মোদীর লোকজনই কি সেই রাম মন্দিরের ২০০ কোটি রুপি অনুদান আত্মসাৎ করেছেন?

ভারতের অযোধ্যায় নির্মিত রাম মন্দির ঘিরে নতুন এক বিতর্ক দেশটির রাজনীতিতে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। মন্দিরের দানবাক্স থেকে সংগৃহীত অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ এখন শুধু মন্দির ট্রাস্ট নয়, সরাসরি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, তার সরকার ও বিজেপির ভূমিকাকেও প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। বিরোধী দলগুলো বলছে, যে রাম মন্দিরকে বিজেপি বহু দশক ধরে নিজেদের রাজনৈতিক ও আদর্শিক প্রকল্প হিসেবে তুলে ধরেছে, সেখানে যদি অনুদান আত্মসাতের মতো ঘটনা ঘটে থাকে, তাহলে এর দায় এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ সরকারের নেই। কী অভিযোগ উঠেছে? অভিযোগ অনুযায়ী, অযোধ্যার রাম মন্দিরে ভক্তদের দেওয়া অনুদানের বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে। ভারতের পত্রিকা দৈনিক ভাস্কর-এর এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, অনিয়ম ও দুর্নীতির পরিমাণ প্রায় ২০০ কোটি রুপিতে পৌঁছাতে পারে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, মন্দিরের ৫০ জনেরও বেশি কর্মচারী অনুদানের অর্থ সরিয়ে নেওয়ার সঙ্গে জড়িত থাকতে পারেন। এই অভিযোগ প্রকাশ্যে আসার পর উত্তর প্রদেশ সরকার একটি বিশেষ তদন্ত দল (এসআইটি) গঠন করেছে। তবে বিরোধীদের অভিযোগ, শুধু এসআইটি গঠন করলেই দায় শেষ হয়ে যায় না। প্রকৃত প্রশ্ন হলো- এই ট্রাস্ট কে গঠন

মোদীর লোকজনই কি সেই রাম মন্দিরের ২০০ কোটি রুপি অনুদান আত্মসাৎ করেছেন?

ভারতের অযোধ্যায় নির্মিত রাম মন্দির ঘিরে নতুন এক বিতর্ক দেশটির রাজনীতিতে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। মন্দিরের দানবাক্স থেকে সংগৃহীত অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ এখন শুধু মন্দির ট্রাস্ট নয়, সরাসরি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, তার সরকার ও বিজেপির ভূমিকাকেও প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।

বিরোধী দলগুলো বলছে, যে রাম মন্দিরকে বিজেপি বহু দশক ধরে নিজেদের রাজনৈতিক ও আদর্শিক প্রকল্প হিসেবে তুলে ধরেছে, সেখানে যদি অনুদান আত্মসাতের মতো ঘটনা ঘটে থাকে, তাহলে এর দায় এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ সরকারের নেই।

কী অভিযোগ উঠেছে?

অভিযোগ অনুযায়ী, অযোধ্যার রাম মন্দিরে ভক্তদের দেওয়া অনুদানের বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে।

ভারতের পত্রিকা দৈনিক ভাস্কর-এর এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, অনিয়ম ও দুর্নীতির পরিমাণ প্রায় ২০০ কোটি রুপিতে পৌঁছাতে পারে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, মন্দিরের ৫০ জনেরও বেশি কর্মচারী অনুদানের অর্থ সরিয়ে নেওয়ার সঙ্গে জড়িত থাকতে পারেন।

এই অভিযোগ প্রকাশ্যে আসার পর উত্তর প্রদেশ সরকার একটি বিশেষ তদন্ত দল (এসআইটি) গঠন করেছে।

তবে বিরোধীদের অভিযোগ, শুধু এসআইটি গঠন করলেই দায় শেষ হয়ে যায় না। প্রকৃত প্রশ্ন হলো- এই ট্রাস্ট কে গঠন করেছে ও কারা এর তদারকি করেছে?

অখিলেশ যাদবের সরাসরি আক্রমণ

সমাজবাদী পার্টির প্রধান অখিলেশ যাদব সোমবার (১৫ জুন) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে উত্তর প্রদেশ সরকারের সমালোচনা করে লেখেন, বিজেপি শাসন দুর্নীতিগ্রস্ত বলেই রাজ্যে আইআইটি নয়, এসআইটি গঠন করতে হচ্ছে।

তিনি দাবি করেন, রাম মন্দিরের অর্থ আত্মসাতের বিষয়টি প্রথম তার দলই সামনে এনেছিল। অখিলেশ আরও কটাক্ষ করে বলেন, তদন্তে পুলিশের সহায়তা প্রয়োজন হলে তিনি প্রস্তুত আছেন, কারণ অভিযুক্তরা খুব দূরে নেই।

তার এই মন্তব্যকে অনেকেই মোদী সরকার ও বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্বের দিকে ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন।

কেন মোদীকে দায়ী করা হচ্ছে?

বিজেপি দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে এসেছে যে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অনুসারে একটি স্বাধীন ট্রাস্ট রাম মন্দির নির্মাণ করেছে। কিন্তু এখন সেই ট্রাস্টই যখন দুর্নীতির অভিযোগে ঘিরে গেছে, তখন বিরোধীরা প্রশ্ন তুলছে- ট্রাস্টটি আসলেই কতটা স্বাধীন ছিল?

২০২০ সালে ট্রাস্ট গঠনের সময় ভারতের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় (পিএমও) থেকে প্রকাশিত এক সরকারি বিজ্ঞপ্তিতে বারবার মোদীর ভূমিকা তুলে ধরা হয়েছিল। ৪০৪ শব্দের ওই বিজ্ঞপ্তিতে ‘প্রধানমন্ত্রী’ শব্দটি চারবার ও ‘পিএম’ শব্দটি নয়বার উল্লেখ করা হয়েছিল।

ট্রাস্টের নিজস্ব ওয়েবসাইট অনুযায়ী, মোদী সংসদে ট্রাস্ট গঠনের ঘোষণা দেওয়ার পর ১৫ সদস্যের মধ্যে ১২ জনকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছিল। আর ট্রাস্টের সদস্যদের নাম ঘোষণা করেছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ।

এই কারণেই বিরোধীরা বলছে, ট্রাস্টকে সম্পূর্ণ স্বাধীন বলে দায় এড়ানো সম্ভব নয়।

কংগ্রেসের অভিযোগ: ‘ভক্তির ওপর ডাকাতি’

ভারতের প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেস এই ঘটনাকে ‘বিশ্বাসের ওপর ডাকাতি’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। দলটি এক্সে লিখেছে, রাম মন্দিরের সঙ্গে কোটি কোটি ভক্তের ধর্মীয় অনুভূতি জড়িয়ে রয়েছে। বিজেপি ও আরএসএস-ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের কারণে সেই বিশ্বাসে আঘাত লেগেছে।

কংগ্রেসের ভাষায়, এটি শুধু আর্থিক কেলেঙ্কারি নয়, বরং মানুষের ধর্মীয় আস্থার ওপর হামলা।

এদিকে, আম আদমি পার্টির মুখপাত্র সঞ্জয় সিং বলেছেন, সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর ভারত সরকারই ট্রাস্ট গঠন করেছিল এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়েরও তদারকি ভূমিকা ছিল। তাই প্রধানমন্ত্রী মোদী কোনোভাবেই দায় এড়াতে পারেন না।

তিনি ট্রাস্টের বর্তমান কাঠামো ভেঙে দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। তার মতে, চম্পত রাইসহ ট্রাস্টের দায়িত্বশীলদের বিরুদ্ধে স্বাধীন তদন্ত হওয়া উচিত এবং বর্তমান ট্রাস্ট বিলুপ্ত করে নিরপেক্ষ ও সৎ ব্যক্তিদের নিয়ে নতুন ট্রাস্ট গঠন করা দরকার।

২০০ কোটি রুপির অভিযোগ কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?

