মায়ের বাটা মসলা থেকে আধুনিক গবেষণাগার: ভেষজের বিবর্তনের যাত্রা
বিবি শাহীজান রান্নাঘরের এক কোণে শিলপাটার ওপর মায়ের হাতের মসলা বাটার শব্দ একসময় ছিল বাঙালি জীবনের পরিচিত দৃশ্য। আদা, রসুন, হলুদ, জিরা কিংবা ধনিয়ার ঘ্রাণে ভরে উঠত ঘর। তখন হয়তো কেউ ভাবেনি, প্রতিদিনের রান্নায় ব্যবহৃত এসব সাধারণ উপাদান একদিন আধুনিক গবেষণাগারে বিজ্ঞানীদের আগ্রহের বিষয় হয়ে উঠবে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ভেষজ ও মসলাকে ঘিরে মানুষের জ্ঞান, গবেষণা এবং ব্যবহার বহুমাত্রিক রূপ পেয়েছে। আজ বিশ্বজুড়ে ভেষজ ও মসলা শুধু খাবারের স্বাদ বাড়ানোর উপাদান নয়, স্বাস্থ্য, অর্থনীতি, সংস্কৃতি এবং বৈজ্ঞানিক গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। মানব সভ্যতার ইতিহাসে ভেষজ ও মসলার ব্যবহার হাজার বছরের পুরোনো। প্রাচীন মিশর, ভারত, চীন ও আরব সভ্যতায় বিভিন্ন উদ্ভিদ ও মসলা খাদ্য, সুগন্ধি এবং চিকিৎসার কাজে ব্যবহৃত হতো। দক্ষিণ এশিয়ার আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা পদ্ধতিতে হলুদ, তুলসী, আদা, দারুচিনি ও কালোজিরার মতো উপাদানের ব্যবহার বহু শতাব্দীর পুরোনো। লোকজ জ্ঞান এবং অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে মানুষ প্রজন্মের পর প্রজন্ম এসব উপাদানের উপকারিতা সম্পর্কে ধারণা অর্জন করেছে। বাংলার গ্রামীণ সমাজেও ভেষজের ব্যবহার ছিল নিত্যদিনের ব্যাপার। সর্দি-কাশি হল
বিবি শাহীজান
রান্নাঘরের এক কোণে শিলপাটার ওপর মায়ের হাতের মসলা বাটার শব্দ একসময় ছিল বাঙালি জীবনের পরিচিত দৃশ্য। আদা, রসুন, হলুদ, জিরা কিংবা ধনিয়ার ঘ্রাণে ভরে উঠত ঘর। তখন হয়তো কেউ ভাবেনি, প্রতিদিনের রান্নায় ব্যবহৃত এসব সাধারণ উপাদান একদিন আধুনিক গবেষণাগারে বিজ্ঞানীদের আগ্রহের বিষয় হয়ে উঠবে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ভেষজ ও মসলাকে ঘিরে মানুষের জ্ঞান, গবেষণা এবং ব্যবহার বহুমাত্রিক রূপ পেয়েছে। আজ বিশ্বজুড়ে ভেষজ ও মসলা শুধু খাবারের স্বাদ বাড়ানোর উপাদান নয়, স্বাস্থ্য, অর্থনীতি, সংস্কৃতি এবং বৈজ্ঞানিক গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
মানব সভ্যতার ইতিহাসে ভেষজ ও মসলার ব্যবহার হাজার বছরের পুরোনো। প্রাচীন মিশর, ভারত, চীন ও আরব সভ্যতায় বিভিন্ন উদ্ভিদ ও মসলা খাদ্য, সুগন্ধি এবং চিকিৎসার কাজে ব্যবহৃত হতো। দক্ষিণ এশিয়ার আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা পদ্ধতিতে হলুদ, তুলসী, আদা, দারুচিনি ও কালোজিরার মতো উপাদানের ব্যবহার বহু শতাব্দীর পুরোনো। লোকজ জ্ঞান এবং অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে মানুষ প্রজন্মের পর প্রজন্ম এসব উপাদানের উপকারিতা সম্পর্কে ধারণা অর্জন করেছে।
বাংলার গ্রামীণ সমাজেও ভেষজের ব্যবহার ছিল নিত্যদিনের ব্যাপার। সর্দি-কাশি হলে আদা ও তুলসীপাতার রস, পেটের সমস্যায় জিরা, গলা ব্যথায় লবঙ্গ কিংবা ক্ষতস্থানে হলুদ ব্যবহারের প্রচলন ছিল ঘরে ঘরে। আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থা বিস্তৃত হওয়ার আগে এসব উপাদানই ছিল মানুষের প্রাথমিক ভরসা। অনেক পরিবারে এখনো সেই ঐতিহ্য টিকে আছে।

২০০ বছর আগের এক দুর্ঘটনা থেকেই দেয়াশলাইর আবিষ্কার

বিশ্ব খাদ্য নিরাপত্তা দিবস: খাদ্যের নিরাপত্তা, জীবনের সুরক্ষা
মসলার ইতিহাসও কম আকর্ষণীয় নয়। একসময় গোলমরিচ, দারুচিনি, লবঙ্গ কিংবা জায়ফল ছিল অত্যন্ত মূল্যবান পণ্য। এসব মসলার সন্ধানে ইউরোপীয় নাবিকেরা দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রা করেছেন। ইতিহাসবিদদের মতে, মসলা বাণিজ্য বিশ্ব অর্থনীতি ও উপনিবেশ বিস্তারের পেছনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। অর্থাৎ রান্নাঘরের ছোট্ট একটি উপাদান একসময় আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও রাজনৈতিক ইতিহাসের গতিপথও প্রভাবিত করেছে।
বর্তমান সময়ে ভেষজ ও মসলাকে ঘিরে গবেষণার ক্ষেত্র আরও বিস্তৃত হয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান হলুদে থাকা কারকিউমিন, রসুনের অ্যালিসিন, দারুচিনির বিভিন্ন সক্রিয় উপাদান কিংবা আদার জিঞ্জারল নিয়ে গবেষণা করছে। বিজ্ঞানীরা এসব উপাদানের সম্ভাব্য স্বাস্থ্যগত প্রভাব, পুষ্টিগুণ এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যবহার নিয়ে কাজ করছেন। যদিও কোনো ভেষজ বা মসলাকে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া রোগের বিকল্প চিকিৎসা হিসেবে গ্রহণ করা উচিত নয়, তবু এসব উপাদানের বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ নতুন নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিচ্ছে।
স্বাস্থ্যসচেতনতার প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে ভেষজ ও মসলার জনপ্রিয়তাও বেড়েছে। অনেক মানুষ এখন খাদ্যাভ্যাসে প্রাকৃতিক উপাদানের ব্যবহার বাড়ানোর দিকে ঝুঁকছেন। রাসায়নিক সংযোজনের পরিবর্তে প্রাকৃতিক স্বাদ ও গুণাগুণের প্রতি আগ্রহ বাড়ছে। ফলে ভেষজ চা, মসলা-ভিত্তিক পানীয়, প্রাকৃতিক খাদ্যপণ্য এবং হারবাল পণ্যের বাজারও সম্প্রসারিত হচ্ছে।
বাংলাদেশের জন্যও ভেষজ ও মসলা গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সম্ভাবনার ক্ষেত্র। দেশে হলুদ, মরিচ, ধনিয়া, আদা, রসুনসহ নানা ধরনের মসলা উৎপাদিত হয়। পাশাপাশি ভেষজ উদ্ভিদ চাষ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পেরও সম্ভাবনা রয়েছে। সঠিক পরিকল্পনা, গবেষণা ও বাজার ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে এই খাত কৃষক এবং উদ্যোক্তাদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে।
তবে ভেষজ ও মসলা ব্যবহারে সচেতনতারও প্রয়োজন আছে। বাজারে ভেজাল মসলা, অনিরাপদ প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং মান নিয়ন্ত্রণের অভাব অনেক সময় ভোক্তার জন্য ঝুঁকি তৈরি করে। তাই নিরাপদ উৎপাদন, সঠিক সংরক্ষণ এবং মানসম্মত বিপণনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে লোকজ জ্ঞানের সঙ্গে আধুনিক বৈজ্ঞানিক গবেষণার সমন্বয় ঘটানোও প্রয়োজন।
ভেষজ ও মসলার গল্প মূলত মানুষের গল্প। এটি সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, খাদ্যাভ্যাস এবং জ্ঞানের বিবর্তনের গল্প। একসময় মায়ের হাতে শিলপাটায় বাটা মসলার যে ঘ্রাণ ঘরের ভেতর ছড়িয়ে পড়ত, আজ সেই উপাদানই গবেষণাগারের পরীক্ষানলে নতুনভাবে মূল্যায়িত হচ্ছে। সময় বদলেছে, প্রযুক্তি এগিয়েছে, কিন্তু প্রকৃতির প্রতি মানুষের আস্থা এখনো অটুট।
ভেষজ ও মসলা আমাদের সেই দীর্ঘ যাত্রার কথাই মনে করিয়ে দেয়। রান্নাঘরের পরিচিত উপাদান থেকে শুরু করে আধুনিক বিজ্ঞানের অনুসন্ধান পর্যন্ত, ভেষজ ও মসলার এই পথচলা মানবসভ্যতার জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও উদ্ভাবনের এক অনন্য সাক্ষ্য হয়ে আছে।
লেখক: প্রাক্তন শিক্ষিকা, অক্সিজেন, চট্টগ্রাম।
কেএসকে
What's Your Reaction?