মায়ের পেট ফেটে জন্ম নেওয়া সেই শিশুটির জন্মদিন আজ, কেমন আছে ফাতেমা?

২০২২ সালের ১৬ জুলাই। দুপুরের প্রখর রোদে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের ত্রিশাল উপজেলা মুহূর্তেই পরিণত হয় শোকের জনপদে। একটি বেপরোয়া ট্রাকের চাপায় একসঙ্গে প্রাণ হারিয়েছিলেন অন্তঃসত্ত্বা রত্না বেগম, তার স্বামী জাহাঙ্গীর আলম এবং তাদের ছয় বছরের মেয়ে সানজিদা। কিন্তু সেই বিভীষিকার মধ্যেই ঘটে এক অলৌকিক ঘটনা, যা বিস্মিত করে গোটা দেশকে। মায়ের গর্ভ ফেটে সড়কের ওপর জন্ম নেয় এক কন্যাশিশু। মৃত্যুর মিছিলের মাঝে জীবন নিয়ে পৃথিবীতে আসা সেই শিশুটির নাম রাখা হয় ফাতেমা। আজ ১৬ জুলাই। অলৌকিক সেই জন্মের চার বছর পূর্ণ করলো ফাতেমা। বর্তমানে ঢাকার আজিমপুর ছোটমণি নিবাসেই বেড়ে উঠছে সে। চার বছরে তার মুখে ফুটেছে কথা, বেড়েছে দৌড়ঝাঁপ, খেলাধুলা আর হাসি। কিন্তু এখনো সে জানে না, তার পৃথিবীতে আসার গল্পটি অন্য সবার মতো নয়। জানে না জন্মের মুহূর্তেই হারিয়েছে মা, বাবা আর বড় বোনকে। শিশুসুলভ সরলতায় সে মাঝেমধ্যেই জানতে চায়, ‘আমি অ্যাক্সিডেন্ট হইয়া বাচ্চা হইছি, আব্বা-আম্মা কই?’ তবে এই প্রশ্নের কোনো উত্তর দিতে পারেন না তার স্বজনরা। ফাতেমার দাদা মোস্তাফিজুর রহমান বাবুল বলেন, ‘ওর বয়স এখনো খুব কম। সত্যিটা জানলে মানসিকভাবে সামলাতে পারবে না। ত

মায়ের পেট ফেটে জন্ম নেওয়া সেই শিশুটির জন্মদিন আজ, কেমন আছে ফাতেমা?

২০২২ সালের ১৬ জুলাই। দুপুরের প্রখর রোদে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের ত্রিশাল উপজেলা মুহূর্তেই পরিণত হয় শোকের জনপদে। একটি বেপরোয়া ট্রাকের চাপায় একসঙ্গে প্রাণ হারিয়েছিলেন অন্তঃসত্ত্বা রত্না বেগম, তার স্বামী জাহাঙ্গীর আলম এবং তাদের ছয় বছরের মেয়ে সানজিদা। কিন্তু সেই বিভীষিকার মধ্যেই ঘটে এক অলৌকিক ঘটনা, যা বিস্মিত করে গোটা দেশকে। মায়ের গর্ভ ফেটে সড়কের ওপর জন্ম নেয় এক কন্যাশিশু। মৃত্যুর মিছিলের মাঝে জীবন নিয়ে পৃথিবীতে আসা সেই শিশুটির নাম রাখা হয় ফাতেমা।

আজ ১৬ জুলাই। অলৌকিক সেই জন্মের চার বছর পূর্ণ করলো ফাতেমা। বর্তমানে ঢাকার আজিমপুর ছোটমণি নিবাসেই বেড়ে উঠছে সে। চার বছরে তার মুখে ফুটেছে কথা, বেড়েছে দৌড়ঝাঁপ, খেলাধুলা আর হাসি। কিন্তু এখনো সে জানে না, তার পৃথিবীতে আসার গল্পটি অন্য সবার মতো নয়। জানে না জন্মের মুহূর্তেই হারিয়েছে মা, বাবা আর বড় বোনকে।

শিশুসুলভ সরলতায় সে মাঝেমধ্যেই জানতে চায়, ‘আমি অ্যাক্সিডেন্ট হইয়া বাচ্চা হইছি, আব্বা-আম্মা কই?’ তবে এই প্রশ্নের কোনো উত্তর দিতে পারেন না তার স্বজনরা।

ফাতেমার দাদা মোস্তাফিজুর রহমান বাবুল বলেন, ‘ওর বয়স এখনো খুব কম। সত্যিটা জানলে মানসিকভাবে সামলাতে পারবে না। তাই এখনো বলিনি। যখন একটু বড় হবে, তখন সব জানানো হবে।’

তিনি বলেন, ফাতেমার স্মৃতিতে মা-বাবার কোনো বাস্তব ছবি নেই। তবু অন্য শিশুদের মতো সেও বাবা-মায়ের কথা জানতে চায়। কখনো বলে তারা কোথায়, কখনো জানতে চায় তারা কেমন আছে।

চার বছর আগে ঘটে যাওয়া সেই দুর্ঘটনা শুধু একটি পরিবারের নয়, পুরো দেশের মানুষকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। দুর্ঘটনায় ঘটনাস্থলেই মারা যান অন্তঃসত্ত্বা রত্না বেগম ও তার স্বামী জাহাঙ্গীর আলম। হাসপাতালে নেওয়ার পথে মারা যায় তাদের বড় মেয়ে সানজিদাও। পরে চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে বেঁচে যায় সদ্যোজাত ফাতেমা।

সেই সময় চিকিৎসকরা বলেছিলেন, এত ভয়াবহ দুর্ঘটনার পরও শিশুটির বেঁচে যাওয়া ছিল চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে অত্যন্ত বিরল ঘটনা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে জাতীয় সংবাদমাধ্যম, সর্বত্র আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে নবজাতক ফাতেমা।

তবে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকলেও জীবনের বাস্তবতা ছিল কঠিন। বাবা জাহাঙ্গীর আলম ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। দিনমজুরির আয়ে চলত সংসার। তার মৃত্যুর পর পরিবারটি কার্যত দিশাহারা হয়ে পড়ে। বাড়িতে ছিল বৃদ্ধ বাবা-মা, অষ্টম শ্রেণি পড়ুয়া মেয়ে জান্নাত, তৃতীয় শ্রেণির ছাত্র ছেলে এবাদত এবং সদ্যোজাত ফাতেমা। শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধী দাদা মোস্তাফিজুর রহমান বাবুলের একটি ছোট দোকানের সামান্য আয় দিয়ে এত বড় পরিবারের দায়িত্ব বহন করা প্রায় অসম্ভব হয়ে ওঠে। এরপর বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান তাদের পাশে দাঁড়ায়। প্রশাসনের পাশাপাশি রাজনৈতিক নেতারাও সহযোগিতা করেন।

পরিবারের সদস্যরা জানান, বিএনপির চেয়ারম্যান ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান লন্ডনে অবস্থানকালেই ফাতেমা ও তার পরিবারের আজীবন ভরণপোষণের দায়িত্ব নেওয়ার ঘোষণা দেন। তার নির্দেশনায় সাবেক ছাত্রনেতা নাইমুল করিম লুইনের মাধ্যমে প্রতি মাসে চাল, ডাল, তেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী পরিবারটির কাছে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।

শুধু তাই নয়, পরিবারটির জন্য একটি পাকা বাড়ি নির্মাণের কাজও চলছে। এছাড়া ফাতেমার অলৌকিক জন্মকে স্মরণীয় করে রাখতে তাদের বাড়ির সামনের সড়কের নামকরণ করা হয়েছে ‘ফাতেমা রোড’।

তবে এসব সহায়তার বাইরেও দাদার সবচেয়ে বড় আকাঙ্ক্ষা একটাই, নাতনিকে নিজের কাছে ফিরিয়ে আনা।

বর্তমানে ছোটমণি নিবাসের নিয়ম অনুযায়ী, ছয় বছর বয়স পূর্ণ হওয়ার আগে শিশুদের অভিভাবকের কাছে স্থায়ীভাবে হস্তান্তর করা হয় না। তাই আরও প্রায় দুই বছর অপেক্ষা করতে হবে মোস্তাফিজুর রহমান বাবুলকে।

তিনি বলেন, দিন গুনছি। ছয় বছর পূর্ণ হলেই ওকে বাড়িতে নিয়ে আসবো। নিজের কাছেই মানুষ করবো। ও যেন কোনো কষ্ট না পায়, সেটাই চাই।

মোস্তাফিজুর রহমান বাবুলের বয়স এখন ৬৫ বছর। দুই ছেলেকেই হারিয়েছেন। তিন মেয়ে জীবিত থাকলেও তাদের সবার আর্থিক অবস্থা দুর্বল। তারপরও ফাতেমার ফুপুরা নিয়মিত তার খোঁজখবর রাখেন।

গত ঈদুল আজহার পরের দিন দাদা-দাদি ঢাকায় গিয়ে ফাতেমার সঙ্গে দেখা করেন। সেদিনও নাতনির একই প্রশ্ন, আব্বা-আম্মা কেমন আছে? প্রশ্ন শুনে চোখের পানি লুকাতে পারেননি তারা।

আজিমপুর ছোটমণি নিবাসের উপ-তত্ত্বাবধায়ক তানজিনা আফরিন বলেন, ‘জন্মের কয়েকদিন পর থেকেই ফাতেমা আমাদের এখানেই আছে। দেখতে দেখতে চার বছর হয়ে গেলো। অন্য শিশুদের মতোই স্বাভাবিকভাবে বড় হচ্ছে সে।’

তিনি জানান, ফাতেমার খাবার, চিকিৎসা, শিক্ষা কিংবা খেলাধুলার কোনো ঘাটতি রাখা হয়নি। নিয়মিত শিক্ষকের মাধ্যমে পাঠদান এবং ধর্মীয় শিক্ষারও ব্যবস্থা রয়েছে। অন্যান্য শিশুদের সঙ্গে খেলাধুলা করে, হাসে, শেখে, গল্প করে। তার বেড়ে ওঠা একেবারেই স্বাভাবিক। তবে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তার কৌতূহলও বাড়ছে। অন্য শিশুদের মতো সেও নিজের পরিবার সম্পর্কে জানতে চায়। কেন সে এখানে থাকে, বাবা-মা কোথায়, এমন নানা প্রশ্ন করে।

এসব প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার সময় খুব সতর্ক থাকতে হয় বলে জানান ছোটমণি নিবাসের কর্মকর্তারা।

ফাতেমার গল্প শুধু একটি অলৌকিক জন্মের গল্প নয়। এটি একইসঙ্গে নির্মম বাস্তবতাও। যেখানে দেখা যায় একটি সড়ক দুর্ঘটনা কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে একটি পরিবারকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে পারে। আবার সেই ধ্বংসস্তূপের মধ্যেই নতুন জীবনের আলো জ্বলে উঠতে পারে।

চার বছরে ফাতেমা অনেক বড় হয়েছে। কিন্তু তার জীবনের সবচেয়ে বড় সত্যটি এখনো অজানা। যে শিশুটি পৃথিবীতে আসার মুহূর্তেই হারিয়েছে সবচেয়ে আপন মানুষগুলোকে, সে আজও বিশ্বাস করে কোথাও না কোথাও তার বাবা-মা আছেন।

হয়ত আরও কিছুদিন পর তাকে জানানো হবে সেই ভয়াবহ দিনের ইতিহাস। বলা হবে, কীভাবে মৃত্যুর মাঝখান থেকে জীবন নিয়ে এসেছিল সে। কিন্তু আজ চার বছর পূর্তির দিনে, ফাতেমার পরিচয় কেবল একটি অলৌকিক জন্ম নয়। সে এখন আশার প্রতীক। প্রতিকূলতার মাঝেও জীবন যে থেমে থাকে না, অন্ধকারের ভেতরেও নতুন সূর্য ওঠে, সেই সত্যেরই এক জীবন্ত উদাহরণ ছোট্ট ফাতেমা।

এফএ/এএসএম

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow