ভারী বর্ষণে বন্যা-জলাবদ্ধতা: অব্যবস্থাপনার নির্মম বাস্তবতা

যখন ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামে তখন প্রাণ ফিরে পায় নদীমাতৃক বাংলাদেশ। দু’কূল ছাপিয়ে কুলকুল করে বয়ে যাওয়া বানের স্রোতে ভেসে চলে যৌবনের কলতান। বর্ষায় বাংলার প্রকৃতিতে কতো শত ফুল ফোটে! কদম কেয়ার কথাতো না বললেই নয়। এছাড়া কামিনী, জুঁই, টগর, বেলি, চাঁপাফুলের সৌরভে সুরভিত হয় প্রকৃতি। সচল ও সজল হয়ে ওঠে বাংলাদেশের নদীপথ। যাতায়াতেও অনেক সুবিধা হয়। নৌপথে স্বল্পব্যয়ে পণ্য পরিবহন সহজ হয়। অনেক রকমের ফল পাওয়া যায় বর্ষাকালে। আম, জাম, কাঁঠাল, আনারস, পেয়ারা, ডেউয়া, চালতা, লটকন, তাল এরকম জনপ্রিয় রস-টসটসে ফলগুলো কিন্তু বর্ষাকালে পাওয়া যায়। এছাড়াও কিন্তু বর্ষার অনেক রূপময় দিক আছে, যা শিশু কিশোর, যুবা কিংবা বৃদ্ধ সব বয়সের মানুষকেই আকৃষ্ট করে, আন্দোলিত করে। বাংলাদেশে বর্ষাকাল মানেই প্রকৃতির নবজাগরণ। নদী-নালা পানিতে ভরে ওঠে, কৃষিজমি নতুন প্রাণ ফিরে পায়, জনজীবনে আসে স্বস্তির ছোঁয়া। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বর্ষার সেই চিরচেনা সৌন্দর্য ক্রমশ দুর্ভোগের প্রতীকে পরিণত হচ্ছে। কয়েক ঘণ্টার ভারী বৃষ্টিতেই রাজধানীসহ দেশের বড় শহরগুলো অচল হয়ে পড়ে। আরও পড়ুন ঢাকা-চট্টগ্রাম ডুবে যায়, কারণ প্রাকৃতিক নাকি মানবসৃষ্ট অন্য

ভারী বর্ষণে বন্যা-জলাবদ্ধতা: অব্যবস্থাপনার নির্মম বাস্তবতা

যখন ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামে তখন প্রাণ ফিরে পায় নদীমাতৃক বাংলাদেশ। দু’কূল ছাপিয়ে কুলকুল করে বয়ে যাওয়া বানের স্রোতে ভেসে চলে যৌবনের কলতান। বর্ষায় বাংলার প্রকৃতিতে কতো শত ফুল ফোটে! কদম কেয়ার কথাতো না বললেই নয়। এছাড়া কামিনী, জুঁই, টগর, বেলি, চাঁপাফুলের সৌরভে সুরভিত হয় প্রকৃতি। সচল ও সজল হয়ে ওঠে বাংলাদেশের নদীপথ। যাতায়াতেও অনেক সুবিধা হয়। নৌপথে স্বল্পব্যয়ে পণ্য পরিবহন সহজ হয়।

অনেক রকমের ফল পাওয়া যায় বর্ষাকালে। আম, জাম, কাঁঠাল, আনারস, পেয়ারা, ডেউয়া, চালতা, লটকন, তাল এরকম জনপ্রিয় রস-টসটসে ফলগুলো কিন্তু বর্ষাকালে পাওয়া যায়। এছাড়াও কিন্তু বর্ষার অনেক রূপময় দিক আছে, যা শিশু কিশোর, যুবা কিংবা বৃদ্ধ সব বয়সের মানুষকেই আকৃষ্ট করে, আন্দোলিত করে। বাংলাদেশে বর্ষাকাল মানেই প্রকৃতির নবজাগরণ। নদী-নালা পানিতে ভরে ওঠে, কৃষিজমি নতুন প্রাণ ফিরে পায়, জনজীবনে আসে স্বস্তির ছোঁয়া। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বর্ষার সেই চিরচেনা সৌন্দর্য ক্রমশ দুর্ভোগের প্রতীকে পরিণত হচ্ছে। কয়েক ঘণ্টার ভারী বৃষ্টিতেই রাজধানীসহ দেশের বড় শহরগুলো অচল হয়ে পড়ে।

অন্যদিকে উজানের ঢল ও অতিবৃষ্টিতে দেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চল বন্যাকবলিত হয়। ঘরবাড়ি, ফসল, সড়ক, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থা-সবকিছুই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। প্রতিবছর একই দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে নিয়ে আসে-এই সংকট কি শুধু প্রকৃতির সৃষ্টি, নাকি মানুষের পরিকল্পনাহীন উন্নয়ন ও দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনারও ফল? বাংলাদেশ ভৌগোলিকভাবেই একটি বদ্বীপ অঞ্চল। গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনাসহ অসংখ্য নদ-নদীর প্রবাহপথে অবস্থিত হওয়ায় মৌসুমি বন্যা এ দেশের বাস্তবতা। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সেই বাস্তবতা এখন আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।

বিশ্বব্যাপী তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে বায়ুমণ্ডলে জলীয়বাষ্পের পরিমাণ বাড়ছে, যার প্রভাব পড়ছে বৃষ্টিপাতের ধরনে। আগে যেখানে দীর্ঘ সময় ধরে মাঝারি বৃষ্টি হতো, এখন সেখানে অল্প সময়ে অস্বাভাবিক মাত্রায় বৃষ্টিপাত হচ্ছে। ফলে নদ-নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে, আবার নগরাঞ্চলের পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থাও অতিরিক্ত চাপ সামলাতে ব্যর্থ হচ্ছে। অর্থাৎ জলবায়ু পরিবর্তন দুর্যোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিলেও সেই ঝুঁকিকে বিপর্যয়ে পরিণত করছে আমাদের অবকাঠামোগত দুর্বলতা।

বিশেষ করে শহরাঞ্চলের জলাবদ্ধতা এখন একটি দীর্ঘস্থায়ী নগর সংকটে রূপ নিয়েছে। রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে বর্ষা এলেই একই চিত্র দেখা যায়। প্রধান সড়ক পানির নিচে তলিয়ে যায়, যানবাহন চলাচল ব্যাহত হয়, ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে আটকে থাকে মানুষ। অফিসগামী কর্মজীবী, শিক্ষার্থী, রোগী-কেউই এই দুর্ভোগ থেকে মুক্ত থাকেন না। এতে শুধু ব্যক্তিগত ভোগান্তিই বাড়ে না; উৎপাদনশীল কর্মঘণ্টা নষ্ট হওয়ায় জাতীয় অর্থনীতিতেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। এই জলাবদ্ধতার মূল কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে অপরিকল্পিত নগরায়ণ। গত কয়েক দশকে শহর সম্প্রসারণের নামে অসংখ্য খাল, জলাধার ও নিম্নাঞ্চল ভরাট করা হয়েছে।

প্রাকৃতিক পানি ধারণ ও নিষ্কাশনের পথ সংকুচিত হওয়ায় বৃষ্টির পানি জমে থাকার প্রবণতা বেড়েছে। অন্যদিকে ড্রেনেজ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা, অপরিকল্পিত সড়ক নির্মাণ, নিয়মিত নালা পরিষ্কারের অভাব এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা সমস্যাকে আরও প্রকট করেছে। কোথাও কোথাও একই এলাকার দায়িত্ব একাধিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বিভক্ত থাকায় সমন্বয়ের অভাবও প্রকট হয়ে ওঠে। ফলে সমস্যার স্থায়ী সমাধানের পরিবর্তে প্রতি বছর অস্থায়ী উদ্যোগই বাস্তবায়িত হয়। গ্রামাঞ্চলের চিত্রও কম উদ্বেগজনক নয়।

আকস্মিক বন্যায় হাজার হাজার হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হয়, মাছের ঘের ভেসে যায়, গবাদিপশু মারা যায় কিংবা খাদ্যসংকটে পড়ে। অনেক পরিবার ঘরবাড়ি ছেড়ে আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে বাধ্য হয়। বিশুদ্ধ পানির সংকট, স্যানিটেশন ব্যবস্থার ভাঙন এবং পানিবাহিত রোগের বিস্তার জনস্বাস্থ্যকে বড় ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেয়। শিক্ষা কার্যক্রমও ব্যাহত হয়; অনেক বিদ্যালয় আশ্রয়কেন্দ্রে পরিণত হওয়ায় পাঠদান বন্ধ রাখতে হয়। অর্থাৎ একটি বন্যা শুধু তাৎক্ষণিক ক্ষতি করে না, বরং দীর্ঘমেয়াদে দারিদ্র‍্য, বেকারত্ব ও সামাজিক বৈষম্যকেও তীব্র করে তোলে। এ সংকটে নাগরিক আচরণের বিষয়টিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। প্লাস্টিক, পলিথিন ও কঠিন বর্জ্য যত্রতত্র ফেলার ফলে ড্রেন ও নালা প্রায়ই বন্ধ হয়ে যায়।

পরিবেশ রক্ষার দায়িত্ব শুধু সরকারের নয়; নাগরিকদেরও। সচেতনতার অভাব এবং আইন অমান্যের সংস্কৃতি জলাবদ্ধতার সংকটকে আরও জটিল করে তুলছে। তাই অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব নাগরিক সংস্কৃতি গড়ে তোলাও জরুরি। বন্যা ও জলাবদ্ধতা মোকাবিলায় স্বল্পমেয়াদি নয়, দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণের বিকল্প নেই।

প্রথমত, দেশের সব শহরের মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবসম্মতভাবে হালনাগাদ করতে হবে এবং নগর পরিকল্পনায় জলাধার, খাল ও উন্মুক্ত জলপ্রবাহ সংরক্ষণ বাধ্যতামূলক করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, আধুনিক ড্রেনেজ ও বৃষ্টির পানি ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে হবে, যাতে অল্প সময়ে অতিবৃষ্টির পানিও দ্রুত নিষ্কাশিত হতে পারে। তৃতীয়ত, খাল ও নদী দখলমুক্ত করে নিয়মিত খননের মাধ্যমে তাদের নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে হবে। একই সঙ্গে জলাভূমি ভরাটের বিরুদ্ধে বিদ্যমান আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে। গ্রামীণ অঞ্চলে নদী ব্যবস্থাপনা, টেকসই বাঁধ নির্মাণ, আগাম বন্যা সতর্কীকরণ ব্যবস্থা এবং জলবায়ু-সহনশীল কৃষি প্রযুক্তির প্রসারে আরও বিনিয়োগ প্রয়োজন। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সহজ শর্তে ঋণ, কৃষি উপকরণ ও পুনর্বাসন সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি।

দুর্যোগ-পরবর্তী ত্রাণ কার্যক্রমের পাশাপাশি জীবিকা পুনর্গঠনের ওপরও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, পানি উন্নয়ন বোর্ড, সিটি করপোরেশন এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, জলবায়ু পরিবর্তনের বাস্তবতা এখন আর ভবিষ্যতের আশঙ্কা নয়; এটি বর্তমানের বাস্তবতা। তাই উন্নয়নের প্রতিটি প্রকল্পে জলবায়ু সহনশীলতা, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাসকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

শুধু কংক্রিটের অবকাঠামো নির্মাণ করলেই উন্নয়ন টেকসই হয় না; প্রকৃতির সঙ্গে ভারসাম্য রক্ষা করাই প্রকৃত উন্নয়নের শর্ত। প্রতিবছর বর্ষা আসবে, ভারী বৃষ্টিও হবে। এটি থামানোর ক্ষমতা মানুষের নেই। কিন্তু সেই বৃষ্টি যেন জাতীয় দুর্ভোগের কারণ না হয়, সেটি নিশ্চিত করা অবশ্যই মানুষের হাতে। কারণ বন্যা ও জলাবদ্ধতা কেবল মৌসুমি দুর্যোগ নয়; এটি দেশের অর্থনীতি, জনস্বাস্থ্য, খাদ্যনিরাপত্তা, পরিবেশ এবং টেকসই উন্নয়নের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত একটি জাতীয় চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সময়োপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ করা না গেলে ভবিষ্যতে দুর্যোগের মাত্রা আরও বাড়বে। আর যদি আজ থেকেই বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনা ও সুশাসনের পথে এগোনো যায়, তবে বর্ষার বৃষ্টি আবারও জীবন ও সমৃদ্ধির বার্তাবাহক হয়ে উঠতে পারে দুর্ভোগের নয়।

কেএসকে

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow