মদিনার ইহুদি-মুশরিকদের মনস্তত্ত্ব ও মহানবীর (সা.) দক্ষ কূটনীতি

রাসুলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) নবুয়তের দ্বাদশ ও ত্রয়োদশ বছরে আকাবার ঐতিহাসিক বায়াতের পর মক্কায় মুসলিমদের ওপর কুরাইশদের নির্যাতন যখন চরম আকার ধারণ করে, তখন মদিনা (তৎকালীন ইয়াসরিব) ইসলাম ও মুসলিমদের জন্য এক নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে আবির্ভূত হয়। তবে রাসুলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) হিজরতের সময় মদিনার জনসংখ্যা ও সামাজিক বিন্যাস মোটেই একক বা একমুখী ছিল না। সেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিল অমুসলিমরা যাদের মূল দুটি বড় গোষ্ঠী ছিল ইহুদি ও পৌত্তলিক বা মুশরিকরা। ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, মদিনার ইহুদি বা মুশরিক কোনো পক্ষই মহানবীর (সা.) আগমনকে অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে স্বাগত জানায়নি। কিন্তু আউস ও খাজরাজ গোত্রের ইসলাম গ্রহণ, মুসলিমদের পারস্পরিক অভূতপূর্ব ঐক্য এবং মদিনার দীর্ঘদিনের অভ্যন্তরীণ গৃহযুদ্ধের পটভূমিতে তারা অনেকটা বাধ্য হয়েই নবীজির (সা.) নেতৃত্ব মেনে নিয়েছিল। ইহুদিদের মনস্তত্ত্ব ও রাসুলুল্লাহর (সা.) প্রারম্ভিক কৌশল মদিনার ইহুদিরা তাদের আসমানি গ্রন্থের সূত্রে জানত যে একজন শেষ নবীর আগমন আসন্ন। তারা তাঁর আগমনের অপেক্ষায় ছিল এবং আশা করত যে সেই নবী তাদের বংশ

মদিনার ইহুদি-মুশরিকদের মনস্তত্ত্ব ও মহানবীর (সা.) দক্ষ কূটনীতি

রাসুলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) নবুয়তের দ্বাদশ ও ত্রয়োদশ বছরে আকাবার ঐতিহাসিক বায়াতের পর মক্কায় মুসলিমদের ওপর কুরাইশদের নির্যাতন যখন চরম আকার ধারণ করে, তখন মদিনা (তৎকালীন ইয়াসরিব) ইসলাম ও মুসলিমদের জন্য এক নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে আবির্ভূত হয়। তবে রাসুলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) হিজরতের সময় মদিনার জনসংখ্যা ও সামাজিক বিন্যাস মোটেই একক বা একমুখী ছিল না। সেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিল অমুসলিমরা যাদের মূল দুটি বড় গোষ্ঠী ছিল ইহুদি ও পৌত্তলিক বা মুশরিকরা।

ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, মদিনার ইহুদি বা মুশরিক কোনো পক্ষই মহানবীর (সা.) আগমনকে অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে স্বাগত জানায়নি। কিন্তু আউস ও খাজরাজ গোত্রের ইসলাম গ্রহণ, মুসলিমদের পারস্পরিক অভূতপূর্ব ঐক্য এবং মদিনার দীর্ঘদিনের অভ্যন্তরীণ গৃহযুদ্ধের পটভূমিতে তারা অনেকটা বাধ্য হয়েই নবীজির (সা.) নেতৃত্ব মেনে নিয়েছিল।

ইহুদিদের মনস্তত্ত্ব ও রাসুলুল্লাহর (সা.) প্রারম্ভিক কৌশল

মদিনার ইহুদিরা তাদের আসমানি গ্রন্থের সূত্রে জানত যে একজন শেষ নবীর আগমন আসন্ন। তারা তাঁর আগমনের অপেক্ষায় ছিল এবং আশা করত যে সেই নবী তাদের বংশ থেকে আসবেন। কিন্তু যখন সেই শেষ নবী কুরাইশ তথা আরবদের মধ্য থেকে আত্মপ্রকাশ করলেন, তখন তাদের দীর্ঘদিনের অহংকার ও বর্ণবাদী মানসিকতা জেগে উঠল। তারা সত্য জেনেও কেবল বংশগত হিংসার কারণে মহানবীকে (সা.) অস্বীকার করল। হাতে গোনা কয়েকজন যেমন বিশিষ্ট ইহুদি পণ্ডিত আবদুল্লাহ ইবনে সালামসহ (রা.) কিছু ইহুদি ছাড়া অধিকাংশ ইহুদিই ইসলাম গ্রহণে অস্বীকৃতি জানায়।

তবে এই বৈরী পরিবেশেও রাসুলুল্লাহ (সা.) অত্যন্ত ধৈর্য ও দূরদর্শিতার পরিচয় দেন। মদিনায় পৌঁছানোর পর তিনি ইহুদিদের সাথে অনাক্রমণ ও পারস্পরিক সহাবস্থানের চুক্তি করেন। তাদের মন জয় করার জন্য শরীয়তের স্পষ্ট নির্দেশ না পাওয়া পর্যন্ত অনেক ক্ষেত্রে তাদের অভ্যাসের সাথে মিল রেখে চলার নীতি গ্রহণ করেন।

মুফাসসির ও হাদিস বিশারদদের মতে, হিজরতের পর দীর্ঘ ১৭ মাস মুসলিমরা ইহুদিদের কেবলা বায়তুল মাকদিসের দিকে মুখ করে সালাত আদায় করেছেন। এ ছাড়া আশুরার রোজা রাখার ক্ষেত্রেও ইহুদিদের রীতির সাথে সামঞ্জস্য রাখা হয়েছিল। সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) মাথার চুল পেছনের দিকে ফেলে রাখতেন আর মক্কার মুশরিকরা সিাঁথি কাটত। আহলে কিতাবরাও চুল পেছনের দিকে ফেলে রাখত। যে বিষয়ে আল্লাহর কোনো স্পষ্ট আদেশ আসেনি, সে বিষয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.) আহলে কিতাবদের অনুসরণ পছন্দ করতেন। তবে পরবর্তীতে তিনি সিঁথি কাটা শুরু করেন। (সহিহ বুখারি: ৩৩৬৫, সহিহ মুসলিম: ২৩৩৬)

অর্থাৎ এই নমনীয় নীতি চিরস্থায়ী ছিল না। পরবর্তীতে যখন ইহুদিদের পক্ষ থেকে প্রকাশ্য বিশ্বাসঘাতকতা, চুক্তি লঙ্ঘন এবং চরম শত্রুতা দেখা দেয়, তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) তাদের সাথে সাদৃশ্য বর্জন করে স্বতন্ত্র ইসলামী সংস্কৃতির বিকাশ ঘটান এবং তাদের ষড়যন্ত্রের কঠোর জবাব দেন।

মদিনার মুশরিক সম্প্রদায় ও সামাজিক সহাবস্থান

মক্কার মুশরিকদের তুলনায় মদিনার মুশরিকদের আচরণ ছিল অপেক্ষাকৃত সহনশীল ও মৃদু। এর মূল কারণ ছিল তাদের ইয়েমেনি বংশোদ্ভূত শান্ত স্বভাব এবং মক্কার মতো মদিনায় পৌত্তলিকতার শেকড় অতটা গভীর না থাকা। প্রথাগত অন্ধ বিশ্বাস থেকে মুক্ত থাকার কারণে মদিনার সাধারণ মানুষের কাছে ইসলামের বার্তা খুব দ্রুত পৌঁছাতে পেরেছিল।

রাসুলুল্লাহ (সা.) মদিনার সাধারণ মুশরিকদের সাথে এক অনন্য শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। মুসলিম ও মুশরিকরা পরস্পর ব্যবসা-বাণিজ্য করত, একে অপরকে ঋণ দিত ও নিত, মেহমানদারি করত এবং উপহার বিনিময় করত। এই স্বাভাবিক সামাজিক সম্পর্কই সাধারণ মুশরিকদের ইসলামকে কাছ থেকে দেখার ও বোঝার সুযোগ করে দেয়, যা মদিনায় ইসলামের দ্রুত প্রসারে ভূমিকা রাখে।

আবদুল্লাহ ইবনে উবাই ও রাজনৈতিক বিদ্বেষ

সব মুশরিক অবশ্য এই পরিবর্তনকে ইতিবাচকভাবে নেয়নি। বিশেষ করে তৎকালীন মদিনার ক্ষমতাভিলাষী নেতারা রাসুলুল্লাহর (সা.) আগমনকে নিজেদের রাজনৈতিক অস্তিত্বের জন্য হুমকি মনে করেছিল। এর মধ্যে সবচেয়ে উগ্র ছিল খাজরাজ গোত্রের প্রভাবশালী নেতা আবদুল্লাহ ইবনে উবাই ইবনে সালুল।

রাসুলুল্লাহর (সা.) হিজরতের আগে আউস ও খাজরাজ গোত্র নিজেদের দীর্ঘদিনের রক্তক্ষয়ী সংঘাতের অবসান ঘটিয়ে আবদুল্লাহ ইবনে উবাইকে পুরো মদিনার একক রাজা হিসেবে মুকুট পরানোর সিদ্ধান্ত প্রায় চূড়ান্ত করে ফেলেছিল। কিন্তু রাসুলুল্লাহর (সা.) আগমনে এবং মদিনাবাসীর ইসলাম গ্রহণে সেই রাজনৈতিক পরিকল্পনা পুরোপুরি নস্যাৎ হয়ে যায়। ফলে ইবনে সালুলের হৃদয়ে মহানবী (সা.) ও ইসলামের প্রতি গভীর হিংসা ও আক্রোশের জন্ম হয়। পরবর্তীতে সে মুখে ইসলামের দাবি করলেও আজীবন ইসলামের অন্যতম প্রধান শত্রুর ভূমিকা পালন করে।

বেদুইন গোত্রসমূহের সাথে রাজনৈতিক দূরদর্শিতা

মদিনার উপকণ্ঠে ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে বসবাসকারী অধিকাংশ অ্যারাবিয়ান বা বেদুইন গোত্র ছিল কঠোর স্বভাবের। রাসুলুল্লাহ (সা.) তাদের সাথেও চমৎকার কূটনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলেন। তিনি কৌশলগত দিক বিবেচনায় নিয়ে দুটি ভিন্ন নীতি গ্রহণ করেন; যারা শান্তিপূর্ণ আচরণ নিশ্চিত করেছিল (যেমন জুহাইনা গোত্র), তাদের সাথে মৈত্রী চুক্তি সম্পাদন করেন; আর যারা মদিনার নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছিল (যেমন বনু সুলাইম), তাদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান পরিচালনা করে মদিনাকে সুরক্ষিত রাখেন।

ইতিহাসের পর্যালোচনায় স্পষ্ট হয় যে, রাসুলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) মদিনার জীবন কেবল একটি ধর্মীয় মতবাদ প্রচারের ইতিহাস নয়; বরং এটি ছিল বহুজাতি ও বহুধর্মীয় একটি সমাজে শান্তি, নিরাপত্তা এবং সামাজিক ইনসাফ প্রতিষ্ঠার এক প্রজ্ঞাপূর্ণ রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বিপ্লব। প্রতিপক্ষের মনস্তত্ত্ব বুঝে ধৈর্যের সাথে সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং প্রয়োজনভেদে কঠোর ও কোমল নীতির সঠিক প্রয়োগই মদিনাকে একটি শক্তিশালী ইসলামি রাষ্ট্রের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করেছিল।

সূত্র: ইসলাম স্টোরি ডট কম

ওএফএফ

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow