ব্রাজিল-জাপান ম্যাচের শেষ ১ মিনিটে কী ঘটেছিল?

ইনজুরি টাইমের শেষ মুহূর্তের নাটকীয় গোলে জাপানকে হারিয়ে বিশ্বকাপের শেষ ষোলোতে জায়গা করে নিয়েছে পাঁচবারের চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল। ম্যাচটি যখন অতিরিক্ত সময়ের দিকে এগোচ্ছিল, ঠিক তখনই ইনজুরি টাইমের শেষ মুহূর্তে (৯৬তম মিনিটে) ব্রুনো গুইমারেসের পাস থেকে বল পেয়ে ব্রাজিলের জয় নিশ্চিত করেন আর্সেনালের তারকা ফরোয়ার্ড গ্যাব্রিয়েল মার্টিনেলি। যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের হিউস্টন শহরের এনআরজি স্টেডিয়ামে গতরাতে ব্রাজিলের এমন শ্বাসরুদ্ধকর জয়ের পর আলোচনা হচ্ছে ইনজুরি টাইমের শেষ এক মিনিটে কী ঘটেছিল? বিশ্বকাপের রাউন্ড অব ৩২-এর ব্রাজিল বনাম জাপান ম্যাচের ইনজুরি টাইমের সেই চরম নাটকীয় মুহূর্তটি ছিল টানটান উত্তেজনা, ট্যাকটিক্যাল ভুল এবং একক নৈপুণ্যের এক অবিশ্বাস্য সংমিশ্রণ। ম্যাচের নির্ধারিত ৯০ মিনিট শেষ হওয়ার পর স্কোরলাইন ছিল ১-১। শুরু থেকেই পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলার চেষ্টা করলেও জাপানের নিখুঁত রক্ষণভাগের সামনে তারা বারবার খেই হারিয়ে ফেলছিল। জাপানি ডিফেন্ডাররা পুরো মাঠজুড়ে স্লাইডিং ট্যাকল, পাস ব্লক এবং ব্রাজিলের তারকাদের স্পেস (জায়গা) না দিয়ে এক দুর্দান্ত ‘ডিফেন্সিভ

ব্রাজিল-জাপান ম্যাচের শেষ ১ মিনিটে কী ঘটেছিল?

ইনজুরি টাইমের শেষ মুহূর্তের নাটকীয় গোলে জাপানকে হারিয়ে বিশ্বকাপের শেষ ষোলোতে জায়গা করে নিয়েছে পাঁচবারের চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল। ম্যাচটি যখন অতিরিক্ত সময়ের দিকে এগোচ্ছিল, ঠিক তখনই ইনজুরি টাইমের শেষ মুহূর্তে (৯৬তম মিনিটে) ব্রুনো গুইমারেসের পাস থেকে বল পেয়ে ব্রাজিলের জয় নিশ্চিত করেন আর্সেনালের তারকা ফরোয়ার্ড গ্যাব্রিয়েল মার্টিনেলি। যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের হিউস্টন শহরের এনআরজি স্টেডিয়ামে গতরাতে ব্রাজিলের এমন শ্বাসরুদ্ধকর জয়ের পর আলোচনা হচ্ছে ইনজুরি টাইমের শেষ এক মিনিটে কী ঘটেছিল?

বিশ্বকাপের রাউন্ড অব ৩২-এর ব্রাজিল বনাম জাপান ম্যাচের ইনজুরি টাইমের সেই চরম নাটকীয় মুহূর্তটি ছিল টানটান উত্তেজনা, ট্যাকটিক্যাল ভুল এবং একক নৈপুণ্যের এক অবিশ্বাস্য সংমিশ্রণ। ম্যাচের নির্ধারিত ৯০ মিনিট শেষ হওয়ার পর স্কোরলাইন ছিল ১-১। শুরু থেকেই পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলার চেষ্টা করলেও জাপানের নিখুঁত রক্ষণভাগের সামনে তারা বারবার খেই হারিয়ে ফেলছিল। জাপানি ডিফেন্ডাররা পুরো মাঠজুড়ে স্লাইডিং ট্যাকল, পাস ব্লক এবং ব্রাজিলের তারকাদের স্পেস (জায়গা) না দিয়ে এক দুর্দান্ত ‘ডিফেন্সিভ মাস্টারক্লাস’ খেলা উপহার দেন।

প্রথমার্ধের মাঝামাঝি সময়ে ২৯তম মিনিটে ব্রাজিলের ডিফেন্ডার দানিলোর এক দুর্বল ব্যাক-পাস মাঝমাঠে ইন্টারসেপ্ট (কেটে দেওয়া) করেন জাপানের মিডফিল্ডার কাইশু সানো। তিনি বল নিয়ে ব্রাজিলের রক্ষণভাগের ওপর দিয়ে এক দুর্দান্ত চিলিং রান নেন। অভিজ্ঞ কাসেমিরোকে গতিতে পরাস্ত করে ডি-বক্সের ঠিক বাইরে থেকে ডান পায়ের এক বুলেট গতির শটে গোললাইন ভেদ করেন সানো।

১-০ গোলে পিছিয়ে থেকে প্রথমার্ধ শেষে চরম চাপে পড়ে যায় ব্রাজিল। পিছিয়ে থাকার পর বিরতিতে ব্রাজিলের ইতালিয়ান কোচ কার্লো আনচেলত্তি দলে বড় ধরনের ট্যাকটিক্যাল পরিবর্তন আনেন। খেলোয়াড়দের পজিশন বদলে উইং ধরে আক্রমণ আরও তীব্র করার নির্দেশ দেন তিনি। এর ফলও মেলে হাতেনাতে। ম্যাচের ৫৬তম মিনিটে একটি কর্নার কিক থেকে উড়ে আসা বল ধরে ডিফেন্ডার গ্যাব্রিয়েল মাগালহায়েস এক নিখুঁত ক্রস বাড়ান। সেখানে প্রথমার্ধের ভুলের প্রায়শ্চিত্ত করে জাপানি ডিফেন্ডারদের মাথার ওপর দিয়ে এক শক্তিশালী হেডে বল জালে জড়ান কাসেমিরো।

এরপর দুই দলই গোলের জন্য চেষ্টা চালালেও নির্ধারিত সময়ে আর কোনো দলই এগিয়ে যেতে পারেনি। ফলে সবাই যখন ধরে নিয়েছিল ম্যাচটি অতিরিক্ত সময়ে গড়াবে, ঠিক তখনই ইনজুরি টাইমের শেষ মিনিটে ঘটে যায় অবিশ্বাস্য এক নাটকীয়তা, যা মুহূর্তেই বদলে দেয় পুরো ম্যাচের চিত্র।

নির্ধারিত সময় শেষে রেফারি ছয় মিনিট অতিরিক্ত যোগ করেছিলেন। সেই অতিরিক্ত সময়ের একেবারে শেষ মুহূর্তে জাপান নিজেদের অর্ধে বলের নিয়ন্ত্রণে ছিল। ম্যাচটিকে অতিরিক্ত সময়ে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যেই তারা রক্ষণাত্মক কৌশল অনুসরণ করছিল। তাই তারা আক্রমণ বাদ দিয়ে পুরো দল নিয়ে নিজেদের ডি-বক্সে ‘বাস পার্ক’ (পুরো রক্ষণাত্মক) করে বসে। তারা এতটাই নিচে নেমে রক্ষণভাগ সামলাচ্ছিলেন যে ব্রাজিলের সেন্ট্রাল ডিফেন্ডাররাও জাপানের বক্সে স্ট্রাইকার হিসেবে পজিশন নেওয়ার সুযোগ পান।

বিপরীতে ব্রাজিলের খেলোয়াড়রা তখন অল-আউট আক্রমণে যান। এমনকি সেন্ট্রাল ডিফেন্ডার গ্যাব্রিয়েল মাগালহায়েসও জাপানের ডি-বক্সে স্ট্রাইকার হিসেবে পজিশন নেন। জাপান দল তখন তাদের পেনাল্টি বক্সের ভেতর ১০ জন খেলোয়াড় নিয়ে দেয়াল তুলে দাঁড়িয়েছিল। জাপানি কোচ হাজিমে মরিয়াসু ডাগআউটের লাইনের পাশে দাঁড়িয়ে হাত নেড়ে খেলোয়াড়দের চিৎকার করে বলছিলেন যেন কেউ নিজের পজিশন ছেড়ে ওপরে না ওঠে।

অন্যদিকে ব্রাজিলের কার্লো আনচেলত্তি চরম উৎকণ্ঠা নিয়ে পকেটে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। গ্যালারিতে ব্রাজিলিয়ান সমর্থকরা তখন নখ কাটছেন আর প্রার্থনার ভঙ্গিতে হাত জোড় করে আছেন। জাপানি দর্শকরা ড্রাম বাজানো থামিয়ে একে অপরের হাত ধরে রুদ্ধশ্বাসে দাঁড়িয়ে খেলা দেখছিলেন।

৯৫ মিনিটের ৩১তম থেকে ৪৫তম সেকেন্ড। তখনই আসে সেই মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া মুহূর্ত। মাঝমাঠে জাপানের উইঙ্গারের একটি ভুল পাস তাদের পুরো পরিকল্পনা ভেস্তে দেয়। জাপান বল ক্লিয়ার করে মাঝমাঠে পাঠাচ্ছিল। জাপানি উইঙ্গার বলটি ধরে কর্নার পতাকার দিকে নিয়ে গিয়ে সময় নষ্ট করতে পারতেন। কিন্তু তিনি ব্যাক-পাস দিতে গিয়ে ব্রাজিলের মিডফিল্ডার ব্রুনো গুইমারেসের পায়ে বল তুলে দেন। এই একটি ছোট ভুলই জাপানের জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়।

বলটি দখলে নেন ব্রাজিলের মিডফিল্ডার ব্রুনো গুইমারেস। পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে তিনি এক মুহূর্তও সময় নষ্ট করেননি। দ্রুত বল নিয়ে জাপানের ডি-বক্সের দিকে এগিয়ে যান এবং আক্রমণে থাকা সতীর্থদের সামনে এগিয়ে আসার সুযোগ করে দেন।

ডি-বক্সের ঠিক বাইরে পৌঁছে গুইমারেস এমনভাবে শরীরের ভঙ্গি তৈরি করেন, যেন তিনি দূরপাল্লার শট নিতে যাচ্ছেন। তার এই ভঙ্গিতে বিভ্রান্ত হয়ে জাপানের কয়েকজন ডিফেন্ডার সামনে এগিয়ে এসে শট ঠেকানোর প্রস্তুতি নেন। ঠিক সেই মুহূর্তে শট না নিয়ে অসাধারণ ফুটবল বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দেন ব্রাজিলিয়ান এই মিডফিল্ডার। চার ডিফেন্ডারের মাঝখানের ফাঁক ভেদ করে তিনি নিখুঁত এক থ্রু পাস বাড়িয়ে দেন বক্সের ভেতরে। পাসটির গতি ও দিক এতটাই নিখুঁত ছিল যে কোনো জাপানি ডিফেন্ডারের পক্ষে সেটি কেটে দেওয়া সম্ভব হয়নি।

এদিকে বদলি হিসেবে মাঠে নামা আর্সেনালের ফরোয়ার্ড গ্যাব্রিয়েল মার্টিনেলি ঠিক সেই মুহূর্তেই অফসাইড ট্র্যাপ ভেঙে দ্রুত গতিতে বক্সের ভেতরে ঢুকে পড়েন। জাপানি গোলরক্ষক জিওন সুজুকি গোলপোস্ট ছেড়ে সামনে এগিয়ে এসে শট আটকানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু মার্টিনেলি অত্যন্ত ঠাণ্ডা মাথায়, প্রথম টাচেই বলটি সুজুকির ডান পাশ দিয়ে দূরের পোস্ট লক্ষ্য করে আলতো পুশ করেন। বলটি পোস্টে লেগে জালের ভেতরের দিকে জড়িয়ে যায়।

গোলটি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই এনআরজি স্টেডিয়ামের গ্যালারি যেন এক জীবন্ত আগ্নেয়গিরিতে পরিণত হয়। মার্টিনেলি তার জার্সি খুলে কর্নার ফ্ল্যাগের দিকে দৌড়ে যান এবং সতীর্থরা তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন। ডাগআউটে নিজের স্বভাবসুলভ শান্ত ভাব ভেঙে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন ব্রাজিলের কোচ কার্লো আনচেলত্তি।

অন্যদিকে শেষ মুহূর্তের সেই চরম নাটকীয় গোলের সময় জাপানের খেলোয়াড়রা সম্পূর্ণ হতভম্ব, স্তব্ধ এবং চরম হতাশ হয়ে পড়েছিলেন। পুরো ম্যাচজুড়ে অসীম বীরত্ব দেখানোর পর শেষ সেকেন্ডের এই গোলটি তারা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছিলেন না। 

মার্টিনেলির শটটি যখন জালের ভেতরের দিকে জড়িয়ে যায়, তখনই জাপানের ডিফেন্ডার ও মিডফিল্ডাররা মাঠের বিভিন্ন জায়গায় হাঁটু গেঁড়ে বসে পড়েন। চরম ক্লান্ত এবং মানসিকভাবে ভেঙে পড়া খেলোয়াড়রা মাথায় হাত দিয়ে মাটির দিকে তাকিয়ে ছিলেন। দুর্দান্ত সব সেভ করে জাপানকে ম্যাচে টিকিয়ে রাখা গোলরক্ষক জিওন সুজুকি বলটি জালে জড়াতে দেখে পোস্টে পিঠ ঠেকিয়ে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলেন। নিজের সর্বোচ্চ চেষ্টা করেও বলটি আটকাতে না পারার আফসোস তার চোখে-মুখে স্পষ্ট ছিল। 

রেফারি যখন ম্যাচ শেষের বাঁশি বাজান, তখন কাইশু সানোসহ (যিনি জাপানের পক্ষে একমাত্র গোলটি করেছিলেন) বেশ কয়েকজন খেলোয়াড় মাঠেই শুয়ে পড়েন এবং কান্নায় ভেঙে পড়েন। দলের অভিজ্ঞ খেলোয়াড় ও অধিনায়ক তখন সতীর্থদের টেনে তোলার চেষ্টা করছিলেন এবং সান্ত্বনা দিচ্ছিলেন। ব্রাজিলের খেলোয়াড় এবং কোচিং স্টাফরা যখন উল্লাস করছিলেন, জাপানি ফুটবলাররা তখন কেবল শূন্য চোখে সেই দৃশ্য দেখছিলেন।  

ম্যাচ পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে অত্যন্ত আবেগপ্রবণ হয়েও জাপানের কোচ মাথা উঁচু করে বলেন, ‘এই হার অত্যন্ত বেদনাদায়ক, তবে এই ম্যাচ প্রমাণ করেছে পরাশক্তিদের সঙ্গে আমাদের ব্যবধান এখন অনেকটাই কমে এসেছে। আমরা বিশ্বমঞ্চের শীর্ষ স্তরের খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছি।’

এভাবেই অবিশ্বাস্য নাটকীয়তায় ২-১ ব্যবধানে জয় তুলে নেয় পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল। শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত দারুণ লড়াই করা জাপানের বিশ্বকাপ মিশন শেষ হয়ে যায়, আর ব্রাজিল নিশ্চিত করে বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর টিকিট।

আগামী ৫ জুলাই রাউন্ড অব ১৬-এ নিউইয়র্কের মেটলাইফ স্টেডিয়ামে (নিউইয়র্ক নিউ জার্সি স্টেডিয়াম) নরওয়ে ও আইভরি কোস্টের মধ্যকার ম্যাচের বিজয়ীর মুখোমুখি হবে সেলেসাওরা।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow