মেসি ম্যাজিক বনাম ইংল্যান্ডের রক্ষণব্যূহ: যেখানে হেরে গেলেন টুখেল

শুরুতে লিওনেল মেসিকে আটকাতে টমাস টুখেলের অধীনে ইংল্যান্ডের পরিকল্পনা ছিল পরিষ্কার। লিওকে কোনোভাবেই জায়গা দেওয়া যাবে না। প্রথমার্ধে তারা এতে দারুণ সফলও হয়েছিল। তরুণ এলিয়ট অ্যান্ডারসনকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল মেসির গায়ে আঠার মতো লেগে থাকার জন্য, ফুটবলের ভাষায় যাকে বলে টাচ-টাইট ডিফেন্স। যখনই মেসি বল পাচ্ছিলেন, অ্যান্ডারসন তাকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছিলেন। এর ফলে প্রথমার্ধে মেসি ১৫ বার বল হারান, যা গত দুটি বিশ্বকাপ বা কোপা আমেরিকার যেকোনো ম্যাচের তুলনায় বেশি। অ্যান্ডারসন এতটাই বেপরোয়া ছিলেন যে, মেসিকে ট্যাকল করে হলুদ কার্ডও দেখেছেন। ইংল্যান্ডের ডিফেন্সিভ ব্লকের কারণে এই সময়ে মেসি কোনো গুরুত্বপূর্ণ পাস বা শট নিতে পারেননি। ইংল্যান্ডের ভুলটা যেখানে হলো : ১-২ গোলে হারা ম্যাচের ৬০ মিনিট পর্যন্ত ইংল্যান্ড বেশ নিয়ন্ত্রণে ছিল। কিন্তু বিপত্তি ঘটল, যখন তারা গোল ধরে রাখার জন্য অতিরিক্ত রক্ষণাত্মক হয়ে পড়ল। হ্যারি কেইন নিজেও স্বীকার করেছেন যে, শুরুতে তারা হাই-প্রেসিং করে আর্জেন্টিনাকে চাপে রেখেছিলেন, কিন্তু পরে তারা অনেক বেশি নিচে নেমে আসেন। ইংল্যান্ডের গোল এবং আর্জেন্টিনার জয়সূচক গোলের মধ্যবর্তী সময়ে

মেসি ম্যাজিক বনাম ইংল্যান্ডের রক্ষণব্যূহ: যেখানে হেরে গেলেন টুখেল

শুরুতে লিওনেল মেসিকে আটকাতে টমাস টুখেলের অধীনে ইংল্যান্ডের পরিকল্পনা ছিল পরিষ্কার। লিওকে কোনোভাবেই জায়গা দেওয়া যাবে না। প্রথমার্ধে তারা এতে দারুণ সফলও হয়েছিল। তরুণ এলিয়ট অ্যান্ডারসনকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল মেসির গায়ে আঠার মতো লেগে থাকার জন্য, ফুটবলের ভাষায় যাকে বলে টাচ-টাইট ডিফেন্স।

যখনই মেসি বল পাচ্ছিলেন, অ্যান্ডারসন তাকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছিলেন। এর ফলে প্রথমার্ধে মেসি ১৫ বার বল হারান, যা গত দুটি বিশ্বকাপ বা কোপা আমেরিকার যেকোনো ম্যাচের তুলনায় বেশি। অ্যান্ডারসন এতটাই বেপরোয়া ছিলেন যে, মেসিকে ট্যাকল করে হলুদ কার্ডও দেখেছেন।

ইংল্যান্ডের ডিফেন্সিভ ব্লকের কারণে এই সময়ে মেসি কোনো গুরুত্বপূর্ণ পাস বা শট নিতে পারেননি।

ইংল্যান্ডের ভুলটা যেখানে হলো : ১-২ গোলে হারা ম্যাচের ৬০ মিনিট পর্যন্ত ইংল্যান্ড বেশ নিয়ন্ত্রণে ছিল। কিন্তু বিপত্তি ঘটল, যখন তারা গোল ধরে রাখার জন্য অতিরিক্ত রক্ষণাত্মক হয়ে পড়ল। হ্যারি কেইন নিজেও স্বীকার করেছেন যে, শুরুতে তারা হাই-প্রেসিং করে আর্জেন্টিনাকে চাপে রেখেছিলেন, কিন্তু পরে তারা অনেক বেশি নিচে নেমে আসেন।

ইংল্যান্ডের গোল এবং আর্জেন্টিনার জয়সূচক গোলের মধ্যবর্তী সময়ে ইংল্যান্ডের পায়ে বল ছিল মাত্র ১২ শতাংশ। ১১ জন খেলোয়াড়ের মধ্যে ১০ জনই যখন পেনাল্টি বক্সের ভেতর ঢুকে রক্ষণ সামলাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন, তখন প্রতিপক্ষের জন্য সুযোগ তৈরি করা সহজ হয়।

আর্জেন্টিনার পাল্টা চাল: ইংল্যান্ড যখন রক্ষণভাগ মজবুত করার জন্য পাঁচজন ডিফেন্ডার নিয়ে খেলতে শুরু করল, তখন আর্জেন্টিনার কোচ লিওনেল স্কালোনি তার তুরুপের তাসগুলো চাললেন। তিনি রদ্রিগো ডি পল এবং গঞ্জালো মন্টিয়েলকে মাঠে নামিয়ে ডান প্রান্ত দিয়ে আক্রমণ শানাতে শুরু করেন। মেসি এবার অ্যান্ডারসনের পাহারা থেকে মুক্ত হয়ে হাফ-স্পেসগুলোতে জায়গা পেতে শুরু করেন।

আর্জেন্টিনা কৌশল করে তাদের ফরোয়ার্ড লাইন ফাঁকা করে দেয়, যাতে ইংল্যান্ডের ডিফেন্ডাররা বিভ্রান্ত হয়ে সামনে চলে আসে এবং পেছনে জায়গা তৈরি হয়। ম্যাচের শেষ দিকে ইংল্যান্ডের ৮ জন খেলোয়াড় মিলে আর্জেন্টিনার মাত্র ৩ জন খেলোয়াড়কে মার্ক করছিল, যার ফলে এনজো ফার্নান্দেজ এবং ডি পলরা ফাঁকায় বল পাওয়ার সুযোগ পান।

টুখেলের পরিকল্পনায় হ্যারি কেইন কেবল আক্রমণভাগেই ছিলেন না, তিনি আর্জেন্টিনার সবচেয়ে নিচে থাকা মিডফিল্ডার লিয়ান্দ্রো পারেদেসের ওপরও কড়া নজর রাখছিলেন। এ ছাড়া দ্বিতীয়ার্ধে রক্ষণ মজবুত করতে কেইন অনেক নিচে নেমে এসে সেন্ট্রাল চ্যানেলে জটলা তৈরি করছিলেন। এমন দ্বৈত ভূমিকার জন্য কেইন মাত্র ২৬ বার বল টাচ করতে পারেন। আর্জেন্টিনার ডি-বক্সে একবারও বল ধরতে পারেননি।

ইংল্যান্ডের আরেকটা কৌশল ছিল সেন্ট্রাল মিডফিল্ডে ম্যান-মার্কিং করা এবং আর্জেন্টিনাকে লং-বল খেলতে বাধ্য করা। ইংল্যান্ডের দুই সেন্টার-ব্যাক এই লং-বলগুলো অনায়াসেই সামলাতে পারছিলেন।

শেষ দিকে ইংল্যান্ডের প্রেস ভাঙার জন্য স্কালোনি এক অদ্ভুত চাল চালেন। তিনি তার ফরোয়ার্ড লাইন পুরোপুরি খালি করে দিয়ে সব খেলোয়াড়কে রাইট ফ্ল্যাঙ্কে নিয়ে আসেন। এর ফলে রাইস, অ্যান্ডারসন এবং বেলিংহ্যাম বিভ্রান্ত হয়ে পড়েন এবং এনজো ফার্নান্দেজের মতো খেলোয়াড়রা শট নেওয়ার জন্য ফাঁকা জায়গা পেয়ে যান।

ডি পলের বহুমুখী ভূমিকা: বদলি হিসেবে নামার পর রদ্রিগো ডি পল কখনো মিডফিল্ডে খেলছিলেন, আবার কখনো উইংয়ে চলে যাচ্ছিলেন। মেসির সঙ্গে তার এই পজিশন অদলবদল ইংল্যান্ডের রক্ষণকে এলোমেলো করে দিয়েছিল।

দেরিতে আক্রমণ: আর্জেন্টিনা ‘ডিলেড রানস’ বা একটু সময় নিয়ে বক্সে ঢোকার কৌশল ব্যবহার করেছিল। ইংল্যান্ড যখন অনেক নিচে নেমে রক্ষণ করছিল, তখন আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়রা পেছন থেকে দৌড়ে এসে আক্রমণে যোগ দিচ্ছিলেন, যা মার্ক করা ইংল্যান্ডের ডিফেন্ডারদের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছিল।

শারীরিক উচ্চতার ঘাটতি পুষিয়ে দেওয়া: আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়রা ইংল্যান্ডের চেয়ে গড়ে প্রায় ৮ সেন্টিমিটার খাটো হওয়া সত্ত্বেও তারা উইং থেকে নিখুঁত ডেলিভারি এবং বক্সে সঠিক সময়ে রান করার মাধ্যমে সেই ঘাটতি পূরণ করে ফেলেছিলেন।

আর্জেন্টিনার দুই গোল: আর্জেন্টিনার ফিরে আসার গল্পটি শুরু হয় এনজো ফার্নান্দেজের সমতাসূচক গোল দিয়ে। ৮৫ মিনিটের সেই মুহূর্তে ইংল্যান্ডের ট্যাকটিক্যাল অবস্থা ছিল লক্ষ্য করার মতো। নিজেদের রক্ষণ সামলাতে গিয়ে ইংল্যান্ডের ৮ জন খেলোয়াড় বক্সের ভেতর আর্জেন্টিনার মাত্র ৩ জন খেলোয়াড়কে মার্ক করতে ব্যস্ত ছিলেন। এই ভুলের সুযোগে বক্সের ঠিক বাইরে এনজো ফার্নান্দেজ, মেসি এবং ডি পল একদম ফাঁকা জায়গা পেয়ে যান। কর্নার থেকে ফিরতি বল নিয়ে মেসি একটু সামনে যান। মেসি যখন এনজোকে বল দেন, তার সামনে প্রতিপক্ষ ডিফেন্ডাররা লাফানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। তাদের ধারণা ছিল, মেসিই হয়তো শট নেবেন। কিন্তু তিনি ইন-সুইংগিং শট না নিয়ে বল রিলিজ করেন ডি-বক্সের বাইরে একদম মাঝবরাবর কোমর নিচু করে শট নেওয়ার মতো প্রস্তুতি নিয়ে অপেক্ষায় থাকা এনজোকে। বাঁ পায়ের প্রথম টাচ একদম আরামে নেন। এরপর প্র্যাকটিস শটের মতো ডান পায়ে বল জালে পাঠিয়ে দেন। এই কয়েক সেকেন্ড তাকে চ্যালেঞ্জ তো দূরের কথা, বিরক্ত করারও কেউ ছিলেন না।

সাত মিনিট পর আর্জেন্টিনার জয়সূচক গোলটি আসে লাউতারো মার্তিনেজের হেড থেকে। ইংল্যান্ডের রক্ষণভাগ অতিরিক্ত নিচে নেমে আসায় মেসি তার প্রিয় হাফ-স্পেস এবং উইংয়ে ইচ্ছেমতো জায়গা পেতে শুরু করেন। ইংল্যান্ডের জমাট ডিফেন্সিভ ব্লকের মধ্যেও মেসি বল ডিস্ট্রিবিউশন এবং সতীর্থদের সঙ্গে ছোট ছোট পাসের মাধ্যমে চাপ তৈরি করতে থাকেন, যার চূড়ান্ত পরিণতি ছিল লাউতারোর করা সেই জয়সূচক গোলটি।

ডান পায়ে মেসি ক্রস পাঠান গোলরক্ষকের সামনে। দুইজন ডিফেন্ডারের ঠিক মাঝের স্পেসে ছিলেন মার্তিনেজ। প্রথমজন লাফ দিয়েও বলের নাগাল পাননি। পেছনের জনও লাফিয়েছিলেন। কিন্তু মেসির মাপা শট গিয়ে পড়ে মার্তিনেজের মাথায়। ওখানেই শেষ হয়ে যায় ইংল্যান্ডের আশা।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow