মায়ের মোবাইলে ইউটিউব দেখে একের পর এক অ্যাপ তৈরি করে চলেছে যমজ দুই ভাই

প্রযুক্তির এই যুগে অনেক শিশুর হাতে থাকে আধুনিক কম্পিউটার, ট্যাব কিংবা স্মার্ট গ্যাজেট। কিন্তু শরীয়তপুরের তিন মেধাবী ভাই-বোনের প্রযুক্তি শেখার একমাত্র ভরসা তাদের মায়ের একটি মোবাইল ফোন। সেই ফোনেই ইউটিউব দেখে তারা শিখেছে অ্যাপ তৈরি। এরই মধ্যে দুই ভাই তৈরি করেছে ই-কমার্স অ্যাপ, মেসেজিং অ্যাপ, এমনকি ছোট ছোট বৈদ্যুতিক যন্ত্রও। আর্থিক সংকট তাদের পথচলায় বাধা হয়ে দাঁড়ালেও থামাতে পারেনি অগ্রযাত্রা। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, শরীয়তপুর সদর উপজেলার কাশাভোগ এলাকার বাসিন্দা আব্দুর রাজ্জাক ও জান্নাতুল ফেরদৌস দম্পতির তিন সন্তান হাবিবা ইসলাম (১২), তাফসির ও তানভীর (১১)। এদের মধ্যে তাফসির ও তানভীর যমজ। বাবা একটি প্রতিষ্ঠানের রিপ্রেজেনটেটিভ হিসেবে কাজ করেন। মা গৃহিণীর পাশাপাশি সেলাইয়ের কাজ করে সংসারে সহযোগিতা করেন। আরও পড়ুন নাগরিক সমস্যা সমাধানে ‘আমাদের চট্টগ্রাম’ অ্যাপ নিয়ে এলো চসিক সীমিত আয়ের এই পরিবারে অভাব-অনটন নিত্যসঙ্গী হলেও সন্তানদের স্বপ্ন পূরণে চেষ্টা করে যাচ্ছেন তারা। সম্প্রতি ধানুকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে তিন ভাই-বোনই প্রাথমিক বৃত্তি অর্জন করে আঙ্গারিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর

মায়ের মোবাইলে ইউটিউব দেখে একের পর এক অ্যাপ তৈরি করে চলেছে যমজ দুই ভাই

প্রযুক্তির এই যুগে অনেক শিশুর হাতে থাকে আধুনিক কম্পিউটার, ট্যাব কিংবা স্মার্ট গ্যাজেট। কিন্তু শরীয়তপুরের তিন মেধাবী ভাই-বোনের প্রযুক্তি শেখার একমাত্র ভরসা তাদের মায়ের একটি মোবাইল ফোন। সেই ফোনেই ইউটিউব দেখে তারা শিখেছে অ্যাপ তৈরি। এরই মধ্যে দুই ভাই তৈরি করেছে ই-কমার্স অ্যাপ, মেসেজিং অ্যাপ, এমনকি ছোট ছোট বৈদ্যুতিক যন্ত্রও। আর্থিক সংকট তাদের পথচলায় বাধা হয়ে দাঁড়ালেও থামাতে পারেনি অগ্রযাত্রা।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, শরীয়তপুর সদর উপজেলার কাশাভোগ এলাকার বাসিন্দা আব্দুর রাজ্জাক ও জান্নাতুল ফেরদৌস দম্পতির তিন সন্তান হাবিবা ইসলাম (১২), তাফসির ও তানভীর (১১)। এদের মধ্যে তাফসির ও তানভীর যমজ। বাবা একটি প্রতিষ্ঠানের রিপ্রেজেনটেটিভ হিসেবে কাজ করেন। মা গৃহিণীর পাশাপাশি সেলাইয়ের কাজ করে সংসারে সহযোগিতা করেন।

সীমিত আয়ের এই পরিবারে অভাব-অনটন নিত্যসঙ্গী হলেও সন্তানদের স্বপ্ন পূরণে চেষ্টা করে যাচ্ছেন তারা। সম্প্রতি ধানুকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে তিন ভাই-বোনই প্রাথমিক বৃত্তি অর্জন করে আঙ্গারিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছে। তাফসির ও তানভীরের বয়স কম হলেও প্রযুক্তির প্রতি তাদের আগ্রহ অনেক। পরিবারের কম্পিউটার কেনার সামর্থ্য নেই। তাই মায়ের স্মার্টফোনে ইউটিউব দেখে নিজেরাই অ্যাপ ডেভেলপমেন্ট শিখেছে। এরই মধ্যে তারা তিনটি ই-কমার্স অ্যাপ এবং হোয়াটসঅ্যাপের আদলে একটি মেসেজিং অ্যাপ তৈরি করেছে। পাশাপাশি নিজেদের উদ্যোগে ব্লেন্ডার, পানির মোটরসহ ছোট ছোট বিভিন্ন বৈদ্যুতিক যন্ত্রও তৈরি করেছে।

মায়ের মোবাইলে ইউটিউব দেখে একের পর এক অ্যাপ তৈরি করে চলেছে যমজ দুই ভাই

তাফসির বলেন, ‘আমরা ক্লাস সিক্সে পড়ি। ইউটিউব দেখে দেখে তিনটি ই-কমার্স অ্যাপস ও একটি কথা বলার অ্যাপস তৈরি করেছি। বায়ার অ্যাপস থেকে যেকোনো পণ্য ক্রয় করা যায়। সেলার অ্যাপস থেকে ব্যবসা করা যায়। তাছাড়া আমরা একটি কথা বলার অ্যাপ বানিয়েছি। যা আমার বাবা-মা এবং শিক্ষকদের ফোনে ইন্সটল করে কথা বলেছি। আমরা ভবিষ্যতে আরও উন্নত প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করতে চাই।’

তানভীর বলেন, ‘অ্যাপস তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের ইলেকট্রনিক্স যন্ত্রপাতি বানিয়েছি। আমরা ফেলনা টিন কেটে মোটরের সাহায্যে একটি ব্লেন্ডার মেশিন বানিয়েছি। মোটরের সাহায্যে সেচযন্ত্র বানিয়েছি। তবে আমরা যে ধরনের অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি বানাতে চাই সেগুলোর ডিভাইস আমাদের জেলা শহরে পাওয়া যায় না। পেলেও দাম অনেক বেশি থাকায় কিনতে কষ্ট হয়। আগামীতে আমরা দুটি রোবট বানাতে চাই। রোবটের একটি মানুষের কথা বুঝতে পারবে এবং ঘরের কাজে সাহায্যে করবে। আরেকটি রোবট তৈরি করবো প্যারালাইজড রোগীদের জন্য। যেখানে হুইলচেয়ারের মাধ্যমে প্যারালাইসিস রোগী তাদের কথা আদান প্রদান করবে। সেভাবে রোবটটি রোগীকে সকল কাজে সহযোগিতা করবে। আমরা অদূর ভবিষ্যতে সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার হতে চাই। নতুন নতুন অ্যাপস তৈরি করে দেশের মানুষের জন্য কাজ করতে চাই। তবে আমাদের আর্থিক সমস্যার কারণে কম্পিউটার কিনতে ও প্রশিক্ষণ নিতে পারছি না। সরকার যদি আমাদের পাশে দাঁড়ায় আমরা অনেক দূর এগিয়ে যেতে পারবো।’

তাদের বড় বোন হাবিবা ইসলামও সমান মেধাবী। পড়াশোনার পাশাপাশি আঁকাআঁকি ও সেলাইয়ে তার দক্ষতা রয়েছে। মায়ের সেলাইয়ের কাজে নিয়মিত সহায়তা করে সে। ভবিষ্যতে চিকিৎসক হয়ে অসহায় মানুষের সেবা করার স্বপ্ন দেখছে হাবিবা।

মায়ের মোবাইলে ইউটিউব দেখে একের পর এক অ্যাপ তৈরি করে চলেছে যমজ দুই ভাই

হাবিবা ইসলাম বলেন, ‘আমরা তিন ভাই বোন। আমি বয়সে বড় আর দুই ভাই যমজ। আমরা এবার প্রাথমিকে তিনজনই বৃত্তি পেয়েছি। আমার ভাইয়েরা মোবাইল ফোনের মাধ্যমে অনেক সুন্দর অ্যাপস তৈরি করতে পারে। ওরা আমাকে সবগুলো দেখায় আমারও খুব ভালো লাগে। আমার ইচ্ছা আছে ভবিষ্যতে আমি একজন চিকিৎসক হয়ে দেশের মানুষকে সেবা দিয়ে পাশে থাকবো।’

সন্তানদের মেধা নিয়ে গর্বিত বাবা আব্দুর রাজ্জাক ও মা জান্নাতুল ফেরদৌস। তবে আর্থিক সংকটের কারণে তাদের জন্য একটি কম্পিউটার কিনে দিতে না পারার আক্ষেপ রয়েছে।

বাবা আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘আমি সামান্য বেতনে সেলস রিপ্রেজেন্টেটিভে চাকরি করি। এই আয় দিয়েই আমি আমার বাচ্চাদের পড়াশোনা ও সংসারের সব খরচ চালাই। আমার বাচ্চাগুলো ভীষণ মেধাবী। ওরা এই বয়সে সামান্য একটি মোবাইলের মাধ্যমে বিভিন্ন অ্যাপ তৈরি করে। এখানে যদি ওরা কম্পিউটার পেত আরও উন্নত অ্যাপস তৈরি করতে পারত। আমার সামর্থ্য না থাকায় ওদের কম্পিউটার কিনে দিতে পারছি না। সরকার যদি আমার বাচ্চাদের দিকে একটু নজর দিত ওরা অনেক দূর এগিয়ে যেত।’

মায়ের মোবাইলে ইউটিউব দেখে একের পর এক অ্যাপ তৈরি করে চলেছে যমজ দুই ভাই

মা জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, ‘আমার তিন সন্তান এবার একসঙ্গে বৃত্তি পেয়েছে। ওরা কোডিং শিখতে চায়, ফ্রিল্যান্সিং শিখতে চায়। ওরা এই বয়সেই বেশ কয়েকটি অ্যাপ তৈরি করতে পেরেছে। তবে আমাদের আর্থিক সমস্যার কারণে ওদের সুবিধাগুলো দিতে পারছি না। আমার সন্তানদের ইচ্ছাশক্তি অনেক বেশি। সুযোগ-সুবিধা পেলে ওরা আরও অনেক দূর এগিয়ে যেতে পারবে।’

এ ব্যাপারে ধানুকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক শিবুনাথ গোস্বামী বলেন, ‘হাবিবা, তাফসির ও তানভীর তিন ভাই-বোনই অত্যন্ত মেধাবী ও পরিশ্রমী। ওরা শিশু থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত আমাদের বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছে। এবার বৃত্তি পরীক্ষার ফলাফলে ওরা তিন ভাইবোন আমাদের বিদ্যালয় থেকে সাধারণ বৃত্তি পেয়েছে। ছোট থেকেই প্রযুক্তির প্রতি তাদের আগ্রহ এবং নিজেরা শেখার চেষ্টা করে। বর্তমানে ওরা অ্যাপ তৈরিতে মনোনিবেশ করেছে। ওর বাবা ছোট একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান চাকরি করে যা দিয়ে ওদের পড়াশুনা চালাতে হিমশিম খেতে হয়। সরকার যদি এই তিন শিশুর প্রতি বিশেষ নজর দেয়, আমাদের ধারণা ওরা আগামীতে আরও বহু দূর এগিয়ে যাবে।’

এফএ/জেআইএম

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow