, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সক্ষমতা বৃদ্ধি, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ কমানো ও সুশাসন নিশ্চিত করা- এসব পদক্ষেপ সমন্বিতভাবে বাস্তবায়ন করে সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, একটি স্থিতিশীল ও পূর্বানুমানযোগ্য আর্থিকব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারলেই কেবল বিনিয়োগ বাড়বে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে ও দেশের অর্থনীতি টেকসই পুনরুদ্ধারের পথে এগোবে। এখন দেখার বিষয়, নতুন সরকার কত দ্রুত ও কার্যকরভাবে এই বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে পারে। খেলাপি ঋণে রেকর্ড বোঝাব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশে। অর্থের হিসাবে যা ৬ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকারও বেশি। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে এ হার ছিল ১৬ দশমিক ৯৩ শতাংশ। একই সংক

ব্যাংক ও আর্থিক খাত পুনর্গঠনই নতুন সরকারের বড় পরীক্ষা

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়লাভ করে সরকার গঠন করতে যাচ্ছে বিএনপি ও তাদের জোটসঙ্গীরা। তবে আগের যে কোনো সময়ের তুলনায় এবার পরিস্থিতি অনেক বেশি জটিল। বিশ্লেষকদের মতে, নতুন সরকারের সামনে আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, খেলাপি ঋণ কমানো ও বিনিয়োগে আস্থা ফেরানোর মতো কঠিন কাজ অপেক্ষা করছে।

সব মিলিয়ে ব্যাংক ও আর্থিক খাত পুনর্গঠন এখন আগামী সরকারের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। শক্তিশালী আইনি কাঠামো, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সক্ষমতা বৃদ্ধি, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ কমানো ও সুশাসন নিশ্চিত করা- এসব পদক্ষেপ সমন্বিতভাবে বাস্তবায়ন করে সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, একটি স্থিতিশীল ও পূর্বানুমানযোগ্য আর্থিকব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারলেই কেবল বিনিয়োগ বাড়বে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে ও দেশের অর্থনীতি টেকসই পুনরুদ্ধারের পথে এগোবে। এখন দেখার বিষয়, নতুন সরকার কত দ্রুত ও কার্যকরভাবে এই বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে পারে।

খেলাপি ঋণে রেকর্ড বোঝা
ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশে। অর্থের হিসাবে যা ৬ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকারও বেশি। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে এ হার ছিল ১৬ দশমিক ৯৩ শতাংশ। একই সংকট বিরাজ করছে আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাতেও।

অর্থনীতিবিদদের মতে, এ পরিস্থিতি শুধু ব্যাংকিং খাত নয়, সামগ্রিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতার জন্য বড় ঝুঁকি। এই ঊর্ধ্বগতির প্রেক্ষাপটে খেলাপি ঋণ আদায়ে কার্যকর ও জোরালো উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।

তারা জানান, রাজনৈতিক প্রভাব, ঋণ পুনঃতফসিলের অপব্যবহার ও ইচ্ছাকৃতভাবে ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ার সংস্কৃতি পরিস্থিতিকে জটিল করেছে। খেলাপি ঋণ কমাতে উৎপাদনমুখী খাতে গতি ফেরানো এবং কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। পাশাপাশি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং আর্থিক খাতে প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন নিশ্চিত করাও সময়ের দাবি।
 ব্যাংক ও আর্থিক খাত পুনর্গঠনই নতুন সরকারের বড় পরীক্ষা

একটি স্থিতিশীল ও পূর্বানুমানযোগ্য ব্যাংকিং ও আর্থিকব্যবস্থা গড়ে তোলা এখন বড় চ্যালেঞ্জ। একই সঙ্গে খেলাপি ঋণ আদায় এবং পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনা অগ্রাধিকার হিসেবে সামনে এসেছে। এছাড়া, চলমান নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণে দেশীয় ও বিদেশি বিনিয়োগে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। অনেক বিনিয়োগকারীই নতুন প্রকল্পে এগোতে অনাগ্রহী। এ অবস্থায় একটি স্বচ্ছ, শক্তিশালী ও আস্থাভিত্তিক আর্থিক পরিবেশ তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি। এমন পরিবেশ কেবল দেশীয় উদ্যোক্তাদের জন্য নয়, আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারী ও বৈশ্বিক ক্রেতাদের কাছেও নতুন চুক্তি ও বিনিয়োগ সিদ্ধান্তে আস্থা সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

গবেষণা প্রতিষ্ঠান চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের রিসার্চ ফেলো অর্থনীতিবিদ এম হেলাল আহমেদ জনি বলেন, নতুন সরকারের জন্য ব্যাংক ও আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা কঠিন হলেও অত্যন্ত জরুরি দায়িত্ব। তার মতে, খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৬ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছানো শুধু ব্যাংকিং খাতের নয়, পুরো অর্থনীতির জন্যই বড় ধরনের ঝুঁকির ইঙ্গিত দেয়।

তিনি সতর্ক করেন, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, ঋণ পুনঃতফসিলের অপব্যবহার এবং ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে যাবে এবং সুশাসন ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই চলমান ব্যাংক খাত সংস্কার কার্যক্রম অব্যাহত রাখা, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সক্ষমতা ও স্বাধীনতা জোরদার করা এবং সব ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি শক্তিশালী করার ওপর জোর দেওয়া প্রয়োজন।

আর্থিক খাতে অনিয়মের উত্তরাধিকার
বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সরকারের মেয়াদে আর্থিক খাতে ব্যাপক অনিয়ম, দুর্নীতি ও অর্থপাচারের অভিযোগ ওঠে। একাধিক ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান নিয়ন্ত্রণ নিয়ে লুটপাটের ঘটনা এবং অর্থ বিদেশে পাচারের ফলে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান কার্যত অচল হয়ে পড়ে। বহু আমানতকারী তাদের জমাকৃত অর্থ ফেরত পেতে অনিশ্চয়তায় পড়েন।

এই প্রেক্ষাপটে অন্তর্বর্তী সরকার সংকটাপন্ন পাঁচটি ব্যাংককে একীভূত করে। ব্যাংকগুলো হলো- ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক এবং এক্সিম ব্যাংক। এই পাঁচ ব্যাংকে প্রায় ৭৫ লাখ হিসাবধারী এবং ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকার আমানত রয়েছে। এগুলোকে একত্র করে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ গঠন করা হয়েছে।

পাশাপাশি আরও ছয়টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান বন্ধের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করাও সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

আরও পড়ুন
ভঙ্গুর অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে নতুন রাষ্ট্রনায়কের সামনে যত চ্যালেঞ্জ
শেয়ারবাজারে গতি ফেরার আশা
নতুন সরকারের কাছে শান্তি ও স্বস্তি চায় সাধারণ মানুষ

বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের সংকট
গণঅভ্যুত্থান ও রাজনৈতিক অস্থিরতার পর দেশের অর্থনীতি গভীর অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে। এতে নতুন বিনিয়োগ স্থবির হয়ে যায়, কর্মসংস্থান মারাত্মকভাবে প্রভাবিত হয় ও রপ্তানিমুখী শিল্পেও ধাক্কা লাগে। ফলে রপ্তানি আয়েও নেতিবাচক প্রবণতা দেখা দেয়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বন্ধ হয়ে যাওয়া শিল্প ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান পুনরায় চালু করে দ্রুত কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। কারণ নতুন কারখানা স্থাপন করে কর্মসংস্থান বাড়ানো একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া, তাই তাৎক্ষণিক কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য বিদ্যমান সক্ষমতাকে কাজে লাগানোই হবে বেশি বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমানের মতে, নতুন সরকারের সামনে প্রধান চ্যালেঞ্জগুলো হলো- বিনিয়োগ স্থবিরতা কাটানো, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়ানো ও দেশি-বিদেশি বিনিয়োগে আস্থা ফিরিয়ে আনা। বর্তমানে মূল্যস্ফীতি ৮ শতাংশের ওপরে অবস্থান করছে, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে দিয়েছে। ফলে অর্থনৈতিক স্বস্তি ফিরিয়ে আনা এখন সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার।
 ব্যাংক ও আর্থিক খাত পুনর্গঠনই নতুন সরকারের বড় পরীক্ষা

আইনশৃঙ্খলা ও আস্থার সংকট
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, শিল্প ও ব্যবসা খাতের স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখতে সবার আগে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি প্রয়োজন। একই সঙ্গে দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণ ও জিরো টলারেন্স নীতি কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। তিনি উল্লেখ করেন, অর্থনীতিতে গতি ফেরাতে এই দুটি বিষয়কে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরি।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. আব্দুল বায়েস মনে করেন, নতুন সরকারের প্রথম ও প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা। কারণ নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা ছাড়া দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানো সম্ভব নয়।

তিনি বলেন, বর্তমান আইনি কাঠামো ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে যথেষ্ট কার্যকর নয়। এজন্য আর্থিক খাতের জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনাল বা পৃথক বিচার কাঠামো বিবেচনা করা যেতে পারে। একই সঙ্গে খেলাপি ঋণ উদ্ধার এবং পাচার হওয়া অর্থ ফেরানো এখন সময়ের দাবি।

বৈদেশিক বাণিজ্য ও নীতিগত পুনর্মূল্যায়ন
বিশ্লেষকদের মতে, বৈদেশিক বাণিজ্য সম্পর্কও নতুন সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক চুক্তিগুলো পর্যালোচনা করে দেশের স্বার্থ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক বাজারে আস্থা পুনর্গঠন এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি না হলে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার দীর্ঘমেয়াদি হবে না।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, সামগ্রিক অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখা ও বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনর্গঠন- নতুন সরকারের প্রাথমিক পর্যায়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার হবে। একই সঙ্গে টেকসই প্রবৃদ্ধির জন্য অনুকূল পরিবেশ গড়ে তুলতে সব নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও জরুরি।

অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার কেবল নীতিগত সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করে না; এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে স্থিতিশীলতা, সুশাসন ও আস্থার বিষয়টি। তাই এসব চ্যালেঞ্জ দক্ষতা ও দৃঢ়তার সঙ্গে মোকাবিলা করতে পারলেই নতুন সরকার জনআস্থা ধরে রাখতে পারবে এবং দেশি-বিদেশি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নতুন গতি সঞ্চার করা সম্ভব হবে- এমনটাই মত বিশেষজ্ঞদের।

ইএআর/একিউএফ

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow