মোস্তাফিজ ‘ওয়ান’ পিস !
একজন খেলোয়াড় তার দেশকে কোথায় নিয়ে যেতে পারেন? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে খুব বেশি গবেষণার প্রয়োজন নেই। পেলে-ম্যারাডোনা, ব্র্যাডম্যান-শচীন, বোল্ট-ফেলপস, সেরেনা-শারাপোভা কিংবা হালের মেসি-রোনালদোর দিকে তাকালেই মিলে যায় উত্তর। ক্রীড়াঙ্গনে তাদের অতিমানবীয়-অবিস্বরণীয় কীর্তির সৌজন্যে বিশ্বমঞ্চে সুমহান মর্যাদা আর স্বগৌরবে দাড়িয়ে আছে তাদের নিজ নিজ দেশও। খেলার মাঠে শুধুমাত্র পারফরম্যান্স করেই যে একজন খেলোয়াড় তার দেশকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারেন এই মুহুর্তে বাংলাদেশের মোস্তাফিজুর রহমানও তার ঝলমলে উদাহরণ। আজ বাদে কাল থেকে শুরু হবে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ। এমন মুহুর্তের উত্তাপ ছড়িয়ে পড়ে গোটা ক্রিকেট দুনিয়ায়। অথচ, এবার সেই উত্তাপটা যেন কোথায় নেই। বরং টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ নিয়ে এখনও এলোমেলো খোদ এর নিয়ন্ত্রক সংস্থা আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল। বাংলাদেশ বিশ্বকাপ বয়কট করার পর তাদের সমর্থন জানিয়ে গ্রুপ পর্বে ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ বয়কট করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে পাকিস্তানও। তাতেই ক্রিকেটের এই সংক্ষিপ্ত সংস্করণের দশম আয়োজন নিয়ে হযবরল...। এবারের বিশ্বকাপ আয়োজন নিয়ে রীতিমতো দিশেহারা হয়ে পড়েছে আইসিসি। বাংলাদেশের
একজন খেলোয়াড় তার দেশকে কোথায় নিয়ে যেতে পারেন? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে খুব বেশি গবেষণার প্রয়োজন নেই। পেলে-ম্যারাডোনা, ব্র্যাডম্যান-শচীন, বোল্ট-ফেলপস, সেরেনা-শারাপোভা কিংবা হালের মেসি-রোনালদোর দিকে তাকালেই মিলে যায় উত্তর। ক্রীড়াঙ্গনে তাদের অতিমানবীয়-অবিস্বরণীয় কীর্তির সৌজন্যে বিশ্বমঞ্চে সুমহান মর্যাদা আর স্বগৌরবে দাড়িয়ে আছে তাদের নিজ নিজ দেশও। খেলার মাঠে শুধুমাত্র পারফরম্যান্স করেই যে একজন খেলোয়াড় তার দেশকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারেন এই মুহুর্তে বাংলাদেশের মোস্তাফিজুর রহমানও তার ঝলমলে উদাহরণ।
আজ বাদে কাল থেকে শুরু হবে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ। এমন মুহুর্তের উত্তাপ ছড়িয়ে পড়ে গোটা ক্রিকেট দুনিয়ায়। অথচ, এবার সেই উত্তাপটা যেন কোথায় নেই। বরং টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ নিয়ে এখনও এলোমেলো খোদ এর নিয়ন্ত্রক সংস্থা আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল। বাংলাদেশ বিশ্বকাপ বয়কট করার পর তাদের সমর্থন জানিয়ে গ্রুপ পর্বে ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ বয়কট করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে পাকিস্তানও। তাতেই ক্রিকেটের এই সংক্ষিপ্ত সংস্করণের দশম আয়োজন নিয়ে হযবরল...। এবারের বিশ্বকাপ আয়োজন নিয়ে রীতিমতো দিশেহারা হয়ে পড়েছে আইসিসি। বাংলাদেশের ‘এক’ সিদ্ধান্তেই ক্ষতির মুখে আইসিসির ৬ হাজার কোটি টাকা।
টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের আগে এই যে সংকট তৈরি হয়েছে তার সূত্রপাত মোস্তাফিজুর রহমানকে নিয়ে। ক্রিকেট বিশ্বের ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ এবং মাঠের খেলার উত্তেজনা যখন এক বিন্দুতে মিলিত হয়, তখন তার প্রভাব কতটা সুদূরপ্রসারী হতে পারে, তার এক জ্বলন্ত উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘মোস্তাফিজ ইস্যু’। আইপিএলের ফ্র্যাঞ্চাইজি কলকাতা নাইট রাইডার্স থেকে মোস্তাফিজুর রহমানকে ছেড়ে দেওয়ার ঘটনাটি পরবর্তীতে কেবল একজন খেলোয়াড়ের দলছুট হওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। এই ঘটনা রূপ নেয় এক আন্তর্জাতিক ক্রিকেটীয় সংকটে, যার প্রভাবে ৬ হাজার কোটি টাকারও বেশি আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছে বিশ্ব ক্রিকেটের নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইসিসি এবং ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড।
এবারের আইপিএল নিলামে ৯ কোটি ২০ লাখ রুপির মোটা অঙ্কের বিনিময়ে মোস্তাফিজকে দলে ভিড়িয়েছিল কলকাতা। তবে পরবর্তীতে রাজনৈতিক চাপের মুখে তাঁকে দল থেকে রিলিজ করে দেয় ফ্র্যাঞ্চাইজিটি। এই সিদ্ধান্তে সরাসরি ৯ কোটি ২০ লাখ রুপির আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হন মোস্তাফিজ। তবে ব্যক্তিগত এই লোকসান ছাপিয়ে বড় হয়ে ওঠে দুই দেশের ক্রিকেটীয় ও কূটনৈতিক সম্পর্ক। ভারতের এমন একপাক্ষিক সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে কড়া অবস্থান নেয় বাংলাদেশ। যার চূড়ান্ত পরিণতি হিসেবে ভারত ও শ্রীলঙ্কায় অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া আসন্ন টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ বয়কটের ঘোষণা দেয় বাংলাদেশ সরকার।
বাংলাদেশের এই প্রতিবাদী অবস্থানে সংহতি প্রকাশ করে পাকিস্তানও। প্রাথমিকভাবে পাকিস্তান পুরো বিশ্বকাপ বয়কটের হুমকি দিলেও পরবর্তীতে কৌশলগত অবস্থান পরিবর্তন করে তারা। পিসিবি জানায়, তারা টুর্নামেন্টে অংশ নিলেও ভারতের বিপক্ষে বহুল প্রতীক্ষিত হাই-ভোল্টেজ ম্যাচটি বয়কট করবে। ক্রিকেট বিশ্বের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক আকর্ষণ হলো ভারত-পাকিস্তান দ্বৈরথ। এই ম্যাচটি বাতিল হওয়া মানেই বিশ্ব ক্রিকেটের ‘রেভিনিউ মডেলে’ ধস নামা। কেননা, ভারত-পাকিস্তান ম্যাচের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা বিশাল ইকোনমি এখন খাদের কিনারে। সুনির্দিষ্ট গাণিতিক হিসাব না থাকলেও মার্কেট ভ্যালু এবং বিজ্ঞাপন বাজার বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সম্প্রচার স্বত্ব, স্পনসরশিপ এবং টিকিটের আয় মিলিয়ে এই একটি ম্যাচের বাণিজ্যিক মূল্য প্রায় ৫০ কোটি মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ৬,১২০ কোটি টাকারও বেশি।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটি’র প্রতিবেদন বলছে, এই হাই-প্রোফাইল ম্যাচে প্রতি ১০ সেকেন্ডের বিজ্ঞাপনের স্লট বিক্রি হয় ২৫ থেকে ৪০ লাখ রুপিতে। ম্যাচটি না হলে সরাসরি ক্ষতির মুখে পড়বে ব্রডকাস্টার প্রতিষ্ঠানগুলো, যারা বিলিয়ন ডলার খরচ করে আইসিসি-র কাছ থেকে স্বত্ব কেনে। ধারণা করা হয়, কেবল বিজ্ঞাপনের মাধ্যমেই একটি ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ থেকে প্রায় ৩০০ কোটি রুপি আয় হয়। বিশ্বকাপের অফিশিয়াল ব্রডকাস্টার জিওস্টার ইতোমধ্যেই ব্যাপক লোকসানের আশঙ্কায় আইসিসি’র কাছে অর্থ ফেরতের দাবি তুলেছে। বাংলাদেশের অনুপস্থিতি এবং পাকিস্তানের ভারত ম্যাচ বয়কটের সিদ্ধান্তে আইসিসি’র ওপর এই চাপ এখন বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশ্বকাপের প্রতিটি ম্যাচের অভ্যন্তরীণ মূল্য যেখানে প্রায় ১৩৮.৭ কোটি রুপি, সেখানে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মতো শক্তিশালী বাজার হারানো আইসিসি’র জন্য এক বাণিজ্যিক আত্মহত্যা হিসেবে গণ্য হচ্ছে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মোস্তাফিজকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া এই পরিস্থিতি আইসিসি’র জন্য এক বড় শিক্ষা। ক্রিকেটের বিশ্বায়ন ও বাণিজ্যিক সাফল্য বজায় রাখতে হলে কোনো নির্দিষ্ট দেশের রাজনৈতিক প্রভাবের ঊর্ধ্বে উঠে সিদ্ধান্ত নেওয়াটা তাই জরুরি। যদিওবা বিশ্বকাপ সফল করার জন্য শেষ মুহুর্তে সবরকমের চেষ্টা চালাচ্ছে আইসিসি। ইতোমধ্যেই আইসিসি পাকিস্তানকে এমন সিদ্ধান্ত আবারো ভেবে দেখার অনুরোধ করেছে। এমনকি নিজ উদ্যোগে পাকিস্তান বোর্ডের সঙ্গে আলোচনাও শুরু করেছে ক্রিকেটের এই শীর্ষ সংগঠন। এরই মধ্যে আইসিসি চেয়ারম্যান জয় শাহর ডেপুটি-চেয়ারম্যান ইমরান খাজাকে দায়িত্বও দেওয়া হয়েছে পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের সঙ্গে কথা বলার। তিনি সিঙ্গাপুর ক্রিকেট সংস্থার প্রতিনিধি। তার দায়িত্ব থাকছে, যেভাবেই হোক পাকিস্তানকে ভারত ম্যাচে খেলার জন্য রাজি করানো। ‘রেভস্পোর্টসের’ এক প্রতিবেদনে
এমনটাই বলা হয়েছে।
তবে পাকিস্তান তাদের সিদ্ধান্তে অনড়। আগেই বয়কট করার কথা বলা পাকিস্তান সরকার বুধবার তো ইসলামাবাদে মন্ত্রিসভার সদস্যদের সামনেও সুষ্পষ্ঠ করেছেন নিজেদের অবস্থান। প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ বলেন, ‘টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপ নিয়ে আমরা খুব পরিষ্কার অবস্থান নিয়েছি—আমরা ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ খেলব না। কারণ, খেলার মাঠে কোনো রাজনীতি থাকা উচিত নয়। আমরা খুব ভেবেচিন্তে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আমাদের পুরোপুরি বাংলাদেশের পাশে দাঁড়ানো উচিত। আমি মনে করি, এটি খুবই উপযুক্ত সিদ্ধান্ত।’পরে বৃহস্পতিবার বিশ্বকাপ শুরুর মাত্র একদিন আগে অধিনায়কদের কার্নিভালে বাংলাদেশের পাশে দাড়িয়েছেন পাকিস্তানের অধিনায়কও। সালমান আঘা বলেন, ‘বাংলাদেশিরা আমাদের ভাই, পাকিস্তানের প্রতি তাদের সমর্থনের জন্য আমরা কৃতজ্ঞ। এটা দুঃখজনক যে তারা বিশ্বকাপে খেলছে না।’
পাকিস্তানের বিপক্ষে টি-টোয়েন্টি, ভারতের সঙ্গে ওয়ানডে আর দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে টেস্ট—ক্রিকেটের তিন সংস্করণের আন্তর্জাতিক অভিষেককেই অসাধারণ সাফল্যে রাঙিয়েছিলেন মোস্তাফিজুর রহমান। শুরুর সেই চমকপ্রদ সাফল্য আজও চলছে তার আপন মহিমায়। জাতীয় দলের বাইরে বিশ্ব ক্রিকেটের শ্রেষ্ঠ ফ্রেঞ্চাইজি লিগেও নিজেকে মেলে ধরেছেন স্বগৌরবে। আইপিএল, কাউন্টি দল সাসেক্স, পিএসএল কিংবা বিপিএল। মোস্তাফিজ যেখানেই পা বাড়িয়েছেন সেখানেই পেয়েছেন সাফল্যের দেখা। চেনা পরিবেশে জ্বলে উঠার স্বভাবজাত বৈশিষ্ঠ ‘দ্য ফিজ’ অচেনা মাঠে নামলেও হয়ে উঠেন অন্যরকম। মাঠের বাইরের কিছুই যেন তাকে স্পর্শ করে না। সেরাটা দিতে হবে, এই ব্রত নিয়েই মাঠে নামেন তিনি। প্রতিপক্ষ দলের ব্যাটারদের কাটারের মায়াবী বিভ্রম ছড়িয়ে লাগামটা টেনে ধরেন দারুণভাবে।
শুরুতে সহজ সরল থাকলেও মোস্তাফিজুর রহমান যেন এখন ‘পাকা খেলোয়াড়’। তার ইস্যুতেই যখন আইসিসি থেকে শুরু করে এশিয়ার তিন পরাশক্তি ভারত-পাকিস্তান-শ্রীলঙ্কার পর স্কটল্যান্ড এমনকি ‘সিলেবাসের’ একদম বাইরে থাকা উগান্ডাতেও বইছে উত্তপ্ত হাওয়া। তখন মোস্তাফিজ কিন্তু একেবারেই নীরব, শান্ত। যাকে নিয়ে এত শোরগোল, ক্রিকেট কূটনীতি থেকে শুরু করে আঞ্চলিক রাজনীতিতেও রীতিমতো ঝড় বয়ে যাচ্ছে, সেই মোস্তাফিজুর রহমানের মুখ থেকে একটা শব্দও বের হয়নি এ ঘটনা নিয়ে। পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো, অনুশীলন আর ম্যাচ—তাকে পাওয়া গেছে কেবল এসবেই। মোস্তাফিজ যতই নিভৃতে থাকতে চান, তাকে বারবার সামনে নিয়ে এসেছে পারফরম্যান্সই।
আইপিএল থেকে বাদ দেওয়ার পর গতকাল বৃহস্পতিবার আবার একই সময়ে শুরু হতে যাওয়া পিএসএলে দলও পেয়ে গেছেন মোস্তাফিজুর রহমান। তাও আবার রেকর্ড সাড়ে ৬ কোটি রুপিতে। তারপরও কোন রকমের প্রতিক্রিয়া নেই। এখানেও মোস্তাফিজ যেন আ্ইডল। তাই তো তার কাছ থেকে শেখার চেষ্টা করেন খোদ সালাউদ্দীনের মতো কোচ। অদম্য টি-টোয়েন্টি কাপ টুর্নামেন্ট শুরুর আগের দিন তো সাফ জানিয়েই দিয়েছেন ধুমকেতুর এই কোচ, ‘আমার মনে হয়, মোস্তাফিজের কাছ থেকে এটা ভালো জিনিস শেখার মতো। এতগুলো টাকা বলেন বা যা–ই বলেন—ও তো হতাশায় ভুগতে পারত। কিন্তু সে জানে যে এটা আসলে নিয়ন্ত্রণে নেই। তার হাতে তো ছিল না। মোস্তাফিজের কাছ থেকে আমি এটা শিখেছি এবং অন্যরাও হয়তো এটা থেকে শিখবে।’
এসবই প্রমাণ করে সাতক্ষীরার সেই বিষ্ময় বালক এখন বিশ্ব ক্রিকেটেই ‘ওয়ান’ পিস। বাংলাদেশের ক্রিকেটের অন্যতম প্রধান মহিরুহ।
What's Your Reaction?