ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশ নেয়নি আরএসএস, অস্তিত্ব ছিল না বিজেপির

১৫ আগস্ট ভারতের স্বাধীনতা দিবস। প্রতিবছর দিনটি ঘিরে দেশজুড়ে নানা আয়োজন হয়। নয়াদিল্লির লাল কেল্লায় জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন প্রধানমন্ত্রী। জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন তিনি। তবে ভারতের স্বাধীনতার ইতিহাস নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কও কম নয়। বিশেষ করে স্বাধীনতা আন্দোলনে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস, বিজেপি এবং রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) ভূমিকা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে মতভেদ রয়েছে। ভারত স্বাধীন হয় ১৯৪৭ সালে। সেই সময় বিজেপির অস্তিত্বই ছিল না। দলটি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৮০ সালে। বিজেপির রাজনৈতিক পূর্বসূরি ভারতীয় জনসংঘ প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৫১ সালে। অর্থাৎ স্বাধীনতার চার বছর পর। ফলে রাজনৈতিক দল হিসেবে বিজেপির স্বাধীনতা আন্দোলনে সরাসরি ভূমিকা থাকার প্রশ্নই ওঠে না। তবে বিজেপির আদর্শিক ধারার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত আরএসএস প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল স্বাধীনতার আগে। ১৯২৫ সালে ব্রিটিশ শাসনামলে সংগঠনটির জন্ম। ফলে স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় আরএসএসের অবস্থান কী ছিল, তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। কংগ্রেসের নেতৃত্বে স্বাধীনতার আন্দোলন ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। শুরুতে দলটি ব্রিটিশ শাসনের অধীনে থেকে বিভিন্ন

ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশ নেয়নি আরএসএস, অস্তিত্ব ছিল না বিজেপির

১৫ আগস্ট ভারতের স্বাধীনতা দিবস। প্রতিবছর দিনটি ঘিরে দেশজুড়ে নানা আয়োজন হয়। নয়াদিল্লির লাল কেল্লায় জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন প্রধানমন্ত্রী। জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন তিনি। তবে ভারতের স্বাধীনতার ইতিহাস নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কও কম নয়। বিশেষ করে স্বাধীনতা আন্দোলনে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস, বিজেপি এবং রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) ভূমিকা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে মতভেদ রয়েছে।

ভারত স্বাধীন হয় ১৯৪৭ সালে। সেই সময় বিজেপির অস্তিত্বই ছিল না। দলটি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৮০ সালে। বিজেপির রাজনৈতিক পূর্বসূরি ভারতীয় জনসংঘ প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৫১ সালে। অর্থাৎ স্বাধীনতার চার বছর পর। ফলে রাজনৈতিক দল হিসেবে বিজেপির স্বাধীনতা আন্দোলনে সরাসরি ভূমিকা থাকার প্রশ্নই ওঠে না।

তবে বিজেপির আদর্শিক ধারার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত আরএসএস প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল স্বাধীনতার আগে। ১৯২৫ সালে ব্রিটিশ শাসনামলে সংগঠনটির জন্ম। ফলে স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় আরএসএসের অবস্থান কী ছিল, তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে।

কংগ্রেসের নেতৃত্বে স্বাধীনতার আন্দোলন

ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। শুরুতে দলটি ব্রিটিশ শাসনের অধীনে থেকে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সংস্কারের দাবি জানাতো। পরে ধীরে ধীরে সেই অবস্থান বদলে যায়।

১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের প্রতিবাদে স্বদেশি আন্দোলন শুরু হয়। ব্রিটিশ পণ্য বর্জন এবং দেশীয় পণ্য ব্যবহারের আহ্বান জানানো হয়। সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ এতে যুক্ত হন।

পরবর্তী সময়ে মহাত্মা গান্ধীর নেতৃত্বে কংগ্রেস অহিংস আন্দোলনকে স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম প্রধান কৌশল হিসেবে গ্রহণ করে। ১৯২০ ও ১৯৩০-এর দশকে অসহযোগ আন্দোলন এবং আইন অমান্য আন্দোলনের মাধ্যমে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে ওঠে।

আরও পড়ুন>
পাকিস্তান-ভারত কেন একদিন আগে পরে স্বাধীনতা দিবস পালন করে?
১৫ আগস্ট কেন ভারতের স্বাধীনতা চাননি জ্যোতিষীরা?
১০৯ বছর আগে ব্রিটিশদের ধার দেওয়া টাকা সুদসহ ফেরত চায় ভারতীয় পরিবার

শুরুতে কংগ্রেস ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অধীনে ডমিনিয়ন মর্যাদা চাইলেও পরে তাদের দাবি বদলে যায়। তারা ‘পূর্ণ স্বরাজ’ বা সম্পূর্ণ স্বাধীনতার দাবি তোলে।

মহাত্মা গান্ধী

১৯৪২ সালে গান্ধীর নেতৃত্বে শুরু হয় ভারত ছাড়ো আন্দোলন। ‘করো অথবা মরো’ স্লোগানে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন আরও তীব্র হয়ে ওঠে। শেষ পর্যন্ত ১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীনতা লাভ করে।

স্বাধীনতার সময় বিজেপি কোথায়?

ভারতের স্বাধীনতার চার দশকেরও বেশি সময় পর বিজেপি রাজনৈতিক দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। ১৯৮০ সালে জনতা পার্টির ভেতরে রাজনৈতিক বিভাজনের পর বিজেপি গঠিত হয়।

তবে বিজেপির আদর্শিক শিকড়ের সঙ্গে আরএসএসের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। আরএসএস প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯২৫ সালে। সংগঠনটি স্বাধীনতার সময় সক্রিয় ছিল।

তবে ব্রিটিশবিরোধী মূলধারার স্বাধীনতা আন্দোলনে আরএসএস ভূমিকা পালন করেনি। বিশেষ করে ১৯৩০ সালের লবণ সত্যাগ্রহ এবং ১৯৪২ সালের ভারত ছাড়ো আন্দোলনে সংগঠনটির সরাসরি অংশগ্রহণ ছিল না। বরং কয়েকটি ক্ষেত্রে আন্দোলনের বিরোধিতা করেছিল এবং ব্রিটিশ শাসনের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে।

তবে বিজেপি ও আরএসএসের সমর্থকদের বক্তব্য ভিন্ন। তাদের দাবি, স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় সংগঠনটির সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন ব্যক্তি জাতীয়তাবাদী কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন। পাশাপাশি বৃহত্তর সাংস্কৃতিক ও জাতীয়তাবাদী ধারার অবদানও বিবেচনায় নেওয়া উচিত।

সাভারকারকে ঘিরেও বিতর্ক

হিন্দুত্ববাদী চিন্তাধারার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব বিনায়ক দামোদর সাভারকারের ভূমিকা নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। সমালোচকেরা তার ব্রিটিশ সরকারের কাছে ক্ষমা প্রার্থনার বিষয়টি সামনে আনেন। তাদের দাবি, তিনি ব্রিটিশ সরকারের কাছে আনুগত্যের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।

অন্যদিকে সাভারকারের সমর্থকেরা তার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের অন্য দিকগুলো তুলে ধরেন এবং তাকে জাতীয়তাবাদী নেতা হিসেবে মূল্যায়ন করেন।

জাতীয় পতাকা নিয়েও প্রশ্ন

ভারতের জাতীয় পতাকা নিয়েও আরএসএসের ঐতিহাসিক অবস্থান নিয়ে বিতর্ক রয়েছে।
স্বাধীনতার আগে আরএসএসের মুখপত্র অর্গানাইজার-এ তেরঙা পতাকার বিরোধিতা করা হয়েছিল। সেখানে গেরুয়া পতাকার পক্ষে মত দেওয়া হয়েছিল বলে তারা উল্লেখ করেন।

আরএসএস

গান্ধী হত্যা ও আরএসএস

মহাত্মা গান্ধীর হত্যাকাণ্ডও আরএসএসকে ঘিরে বিতর্কের অন্যতম বড় বিষয়। ১৯৪৮ সালের ৩০ জানুয়ারি নাথুরাম গডসের গুলিতে গান্ধী নিহত হন। গডসের সঙ্গে আরএসএসের অতীত সম্পর্ক ছিল কি না, তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক বিতর্ক চলছে।

গান্ধী হত্যার পর ভারত সরকার আরএসএসকে নিষিদ্ধ করে। ১৯৪৯ সালের ১১ জুলাই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়।

পরবর্তী সময়েও বিভিন্ন ঘটনায় সংগঠনটির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের ইতিহাস রয়েছে।

মোদী ও আরএসএসের সম্পর্ক

বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির রাজনৈতিক জীবনের সঙ্গে আরএসএসের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। বিজেপির আদর্শিক ভিত্তির সঙ্গেও সংগঠনটির সম্পর্ক রয়েছে।

মোদীর সরকারের বিভিন্ন নীতি নিয়ে বিরোধীদের সমালোচনা রয়েছে। বিশেষ করে কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা বাতিল, নাগরিকত্ব আইন এবং ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক হয়েছে।

বিরোধীদের অভিযোগ, এসব পদক্ষেপ ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্রকে দুর্বল করেছে। অন্যদিকে বিজেপি এসব পদক্ষেপকে জাতীয় স্বার্থ ও সংস্কারের অংশ হিসেবে তুলে ধরে।

খাড়গের সরাসরি আক্রমণ

এদিকে বিজেপি ও আরএসএসকে আক্রমণ করেছেন কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে।

উত্তরাখণ্ডের হালদোয়ানির রামলীলা ময়দানে এক জনসভায় তিনি বলেন, ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে বিজেপি ও আরএসএসের কোনো ভূমিকা ছিল না।

খাড়গে প্রশ্ন করেন, ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সময় বিজেপি বা আরএসএসের কোনো প্রকৃত সদস্য কারাগারে গিয়েছিলেন কি না। তার দাবি, স্বাধীনতা আন্দোলনে কংগ্রেসই নেতৃত্ব দিয়েছে।

স্বাধীনতা দিবসে সাজানো হয়েছে ইন্ডিয়া গেট

তিনি আরও বলেন, স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাস থাকা সত্ত্বেও বিজেপি ও আরএসএস এখনো কংগ্রেসের দেশপ্রেম নিয়ে প্রশ্ন তোলে।

তবে খাড়গের এই বক্তব্য কংগ্রেসের রাজনৈতিক অবস্থান। বিজেপি ও আরএসএসের সমর্থকেরা স্বাধীনতা আন্দোলনে তাদের আদর্শিক ধারার ভূমিকা নিয়ে ভিন্ন ব্যাখ্যা দেন।

আরও পড়ুন>
পাকিস্তান-ভারত কেন একদিন আগে পরে স্বাধীনতা দিবস পালন করে?
১৫ আগস্ট কেন ভারতের স্বাধীনতা চাননি জ্যোতিষীরা?
১০৯ বছর আগে ব্রিটিশদের ধার দেওয়া টাকা সুদসহ ফেরত চায় ভারতীয় পরিবার

সব মিলিয়ে, ১৯৪৭ সালে ভারতের স্বাধীনতার সময় বিজেপির অস্তিত্ব ছিল না। যা ঐতিহাসিকভাবে স্পষ্ট। তবে স্বাধীনতার আগে প্রতিষ্ঠিত আরএসএসের ভূমিকা নিয়ে রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক বিতর্ক আজও চলছে। কংগ্রেসের নেতৃত্বে স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাস যেমন সুপ্রতিষ্ঠিত, তেমনি আরএসএসের অবস্থান ও কর্মকাণ্ডের মূল্যায়ন নিয়ে রয়েছে নানা মত। আর এই ইতিহাসই আজও ভারতের রাজনীতিতে বিজেপি, আরএসএস ও কংগ্রেসের মধ্যে তীব্র বিতর্কের অন্যতম বিষয়।

সূত্র: দ্য হিন্দু, দ্য ওয়্যার, গাল্ফ নিউজ, ব্রিটেনিকা

এমএসএম

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow