‘মৃত’ শিক্ষাক্রমের সেকেলে পাঠ্যবই, পরিমার্জনেও অনীহা

দেশের শিক্ষাব্যবস্থা চলছে ২০১০ সালে প্রণীত জাতীয় শিক্ষাক্রমে, যা ‘সৃজনশীল পদ্ধতি’ নামে পরিচিত। পাঠ্যবই, ক্লাস, পরীক্ষা, মূল্যায়ন-সবই চলছে ১৬ বছর আগের তৈরি নিয়মে। অথচ ২০২০ সালেই সৃজনশীল শিক্ষাক্রমকে ‘অকার্যকর’ ও ‘বাস্তবায়নের অযোগ্য’ ঘোষণা করা হয়েছিল। ‘মৃত’ ঘোষণার ছয় বছর পরও একই শিক্ষাক্রমে পড়ালেখা করছে দেশের ‘আলফা’ প্রজন্মের প্রায় পাঁচ কোটি শিক্ষার্থী। অথচ দেড় দশকে বদলে গেছে বিশ্ব। আধুনিকায়ন ও প্রযুক্তির ছোঁয়া লেগেছে সবক্ষেত্রে। সেই বিবেচনায় বহু পিছিয়ে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা। বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর নতুন শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন শিক্ষাক্রম পরিবর্তনের ঘোষণা দিয়েছেন। অবশ্য কাজটি সময়সাপেক্ষ হওয়ায় বর্তমান শিক্ষাক্রম মেনেই শতভাগ পাঠ্যবই পরিমার্জনে নির্দেশনা দেন তিনি। নানান অজুহাতে এ নির্দেশনা এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)। বোর্ডের দায়িত্বে থাকা আওয়ামী লীগপন্থি বলে পরিচিত কর্মকর্তারা শতভাগ পাঠ্যবই পরিমার্জনে অনীহা দেখাচ্ছেন। তারা বানান, বাক্য গঠন ও ছাপার ভুলগুলো সংশোধন করেই দায় সারতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। এতে ২০২৭ শিক্ষাবর্ষেও শিক্

‘মৃত’ শিক্ষাক্রমের সেকেলে পাঠ্যবই, পরিমার্জনেও অনীহা

দেশের শিক্ষাব্যবস্থা চলছে ২০১০ সালে প্রণীত জাতীয় শিক্ষাক্রমে, যা ‘সৃজনশীল পদ্ধতি’ নামে পরিচিত। পাঠ্যবই, ক্লাস, পরীক্ষা, মূল্যায়ন-সবই চলছে ১৬ বছর আগের তৈরি নিয়মে। অথচ ২০২০ সালেই সৃজনশীল শিক্ষাক্রমকে ‘অকার্যকর’ ও ‘বাস্তবায়নের অযোগ্য’ ঘোষণা করা হয়েছিল। ‘মৃত’ ঘোষণার ছয় বছর পরও একই শিক্ষাক্রমে পড়ালেখা করছে দেশের ‘আলফা’ প্রজন্মের প্রায় পাঁচ কোটি শিক্ষার্থী।

অথচ দেড় দশকে বদলে গেছে বিশ্ব। আধুনিকায়ন ও প্রযুক্তির ছোঁয়া লেগেছে সবক্ষেত্রে। সেই বিবেচনায় বহু পিছিয়ে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা। বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর নতুন শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন শিক্ষাক্রম পরিবর্তনের ঘোষণা দিয়েছেন। অবশ্য কাজটি সময়সাপেক্ষ হওয়ায় বর্তমান শিক্ষাক্রম মেনেই শতভাগ পাঠ্যবই পরিমার্জনে নির্দেশনা দেন তিনি।

নানান অজুহাতে এ নির্দেশনা এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)। বোর্ডের দায়িত্বে থাকা আওয়ামী লীগপন্থি বলে পরিচিত কর্মকর্তারা শতভাগ পাঠ্যবই পরিমার্জনে অনীহা দেখাচ্ছেন। তারা বানান, বাক্য গঠন ও ছাপার ভুলগুলো সংশোধন করেই দায় সারতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। এতে ২০২৭ শিক্ষাবর্ষেও শিক্ষার্থীরা পুরোনো ধাচের বা ‘সেকেলে’ পাঠ্যবই পাবে বলে মনে করছেন শিক্ষা-সংশ্লিষ্টরা।

শিক্ষাবিদরা বলছেন, বছর বছর শিক্ষাক্রম না পাল্টে, বরং তা যুগোপযোগী করাটা বেশি টেকসই। পাঠ্যবইয়ে শুধু সেকেলে প্রবন্ধ, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ধারণা-পাঠ এবং মুখস্থবিদ্যা রাখলে এখন আর চলবে না। যুগোপযোগী ও হাতে-কলমে শেখার মতো পাঠ্য যুক্ত করতে হবে। এক্ষেত্রে প্রতি বছর পাঠ্যবই পরিমার্জনের বিকল্প নেই।

শিক্ষাক্রম ‘অকার্যকর’, পাঠ্যবই ‘সেকেলে’

২০১০ সালে সৃজনশীল শিক্ষাক্রম পদ্ধতি প্রণয়ন করা হয়। উদ্দেশ্য ছিল মুখস্থবিদ্যার পরিবর্তে শিক্ষার্থীদের চিন্তাশক্তি, নিজস্ব মেধা ও সৃজনশীলতার বিকাশ ঘটানো। ২০১২ সাল থেকে এ পদ্ধতি ষষ্ঠ-দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত পুরোদমে চালু হয়। তবে তা দুর্বোধ্য হয়ে ওঠে শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের কাছে। এতে শুরুতেই হোঁচট খায় সৃজনশীল পদ্ধতি।

২০১৮ সালে এক গবেষণায় দেখা যায়, ৪২ শতাংশ শিক্ষকই সৃজনশীল বোঝেন না। তারা প্রশ্ন করতেও পারেন না। নোট-গাইড দেখে প্রশ্ন তৈরি করেন এবং উত্তর বানান। শিক্ষার্থীদের ৯২ শতাংশও হয়ে পড়ে গাইড বইনির্ভর। সার্বিক দিক বিবেচনা করে এ পদ্ধতি বাতিল করে তৎকালীন সরকার।

২০২২ সালে আওয়ামী লীগ সরকার নতুন শিক্ষাক্রম নিয়ে আসে, যা শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের কাছে আরও বেশি দুর্বোধ্য ও অগ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে। পরীক্ষাবিহীন এ কারিকুলাম বাতিলের দাবিতে ব্যাপক আন্দোলন হয়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ক্ষমতায় বসে অন্তর্বর্তী সরকার।

সরকারে বসার এক সপ্তাহের মধ্যেই আওয়ামী লীগ আমলের নতুন শিক্ষাক্রম বাতিল করে অন্তর্বর্তী সরকার। উপায় না পেয়ে তারা ফিরিয়ে আনেন ২০১০ সালে প্রণীত সেই ‘মৃত’ সৃজনশীল পদ্ধতি। ২০২৪ সাল থেকে পুনরায় এ পদ্ধতি বহাল রয়েছে। ২০২৭ সালেও এ পদ্ধতিতেই চলবে শিক্ষাকার্যক্রম।

জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) ঊর্ধ্বতন এক বিশেষজ্ঞ নাম প্রকাশ না করে জাগো নিউজকে বলেন, ‘ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণির পাঠ্যবই শতভাগ পরিমার্জন দরকার। ২০১০ সালের শিক্ষাক্রমে প্রণীত বই দিয়ে ২০২৭ সালে পাঠদান করাটা হাস্যকর। এটা সরকারের পক্ষ থেকে জোরালোভাবে এনসিটিবিতে আসা দরকার। তা না হলে দায়সারা পরিমার্জন করে ২০২৭ সালের পাঠ্যবই ছাপিয়ে ফেলা হতে পারে।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইআর) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মনিনুর রশীদ। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘১৫-১৬ বছর আগের একটি শিক্ষাক্রম শতভাগ মেনে ২০২৭ সালে এসে তো আপনি শিক্ষার্থীদের পড়াতে পারবেন না। ছোটবেলা থেকে তারা যে বৈপ্লবিক প্রযুক্তির ছোঁয়ায় বড় হচ্ছে, পাঠ্যবইয়ে যদি তার ছিঁটেফোঁটাও না থাকে; তাহলে তো সে পড়ালেখায় আগ্রহী হয়ে উঠবে না। অবশ্যই পাঠ্যবই যুগোপযোগী করতে হবে। এক্ষেত্রে পরিমার্জনে অ্যাকটিভ থাকা জরুরি।’

শিক্ষা নিয়ে দীর্ঘদিন বেসরকারি খাতে কাজ করছেন রাশেদা কে চৌধূরী। তিনি শিক্ষা নিয়ে কাজ করা বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলোর মোর্চা গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক।

রাশেদা কে চৌধূরী জাগো নিউজকে বলেন, ‘সৃজনশীল পদ্ধতি মুখ থুবড়ে পড়েছিল শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ ঘাটতির কারণে। তখন ৪১ শতাংশ শিক্ষক এটা বুঝতেন না। তারপর বাতিল করা হলো। মাঝে অন্য কারিকুলাম এলো। তারপর আবার সৃজনশীল ফেরানো হলো। তাহলে আগেই ৪১ শতাংশ শিক্ষক বুঝতেন না এটা। নতুন যারা নিয়োগ পেয়েছেন, তারাও এটার ওপর প্রশিক্ষণ নেননি। তারাও বোঝেন না। সবমিলিয়ে দেখা যাবে যে কারিকুলাম চলছে, তা ৮০ শতাংশের বেশি শিক্ষক বোঝেন না। নোট-গাইড পড়ে টেনেটুনে চালিয়ে নিচ্ছেন। এভাবে কী একটা দেশের শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে উঠতে পারে?’

বই পরিমার্জনে এনসিটিবির ‘অনীহা’

ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণির পাঠ্যবই ‘সংশোধন ও পরিমার্জনের’ কাজ এরই মধ্যে শুরু করেছে এনসিটিবি। তবে তা শুধুই দায়সারার জন্য। বানান, বাক্য গঠন ও ছাপার ভুলগুলো সংশোধন করে কাজ শেষ করতে নির্দেশনা দিচ্ছেন এনসিটিবির শীর্ষ কর্মকর্তারা।

পরমার্জন ও সংশোধনের কাজ করা কয়েকজন গবেষণা কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শিক্ষামন্ত্রী শতভাগ পাঠ্যবই পরিমার্জনের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে বলে গেলেও এনসিটিবির কর্মকর্তারা তাতে নজর দিচ্ছেন না। তারা বানান ও বাক্য দেখে পাণ্ডুলিপি ছেড়ে দিতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। বিশেষ করে এনসিটিবিতে দায়িত্বে থাকা আওয়ামী লীগপন্থি কর্মকর্তারা বই পরিমার্জনে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছেন।

তাদের মধ্যে একজন গবেষণা কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে জাগো নিউজকে বলেন, ‘এনসিটিবির বেশিরভাগ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা আওয়ামী লীগপন্থি। তারা বিগত ১৫ বছরে বিভিন্নভাবে সুবিধাভোগী। এনসিটিবির তিনজন সদস্য (প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও পাঠ্যপুস্তক) সরাসরি আওয়ামী লীগপন্থি। বর্তমানে চেয়ারম্যানের অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা মাহবুবুল হক পাটওয়ারীও প্রশাসন ক্যাডারের আওয়ামী লীগপন্থি কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত। তারা কেউই চান না যে, আওয়ামী লীগ আমলে প্রণীত কারিকুলাম ও পাঠ্যবইয়ে পরিবর্তন আসুক। সেজন্য শিক্ষামন্ত্রীর ঘোষণার পরও শতভাগ পাঠ্যবই পরিমার্জনে কোনো আগ্রহ নেই তাদের।’

তবে বিষয়টি অস্বীকার করেন এনসিটিবির চেয়ারম্যান (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মাহবুবুল হক পাটওয়ারী। তিনি বলেন, ‘শিক্ষামন্ত্রীর নির্দেশনায় পাঠ্যবই সংশোধন ও পরিমার্জনের কাজ শুরু হয়েছে। এ কাজে কারও অবহেলা বা অনীহা দেখানোর সুযোগ নেই।’

দুইশ সদস্যের বিশেষজ্ঞ কমিটির উদ্যোগ

পাঠ্যবই সংশোধন ও পরিমার্জনে দুইশ সদস্যের বিশেষজ্ঞ কমিটি করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন এনসিটিবি কর্মকর্তারা। তবে তারা কী ধরনের পরিমার্জন কাজ করবেন, তা নিয়ে স্পষ্ট তথ্য জানাতে পারেননি কেউ।

এনসিটিবির সদস্য (শিক্ষাক্রম) অধ্যঅপক ড. এ কে এম মাসুদুল হক বলেন, বিষয়ভিত্তিক বিশেষজ্ঞদের একটি খসড়া তালিকা আমরা প্রস্তুত করেছি। শিগগির এটি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া হবে। কমিটি অনুমোদন হলে পাঠ্যপুস্তক পরিমার্জনের কাজ শুরু করা হতে পারে। এ পরিমার্জন হবে শুধু ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের জন্য।’

বিশেষজ্ঞদের মতামত গুরুত্ব দেওয়ার তাগিদ

তবে শুধু কমিটি করলেই হবে না, প্রকৃতভাবে পরিমার্জনের কাজ করার তাগিদ দিয়েছেন শিক্ষাবিদরা। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমিরেটাস অধ্যাপক ড. মনজুর আহমদ জাগো নিউজকে বলেন, ‘অতীতেও দেখা যায় কমিটি করা হয়, কিন্তু তাদের কাজে লাগানো হয় না। তাদের পরামর্শ গ্রহণ করার ক্ষেত্রেও অনীহা দেখানো হয়। কমিটিতে বিশেষজ্ঞ রাখার ক্ষেত্রেও অদূরদর্শিতা দেখা যায়। যারা শিক্ষা নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করছেন, তাদের রেখে কমিটি করা এবং পাঠ্যবই পরিমার্জনে তাদের মতামত গুরুত্ব দেওয়াটা উচিত হবে।’

জানতে চাইলে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন জাগো নিউজকে বলেন, ‘কোনো অনীহা দেখানোর সুযোগ নেই। কমিটি হচ্ছে, কাজও হবে। দ্রুতই সব প্রকাশ্যে আসবে। এবার শুধু পরিমার্জনটা হবে। এরপর কারিকুলাম রিভিউ হবে। সেটারও কাজ দ্রুত শুরু হবে। কিন্তু রিভিউয়ের পর নতুন যে কারিকুলাম হবে, সেটা ২০২৮ সাল থেকে আমরা চালু করার চেষ্টা করবো। পিছিয়ে থাকা যাবে না, পিছিয়ে আমরা থাকবোও না। শিক্ষাব্যবস্থা ও পাঠ্যবই যুগোপযোগী হবে, পাঠদানেও প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা হবে।’

এএএইচ/এমআরএম/এমএফএ

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow