ভার্চুয়াল জগতের টানে হারিয়ে যাচ্ছে শৈশব
মাহজাবীন তাসনীম রুহী একসময় বিকেল মানেই ছিল মাঠভরা কোলাহল। পাড়ার ছেলেমেয়েরা দৌড়ঝাঁপ করতো। খেলতো গোল্লাছুট, কানামাছি, বউচি কিংবা ক্রিকেট। সন্ধ্যা নামলে মায়ের ডাক শুনে ঘরে ফিরতো। সেই দৃশ্য যেন ক্রমেই বিরল হয়ে উঠছে। মাঠ আছে কিন্তু শিশু নেই। আছে মুঠোফোনের আসক্তি। ভিডিও গেম আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নেশা। ইউটিউব, টিকটক ও ফেসবুকের ভিডিও, রিলস বা শর্ট ভিডিও তাদের আকৃষ্ট করছে। ফলে সোশ্যাল মিডিয়ার অতিরিক্ত ব্যবহার, বিশেষ করে শিশুদের জীবনে নতুন সংকট তৈরি করেছে। শিশুরা ধীরে ধীরে বাস্তব জগত থেকে দূরে সরে ভার্চুয়াল জগতে বেশি সময় কাটাচ্ছে। ফলে তাদের শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক বিকাশের ওপর নানা ধরনের প্রভাব পড়ছে। বদলে যাওয়া চিত্র একযুগ আগেও শিশুর অবসর কাটতো বই পড়ে, বন্ধুদের সঙ্গে খেলাধুলা করে কিংবা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে গল্প করে। এখন অবসরের বড় অংশ দখল করে নিয়েছে স্মার্টফোন। খাওয়ার সময়, পড়ার ফাঁকে, এমনকি ঘুমানোর আগেও ফোন যেন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। অনেক অভিভাবকও শিশুকে শান্ত রাখার সহজ উপায় হিসেবে স্মার্টফোন হাতে তুলে দেন। সাময়িকভাবে সুবিধাজনক মনে হলেও দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব উদ্বেগজনক। শারীরিক
মাহজাবীন তাসনীম রুহী
একসময় বিকেল মানেই ছিল মাঠভরা কোলাহল। পাড়ার ছেলেমেয়েরা দৌড়ঝাঁপ করতো। খেলতো গোল্লাছুট, কানামাছি, বউচি কিংবা ক্রিকেট। সন্ধ্যা নামলে মায়ের ডাক শুনে ঘরে ফিরতো। সেই দৃশ্য যেন ক্রমেই বিরল হয়ে উঠছে। মাঠ আছে কিন্তু শিশু নেই। আছে মুঠোফোনের আসক্তি। ভিডিও গেম আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নেশা। ইউটিউব, টিকটক ও ফেসবুকের ভিডিও, রিলস বা শর্ট ভিডিও তাদের আকৃষ্ট করছে। ফলে সোশ্যাল মিডিয়ার অতিরিক্ত ব্যবহার, বিশেষ করে শিশুদের জীবনে নতুন সংকট তৈরি করেছে। শিশুরা ধীরে ধীরে বাস্তব জগত থেকে দূরে সরে ভার্চুয়াল জগতে বেশি সময় কাটাচ্ছে। ফলে তাদের শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক বিকাশের ওপর নানা ধরনের প্রভাব পড়ছে।
বদলে যাওয়া চিত্র
একযুগ আগেও শিশুর অবসর কাটতো বই পড়ে, বন্ধুদের সঙ্গে খেলাধুলা করে কিংবা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে গল্প করে। এখন অবসরের বড় অংশ দখল করে নিয়েছে স্মার্টফোন। খাওয়ার সময়, পড়ার ফাঁকে, এমনকি ঘুমানোর আগেও ফোন যেন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। অনেক অভিভাবকও শিশুকে শান্ত রাখার সহজ উপায় হিসেবে স্মার্টফোন হাতে তুলে দেন। সাময়িকভাবে সুবিধাজনক মনে হলেও দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব উদ্বেগজনক।
শারীরিক ও মানসিক ঝুঁকি
চিকিৎসকদের মতে, দীর্ঘসময় মোবাইল বা ট্যাবের পর্দার দিকে তাকিয়ে থাকলে শিশুদের চোখের সমস্যা, ঘুমের ব্যাঘাত এবং শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা দেখা দিতে পারে। খেলাধুলা কমে যাওয়ার ফলে স্থূলতা বা অতিরিক্ত ওজনের ঝুঁকিও বাড়ছে। পাশাপাশি রয়েছে মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়। অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহারের কারণে শিশুদের মনোযোগ ধরে রাখার ক্ষমতা কমে যেতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে সহজেই বিরক্ত হয়ে পড়ে। সামাজিক যোগাযোগে অনীহা দেখা দেয়। বাস্তব জীবনের সম্পর্কের চেয়ে ভার্চুয়াল সম্পর্ককে বেশি গুরুত্ব দিতে শুরু করে।

মাকে কি না মরে পড়ে থাকতে হয়েছে ৭ দিন
হারিয়ে যাচ্ছে সামাজিক শিক্ষা
একটি শিশু শুধু বই পড়ে বড় হয় না, বড় হয় মানুষের সঙ্গে মিশে, খেলাধুলা করে, হার-জিতের অভিজ্ঞতা অর্জন করে। মাঠে খেলতে গিয়ে দলবদ্ধতা শেখে, বন্ধুত্ব শেখে, নেতৃত্ব শেখে এবং অন্যকে সম্মান করতে শেখে। কিন্তু যখন অধিকাংশ সময় পর্দার সামনে কাটে; তখন সামাজিক শিক্ষার সুযোগ কমে যায়। শিশুরা বাস্তব জীবনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা অর্জন থেকে বঞ্চিত হয়।
দায় কার
এ পরিবর্তনের জন্য শুধু শিশুকে দায়ী করলে ভুল হবে। ব্যস্ত নগরজীবন, খেলার মাঠের সংকট, নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ এবং অভিভাবকদের সময়ের অভাব মিলিয়েই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। অনেক এলাকায় এখন আর পর্যাপ্ত খেলার মাঠ নেই। যে মাঠগুলো আছে; সেগুলোর অনেকগুলোই দখল, নির্মাণ কিংবা অব্যবস্থাপনার কারণে শিশুদের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। ফলে শিশুরা ঘরে বসে মোবাইলকেই বিনোদনের প্রধান মাধ্যম হিসেবে বেছে নিচ্ছে।
সমাধানের পথ
প্রযুক্তি থেকে শিশুদের পুরোপুরি দূরে রাখা সম্ভব নয়, প্রয়োজনও নেই। কারণ প্রযুক্তি আধুনিক শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তবে এর ব্যবহার হতে হবে নিয়ন্ত্রিত। সচেতন অভিভাবকদের উচিত শিশুদের সঙ্গে বেশি সময় কাটানো। তাদের বইপড়ায় উৎসাহিত করা। খেলাধুলার সুযোগ তৈরি করা। স্কুলগুলোতেও সহশিক্ষা কার্যক্রম ও ক্রীড়া চর্চার ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে খেলার মাঠ সংরক্ষণ ও নতুন মাঠ তৈরির উদ্যোগ নিতে হবে।
ভবিষ্যতের জন্য ভাবনা
শিশুরা একটি দেশের ভবিষ্যৎ। তাদের শৈশব যদি পর্দার আলোয় সীমাবদ্ধ হয়ে যায়। তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মানসিক ও সামাজিক বিকাশ নিয়ে উদ্বেগ থেকেই যায়। তাই এখনই সময় ভাবার। প্রযুক্তি আমাদের প্রয়োজন কিন্তু প্রযুক্তি যেন শৈশবকে গ্রাস না করে। শিশুর হাতে শুধু মোবাইল নয়, বইও থাকতে হবে। শুধু গেম নয়, খেলাধুলাও থাকতে হবে। শুধু ভার্চুয়াল বন্ধু নয়, বাস্তব বন্ধুত্বও থাকতে হবে। কারণ একটি সুন্দর শৈশবই একটি সুন্দর ভবিষ্যতের ভিত্তি। সেই ভিত্তি রক্ষার দায়িত্ব আমাদের।
লেখক: অনার্স দ্বিতীয় বর্ষ, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, এমসি কলেজ, সিলেট।
এসইউ
What's Your Reaction?
