মুক্ত গণমাধ্যম দিবসেই সাংবাদিককে বিমানবন্দরে আটকে দিতে হলো?
বিদেশি সংবাদমাধ্যমের ঢাকায় কর্মরত সাংবাদিকদের সংগঠন ওকাবের সভাপতি এবং জার্মান নিউজ এজেন্সি ডিপিএর প্রতিনিধি নজরুল ইসলাম মিঠুকে বিমানবন্দর থেকে ফেরত পাঠানো হয়েছে। তিনি ব্যক্তিগত কাজে চায়নায় যেতে চেয়েছিলেন। যেদিন এই ঘটনাটি ঘটলো, সেদিন তেসরা মে, বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস। জাতিসংঘ ১৯৪৮ সালে যে মানবাধিকারের সার্বজনীন ঘোষণাপত্র প্রকাশ করেছে, তার ১৩ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, নিজ রাষ্ট্রের চৌহদ্দির মধ্যে স্বাধীনভাবে চলাফেরা এবং বসবাস করার অধিকার প্রত্যেকেরই রয়েছে। সেইসাথে প্রত্যেকেরই নিজ দেশসহ যেকোনো দেশ পরিত্যাগ এবং স্বদেশে প্রত্যাবর্তনেরও অধিকার রয়েছে। সুতরাং নজরুল ইসলাম মিঠুকে যে বিমানবন্দরে আটকে দেয়া হলো, সেটি জাতিসংঘের এই মানবাধিকারের ঘোষণাপত্রের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৬ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, জনস্বার্থে আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসঙ্গত বাধানিষেধ-সাপেক্ষে বাংলাদেশের সর্বত্র অবাধ চলাফেরা, এর যেকোনো স্থানে বসবাস ও বসতিস্থাপন এবং বাংলাদেশ ত্যাগ ও বাংলাদেশে পুনঃপ্রবেশ করার অধিকার প্রত্যেক নাগরিকের থাকবে। তার মানে জনস্বার্থে আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসঙ্গত বাধানিষেধ ছাড়া
বিদেশি সংবাদমাধ্যমের ঢাকায় কর্মরত সাংবাদিকদের সংগঠন ওকাবের সভাপতি এবং জার্মান নিউজ এজেন্সি ডিপিএর প্রতিনিধি নজরুল ইসলাম মিঠুকে বিমানবন্দর থেকে ফেরত পাঠানো হয়েছে। তিনি ব্যক্তিগত কাজে চায়নায় যেতে চেয়েছিলেন। যেদিন এই ঘটনাটি ঘটলো, সেদিন তেসরা মে, বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস।
জাতিসংঘ ১৯৪৮ সালে যে মানবাধিকারের সার্বজনীন ঘোষণাপত্র প্রকাশ করেছে, তার ১৩ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, নিজ রাষ্ট্রের চৌহদ্দির মধ্যে স্বাধীনভাবে চলাফেরা এবং বসবাস করার অধিকার প্রত্যেকেরই রয়েছে। সেইসাথে প্রত্যেকেরই নিজ দেশসহ যেকোনো দেশ পরিত্যাগ এবং স্বদেশে প্রত্যাবর্তনেরও অধিকার রয়েছে।
সুতরাং নজরুল ইসলাম মিঠুকে যে বিমানবন্দরে আটকে দেয়া হলো, সেটি জাতিসংঘের এই মানবাধিকারের ঘোষণাপত্রের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৬ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, জনস্বার্থে আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসঙ্গত বাধানিষেধ-সাপেক্ষে বাংলাদেশের সর্বত্র অবাধ চলাফেরা, এর যেকোনো স্থানে বসবাস ও বসতিস্থাপন এবং বাংলাদেশ ত্যাগ ও বাংলাদেশে পুনঃপ্রবেশ করার অধিকার প্রত্যেক নাগরিকের থাকবে।
তার মানে জনস্বার্থে আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসঙ্গত বাধানিষেধ ছাড়া যেকেউ দেশত্যাগ এবং দেশে পুনঃপ্রবেশ করতে পারবেন। প্রশ্ন হলো, নজরুল ইসলাম মিঠুকে কোন জনস্বার্থে বা কোন যুক্তিতে আটকে দেয়া হলো?
বিষয়টা নিয়ে রবিবার রাতে তার সঙ্গে আমার কথা হয়। তিনি বলেন, ইমিগ্রেশন পুলিশ তাকে বলেছে যে, তার বিদেশ যাওয়ার ক্ষেত্রে অফিসিয়ালি কোনো আপত্তি নেই। তার কাগজপত্রেও কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু একটি গোয়েন্দা বাহিনীর (নাম উল্লেখ করছি না) তরফে আপত্তি দেয়া হয়েছে।
প্রশ্ন হলো, ওই গোয়েন্দা বাহিনী কী কারণে জনাব মিঠুর বিদেশ যাওয়া আটকে দিলো বা তিনি যাতে বিদেশে যেতে না পারেন, বিমানবন্দরে কেন সেই নির্দেশনা দিলো? মিঠু কি কোনো শীর্ষ সন্ত্রাসী বা তিনি কি রাষ্ট্রের জন্য এমন কোনো ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তি যিনি দেশের বাইরে গেলে দেশের জন্য বড় ধরনের বিপদের কারণ হবেন? নাকি গোয়েন্দা বাহিনী মনে করে যে, জনাব মিঠু দেশের বাইরে গিয়ে দেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করবেন?
এই ঘটনার মধ্য দিয়ে বস্তুত শুধু দেশে নয়, দেশের বাইরেও বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশের বর্তমান সরকার সম্পর্কে একটা ভুল বার্তা দেয়া হলো। প্রথমত, ঘটনাটি ঘটানো হলো তেসরা মে বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবসে। দ্বিতীয়ত, যার সঙ্গে ঘটনাটি ঘটানো হলো, আর দশজন সাংবাদিকের সঙ্গে তার একটি বড় পার্থক্য হলো, তিনি জার্মানির মতো একটি দেশের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যমে তিনি কাজ করেন এবং বিদেশি সাংবাদিকদের সংগঠন ওকাপের সভাপতি। তার মানে তাকে বিমানবন্দরে আটকে দেয়ার এই ঘটনাটি শুধু আর দেশের ভেতরে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটা দেশের বাইরেও চলে গেছে। জাতিসংঘ, রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারসহ আরও যেসব সংস্থা সাংবাদিকদের অধিকার নিয়ে কাজ করে, সেসব সংগঠন জেনে গেছে যে, বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবসেই বাংলাদেশের এমন একজন সাংবাদিককে বিমানবন্দরে আটকে দেয়া হয়েছে, যিনি একটি বিদেশি সংবাদমাধ্যমের বাংলাদেশ প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করছেন।
অতএব এই প্রশ্ন তোলাও সঙ্গত যে, যার বা যাদের নির্দেশ অথবা নির্দেশনায় নজরুল ইসলাম মিঠুকে আটকে দেয়া হলো, তারা কি বুঝেশুনেই কাজটা করলেন যাতে দেশের বাইরে একটা ভুল বার্তা যায়? যে বিএনপি সরকারের বয়স মাত্র আড়াই মাস, এবং যে সরকার শুরু থেকেই গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিতের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে; নির্বাচনের আগে যে তারেক রহমান অসংখ্যবার নাগরিকের বাকস্বাধীনতা ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতার পক্ষে কথা বলেছেন—তিনি প্রধানমন্ত্রী থাকা অবস্থায় একজন সিনিয়র সাংবাদিককে সুনির্দিষ্ট কারণ ছাড়া বিমানবন্দরে আটকে দেয়ার ঘটনাটি ‘স্যাবোটাজ’ কি না, সেটি খতিয়ে দেখা দরকার।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, জুলাই অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগের পতনের পরে যে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হলো এবং যে সরকারের আমলে অসংখ্য সাংবাদিকের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা হলো; যখন অনেক সাংবাদিক গ্রেপ্তার হলেন, তখনও নজরুল ইসলাম মিঠু বিদেশ সফর করেছেন।
২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে তিনি দেশের বাইরে গিয়েছেন। আবার পরের মাসে ফিরে এসেছেন। অর্থাৎ মব সন্ত্রাসের আমলেও যার বিদেশ যেতে অসুবিধা হয়নি, একটি নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকারের আমলে তাকে কেন, কোন জনস্বার্থে বা কোন যুক্তিতে তাকে আটকে দেয়া হলো এবং তাও বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবসেই—সেটি সরকারের তরফে পরিষ্কার করতে হবে। যে বাহিনীর নির্দেশ অথবা নির্দেশনাতেই এই ঘটনা ঘটে থাকুক না কেন, তথ্য মন্ত্রণালয় অথবা প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইং থেকে এর একটি ব্যাখ্যা আসা জরুরি। কারণ আজ জনাব মিঠুকে আটকে দেয়া হয়েছে, কাল এই ঘটনা আরেকজনের সঙ্গে ঘটবে।
কারো বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে রাষ্ট্র তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে। কিন্তু বায়বীয় অভিযোগে কাউকে গ্রেপ্তার করে মাসের পর মাস কারাবন্দি রাখা; ফ্যাসিস্টের দোসর ট্যাগ দিয়ে তার ওপর মব সৃষ্টি করা কিংবা তাকে নানাভাবে নাজেহাল ও হয়রানি করার দিন শেষ হওয়া উচিত। অন্তত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পরে এই ধরনের ঘটনা আর একটিও না ঘটা উচিত ছিল।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সম্প্রতি বলেছেন, যারা বিনা বিচারে কারাগারে আছেন এবং যারা পয়সার অভাবে মামলা লড়তে পারছেন না, সরকার তাদের পাশে দাঁড়াবে।
চব্বিশের অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগের পতনের পরে অসংখ্য সাংবাদিকের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা হয়েছে। এসব মামলায় অনেকে এখনও কারাবন্দি। অথচ কারো বিরুদ্ধে হত্যার অভিযোগ প্রমাণ করা যাবে না। অর্থাৎ প্রত্যেকটা মামলাই যে বায়বীয়—সেটা পুলিশ যেমন জানে, তেমনি আদালতও জানে। কিন্তু তাদের জামিন হয় না। আইনের শাসনের এ এক নির্মম পরিহাস!
এটা অস্বীকার করা যাবে না যে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে অনেক সাংবাদিক নানাভাবে সরকারের সুবিধাভোগী ছিলেন। সরকারের নানাবিধ অন্যায়ের পক্ষে নির্লজ্জভাবে দাঁড়িয়েছেন। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে, তাদেরকে হত্যা মামলায় বছরের পর বছর কারাগারে রাখতে হবে। তার অর্থ এই নয় যে, একটি মিথ্যা ও বায়বীয় অভিযোগে দায়ের করা মামলায় আদালত তাদেরকে জামিন দেবে না।
তাদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রভাব এবং প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সম্পর্ক কাজে লাগিয়ে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ থাকলে কিংবা তারা যদি বিদেশে টাকা পাচার করে থাকেন অথবা তারা যদি প্রশাসনিক ক্ষমতা কাজে লাগিয়ে কোনো জমি দখল বা এরকম কোনো অপরাধ করে থাকেন, সেজন্য সুনির্দিষ্ট অভিযোগে মামলা হতে পারতো। কিন্তু যারা এসব মামলা করেছেন বা এসব মামলার পেছনে যারা আছেন, তারা একটি সুদূরপ্রসারি লক্ষ্য নিয়েই হত্যা মামলা করেছেন—যাতে আদালত থেকে তারা সহজে জামিন না পান।
শান্তিতে নোবেলজয়ী ড. ইউনূসের শান্তিবাদী সরকারও বারবার সুশাসন, গণতন্ত্র ও সংস্কারের কথা বলেছে। পুলিশ ও বিচার বিভাগের সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে। অথচ সেই আমলেই পুলিশ যে বায়বীয় অভিযোগে দেয়া মামলায় সাংবাদিকদের গ্রেপ্তার করলো এবং আদালত যে সেই মামলায় জামিন দিল না—এ বিষয়ে সরকার চুপ থেকেছে। অথবা সরকারকে চুপ রাখা হয়েছে। কিন্তু একটি নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকারের আমলেও এই অপসংস্কৃতি কেন অব্যাহত থাকবে এবং বর্তমান সরকারও কেন বিগত সরকারের পাপের বোঝা টানতে থাকবে—সেটিই বড় প্রশ্ন।
আমীন আল রশীদ: সাংবাদিক ও লেখক।
এইচআর/এমএস
What's Your Reaction?