ভারতে তৃণমূল কংগ্রেসের ভাঙনের গুঞ্জন: অলীক নাকি বাস্তব?
ভারতের পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে তৃণমূল কংগ্রেস দীর্ঘদিন ধরে একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি করেছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে দলটি বামফ্রন্টের দীর্ঘ শাসনের অবসান ঘটিয়েছে। বিজেপির উত্থানের মুখেও বহু বছর নিজেদের অবস্থান ধরে রেখেছে তারা। কিন্তু সাম্প্রতিক নির্বাচন-পরবর্তী পরিস্থিতি নতুন প্রশ্ন সামনে এনেছে। তৃণমূল কংগ্রেস কি সত্যিই ভাঙনের মুখে? নাকি এটি কেবল রাজনৈতিক গুঞ্জন ও চাপ সৃষ্টির কৌশল? প্রশ্নটি এখন আর অমূলক নয়। কারণ দলটির অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে এসেছে। বিশেষ করে সাম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে বিরোধী দলনেতা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া বিতর্ক এখন দলীয় শৃঙ্খলার প্রশ্ন ছাড়িয়ে সাংগঠনিক সংকটের রূপ নিচ্ছে। ঘটনার শুরু হয়েছে বিরোধী দলনেতা নির্বাচনকে নিয়ে। তৃণমূল দলের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল, বিধায়কদের সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়কে বিরোধী দলনেতা করা হয়েছে। কিন্তু সেই সিদ্ধান্তের ভিত্তি হিসেবে জমা দেওয়া রেজুলেশন নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। অভিযোগ, সেখানে একাধিক বিধায়কের স্বাক্ষর জাল করা হয়েছে। বিষয়টি তদন্তের পর্যায়ে চলে যায়। সিআইডি সক্রিয় হয়। কয়
ভারতের পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে তৃণমূল কংগ্রেস দীর্ঘদিন ধরে একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি করেছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে দলটি বামফ্রন্টের দীর্ঘ শাসনের অবসান ঘটিয়েছে। বিজেপির উত্থানের মুখেও বহু বছর নিজেদের অবস্থান ধরে রেখেছে তারা। কিন্তু সাম্প্রতিক নির্বাচন-পরবর্তী পরিস্থিতি নতুন প্রশ্ন সামনে এনেছে। তৃণমূল কংগ্রেস কি সত্যিই ভাঙনের মুখে? নাকি এটি কেবল রাজনৈতিক গুঞ্জন ও চাপ সৃষ্টির কৌশল?
প্রশ্নটি এখন আর অমূলক নয়। কারণ দলটির অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে এসেছে। বিশেষ করে সাম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে বিরোধী দলনেতা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া বিতর্ক এখন দলীয় শৃঙ্খলার প্রশ্ন ছাড়িয়ে সাংগঠনিক সংকটের রূপ নিচ্ছে।
ঘটনার শুরু হয়েছে বিরোধী দলনেতা নির্বাচনকে নিয়ে। তৃণমূল দলের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল, বিধায়কদের সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়কে বিরোধী দলনেতা করা হয়েছে। কিন্তু সেই সিদ্ধান্তের ভিত্তি হিসেবে জমা দেওয়া রেজুলেশন নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। অভিযোগ, সেখানে একাধিক বিধায়কের স্বাক্ষর জাল করা হয়েছে। বিষয়টি তদন্তের পর্যায়ে চলে যায়। সিআইডি সক্রিয় হয়। কয়েকজন বিধায়কের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। এরপর পরিস্থিতি দ্রুত রাজনৈতিক মোড় নেয়।
তৃণমূল বিধায়ক ঋতব্রত ব্যানার্জি ও সন্দীপন সাহা প্রকাশ্যে এই বিষয়ে আপত্তি তোলেন। দল তাঁদের বহিষ্কার করে। সাধারণত দলীয় শৃঙ্খলার প্রশ্নে এমন সিদ্ধান্ত নতুন কিছু নয়। কিন্তু বহিষ্কারের পর ঋতব্রতের বক্তব্য পরিস্থিতিকে নতুন মাত্রা দেয়। তিনি দাবি করেন, বহু বিধায়ক তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। এমনকি রাজনৈতিক মহলের বিভিন্ন প্রভাবশালী ব্যক্তিও তাঁর সঙ্গে কথা বলেছেন। এখান থেকেই শুরু হয় জল্পনা।
রাজনীতিতে সংখ্যাই শেষ কথা। পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় বর্তমানে তৃণমূলের বিধায়ক সংখ্যা ৭৮। দলত্যাগ বিরোধী আইন এড়াতে প্রয়োজন দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থন। অর্থাৎ প্রায় ৫৩ জন বিধায়ক। গুঞ্জন রয়েছে, অসন্তুষ্ট বিধায়কদের সংখ্যা সেই সীমার কাছাকাছি পৌঁছেছে। যদিও এই দাবির পক্ষে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক প্রমাণ সামনে আসেনি। তবু প্রশ্ন থেকে যায়। যদি সবকিছু গুজব হয়, তাহলে দলীয় বৈঠকে এত কম উপস্থিতি কেন? কেন পরাজিত নেতাদের একাংশ প্রকাশ্যে ক্ষোভ উগরে দিচ্ছেন? কেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠছে? সমস্যার মূল আসলে নেতৃত্বের প্রশ্নে।
তৃণমূল কংগ্রেস দীর্ঘদিন ধরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়-কেন্দ্রিক দল। তাঁর জনপ্রিয়তা দলকে ক্ষমতায় এনেছে। তাঁর সংগ্রামের ইতিহাস দলকে পরিচিতি দিয়েছে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় দলের দ্বিতীয় শক্তিশালী মুখ হিসেবে উঠে এসেছেন। স্বাভাবিকভাবেই নতুন নেতৃত্বের উত্থান সব দলের ভেতরেই কিছু অস্বস্তি তৈরি করে। তৃণমূলও তার ব্যতিক্রম নয়।
গত কয়েক বছরে পশ্চিমবঙ্গের “কালীঘাট বনাম ক্যামাক স্ট্রিট”, “প্রবীণ বনাম নবীন”, “সংগঠন বনাম কর্পোরেট সংস্কৃতি”—এমন নানা আলোচনা রাজনৈতিক মহলে শোনা গেছে। তৃণমূল কংগ্রেসের দলীয় নেতৃত্ব সেসবকে গুরুত্ব না দিলেও অসন্তোষ যে জমা হচ্ছিল, তা এখন স্পষ্ট।
সদ্য বহিষ্কার প্রাপ্ত তৃণমূলের বিধায়ক ঋতব্রত ব্যানার্জির বক্তব্যে ‘কর্পোরেট কালচার’-এর সমালোচনা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ এই অভিযোগ নতুন নয়। দলের অনেক পুরনো নেতা মনে করেন, তৃণমূলের রাজনৈতিক চরিত্র ধীরে ধীরে বদলেছে। আন্দোলননির্ভর সংগঠন থেকে এটি একটি কেন্দ্রীভূত প্রশাসনিক কাঠামোয় রূপ নিয়েছে। ফলে মাঠপর্যায়ের নেতাদের প্রভাব কমেছে। তবে এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখতে হবে।অসন্তোষ থাকা আর ভাঙন হওয়া এক জিনিস নয়।
ভারতের রাজনীতিতে বহু দল অভ্যন্তরীণ সংকটের মধ্য দিয়ে গেছে। কংগ্রেসে হয়েছে। সমাজবাদী পার্টিতে হয়েছে। তামিলনাড়ুতে ডিএমকেতেও হয়েছে। কিন্তু সব সংকট দলভাঙনে গড়ায়নি।
আবার মহারাষ্ট্রের উদাহরণও সামনে রয়েছে। শিবসেনা এবং এনসিপির ভাঙন ভারতের আঞ্চলিক রাজনীতিতে নতুন অধ্যায় তৈরি করেছে। একনাথ শিন্ডে এবং অজিত পাওয়ার দেখিয়েছেন, সংগঠনের বড় অংশ সঙ্গে থাকলে প্রতিষ্ঠাতা নেতৃত্বকেও চ্যালেঞ্জ করা সম্ভব। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বারবার অভিযোগ করেছেন, পশ্চিমবঙ্গেও একই কৌশল প্রয়োগের চেষ্টা চলছে। তাঁর এই আশঙ্কা পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
কারণ বিজেপি দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূলের বিকল্প শক্তি হওয়ার চেষ্টা করছে। নির্বাচনে প্রত্যাশিত ফল না পেলে প্রতিপক্ষের ভেতরে বিভাজন সৃষ্টি করাও একটি রাজনৈতিক কৌশল হতে পারে। মহারাষ্ট্রে সেই বাস্তবতা দেখা গেছে। ফলে পশ্চিমবঙ্গে অনুরূপ পরিস্থিতি তৈরি হলে তা অস্বাভাবিক হবে না। তবে পশ্চিমবঙ্গ এবং মহারাষ্ট্রের মধ্যে একটি মৌলিক পার্থক্য রয়েছে।
মহারাষ্ট্রে একনাথ শিন্ডে ও অজিত পাওয়ার নিজ নিজ দলে শক্তিশালী সাংগঠনিক ভিত্তি তৈরি করেছিলেন। তাঁদের নিজস্ব অনুসারী গোষ্ঠী ছিল। পশ্চিমবঙ্গে এখনো তৃণমূলের ভেতরে তেমন কোনো বিকল্প শক্তিকেন্দ্র দৃশ্যমান নয়। ঋতব্রত ব্যানার্জি আলোচনায় থাকলেও তিনি এখনো সেই পর্যায়ের নেতা নন, যিনি এককভাবে দলের বড় অংশকে নেতৃত্ব দিতে পারবেন। এ কারণেই বর্তমান পরিস্থিতিকে সরাসরি দলভাঙনের পূর্বাভাস বলা কঠিন। বরং এটিকে সতর্ক সংকেত বলা বেশি যুক্তিযুক্ত।
নির্বাচনী পরাজয় প্রায় সব রাজনৈতিক দলকেই আত্মসমালোচনার মুখে দাঁড় করায়। তখন নেতৃত্ব, প্রার্থী নির্বাচন, সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত এবং ক্ষমতার কেন্দ্র নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। তৃণমূলও সেই পর্যায়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এখনো পশ্চিমবঙ্গের সবচেয়ে জনপ্রিয় রাজনৈতিক মুখ। দলের অধিকাংশ নেতা ও কর্মীর রাজনৈতিক পরিচয়ের সঙ্গে তাঁর নাম ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ফলে তাঁকে বাদ দিয়ে “আসল তৃণমূল” গড়ে তোলা সহজ কাজ নয়। রাজনৈতিক আবেগ, সাংগঠনিক বাস্তবতা এবং ভোটারদের মানসিকতা—সবকিছুই সেখানে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াবে।
তৃণমূল কংগ্রেসে দলের ভেতরের অসন্তোষকে অবহেলা করার সুযোগ নেই। বহিষ্কার সমস্যার তাৎক্ষণিক সমাধান দিতে পারে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে আস্থার সংকট বাড়াতে পারে। বিরোধী মতকে শত্রু মনে না করে সংলাপের সুযোগ তৈরি করাই রাজনৈতিকভাবে বেশি কার্যকর।
পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি এখন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়েছে। তৃণমূলের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বিজেপি নয়; বরং নিজেদের ভেতরের ঐক্য ধরে রাখা। কারণ ইতিহাস বলে, শক্তিশালী বিরোধী দল অনেক সময় সরকারকে হারাতে পারে না, কিন্তু অভ্যন্তরীণ বিভাজন পারে।
তৃণমূলে ভাঙনের গুঞ্জন আজ বাস্তবতা নয়। কিন্তু একে পুরোপুরি অলীক বলাও কঠিন। রাজনৈতিক সংকটের বীজ ইতিমধ্যেই বপন হয়েছে। সেই বীজ থেকে বড় গাছ জন্মাবে, নাকি নেতৃত্বের প্রজ্ঞায় তা শুকিয়ে যাবে—সেটিই এখন দেখার বিষয়। পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির আগামী অধ্যায় অনেকটাই নির্ভর করছে সেই উত্তরের ওপর।
সহকারী অধ্যাপক
সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগ
পোর্ট সিটি ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি
এইচআর/এমএস
What's Your Reaction?