ভোরে বেরিয়ে ফিরতেন রাতে, লিওনেলকে যেভাবে ‘মেসি’ বানিয়েছেন বাবা হোর্হে
বিশ্বের অন্যতম সেরা ফুটবলার লিওনেল মেসির গল্পটা শুধু একজন প্রতিভাবান ছেলের নয়; এর পেছনে আছে এক বাবার অসীম ত্যাগ, লড়াই আর বিশ্বাসের গল্প। যে বাবা ভোর ৪টায় কাজে বেরিয়ে রাত ৯টায় বাড়ি ফিরতেন। সন্তানের সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ পেতেন খুব কম। সেই হোর্হে মেসিই ছেলের স্বপ্নকে নিজের স্বপ্ন বানিয়ে নিয়েছিলেন। ছোট্ট রোজারিও থেকে মেসিকে বিশ্বের মঞ্চে পৌঁছে দেওয়ার সেই মানুষটি দীর্ঘ অসুস্থতার পর ৬৮ বছর বয়সে মারা গেছেন। তার চলে যাওয়ার পর আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে ‘মেসি’ হয়ে ওঠার গল্পের নেপথ্যে কতটা বড় ছিলেন হোর্হে। ১৯৫৮ সালে রোজারিওর লাস হেরাস এলাকায় জন্ম হোর্হে মেসির। জীবনের বড় একটি সময় স্টিল কারখানায় সুপারভাইজার হিসেবে কাজ করেছেন। স্ত্রী সেলিয়া কুচ্চিত্তিনির সঙ্গে চার সন্তানের সংসার — রদ্রিগো, মাতিয়াস, লিওনেল ও মারিয়া সল। পরিবারে ফুটবল ছিল নিত্যদিনের আনন্দ। ছোট্ট লিওনেলকে প্রথম দিকে নিজেই কোচিং করাতেন হোর্হে। মাত্র চার বছর বয়সেই ছেলের মধ্যে অন্যরকম কিছু দেখতে পেয়েছিলেন তিনি। ২০০৩ সালে ‘এল গ্রাফিকো’কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে হোর্হে বলেছিলেন, ‘চার বছর বয়সেই আমরা বুঝেছিলাম, সে আলাদা। সে ড্রিবল করত এবং বুটের ডগায়
বিশ্বের অন্যতম সেরা ফুটবলার লিওনেল মেসির গল্পটা শুধু একজন প্রতিভাবান ছেলের নয়; এর পেছনে আছে এক বাবার অসীম ত্যাগ, লড়াই আর বিশ্বাসের গল্প। যে বাবা ভোর ৪টায় কাজে বেরিয়ে রাত ৯টায় বাড়ি ফিরতেন। সন্তানের সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ পেতেন খুব কম। সেই হোর্হে মেসিই ছেলের স্বপ্নকে নিজের স্বপ্ন বানিয়ে নিয়েছিলেন।
ছোট্ট রোজারিও থেকে মেসিকে বিশ্বের মঞ্চে পৌঁছে দেওয়ার সেই মানুষটি দীর্ঘ অসুস্থতার পর ৬৮ বছর বয়সে মারা গেছেন। তার চলে যাওয়ার পর আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে ‘মেসি’ হয়ে ওঠার গল্পের নেপথ্যে কতটা বড় ছিলেন হোর্হে।
১৯৫৮ সালে রোজারিওর লাস হেরাস এলাকায় জন্ম হোর্হে মেসির। জীবনের বড় একটি সময় স্টিল কারখানায় সুপারভাইজার হিসেবে কাজ করেছেন। স্ত্রী সেলিয়া কুচ্চিত্তিনির সঙ্গে চার সন্তানের সংসার — রদ্রিগো, মাতিয়াস, লিওনেল ও মারিয়া সল।
পরিবারে ফুটবল ছিল নিত্যদিনের আনন্দ। ছোট্ট লিওনেলকে প্রথম দিকে নিজেই কোচিং করাতেন হোর্হে। মাত্র চার বছর বয়সেই ছেলের মধ্যে অন্যরকম কিছু দেখতে পেয়েছিলেন তিনি।
২০০৩ সালে ‘এল গ্রাফিকো’কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে হোর্হে বলেছিলেন, ‘চার বছর বয়সেই আমরা বুঝেছিলাম, সে আলাদা। সে ড্রিবল করত এবং বুটের ডগায় বল ভারসাম্য রেখে রাখতো। আমরা বিশ্বাসই করতে পারতাম না।’
কিন্তু তখনও কেউ জানতেন না, এই ছোট্ট ছেলেটিই একদিন ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় হয়ে উঠবে।
গ্র্যান্ডোলিতে মেসির শুরুর দিনগুলোও ছিল সংগ্রামের। একবার হোর্হের কাছে ছেলের ম্যাচ দেখার টিকিট কেনার মতো অর্থও ছিল না। সেই ঘটনার পর লিওনেলকে নিয়ে নিউয়েলস ওল্ড বয়েজে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।
সাত বছর বয়স থেকে ১৩ বছর পর্যন্ত নিউয়েলসেই খেলেন মেসি। সেখানেই সামনে আসে সবচেয়ে বড় বাধা মেসির শরীরে গ্রোথ হরমোনের ঘাটতি ধরা পড়ে। চিকিৎসার জন্য প্রতি মাসে প্রয়োজন ছিল প্রায় ৯০০ ডলার।
পরিবারের পক্ষে সেই খরচ চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। নিউয়েলস ওল্ড বয়েজও পুরো খরচ বহন করতে রাজি হয়নি। রিভার প্লেটও শেষ পর্যন্ত তাকে নেয়নি।
কিন্তু হোর্হে থামেননি।
তিনি জানতেন, তার ছেলের প্রতিভা অন্যরকম। বার্সেলোনা মেসির প্রতি আগ্রহ দেখাচ্ছে এই খবর পাওয়ার পর পরিবারের সঙ্গে স্পেনের কাতালোনিয়ায় চলে যান তিনি। সেখানে নিশ্চিত কোনো ভবিষ্যৎ ছিল না, ছিল শুধু একটি বিশ্বাস ছেলের জন্য সবচেয়ে ভালোটা করতে হবে।
বার্সেলোনায় মেসির প্রথম বছর ছিল ভীষণ কঠিন। নতুন দেশ, নতুন পরিবেশ, চিকিৎসার খরচ সব মিলিয়ে অনিশ্চয়তায় ভুগছিল পরিবার।
একপর্যায়ে মেসির মা সেলিয়াকে রোজারিওতে ফিরে যেতে হয়। ছোট্ট লিওর পাশে তখনও থেকে যান হোর্হে। বার্সেলোনা তাকে নেবে কি না, সেটিও তখন নিশ্চিত ছিল না। সেই অনিশ্চয়তার অবসান হয় এক ঐতিহাসিক দুপুরে। বার্সেলোনার তৎকালীন ক্রীড়া পরিচালক কার্লেস রেক্সাচ হোর্হেকে মধ্যাহ্নভোজে ডাকেন। সেখানেই একটি ন্যাপকিনে লেখা হয় মেসির প্রথম চুক্তি।
সেই ছোট্ট কাগজটিই পরে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম বিখ্যাত দলিল হয়ে ওঠে।
মেসির সামনে তখন স্পেনের হয়ে খেলার সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছিল। বার্সেলোনার যুব দলে তার অসাধারণ পারফরম্যান্স দেখে স্প্যানিশ ফুটবল কর্তারা তাকে জাতীয় দলে পাওয়ার আগ্রহ দেখান। কিন্তু হোর্হে জানতেন, তার ছেলে আর্জেন্টিনার হয়েই খেলতে চায়।
তাই মেসির সেরা মুহূর্তগুলোর ভিডিও তৈরি করে আর্জেন্টিনার যুব দলের কোচ হুগো তোকাল্লির কাছে পাঠিয়েছিলেন তিনি। আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গেও যোগাযোগ রাখেন এবং নিশ্চিত করেন — তার ছেলে জন্মভূমির হয়েই খেলতে চায়।
২০০৪ সালের ২৯ জুন প্যারাগুয়ের বিপক্ষে অনূর্ধ্ব-২০ দলের হয়ে আর্জেন্টিনার জার্সিতে অভিষেক হয় মেসির। এক অর্থে, হোর্হে শুধু একজন ফুটবলারকে বড় করেননি; তিনি আর্জেন্টিনার হাতে তুলে দিয়েছিলেন তাদের ভবিষ্যৎ কিংবদন্তিকে।
মেসি একবার বলেছিলেন, ছোটবেলা থেকেই প্রতিটি ম্যাচের পর বাবার মতামত তার কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল, ‘আমি সবসময় বাবার অনুমোদন চাইতাম। প্রতিটি ম্যাচের পর তাকে জিজ্ঞেস করতাম, আমি কেমন খেলেছি।’
এটাই ছিল মেসি ও হোর্হের সম্পর্ক। বিশ্বের কোটি মানুষ মেসির খেলা দেখলেও ম্যাচ শেষে একজন মানুষের মতামত তার কাছে আলাদা গুরুত্ব রাখতো — তার বাবা।
২০০৮ সালে উরুগুয়ের বিপক্ষে বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের ম্যাচে গোল করার পর মেসি জার্সি তুলে দেখিয়েছিলেন ভেতরের টি-শার্ট। সেখানে লেখা ছিল — ‘আমি তোমাকে ভালোবাসি, বাবা’
সেই সময় হোর্হে কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলেন। মেসির কাছে বাবাকে ভালোবাসা জানানোর সবচেয়ে সুন্দর উপায় ছিল ফুটবল দিয়েই তাকে উপহার দেওয়া।
একজন বাবার জন্য এর চেয়ে বড় উপহার আর কী হতে পারে
মেসির জীবনে এরপর এসেছে বার্সেলোনা, পিএসজি, ইন্টার মিঃয়ামি, বিশ্বকাপ, কোপা আমেরিকা, ব্যালন ডি’অর আর অসংখ্য সাফল্য। তার সঙ্গে হোর্হেও হয়ে উঠেছেন ছেলের ক্যারিয়ারের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিনিধি, চুক্তি ও বাণিজ্যিক বিষয় সামলানো মানুষ। কিন্তু সব পরিচয়ের আগে তিনি ছিলেন লিওনেল মেসির বাবা।
ভোর ৪টায় কাজে বের হওয়া সেই মানুষটি হয়তো তখন জানতেন না, তার ছেলে একদিন পৃথিবীর কোটি মানুষের ভালোবাসার মানুষ হবে। তিনি শুধু জানতেন — ছেলেটি ফুটবল ভালোবাসে, আর তার স্বপ্নটাকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে।
আজ মেসির হাতে অসংখ্য ট্রফি। ফুটবল ইতিহাসে তার নাম চিরস্থায়ী। কিন্তু সেই সাফল্যের গল্পের প্রথম পাতায় যে মানুষটির নাম লেখা — তিনি হোর্হে মেসি। বাবা চলে গেছেন, কিন্তু মেসির প্রতিটি গোল, প্রতিটি অর্জন আর প্রতিটি স্মৃতির ভেতর হয়তো সারাজীবন বেঁচে থাকবেন সেই মানুষটি। যিনি ভোর ৪টায় ঘর থেকে বেরিয়ে যেতেন শুধু তার ছেলের স্বপ্নটাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য।
আরআর/আইএন
What's Your Reaction?