মেসি-রোনালদোর কাতারে হালান্ড! ফুটবল বিশ্বে নতুন মহাতারকা
তিনি দেখতে অনেকটা নর্স পুরাণের চরিত্র থরের মতো। আবার গোল করার পর অনেক সময় যোগাসনের ‘লোটাস পজিশনে’ বসে পড়েন, যেন হিন্দুদের শিবের ধ্যানমগ্ন রূপ। তবে আরলিং ব্রট হালান্ড আসলে নিজের মতো করেই এক বিস্ময়কর চরিত্র। তার পরিসংখ্যান যেন রূপকথা বা পৌরাণিক কাহিনির মতো। মাত্র ২৫ বছর বয়সেই নরওয়ের এই স্ট্রাইকার এমন গতিতে গোল করে চলেছেন যে, অনেকেই মনে করছেন তিনি একদিন ফুটবল ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়ে উঠতে পারেন। হালান্ডের উত্থান ও অবিশ্বাস্য পরিসংখ্যান গত দশকের দ্বিতীয়ার্ধে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম টিকটকের মতোই বিস্ফোরক আবির্ভাব ঘটে হালান্ডের। মাত্র ১৫ বছর বয়সে ব্রাইনের হয়ে পেশাদার ফুটবলে অভিষেক হয় তার। পরের বছর মোল্ডের জার্সিতে অভিষেক ম্যাচেই গোল করেন। এরপর অস্ট্রিয়ার ক্লাব সালজবুর্গে নিজের একমাত্র পূর্ণ মৌসুমে ২২ ম্যাচে করেন ২৮ গোল। ২০১৯ অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপে নরওয়ের হয়ে হন্ডুরাসকে ১২-০ গোলে বিধ্বস্ত করার ম্যাচে একাই করেন ৯ গোল- যা এখনও বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম বিস্ময়কর ব্যক্তিগত পারফরম্যান্স। এরপর জার্মানিতে বরুসিয়া ডর্টমুন্ডের হয়ে গোলবন্যা বইয়ে দেন তিনি। আরবি লাইপজিগকে হারিয়ে ডিএফবি-পোকাল (লিগ কাপ)
তিনি দেখতে অনেকটা নর্স পুরাণের চরিত্র থরের মতো। আবার গোল করার পর অনেক সময় যোগাসনের ‘লোটাস পজিশনে’ বসে পড়েন, যেন হিন্দুদের শিবের ধ্যানমগ্ন রূপ। তবে আরলিং ব্রট হালান্ড আসলে নিজের মতো করেই এক বিস্ময়কর চরিত্র। তার পরিসংখ্যান যেন রূপকথা বা পৌরাণিক কাহিনির মতো। মাত্র ২৫ বছর বয়সেই নরওয়ের এই স্ট্রাইকার এমন গতিতে গোল করে চলেছেন যে, অনেকেই মনে করছেন তিনি একদিন ফুটবল ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়ে উঠতে পারেন।
হালান্ডের উত্থান ও অবিশ্বাস্য পরিসংখ্যান
গত দশকের দ্বিতীয়ার্ধে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম টিকটকের মতোই বিস্ফোরক আবির্ভাব ঘটে হালান্ডের। মাত্র ১৫ বছর বয়সে ব্রাইনের হয়ে পেশাদার ফুটবলে অভিষেক হয় তার। পরের বছর মোল্ডের জার্সিতে অভিষেক ম্যাচেই গোল করেন। এরপর অস্ট্রিয়ার ক্লাব সালজবুর্গে নিজের একমাত্র পূর্ণ মৌসুমে ২২ ম্যাচে করেন ২৮ গোল।
২০১৯ অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপে নরওয়ের হয়ে হন্ডুরাসকে ১২-০ গোলে বিধ্বস্ত করার ম্যাচে একাই করেন ৯ গোল- যা এখনও বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম বিস্ময়কর ব্যক্তিগত পারফরম্যান্স।
এরপর জার্মানিতে বরুসিয়া ডর্টমুন্ডের হয়ে গোলবন্যা বইয়ে দেন তিনি। আরবি লাইপজিগকে হারিয়ে ডিএফবি-পোকাল (লিগ কাপ) জয়ে বড় ভূমিকা রাখেন। ডর্টমুন্ডের হয়ে ৮৯ ম্যাচে করেন ৮৬ গোল।
পরে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ ক্লাব ম্যানচেস্টার সিটিতে যোগ দিয়ে আরও ভয়ংকর হয়ে ওঠেন হালান্ড। প্রথম তিন মৌসুমেই ক্লাবটিকে এনে দেন দুটি প্রিমিয়ার লিগ শিরোপা এবং প্রথম উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ট্রফি। সে সঙ্গে দ্বিতীয়বারের মতো হন চ্যাম্পিয়ন্স লিগের সর্বোচ্চ গোলদাতা।
জাতীয় দলেও চলছে তার গোলঝড়। মাত্র ৮ ম্যাচে ১৬ গোল করে নরওয়েকে পৌঁছে দিয়েছেন ২০২৬ বিশ্বকাপে। আর এর ফলে প্রথম রাউন্ডেই দেখা যেতে পারে বহুল প্রতীক্ষিত হালান্ড বনাম কিলিয়ান এমবাপে দ্বৈরথ।
হালান্ডকে নিয়ে তারকাদের মন্তব্য
আরলিং হালান্ডকে নিয়ে ম্যানচেস্টার সিটির কোচ পেপ গার্দিওলা বলেন,‘ওর সঙ্গে খেলা মানে দলে মেসি বা ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো থাকার মতো। ওর প্রভাব বিশাল। সে দলকে অন্য এক উচ্চতায় নিয়ে যায়। মেসি আর রোনালদো ১৫ বছর ধরে এটা করেছে। হালান্ডও এখন সেই স্তরে।’
ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড কিংবদন্তি গ্যারি নেভিলের ভাষায়, ‘সে এক বিস্ময়। অবিশ্বাস্য। দৌড় শুরু করার বিস্ফোরণ, শক্তি- অনেকটা ব্রাজিলিয়ান রোনালদোর মতো। জিদান, ব্রাজিলিয়ান রোনালদো, পর্তুগিজ রোনালদো- সে কাতারেই আছে হালান্ড। সে অসাধারণ। মনে হয় যেন এক শরীরে চারজন খেলোয়াড়।’
নরওয়ের স্ট্রাইকার আলেকজান্ডার সোরলথ বলেন, ‘আপনি ভাববেন সবই দেখে ফেলেছেন; কিন্তু সে প্রতিদিন আরও উন্নতি করছে। এমন কিছু নেই যা সে পারে না। তার পরিসংখ্যান অবিশ্বাস্য।’
সংগীতশিল্পী ও ম্যানচেস্টার সিটি সমর্থক নোয়েল গ্যালাঘারের মন্তব্য, ‘হালান্ড এমন এক খেলোয়াড়, যে মাঝমাঠ থেকে বল নিয়ে একাই পুরো ডিফেন্স ভেঙে ফেলতে পারে। সে হতে পারে সব দানবেরও দানব।’
লিভারপুল কিংবদন্তি জেমি ক্যারাঘার বলেছেন, ‘আমার মনে হয় আমরা ইংলিশ ফুটবলের ইতিহাসের সেরা গোলস্কোরারকে দেখছি। গ্যারি লিনেকার, অ্যালান শিয়ারার, হ্যারি কেইন, ইয়ান রাশ- সবাইকে ভাবুন। কিন্তু হালান্ড যা করছে, আমরা আগে কখনও দেখিনি। সার্জিও আগুয়েরোর মতো কিংবদন্তির ক্লাবে খেলেও সে সম্পূর্ণ ভিন্ন স্তরের।’
হালান্ড সম্পর্কে মজার কিছু তথ্য
২০০৬ সালে মাত্র পাঁচ বছর বয়সে দাঁড়িয়ে লং জাম্পে ১.৬৩ মিটার লাফিয়ে বিশ্বরেকর্ড গড়েছিলেন হালান্ড। তার মা গ্রি মারিতা ব্রট ছিলেন নরওয়ের জাতীয় হেপ্টাথলেট চ্যাম্পিয়ন।
কৈশোরে নরওয়ের জাতীয় হ্যান্ডবল দল থেকেও ডাক পেয়েছিলেন তিনি। শৈশবে তিনি অনুপ্রাণিত হয়েছেন স্প্যানিশ ফুটবলার মিচু, জ্লাতান ইব্রাহিমোভিচ এবং ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোকে দেখে।
নরওয়ের অনূর্ধ্ব-১৭ দলের সতীর্থ এরিক বথেইম ও এরিক টোবিয়াস স্যান্ডবার্গকে নিয়ে ‘ফ্লো কিংজ’ নামে একটি র্যাপ ব্যান্ডও করেছিলেন হালান্ড। তাদের গান ‘কিগো জো’ ইউটিউবে প্রায় দেড় কোটি ভিউ পেয়েছে।
২০২০ সালে বরুসিয়া ডর্টমুন্ডে যোগ দেওয়ার পর সতীর্থদের সামনে বব মার্লের বিখ্যাত গান ‘থ্রি লিটল বার্ডস’ গেয়েছিলেন হালান্ড।
রেকর্ড ভাঙার আরেক নাম হালান্ড
- ডর্টমুন্ডের হয়ে প্রথম ৫ গোল করতে তার সময় লেগেছিল মাত্র ৫৬ মিনিট।
- ৫০ বুন্দেসলিগা গোল করতে খেলেন মাত্র ৫০ ম্যাচ- যা আগের রেকর্ডধারী টিমো কোনিয়েটস্কার ৫৯ ম্যাচের রেকর্ড ভেঙে দেয়।
- ম্যানচেস্টার সিটিতে প্রথম মৌসুমেই প্রিমিয়ার লিগে করেন ৩৬ গোল- এক মৌসুমে সর্বোচ্চ গোলের নতুন রেকর্ড।
- সবচেয়ে দ্রুত ৫০ ও ১০০ প্রিমিয়ার লিগ গোলের রেকর্ডও এখন তার দখলে। ৫০ গোল করতে খেলেন মাত্র ৪৮ ম্যাচ এবং ১০০ গোল করতে ১১১ ম্যাচ। আগের রেকর্ড ছিল যথাক্রমে অ্যান্ডি কোলের ৬৫ ও অ্যালান শিয়ারারের ১২৪ ম্যাচ।
- ৬০ মিটার স্প্রিন্ট তিনি দৌড়েছেন মাত্র ৬.৬২ সেকেন্ডে। তুলনায় নরওয়ের জাতীয় রেকর্ড ৬.৫৫ সেকেন্ড এবং বিশ্বরেকর্ড ৬.৩৪ সেকেন্ড।
- চ্যাম্পিয়ন্স লিগে ৫০ গোল করতে তার লেগেছে মাত্র ৪৯ ম্যাচ। আগের দ্রুততম রেকর্ড ছিল রুড ফন নিস্টেলরয়ের- ৬২ ম্যাচ।
- নরওয়ের হয়ে ৪৬ ম্যাচে করেছেন ৫০ গোল। আন্তর্জাতিক ফুটবলে ৫০ গোল করতে ৫০ ম্যাচের কম লাগা ইতিহাসের মাত্র ষষ্ঠ ফুটবলার তিনি।
- ২০২৫ সালে জাতীয় দলের হয়ে ৯ ম্যাচে ১৭ গোল করে আন্তর্জাতিক ফুটবলের সর্বোচ্চ গোলদাতা ছিলেন হালান্ড।
বিশ্বকাপে নরওয়ের ইতিহাস
১৯৩৮ সালে প্রথম বিশ্বকাপে অংশ নেয় নরওয়ে। অভিষেকেই তৎকালীন চ্যাম্পিয়ন ইতালিকে অতিরিক্ত সময়ে নিয়ে গিয়েছিল তারা।
এরপর ১৯৯৪ বিশ্বকাপে দীর্ঘ ৫৬ বছর পর ফিরেছিল নরওয়ে। নেদারল্যান্ডস, ইংল্যান্ড ও পোল্যান্ডকে পেছনে ফেলে বিশ্বকাপে জায়গা করে নেয় তারা। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বকাপে একই পয়েন্ট ও গোল ব্যবধান নিয়ে গ্রুপ থেকে বিদায় নিতে হয় গোলসংখ্যায় পিছিয়ে থাকায়।
১৯৯৮ সালে আবারও বিশ্বকাপে চমক দেখায় নরওয়ে। ব্রাজিলকে হারিয়ে শেষ ষোলোতে ওঠে তারা। তবে ইতালির ক্রিশ্চিয়ান ভিয়েরির গোলে থেমে যায় তাদের যাত্রা।
২০২৬ বিশ্বকাপে নরওয়ের স্বপ্ন
২১ শতকে এই প্রথম বিশ্বকাপে ফিরছে নরওয়ে। তবে অনেকেই তাদের ‘ডার্ক হর্স’ হিসেবে দেখছেন। বাছাইপর্বে ইতালিকে হোম ও অ্যাওয়ে- দুই ম্যাচেই হারিয়েছে তারা। জিতেছে ৮ ম্যাচের সবগুলো। করেছে ৩৭ গোল, হজম করেছে মাত্র ৫টি।
স্টালে সোলব্যাকেনের দলে শুধু হালান্ডই নন, আছেন আর্সেনালের মার্টিন ওডেগার্ড, লাইপজিগের তরুণ উইঙ্গার আন্তোনিও নুসা, ফুলহ্যামের সান্দের বের্গে, অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদের আলেকজান্ডার সোরলথ এবং ক্রিস্টাল প্যালেসের ইয়ুর্গেন স্ট্রান্ড লারসেনের মতো তারকারাও।
যদিও তাদের গ্রুপে আছে আফ্রিকান চ্যাম্পিয়ন সেনেগাল, শক্তিশালী ফ্রান্স এবং এশিয়ার দেশ ইরাক। তবে হালান্ডের ভাষায়, ‘নরওয়ে কোনো দলকেই ভয় পায় না।’
আইএইচএস/
What's Your Reaction?