বিশ্লেষকদের মতে, এই অভিযোগ সাধারণ কোনো দুর্নীতির ঘটনা নয়। রাম মন্দির প্রকল্পকে বিজেপি কয়েক দশক ধরে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করেছে। বাবরি মসজিদ-রামজন্মভূমি আন্দোলন বিজেপির উত্থানের অন্যতম প্রধান ভিত্তি ছিল।

দৈনিক ভাস্করের রাজনৈতিক সম্পাদক কে.পি. মালিক বলেছেন, যদি সত্যিই ২০০ কোটি রুপির অনিয়ম হয়ে থাকে, তাহলে সেটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক।

তার ভাষায়, এটি হিন্দুদের বিশ্বাসের ওপর সরাসরি আঘাত ও এর জন্য জবাবদিহি প্রয়োজন।

অনেকের মতে, নতুন ধরনের আক্রমণাত্মক হিন্দুত্ববাদী পরিচয়ের সবচেয়ে বড় প্রতীকই হলো রাম মন্দির। সেই প্রতীক যদি আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগে কলঙ্কিত হয়, তাহলে তা মোদী ও বিজেপির জন্য বড় রাজনৈতিক সমস্যায় পরিণত হতে পারে।

অযোধ্যায় শুরু হয়েছে রাজনৈতিক আন্দোলন

১৫ জুন কংগ্রেস নেতা শরদ শুকলা অযোধ্যা শহরে বিশাল একটি হোর্ডিং টানান। সেখানে রাম মন্দিরের দানবাক্সের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ তুলে ধরা হয় ও ধর্মীয় রীতিনীতি অনুযায়ী এর শাস্তির কথাও উল্লেখ করা হয়।

পরে পৌরকর্মীদের সেই পোস্টার সরিয়ে ফেলতে দেখা যায়।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, পোস্টারটি নামানোর পর পেছনে একটি বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপন প্রকাশ পায়।

বিরোধীরা অভিযোগ করেছে, দুর্নীতির অভিযোগ আড়াল করতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

পুরোনো হিন্দুত্ববাদীরাও ক্ষুব্ধ

সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, বিজেপি ও রাম মন্দির আন্দোলনের পুরোনো নেতারাও এখন প্রকাশ্যে ক্ষোভ দেখাতে শুরু করেছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত নাম বিনয় কাটিয়ার।

বাবরি মসজিদ ধ্বংস আন্দোলনের অন্যতম মুখ ও বজরং দলের প্রতিষ্ঠাতা কাটিয়ার সাংবাদিকদের বলেন, এরা সবাই চোর।

তিনি অভিযোগ করেন, রাম মন্দির প্রকল্পের নিয়ন্ত্রণ তার মতো পুরোনো নেতাদের কাছ থেকে সরিয়ে নেওয়ার পর যারা দায়িত্ব পেয়েছেন, তাদের সবাই দুর্নীতিতে জড়িত।

কাটিয়ার দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ করে আসছেন যে মোদী যুগে তাকে ও তার মতো পুরোনো হিন্দুত্ববাদী নেতাদের কোণঠাসা করা হয়েছে। এখন তিনি আবারও দাবি করছেন, বর্তমান নেতৃত্ব যে রাজনৈতিক অবস্থানে পৌঁছেছে, তার পেছনে তার মতো নেতাদের ত্যাগ রয়েছে।

২০২৭ সালের নির্বাচনে কী প্রভাব পড়তে পারে?

২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে অযোধ্যা অন্তর্ভুক্ত আসনে বিজেপির পরাজয় অনেককে বিস্মিত করেছিল। বিশ্লেষকদের মতে, নতুন এই বিতর্ক ২০২৭ সালের উত্তর প্রদেশ বিধানসভা নির্বাচনের আগে বিজেপির জন্য আরও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।

সমাজবাদী পার্টির ‘পিডিএ’ (পিছিয়ে পড়া শ্রেণি, দলিত ও আদিবাসী) সামাজিক সমীকরণ ও কংগ্রেসের সঙ্গে সম্ভাব্য জোট বিজেপির জন্য কঠিন পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।

এই অবস্থায় রাম মন্দিরের অনুদান কেলেঙ্কারি শুধু একটি আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ নয়; এটি বিজেপির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক প্রতীক, হিন্দুত্ববাদী ভোটব্যাংক ও মোদীর ব্যক্তিগত ভাবমূর্তিকেও সরাসরি চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করিয়েছে।

সূত্র: দ্য ওয়্যার

এসএএইচ

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow