ভারত-বাংলাদেশ নদীকেন্দ্রিক রাজনীতির ভবিষ্যৎ কী? 

বাংলাদেশের আন্তজার্তিক নদীর সংখ্যা ৫৭টি হলেও আন্তজার্তিক চুক্তি হয়েছে কেবল একটি নদীর। পদ্মা; যা ভারতে গঙ্গা নামে পরিচিত। কিন্তু কেন বাংলাদেশ স্বাধীনতার এতো বছর পরেও কোনো দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে আসতে পারেনি, কেন চুক্তি আলোচনা বারবার ভেস্তে যাচ্ছে এবং ফুরিয়ে আসা গঙ্গা-চুক্তির আদৌ নবায়ন হবে কি না তা জানতে হলে ফিরে তাকাতে হবে স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশ সময়ে।  স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের জুন মাসে সর্বপ্রথম ভারত-বাংলাদেশ যৌথ নদী কমিশনের উদ্যোগ নেয়া হয়। যৌথ নদী কমিশনের অধ্যাদেশের আর্টিকেল ৪ অনুযায়ী কমিশনের কাজ হিসেবে প্রধান তিনটি কাজকে গুরুত্ব দেয়া হয়। এগুলো হলো (১) দু'দেশের লিয়াজোঁ বজায় রেখে নদী-শাসন ও ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা (২) বন্যা নিয়ন্ত্রণ পরিকল্পনা তৈরি ও প্রণয়ন করা ও (৩) দু'দেশের মধ্যকার যোগাযোগ বৃদ্ধি ও বন্যার পূর্বাভাস প্রদান করা।  ১৯৮৩ সালে যৌথ নদী কমিশনের উদ্যোগে তিস্তা পানিচুক্তি হওয়ার কথা থাকলেও রাজনৈতিক কারণে তা ভেস্তে যায়। কূটনৈতিকভাবে সমস্যার সমাধান না হওয়ায় ১৯৯০ সালে তৎকালীন বাংলাদেশ সরকার লালমনিরহাটে সরকারি খরচে তিস্তা ব্যারেজ তৈরির প্রকল্প হাতে নেয়, ফলে তিস্তার শাখানদী ও খালের

ভারত-বাংলাদেশ নদীকেন্দ্রিক রাজনীতির ভবিষ্যৎ কী? 

বাংলাদেশের আন্তজার্তিক নদীর সংখ্যা ৫৭টি হলেও আন্তজার্তিক চুক্তি হয়েছে কেবল একটি নদীর। পদ্মা; যা ভারতে গঙ্গা নামে পরিচিত। কিন্তু কেন বাংলাদেশ স্বাধীনতার এতো বছর পরেও কোনো দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে আসতে পারেনি, কেন চুক্তি আলোচনা বারবার ভেস্তে যাচ্ছে এবং ফুরিয়ে আসা গঙ্গা-চুক্তির আদৌ নবায়ন হবে কি না তা জানতে হলে ফিরে তাকাতে হবে স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশ সময়ে। 

স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের জুন মাসে সর্বপ্রথম ভারত-বাংলাদেশ যৌথ নদী কমিশনের উদ্যোগ নেয়া হয়। যৌথ নদী কমিশনের অধ্যাদেশের আর্টিকেল ৪ অনুযায়ী কমিশনের কাজ হিসেবে প্রধান তিনটি কাজকে গুরুত্ব দেয়া হয়। এগুলো হলো (১) দু'দেশের লিয়াজোঁ বজায় রেখে নদী-শাসন ও ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা (২) বন্যা নিয়ন্ত্রণ পরিকল্পনা তৈরি ও প্রণয়ন করা ও (৩) দু'দেশের মধ্যকার যোগাযোগ বৃদ্ধি ও বন্যার পূর্বাভাস প্রদান করা। 

১৯৮৩ সালে যৌথ নদী কমিশনের উদ্যোগে তিস্তা পানিচুক্তি হওয়ার কথা থাকলেও রাজনৈতিক কারণে তা ভেস্তে যায়। কূটনৈতিকভাবে সমস্যার সমাধান না হওয়ায় ১৯৯০ সালে তৎকালীন বাংলাদেশ সরকার লালমনিরহাটে সরকারি খরচে তিস্তা ব্যারেজ তৈরির প্রকল্প হাতে নেয়, ফলে তিস্তার শাখানদী ও খালের পানি ব্যবস্থাপনার দ্রুত উন্নতি ঘটে। কিন্তু ১৯৯৬ সালে ভারত সরকার তিস্তা ব্যারেজ থেকে মাত্র ১০০ কিলোমিটার দূরে জলপাইগুড়িতে তৈরি করে আরও বৃহদাকার গজলডোবা ব্যারেজ। যার ফলে তিস্তা নদীর স্বাভাবিক গতিপ্রকৃতি সম্পূর্ণরূপে নষ্ট হয়ে যায়।
 
তিস্তা নদীর উৎপত্তি ভারতের সিকিম রাজ্যে, যেখানে তিস্তার ওপর নির্ভরশীল মাত্র ২% মানুষ, অন্যদিকে তিস্তার ডাউনস্ট্রিম পশ্চিমবঙ্গের ২৭% মানুষ তিস্তার ওপর নির্ভরশীল, যেখানে বাংলাদেশের প্রায় ৩০ লক্ষ বা ৭১% মানুষ তিস্তার ওপর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে নির্ভরশীল। গজলডোবা ব্যারেজ তৈরির ফলে তিস্তার স্বাভাবিক পানি প্রবাহ যা প্রায় ৬০ বিলিয়ন কিউবিক মিটার, তা খরা মৌসুমে নেমে দ্বারায় মাত্র ৫০০ মিলিয়ন কিউবিক মিটারে। দিপক্ষীয় কূটনৈতিক তৎপরতা ও পানি সমস্যার সমাধান করতে সর্বশেষ ২০১০ সালে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক ভারতকে একটি খসড়া প্রস্তাবনা দেয়া হয়, যাতে উল্লেখ করা হয় ভারত তিস্তার ৪০%, এবং বাংলাদেশ তিস্তার ৪০% এবং ২০% পানি নায্যতার ভিত্তিতে বন্টন করা হবে। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার চুক্তিতে রাজি থাকলেও শেষ মুহূর্তে চুক্তিতে সই করতে রাজি হননি পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি। ফলে দীর্ঘ ৫৪ বছরেও তিস্তা নদীর ন্যায্য পানিবণ্টন করা সম্ভব হয়নি।
 
বাংলাদেশ-ভারতের নদীকেন্দ্রিক রাজনীতি কখনই ন্যায্য ছিল না, বাংলাদেশের তরফ থেকে দীর্ঘ ত্রিশ বছরের চেষ্টার ফলে ১৯৯৬ সালে ভারতের সাথে একমাত্র আন্তর্জাতিক চুক্তি ‘গঙ্গা-চুক্তি’ তে আবদ্ধ হয় দুটি দেশ। চুক্তি অনুযায়ী খরা মৌসুমে (জানুয়ারি-মে) গঙ্গা থেকে অন্তত ৩৫,০০০ কিউসেক পানি দিতে আইনগতভাবে বাধ্য ভারত সরকার। কিন্তু রাজনৈতিক উদাসীনতা এবং অসহযোগিতার কারণে ভারত কখনই গঙ্গার পানির ন্যায্য হিস্যা দেয়নি। গঙ্গা, যা বাংলাদেশের বৃহত্তম পদ্মা নদী- দেশের ২১টি জেলার উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। অথচ ভারতের গঙ্গা-চুক্তি অমান্য করে পানি আটকে রাখার ফলে প্রায় ১.৫ মিলিয়ন হেক্টর আবাদী জমি ও খাল-বিল সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস হয়ে গেছে। দেশের বিখ্যাত জিকে খাল প্রকল্পের (গঙ্গা-কপোতাক্ষ) ৯৩% শতাংশই এখন সম্পূর্ণ পতিত জমিতে পরিণত হয়েছে। ভারতের সাথে অভিন্ন নদীগুলোর অধিকাংশেই অবৈধ বাঁধ ও কূটনৈতিক ব্যর্থতার ফলে বাংলাদেশের পানি ব্যবস্থাপনার দিনদিন অবনতি হচ্ছে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হলো, ৩০ বছর মেয়াদি গঙ্গা-চুক্তির ফলে বাংলাদেশের এখনো আইনগতভাগে পানি পাওয়ার দাবিদার। কিন্তু, গঙ্গা-চুক্তির মেয়াদ এবছর, অর্থাৎ ২০২৬ সালে শেষ হলে, বাংলাদেশের গঙ্গার পানি আদায়ের আইনগত আর কোনো ভিত্তিই থাকবে না। 
তিস্তা কিংবা পদ্মা ছাড়াও দেশের আরো ৫২টি আন্তর্জাতিক নদী ভারতের সাথে সংযুক্ত যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ৩৮টির মধ্যে ৩৬টিতেই অবৈধ বাঁধ ও ব্যারেজ নির্মাণ করে নদীর প্রাকৃতিক গতিপ্রকৃতি আটকে দেওয়া হয়েছে। ফলে পানি শুধু কোনো সম্পদ নয়, বরং অস্ত্রে পরিণত হয়েছে।

বাংলাদেশের তরফ থেকে বারংবার সহযোগিতা ও কূটনৈতিক সম্পর্ক বৃদ্ধির আহবান জানানো হলেও ভারত পানি ইস্যুতে এখনো অটল। ৫ অক্টোবর ২০১৯ সালে একটি MoU সাক্ষরের মাধ্যমে ফেনী নদী থেকে ১.৮২ কিউসেক পানি উত্তোলনের ব্যাপারে দু-দেশের কূটনীতিকদের মধ্যে সিদ্ধান্ত হয়, যদিও তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে, ৬ সেপ্টেম্বর ২০২২ সালে আরেকটি MoU স্বাক্ষরে দুই দেশ সুরমা ও কুশিয়ারা নদী থেকে খরা মৌসুমে ১৫৩ কিউসেক পানি উত্তোলনের ব্যাপারে সম্মত হয়। দুঃখজনকভাবে এই সিদ্ধান্তও বাস্তবায়ন হয়নি। 

নদী, হাওর ও পানি ব্যবস্থাপনায় ভারতের অসহযোগিতার ফলে বাংলাদেশের বাৎসরিক আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে কৃষি জমির পরিমাণ হ্রাস, নদীর নাব্যতা ও যোগাযোগ ব্যবস্থার অবনতি, মৌসুমি বন্যা, খরা, ও বাস্তুহারা অন্যতম। একটি গবেষণা অনুযায়ী, তিস্তায় ক্রমাগত বাঁধের ফলে শুধু রংপুরেই ৩,০০০ এর অধিক চর জেগেছে। বাস্তুচ্যুত হয়েছে প্রায় ৫,০০,০০০ মানুষ। 

ভারতের সহযোগিতা না পাওয়ায় বাংলাদেশ সম্প্রতি চীনের কাছে ৫০ বছর মেয়াদি তিস্তা মহাপ্রকল্পের রোডম্যাপ চেয়েছে। অন্যদিকে, তিস্তার পাশাপাশি পানি ব্যবস্থাপনার উন্নয়নে সম্প্রতি চীনের থেকে ২১০ কোটি টাকা অনুদান ও বিভিন্ন মেয়াদে ঋন নিয়েছে বাংলাদেশ। কিন্তু নদীমাতৃক দেশের জন্যে এত ব্যয়বহুল প্রকল্প আদৌ কি লাভজনক হবে? ভাটির দেশে নদী ছাড়াও দেশের হাওর-বাওড় রক্ষা ও সম্পূর্ণ পানি ব্যবস্থাপনায় এত ব্যয়বহুল প্রকল্প মুখরোচক শোনালেও, তা বাস্তবায়ন ও কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা কম। এর প্রধান কারণ, অতিরিক্ত ব্যয়বহুল প্রকল্পের ফলে সকল নদীর জন্য আলাদা আলাদা প্রকল্প হাতে নেয়া সম্ভব নয়। 

অন্যদিকে, চীনা ঋণের ফলে পার্শ্ববর্তী দেশের সাথে কূটনীতিক সম্পর্কের আরো অবনতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বলাই বাহুল্য, জুলাই অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে এখন পর্যন্ত ভারত সরকার বাংলাদেশি নাগরিকদের ভিসা আবেদন বন্ধ রেখেছে। তাই, দুই দেশের মধ্যকার সম্পর্ক উন্নয়ন ও কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করতে আবারও নদী-কেন্দ্রিক দ্বিপাক্ষিক চুক্তির বিকল্প নেই, বিশেষত বাংলাদেশের প্রয়োজনই যেহেতু বেশি। একই সাথে গঙ্গাচুক্তির পুনঃমূল্যায়ন, অভিন্ন নদীসমূহের প্রাপ্য হিস্যা আদায় করতে কূটনৈতিক তৎপরতা বৃদ্ধির পাশাপাশি দু-দেশের মধ্যকার সমতার সম্পর্ক সৃষ্টি করা জরুরি।

কিন্তু, বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকরা কি আদৌ ভারতের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে প্রস্তুত? দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক উন্নয়নের মাধ্যমে দু-দেশের দীর্ঘদিনের সমস্যার কূটনৈতিক সমাধান করতে আগ্রহী?  কিংবা গঙ্গা-চুক্তি নবায়ন নিয়ে আদৌ রাষ্ট্রীয় কোন পরিকল্পনা আছে? সে প্রশ্ন রয়েই যায়! 

মুহাম্মদ ইরফান সাদিক 
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
 

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow