মেহেরপুর সীমান্ত দিয়ে এক বছরে ৩৭২ জনকে পুশইন

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সীমান্তবর্তী জেলা মেহেরপুর। আর এই মেহেরপুর সীমান্তে ২০২৫ সালজুড়ে নীরবে চলেছে এক গভীর মানবিক সংকট। কাঁটাতারের বেড়া আর সীমান্ত পিলারের আড়ালে, রাতের অন্ধকারে কিংবা সীমিত আনুষ্ঠানিকতায় ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) একের পর এক বাংলাদেশিকে দেশে ঠেলে দিয়েছে। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, শুধু মেহেরপুর জেলার গাংনী ও মুজিবনগর সীমান্ত দিয়েই গত এক বছরে ৩৭২ জন বাংলাদেশিকে ফেরত পাঠানো হয়েছে। এ মানুষগুলো কেউ নতুন নন। কাজের সন্ধানে তারা কেউ ২৫ বছর আগে, কেউ ১০ বছর আগে, কেউবা আবার চার-পাঁচ বছর আগে অবৈধ পথে ভারতে গিয়েছিলেন। কলকাতা, নয়ডা, নদীয়া, বহরমপুরসহ বিভিন্ন অঞ্চলের ইটভাটা, লোহার কারখানা ও নির্মাণ খাতে শ্রমিক হিসেবে কাজ করছিলেন তারা, কেউ আবার স্থানীয় হতে সেখানে বাড়ি ঘর তৈরি করে শুরু করেছিলেন। পরিবার গড়েছেন, জীবন সাজিয়েছেন, কিন্তু আইনের চোখে তারা ছিলেন অনিবন্ধিত। ফেরত আসা একাধিক ব্যক্তির ভাষ্য অনুযায়ী, ভারতীয় পুলিশ তাদের আটক করে হাজতে নেয়, পরে বিএসএফের কাছে হস্তান্তর করে। অনেককে সপ্তাহ বা মাসজুড়ে কারাগারে থাকতে হয়। কারাভোগ শেষে মুক্তির নামে ট্রাকে করে সীমান্তে এনে র

মেহেরপুর সীমান্ত দিয়ে এক বছরে ৩৭২ জনকে পুশইন

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সীমান্তবর্তী জেলা মেহেরপুর। আর এই মেহেরপুর সীমান্তে ২০২৫ সালজুড়ে নীরবে চলেছে এক গভীর মানবিক সংকট। কাঁটাতারের বেড়া আর সীমান্ত পিলারের আড়ালে, রাতের অন্ধকারে কিংবা সীমিত আনুষ্ঠানিকতায় ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) একের পর এক বাংলাদেশিকে দেশে ঠেলে দিয়েছে।

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, শুধু মেহেরপুর জেলার গাংনী ও মুজিবনগর সীমান্ত দিয়েই গত এক বছরে ৩৭২ জন বাংলাদেশিকে ফেরত পাঠানো হয়েছে।

এ মানুষগুলো কেউ নতুন নন। কাজের সন্ধানে তারা কেউ ২৫ বছর আগে, কেউ ১০ বছর আগে, কেউবা আবার চার-পাঁচ বছর আগে অবৈধ পথে ভারতে গিয়েছিলেন। কলকাতা, নয়ডা, নদীয়া, বহরমপুরসহ বিভিন্ন অঞ্চলের ইটভাটা, লোহার কারখানা ও নির্মাণ খাতে শ্রমিক হিসেবে কাজ করছিলেন তারা, কেউ আবার স্থানীয় হতে সেখানে বাড়ি ঘর তৈরি করে শুরু করেছিলেন। পরিবার গড়েছেন, জীবন সাজিয়েছেন, কিন্তু আইনের চোখে তারা ছিলেন অনিবন্ধিত।

ফেরত আসা একাধিক ব্যক্তির ভাষ্য অনুযায়ী, ভারতীয় পুলিশ তাদের আটক করে হাজতে নেয়, পরে বিএসএফের কাছে হস্তান্তর করে। অনেককে সপ্তাহ বা মাসজুড়ে কারাগারে থাকতে হয়। কারাভোগ শেষে মুক্তির নামে ট্রাকে করে সীমান্তে এনে রাতের আঁধারে কাঁটাতারের গেট খুলে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া হয়।

৩ ডিসেম্বর রাতে গাংনী সীমান্ত দিয়ে এভাবেই নারী, পুরুষ ও শিশুসহ ৩০ জন বাংলাদেশিকে পুশইন করা হয়। তাদের মধ্যে ১৮ জন পুরুষ, ১২ জন নারী ও ২ জন শিশু ছিলেন। তারা খুলনা, লালমনিরহাটসহ বিভিন্ন জেলার বাসিন্দা। তারা জানান, দীর্ঘদিন ধরে ভারতে কাজ করছিলেন, হঠাৎ করেই আটক হয়ে দেশে ফিরতে বাধ্য হন।

এর আগে ১৯ নভেম্বর গাংনী উপজেলার কাথুলী সীমান্তে পতাকা বৈঠকের মাধ্যমে ২৪ জন বাংলাদেশিকে বিজিবির কাছে হস্তান্তর করে বিএসএফ। ওই বৈঠকে বিজিবির পক্ষে কাথুলী কোম্পানির দপ্তর কমান্ডার নায়েক সুবেদার মো. কামরুজ্জামান এবং বিএসএফের পক্ষে নদীয়া জেলার তেহট্টর ৫৬ ব্যাটালিয়নের তেইরপুর কোম্পানি কমান্ডার এসি আনচ কুমার উপস্থিত ছিলেন।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, অক্টোবর থেকে আগস্ট এই কয়েক মাসেই ফেরত পাঠানোর ঘটনা ছিল সবচেয়ে বেশি। ২৬ অক্টোবর মুজিবনগর সীমান্ত দিয়ে নারী, পুরুষ ও শিশুসহ ২৯ জনকে হস্তান্তর করা হয়। এর একদিন আগে ২৫ অক্টোবর গাংনীর কাজিপুর ও কাথুলী সীমান্ত দিয়ে ৬ জন তৃতীয় লিঙ্গের সদস্যসহ মোট ৬০ জন নারী-পুরুষকে দুই দফায় ফেরত পাঠানো হয়।

১৮ অক্টোবর কাথুলী সীমান্ত দিয়ে ১৪ জন, ২০ সেপ্টেম্বর কাজিপুর সীমান্তে দুই দফায় ২২ জন, এবং ১৯ সেপ্টেম্বর মুজিবনগর সীমান্তের স্বাধীনতা সড়কের ১০৫ নম্বর পিলারের কাছে এক শিশুসহ চারজন বাংলাদেশিকে হস্তান্তর করা হয়। ৬ সেপ্টেম্বর দারিয়াপুর সীমান্ত দিয়ে এক মা ও তার দুই মেয়েকে পুশইন করা হয়।

১৯ আগস্ট কাজিপুর সীমান্ত দিয়ে নারী ও শিশুসহ ৩৯ জন, ১৪ আগস্ট মুজিবনগর সীমান্ত দিয়ে ৯ জন, ১৩ আগস্ট এক পুরুষ ও তিন নারী এবং ১ আগস্ট চার শিশু ও পাঁচ নারীসহ ১৭ জন বাংলাদেশিকে ফেরত পাঠানো হয়।

এর আগেও ধারাবাহিকভাবে পুশইনের ঘটনা ঘটেছে। ২৯ জুলাই গাংনীর বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে ৭ জন নারীসহ ১৮ জন, জুন মাসে রংমহল সীমান্ত দিয়ে দুই দফায় ৮ জন, ১০ জুন আনন্দবাস সীমান্ত দিয়ে ১২ জন, ৪ মে ভবেরপাড়া সীমান্ত দিয়ে ১০ জন, ২৫ মে সোনাপুর সীমান্ত দিয়ে ১৯ জন এবং ২৭ মে সোনাপুর সীমান্তের ১০১ নম্বর পিলার দিয়ে আরও ৩০ বাংলাদেশিকে পুশইন করা হয়।

বছরের শুরুতে, ২৬ ফেব্রুয়ারি সোনাপুর মাঝপাড়া সীমান্ত দিয়ে ১৫ জনকে পুশইন করা হয়, যাদের অধিকাংশই কুড়িগ্রামের বাসিন্দা। এ ছাড়া চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী, পাবনা, লালমনিরহাট, কক্সবাজার, ফরিদপুর ও পিরোজপুর জেলার মানুষও এই তালিকায় রয়েছেন।

মেহেরপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম এন্ড অপস) জামিনুর রহমান খান কালবেলাকে বলেন, পুশইন হয়ে আসা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে বিজিবির পক্ষ থেকে স্থানীয় থানাতে মামলা দেওয়া হয়। থানা মামলাটি গ্রহণ করে, পরে যাচাই-বাছাই করে পুশইন হওয়া ব্যক্তিদের হস্তান্তর করা হয় তাদের দেশীয় অভিভাবকদের কাছে। তবে পুশইন হওয়া ব্যক্তিদের কেউ যদি ভারতীয় হয়ে থাকেন তাদেরকে কারাগারে পাঠানো হয়।

চুয়াডাঙ্গা-৬ বিজিবি ব্যাটালিয়নের পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল নাজমুল হাসান কালবেলাকে বলেন, আমরা বিজিবির পক্ষ থেকে বিএসএফকে প্রথমে মৌখিকভাবে এবং পরে পতাকা বৈঠকের মাধ্যমে স্পষ্টভাবে বলে দিয়েছি অবৈধ অভিবাসী ফেরত পাঠানোর ক্ষেত্রে ডিপ্লোম্যাটিক চ্যানেল ব্যবহার করতে। বিজিবির পক্ষ থেকে কোনো পুশইন বরদাস্ত করা হবে না। ডিপ্লোম্যাটিক চ্যানেল মেনে হস্তান্তর না করে বিএসএফ ভবিষ্যতে পুশইন করলে বিজিবির পক্ষ থেকে পুশব্যাক করা হবে। এ ছাড়াও সাম্প্রতিক সময়ে পুশইনের ঘটনা বেড়ে যাওয়াতে সীমান্তে নজরদারি ও টহল বাড়ানো হয়েছে।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow