মনন অবক্ষয় ও জ্ঞানের অন্বেষা 

মানবসভ্যতার ইতিহাসে জ্ঞানের প্রধান বাহন ছিলো বই। সভ্যতার প্রতিটি নবজাগরণ, প্রতিটি মননের দীপ্তি, প্রতিটি দর্শনের উন্মেষ বইয়ের পাতায়'ই প্রথম আলো জ্বালিয়েছে। কিন্তু আধুনিক কালের এই ত্বরান্বিত প্রযুক্তিনির্ভর যুগে মানুষ ক্রমশ বইয়ের নীরব আশ্রয় ত্যাগ করে প্রবেশ করছে পর্দার ক্ষণস্থায়ী মোহে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ক্ষুদ্র ভিডিও, রিলস কিংবা অনবরত স্ক্রল এই সবই যেন মানুষের মনকে ক্ষণিক বিনোদনের মায়াজালে আবদ্ধ করছে। ফলে যে সময়টি এককালে ছিল অধ্যয়ন, মনন ও ভাবনার আজ তা বিলীন হচ্ছে ডিজিটাল কোলাহলে। সংস্কৃত ভাষায় একটি প্রবাদ আছে— পুস্তক হলো জ্ঞানের ভাণ্ডার। মানবসভ্যতার যে জ্ঞান-ঐতিহ্য, তা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বইয়ের পাতায় সংরক্ষিত হয়েছে। যখন আমরা কোনো গ্রন্থ পাঠ করি, তখন কেবল শব্দ পড়ি না, আমরা প্রবেশ করি অন্য এক যুগে, অন্য এক মননে।  দর্শনশাস্ত্রের প্রখ্যাত চিন্তক Rene Descartes বলেছিলেন— The reading of all good books is like conversation with the finest minds of past centuries. অর্থাৎ উৎকৃষ্ট বই পড়া মানে অতীতের শ্রেষ্ঠ মনীষীদের সঙ্গে আলাপ করা। কিন্তু আজকের বাস্তবতায় এই গভীর অভিজ্ঞতা ক্রমশ বিরল

মনন অবক্ষয় ও জ্ঞানের অন্বেষা 

মানবসভ্যতার ইতিহাসে জ্ঞানের প্রধান বাহন ছিলো বই। সভ্যতার প্রতিটি নবজাগরণ, প্রতিটি মননের দীপ্তি, প্রতিটি দর্শনের উন্মেষ বইয়ের পাতায়'ই প্রথম আলো জ্বালিয়েছে। কিন্তু আধুনিক কালের এই ত্বরান্বিত প্রযুক্তিনির্ভর যুগে মানুষ ক্রমশ বইয়ের নীরব আশ্রয় ত্যাগ করে প্রবেশ করছে পর্দার ক্ষণস্থায়ী মোহে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ক্ষুদ্র ভিডিও, রিলস কিংবা অনবরত স্ক্রল এই সবই যেন মানুষের মনকে ক্ষণিক বিনোদনের মায়াজালে আবদ্ধ করছে। ফলে যে সময়টি এককালে ছিল অধ্যয়ন, মনন ও ভাবনার আজ তা বিলীন হচ্ছে ডিজিটাল কোলাহলে।


সংস্কৃত ভাষায় একটি প্রবাদ আছে— পুস্তক হলো জ্ঞানের ভাণ্ডার। মানবসভ্যতার যে জ্ঞান-ঐতিহ্য, তা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বইয়ের পাতায় সংরক্ষিত হয়েছে। যখন আমরা কোনো গ্রন্থ পাঠ করি, তখন কেবল শব্দ পড়ি না, আমরা প্রবেশ করি অন্য এক যুগে, অন্য এক মননে। 


দর্শনশাস্ত্রের প্রখ্যাত চিন্তক Rene Descartes বলেছিলেন— The reading of all good books is like conversation with the finest minds of past centuries. অর্থাৎ উৎকৃষ্ট বই পড়া মানে অতীতের শ্রেষ্ঠ মনীষীদের সঙ্গে আলাপ করা।


কিন্তু আজকের বাস্তবতায় এই গভীর অভিজ্ঞতা ক্রমশ বিরল হয়ে উঠছে। আধুনিক মানুষ, বিশেষত তরুণ প্রজন্ম দ্রুত বিনোদনের দিকে ঝুঁকছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কয়েক সেকেন্ডের ভিডিও দেখার অভ্যাস মনকে তৎক্ষণাৎ উত্তেজনা দেয় বটে, কিন্তু তা চিন্তার গভীরতা তৈরি করতে পারে না। বরং একে বলা যায়  ক্ষণিক আনন্দ কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী শূন্যতা।


বই পাঠ মানুষের চিন্তাশক্তিকে প্রশস্ত করে, ভাষাকে পরিশীলিত করে এবং অভিজ্ঞতার পরিধি বিস্তৃত করে। বইয়ের মধ্যে মানুষ শুধু তথ্য পায় না, পায় অনুভব, উপলব্ধি এবং আত্মসমালোচনার ক্ষমতা। একটি উপন্যাস পাঠ করলে আমরা চরিত্রগুলোর জীবনবোধের সঙ্গে একাত্ম হই, একটি দর্শনের বই পড়লে চিন্তার নতুন দ্বার উন্মুক্ত হয়, আর ইতিহাস পাঠ করলে উপলব্ধি করি সভ্যতার উত্থান-পতনের ধারাবাহিকতা।
সংস্কৃত ভাষায় একটি প্রবাদ আছে
‘বিদ্যা বিনয় দেয়, আর সেই বিনয় মানুষকে যোগ্যতার দিকে নিয়ে যায়।’


অন্যদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মানুষের মনকে এক অদ্ভুত তাড়নার মধ্যে রাখে। সেখানে গভীর মনন নয়, বরং দ্রুত প্রতিক্রিয়া ও ক্ষণস্থায়ী উত্তেজনা মুখ্য। মানুষ ক্রমাগত নতুন ভিডিও বা নতুন পোস্টের সন্ধানে ছুটে চলে। এই অবস্থা যেন এক প্রকার ডিজিটাল মায়াজাল, যেখানে মন আটকে যায় কিন্তু আত্মা পরিপুষ্ট হয় না।


বাংলা সাহিত্যে বহুদিন ধরেই বইকে মানবমুক্তির অন্যতম উপায় হিসেবে দেখা হয়েছে। কারণ বই মানুষকে আত্মজিজ্ঞাসার দিকে নিয়ে যায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পর্দা মানুষকে বহির্মুখী করে, কিন্তু বই মানুষকে অন্তর্মুখী করে তোলে। আর আত্মদর্শন ছাড়া প্রকৃত জ্ঞান সম্ভব নয়।


বর্তমান প্রজন্মের জন্য তাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ভারসাম্য রক্ষা করা। প্রযুক্তি নিঃসন্দেহে আধুনিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ; কিন্তু প্রযুক্তি যেন মননের বিকল্প না হয়ে ওঠে। যদি মানুষ প্রতিদিন কিছু সময় বইয়ের জন্য সংরক্ষণ করে, তবে সেই সামান্য সময়ই তাকে নতুন চিন্তার জগতে প্রবেশ করাতে পারে।


জ্ঞানের মতো পবিত্র আর কিছু নেই। আর সেই জ্ঞান অর্জনের অন্যতম প্রধান পথ হলো বই। অতএব, যে সমাজ বই থেকে দূরে সরে যায়, সে সমাজ আসলে নিজের ভবিষ্যৎ থেকেই দূরে সরে যায়। কারণ জ্ঞানহীন বিনোদন সভ্যতাকে সাময়িক উল্লাস দিতে পারে, কিন্তু স্থায়ী প্রজ্ঞা দিতে পারে না।


বইয়ের নীরব আলোই পারে মানুষের অন্তরকে আলোকিত করতে। ডিজিটাল যুগের এই প্রগাঢ় মোহের মধ্যেও আমাদের মনে রাখতে হবে, রিলস মানুষকে কয়েক সেকেন্ড আনন্দ দেয়, কিন্তু বই মানুষকে যুগের পর যুগ চিন্তা করার শক্তি দেয়।
আর সেই চিন্তার মধ্যেই লুকিয়ে আছে মানবসভ্যতার প্রকৃত অগ্রযাত্রা।

 

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow