মেসি কি এবার রাজনীতিতে নামবেন?

পায়ের জাদুতে প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগ ভেঙে চুরমার করে দেওয়া লিওনেল মেসির জন্য বাঁ পায়ের অতি চেনা এক ক্যারিশমা। কিন্তু মাঠের বাইরের জটিল রাজনৈতিক মারপ্যাঁচে পা না গলিয়ে যেভাবে তিনি নিজেকে আড়ালে রাখেন, সেই কৌশলও ফুটবলীয় ড্রিবলিংয়ের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। তিনি লিওনেল মেসি—বিশ্ব ফুটবলের সর্বকালের অন্যতম সেরা মহাতারকা। ফুটবলের আধুনিক ইতিহাসে দিয়েগো ম্যারাডোনা থেকে শুরু করে পেলে কিংবা রোমারিওদের মতো কিংবদন্তিরা বিভিন্ন সময়ে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে রাজনৈতিক মতাদর্শ প্রকাশ করেছেন, জড়িয়েছেন ক্ষমতার বৃত্তে। ঠিক তখন মেসি (Lionel Messi) নিজেকে আগলে রেখেছেন একটি অদৃশ্য রাজনৈতিক দেওয়ালের ওপারে। কিন্তু কেন? ম্যারাডোনা বনাম মেসি ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক ম্যারাডোনা ছিলেন প্রকাশ্য রাজনৈতিক অবস্থানের জন্য পরিচিত। কিউবার নেতা ফিদেল কাস্ত্রো, ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট হুগো শাভেজসহ বিভিন্ন বামপন্থি নেতার প্রতি সমর্থন জানিয়েছিলেন তিনি। তার হাতে ছিল বিপ্লবী নেতা চে গুয়েভারার উল্কি। দিয়েগো ম্যারাডোনা ও লিওনেল মেসি/ ছবি: ফেসবুক@মেসি অন্যদিকে মেসি আর্জেন্টিনা, স্পেন, ফ্রান্স কিংবা যুক্তরাষ্ট্র—যেখানেই থেকেছেন, রাজনৈ

মেসি কি এবার রাজনীতিতে নামবেন?

পায়ের জাদুতে প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগ ভেঙে চুরমার করে দেওয়া লিওনেল মেসির জন্য বাঁ পায়ের অতি চেনা এক ক্যারিশমা। কিন্তু মাঠের বাইরের জটিল রাজনৈতিক মারপ্যাঁচে পা না গলিয়ে যেভাবে তিনি নিজেকে আড়ালে রাখেন, সেই কৌশলও ফুটবলীয় ড্রিবলিংয়ের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। তিনি লিওনেল মেসি—বিশ্ব ফুটবলের সর্বকালের অন্যতম সেরা মহাতারকা।

ফুটবলের আধুনিক ইতিহাসে দিয়েগো ম্যারাডোনা থেকে শুরু করে পেলে কিংবা রোমারিওদের মতো কিংবদন্তিরা বিভিন্ন সময়ে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে রাজনৈতিক মতাদর্শ প্রকাশ করেছেন, জড়িয়েছেন ক্ষমতার বৃত্তে। ঠিক তখন মেসি (Lionel Messi) নিজেকে আগলে রেখেছেন একটি অদৃশ্য রাজনৈতিক দেওয়ালের ওপারে। কিন্তু কেন?

ম্যারাডোনা বনাম মেসি

১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক ম্যারাডোনা ছিলেন প্রকাশ্য রাজনৈতিক অবস্থানের জন্য পরিচিত। কিউবার নেতা ফিদেল কাস্ত্রো, ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট হুগো শাভেজসহ বিভিন্ন বামপন্থি নেতার প্রতি সমর্থন জানিয়েছিলেন তিনি। তার হাতে ছিল বিপ্লবী নেতা চে গুয়েভারার উল্কি।

messi
দিয়েগো ম্যারাডোনা ও লিওনেল মেসি/ ছবি: ফেসবুক@মেসি

অন্যদিকে মেসি আর্জেন্টিনা, স্পেন, ফ্রান্স কিংবা যুক্তরাষ্ট্র—যেখানেই থেকেছেন, রাজনৈতিক বিষয়ে খুব কমই মন্তব্য করেছেন।

বার্সেলোনায় প্রায় দুই দশকের ক্যারিয়ারে কাতালোনিয়ার স্বাধীনতা আন্দোলন নিয়ে কোনো অবস্থান নেননি তিনি। এমনকি আন্দোলনটি যখন স্পেনের অন্যতম বড় রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হয়েছিল, তখনও নিরপেক্ষ অবস্থান বজায় রেখেছিলেন।

আর্জেন্টিনার রাজনীতিতে জটিল মেরুকরণ

আর্জেন্টিনার (Argentina) অভ্যন্তরীণ রাজনীতি অত্যন্ত জটিল এবং চরমভাবে বিভক্ত। দেশটির ফুটবলাররা সামান্য কোনো রাজনৈতিক মন্তব্য করলেই দেশজুড়ে তুমুল বিতর্ক শুরু হয়। ২০২২ সালে মেসির নেতৃত্বে আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপ জয়ের পর একটি ঐতিহাসিক ঘটনা ঘটে। প্রথা অনুযায়ী, তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আলবার্তো ফার্নান্দেজের পক্ষ থেকে পুরো দলকে প্রেসিডেন্টের বাসভবন ‘কাসা রোসাদা’তে আমন্ত্রণ জানানো হয়। কিন্তু অধিনায়ক মেসির অনড় সিদ্ধান্তে পুরো দল সেই রাষ্ট্রীয় আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করে।

এমনকি, বর্তমান প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই বহুবার প্রকাশ্যে মেসির প্রশংসা করলেও আজ অবধি তাকে সঙ্গে নিয়ে কোনো অনুষ্ঠানে উপস্থিত হওয়া বা একসঙ্গে ছবি তোলার সুযোগ পাননি। উদ্দেশ্য একটাই—ফুটবলের এই মহাতারকাকে যেন কোনো রাজনৈতিক দল তাদের প্রচারণায় ব্যবহার করতে না পারে।

ক্লাবের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এড়ানো

মেসির এই রাজনৈতিক দূরত্ব শুধু দেশের বেলাতেই নয়, ক্লাবের রাজনীতিতেও সমানভাবে প্রযোজ্য। ২০২৬ সালের মার্চে অনুষ্ঠিত এফসি বার্সেলোনার ক্লাব প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে কেন্দ্র করে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা ভোটারদের টানতে মেসির নাম ও ইমেজ ব্যাপকভাবে ব্যবহার করার চেষ্টা করেন।

প্রার্থী মার্ক সিরিয়া একটি প্রচারণা ব্যানারে পরোক্ষভাবে মেসির উপস্থিতি দেখিয়েছিলেন। পরে অবশ্য তিনি স্বীকার করেন, মেসির সঙ্গে তার কখনো সরাসরি কথা হয়নি।

অন্যদিকে, ভিক্টর ফন্ট তার পুরো প্রকল্পের কেন্দ্রবিন্দুতেই রেখেছিলেন মেসিকে। তিনি তিনটি বড় প্রস্তাব দিয়েছিলেন। এর মধ্যে ছিল মেসিকে ক্লাবের সম্মানসূচক সভাপতি করা, বার্সেলোনার জার্সিতে তার বিদায়ী ম্যাচ আয়োজন এবং মেসি ও বার্সেলোনা ব্র্যান্ডকে ঘিরে যৌথ বাণিজ্যিক উদ্যোগ গড়ে তোলা।

messi
লিওনেল মেসি/ ছবি: ফেসবুক@মেসি

বর্তমান সভাপতি জোয়ান লাপোর্তা বেছে নিয়েছিলেন ভিন্ন পথ। তিনি প্রতিশ্রুতি দেন, স্টেডিয়ামের সংস্কারকাজ শেষ হলে মেসির জন্য বিশেষ সম্মাননা আয়োজন করা হবে। ক্লাবের অন্যান্য কিংবদন্তিদের সঙ্গে তার একটি ভাস্কর্যও স্থাপন করা হতে পারে।

তবে শুরু থেকেই এ বিষয়ে নীরব ছিলেন মেসি। ঘনিষ্ঠদের মতে, নির্বাচনের সময় প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করলে সেটি সহজেই নির্দিষ্ট কোনো প্রার্থীর প্রতি সমর্থন হিসেবে ব্যাখ্যা করা হতে পারত। সেই ঝুঁকি এড়াতেই তিনি নীরবতার পথ বেছে নেন।

প্রোটোকল বনাম বিতর্ক এড়ানোর কৌশল

২০২৬ সালের মার্চে ইন্টার মায়ামির হয়ে এমএলএস কাপ জয়ের পর প্রথা অনুযায়ী হোয়াইট হাউজে যায় পুরো দল। সেখানে মেসি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন এবং একটি ফুটবল উপহার দেন, যা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তীব্র বিতর্ক শুরু হয় । তবে এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে ইন্টার মিয়ামির প্রধান কোচ হাভিয়ের মাশচেরানো জানান, ‘আমরা শুধু প্রোটোকল অনুসরণ করছিলাম, যা কার্যত একটি ঐতিহ্যের মতো—কোনো দল চ্যাম্পিয়ন হলে তারা হোয়াইট হাউজে যায়।’

ট্রাম্পের সেই অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকলেও কোনো ধরনের রাজনৈতিক বক্তব্য থেকে বিরত ছিলেন মেসি, যা প্রমাণ করে তিনি রাষ্ট্রপ্রধানদের সম্মান করলেও ব্যক্তিগতভাবে রাজনৈতিক মেরুকরণ এড়িয়ে চলেন।

এর আগে, যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের দেওয়া ‘প্রেসিডেনশিয়াল মেডেল অব ফ্রিডম’ গ্রহণের অনুষ্ঠান ‘ সময়সূচি জটিলতা’র অজুহাতে এড়িয়ে গিয়েছিলেন মেসি।

messi
লিওনেল মেসি/ ফাইল ছবি: ফেসবুক@মেসি

হংকং বিতর্কে মেসির অবস্থান

২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে হংকংয়ে একটি প্রীতি ম্যাচে ইনজুরির কারণে মেসি মাঠে নামেননি, যা নিয়ে তীব্র রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হয় এবং গ্যালারি থেকে দুয়ো শুনতে হয়। হংকংয়ের রাজনীতিবিদরা একে রাজনৈতিক বয়কট হিসেবে আখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করলে মেসি পরবর্তীতে একটি ভিডিও বার্তা দিয়ে স্পষ্ট করেন যে, এর পেছনে কোনো রাজনৈতিক এজেন্ডা ছিল না।

তিনি পরিষ্কার জানান, খেলাধুলার সঙ্গে রাজনীতি মেশানো তিনি মোটেও পছন্দ করেন না এবং ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই চীনের ফুটবল ভক্তদের প্রতি তার বিশেষ ভালোবাসা রয়েছে।

রাজনীতি নয়, ব্র্যান্ড রক্ষা?

যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়া টেক বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক কির্ক বোম্যান মনে করেন, মেসির এই সিদ্ধান্তগুলো দীর্ঘমেয়াদি ভাবনার অংশ।

তিনি বলেন, মেসি শুধু একজন ফুটবলার নন, তিনি একটি বৈশ্বিক ব্র্যান্ড। তার বিভিন্ন ব্যবসায়িক বিনিয়োগ রয়েছে। এমনকি ইন্টার মায়ামিতেও তার মালিকানা অংশীদারত্ব আছে।

messi
লিওনেল মেসি/ ছবি: ফেসবুক@মেসি

বোম্যানের মতে, মেসি সরাসরি রাজনীতিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ না করলেও এমন কর্মকাণ্ডে অংশ নেন, যেখানে তার ব্যক্তিগত বা বাণিজ্যিক ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা কম থাকে। তিনি বলেন, ‘মেসি রাজনীতিতে জড়াতে চান না। তবে কোনো পদক্ষেপ যদি তার ব্র্যান্ডের জন্য ইতিবাচক হয়, তাহলে সেটি এড়িয়ে চলেন না।’

ফোর্বস এবং ইয়াহু স্পোর্টসের অর্থনৈতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, মাঠের বাইরে বিভিন্ন বৈশ্বিক স্পনসরশিপ ও ব্যবসা থেকে মেসির বার্ষিক আয় প্রায় ৫০ থেকে ৭০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।

রাজনীতিতে জড়ানো বা কোনো নির্দিষ্ট মতাদর্শকে সমর্থন করার অর্থ হলো বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি ভক্ত ও গ্রাহকের একটি বড় অংশকে প্রতিপক্ষ বানিয়ে ফেলা। সে কারণে নিজের বাণিজ্যিক সাম্রাজ্য এবং সর্বজনীন ভাবমূর্তি ধরে রাখতে মেসি রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা বজায় রাখেন।

রাজনীতির বদলে সমাজসেবা

রাজনীতির মঞ্চে না গিয়েও মেসি মানুষের সেবা করছেন ভিন্ন উপায়ে। নিজের গড়া লিও মেসি ফাউন্ডেশন (Fundación Leo Messi)-এর মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষা, চিকিৎসা ও পুষ্টির জন্য কাজ করছেন তিনি। ইউনিসেফের (UNICEF) গুডউইল অ্যাম্বাসেডর হিসেবেও তিনি বিশ্বব্যাপী সমাদৃত।

লিওনেল মেসি প্রমাণ করেছেন, মানুষের ভালোবাসা পাওয়ার জন্য বা সমাজে পরিবর্তন আনার জন্য ব্যালট পেপারের সিল কিংবা রাজনৈতিক মঞ্চের বক্তৃতার প্রয়োজন হয় না। মাঠের সবুজ ঘাস আর পায়ের জাদুই তাকে কোটি মানুষের ‘হৃদয়ের রাজা’ বানিয়ে রেখেছে। এরপরও তিনি কোনোদিন রাজনীতিতে নাম লেখাবেন কি না, তা কেবল সময়ই বলতে পারে।

সূত্র: এপি, দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস, নিউ লাইনস ম্যাগাজিন, বিইন স্পোর্টস, ফোর্বস, টাইম
কেএএ/

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow