‘মিম পেজে’র আড়ালে অশ্লীলতা, মানসিকভাবে বিপর্যস্ত শিক্ষার্থীরা

মেহেরপুরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া, বিকৃত ও কুরুচিপূর্ণ কনটেন্ট ছড়িয়ে ব্যক্তিগত মানহানি ও সামাজিক হেয়প্রতিপন্ন করার ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। পৃথক পৃথক ঘটনায় ভুক্তভোগীরা থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন। দোষীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন তারা। ভুক্তভোগী মো. মঞ্জুরুল আল মামুন অভিযোগ করেন, আমার অজান্তে একটি মেয়ের ছবির সঙ্গে ফেসবুক থেকে নেওয়া ছবি যুক্ত করে একটি ভিডিও তৈরি করে ‘Troll Meherpur 2.0’ নামের একটি পেজে প্রকাশ করা হয়। ভিডিওটির শিরোনামে আমাকে জড়িয়ে মিথ্যা ও আপত্তিকর সম্পর্কের ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।  তিনি আরও বলেন, এ বিষয়ে পেজ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারা উল্টো অসৌজন্যমূলক আচরণ ও হুমকি প্রদান দেয়। এতে আমার ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ও সামাজিক মর্যাদা হুমকির মুখে পড়েছে। মেহেরপুর সদর থানায় আইনি প্রতিকার পেতে সাধারণ ডায়েরি করেছি।  মো. খাইরুল ইসলাম নামের একজন বলেন, মেহেরপুর সরকারি মহিলা কলেজে নবীনবরণ অনুষ্ঠানের ভিডিও ফুটেজ থেকে খণ্ডিত অংশ নিয়ে বিকৃতভাবে সম্পাদনা করে বিভিন্ন ফেসবুক গ্রুপ ও পেজে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। ‘Meherpur Memes’, ‘Meherpur Stories Hubs’, ‘Tr

‘মিম পেজে’র আড়ালে অশ্লীলতা, মানসিকভাবে বিপর্যস্ত শিক্ষার্থীরা
মেহেরপুরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া, বিকৃত ও কুরুচিপূর্ণ কনটেন্ট ছড়িয়ে ব্যক্তিগত মানহানি ও সামাজিক হেয়প্রতিপন্ন করার ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। পৃথক পৃথক ঘটনায় ভুক্তভোগীরা থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন। দোষীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন তারা। ভুক্তভোগী মো. মঞ্জুরুল আল মামুন অভিযোগ করেন, আমার অজান্তে একটি মেয়ের ছবির সঙ্গে ফেসবুক থেকে নেওয়া ছবি যুক্ত করে একটি ভিডিও তৈরি করে ‘Troll Meherpur 2.0’ নামের একটি পেজে প্রকাশ করা হয়। ভিডিওটির শিরোনামে আমাকে জড়িয়ে মিথ্যা ও আপত্তিকর সম্পর্কের ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।  তিনি আরও বলেন, এ বিষয়ে পেজ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারা উল্টো অসৌজন্যমূলক আচরণ ও হুমকি প্রদান দেয়। এতে আমার ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ও সামাজিক মর্যাদা হুমকির মুখে পড়েছে। মেহেরপুর সদর থানায় আইনি প্রতিকার পেতে সাধারণ ডায়েরি করেছি।  মো. খাইরুল ইসলাম নামের একজন বলেন, মেহেরপুর সরকারি মহিলা কলেজে নবীনবরণ অনুষ্ঠানের ভিডিও ফুটেজ থেকে খণ্ডিত অংশ নিয়ে বিকৃতভাবে সম্পাদনা করে বিভিন্ন ফেসবুক গ্রুপ ও পেজে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। ‘Meherpur Memes’, ‘Meherpur Stories Hubs’, ‘Troll Meherpur’ ও ‘Roasted Meherpur’ নামের প্ল্যাটফর্মগুলোতে এসব ভিডিও প্রচার করা হয়।  তিনি আরও বলেন, এসবের কারণে সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীরা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছে এবং তাদের স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। বিষয়টা নিয়ে কলেজ কর্তৃপক্ষ জেলা পুলিশকে আইনগত ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ করেছে। মো. তৌফিক এলাহী অভিযোগ করে বলেন, ‘Meherpur Memes’ নাম ব্যবহার করে পরিচালিত একটি ফেসবুক আইডি থেকে আমার বোনসহ পরিবারের সদস্যদের নিয়ে আপত্তিকর ভিডিও তৈরি ও প্রচার করা হয়েছে। একই নামে একাধিক আইডি খুলে অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিরা এ ধরনের অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে। এতে আমার পরিবার সামাজিক ও মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। মেহেরপুর সরকারি মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ আব্দুল্লাহ আল-আমিন ধুমকেতু কালবেলাকে বলেন, অতীতেও এ ধরনের একাধিক ঘটনা ঘটেছে, কিন্তু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে অভিযোগ দিয়েও অনেক ক্ষেত্রে কার্যকর প্রতিকার পাওয়া যায়নি। উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, কিছুদিন আগে কলেজের নবীনবরণ অনুষ্ঠানে এক শিক্ষার্থীকে মিষ্টি খাওয়ানোর একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। পরবর্তীতে ওই ভিডিও ডাউনলোড করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির মাধ্যমে বিকৃত করে একটি মিম পেজে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়, যাতে দেখা যায় মেয়েটিকে একটি কুকুর খাওয়ানো হচ্ছে। ভিডিওটি প্রকাশের পর সেখানে অসংখ্য শেমিং ও বুলিং মন্তব্য যুক্ত হয়, যার ফলে ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী মানসিকভাবে মারাত্মক বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। তিনি আরও বলেন, বর্তমানে প্রতিনিয়তই কলেজ ও স্কুলপড়ুয়া মেয়েদের লক্ষ্য করে নানা ধরনের আপত্তিকর ও অনাকাঙ্ক্ষিত ভিডিও এবং ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আপলোড করা হচ্ছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সাইবার নিরাপত্তা আইনের কার্যকর বাস্তবায়নের পাশাপাশি সামাজিক ও পারিবারিক পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধি অত্যন্ত জরুরি। আশঙ্কা প্রকাশ করে অধ্যক্ষ বলেন, আগামীকাল পয়লা বৈশাখ উপলক্ষে বিভিন্ন র‍্যালিতে বিপুলসংখ্যক নারী অংশগ্রহণ করবেন। এসব র‍্যালির ভিডিও গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ার পর সেখান থেকেও একই ধরনের শেমিং ও বুলিংয়ের ঘটনার পুনরাবৃত্তি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। মেহেরপুরে ফেসবুকভিত্তিক মিম পেজের আড়ালে অশ্লীলতা ও ভুয়া গণমাধ্যম পরিচালনার অভিযোগও সামনে এসেছে। বিভিন্ন নামে পেজ খুলে স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থীসহ সাধারণ নারী-পুরুষের ব্যক্তিগত ছবি ও ভিডিও অনুমতি ছাড়াই সংগ্রহ, সম্পাদনা ও বিকৃতভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। এতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সামাজিক মর্যাদা ক্ষুণ্ন হওয়ার পাশাপাশি তারা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছেন। মেহেরপুর জেলা জজ আদালতের আইনজীবী মিজানুর রহমান কালবেলাকে বলেন, এ ধরনের কর্মকাণ্ড ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের একাধিক ধারার সরাসরি লঙ্ঘন। উক্ত আইনে অনলাইনে মানহানিকর, বিভ্রান্তিকর বা মিথ্যা তথ্য প্রচার, অন্যের ব্যক্তিগত তথ্য বা ছবি অনুমতি ছাড়া প্রকাশ এবং সুনাম ক্ষুণ্ন করার উদ্দেশ্যে কনটেন্ট প্রচারকে দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। একই সঙ্গে পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১২ অনুযায়ী কোনো ব্যক্তির ছবি বা ভিডিও বিকৃত করে অশ্লীলভাবে উপস্থাপন ও প্রচার করাও ফৌজদারি অপরাধ, যার জন্য কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ভুক্তভোগীরা সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন হওয়া, শিক্ষা ও পেশাগত জীবনে প্রতিবন্ধকতা এবং পারিবারিক ও মানসিক সংকটে পড়ার অভিযোগ জানিয়েছেন। অনেক ক্ষেত্রে সামাজিক লজ্জা ও নিরাপত্তাহীনতার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিরা আইনগত প্রতিকার চাইতে নিরুৎসাহিত হচ্ছেন, যা অপরাধীদের দুঃসাহসিকতা বাড়িয়ে দিচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টদের অভিমত। সাইবার সিকিউরিটি বিশেষজ্ঞ এম এ মুহিত বলেন, মেহেরপুরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, বিশেষ করে ফেসবুকের বিভিন্ন পেজে অশ্লীল কনটেন্ট উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে, যা ভার্চুয়াল সমাজে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।  তিনি আরও বলেন, অশ্লীলতা শুধু নৈতিকতা নষ্ট করে না, এটি মানসিক অবসাদ সৃষ্টি করে, সম্পর্ক ভাঙে এবং তরুণ সমাজকে বিপথে ঠেলে দেয়। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের ডিজিটাল দক্ষতা বৃদ্ধি, অশ্লীল কনটেন্ট রিপোর্টের কৌশল শেখানো, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সৃজনশীল শিক্ষণ পদ্ধতি চালু এবং সাইবার আইন সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধি জরুরি। মেহেরপুর জেলা পুলিশের মিডিয়া ফোকাল পার্সন জামিনুর রহমান খান বলেন, ভুক্তভোগীদের অভিযোগের ভিত্তিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া, বিকৃত ও মানহানিকর কনটেন্ট প্রচারের ঘটনাগুলো অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং ইতোমধ্যে তদন্ত শুরু হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে বয়স বিবেচনায় সংশ্লিষ্টদের সতর্ক করা হয়েছে।  তিনি আরও বলেন, সংশ্লিষ্ট ফেসবুক আইডি ও পেজ শনাক্তে প্রযুক্তিগত সহায়তা নেওয়া হচ্ছে এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এ ধরনের অপরাধ ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনসহ প্রচলিত আইনের আওতায় শাস্তিযোগ্য এবং এ বিষয়ে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। ভুক্তভোগীদের দ্রুত থানায় অভিযোগ দায়েরের আহ্বান জানিয়ে সবাইকে দায়িত্বশীল আচরণ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করার অনুরোধ জানান তিনি।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow