ম্যারাডোনা-মেসি এক সুতোয় গাঁথা

ইতিহাসের চাকা যেন ঘুরল দীর্ঘ ৪০ বছর পর। ১৯৮৬ সালে মেক্সিকোর মাটিতে ইংল্যান্ডকে চূর্ণ করে আর্জেন্টিনাকে বিশ্বকাপের ফাইনালে তোলার রূপকার ছিলেন দিয়েগো আরমান্দো ম্যারাডোনা। ২০২৬ সালে এসে উত্তর আমেরিকার মাটিতে সেই ইংল্যান্ডকেই কাঁদিয়ে আলবিসেলেস্তেদের টানা দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের ফাইনালে তুললেন লিওনেল মেসি। সময়ের ব্যবধান চার দশকের হলেও, চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী থ্রি লায়ন্সদের বিপক্ষে মহাকাব্যিক লড়াইয়ের প্রেক্ষাপট যেন একই সুতোয় গেঁথে দিল আর্জেন্টিনার এই দুই ফুটবল ঈশ্বরকে। ম্যারাডোনার সেই বিখ্যাত ২-১ ব্যবধানের জয়কেই যেন গত রাতে আটলান্টায় ফিরিয়ে আনলেন ৩৯ বছর বয়সী মেসি। আর এর মাধ্যমেই আবারও প্রমাণিত হলো- নাম ম্যারাডোনা হোক কিংবা মেসি, আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাস আসলে এক অনন্য গৌরবের সুতোয় গাঁথা। ম্যারাডোনার ছায়া ও ফকল্যান্ডের আবহ ম্যাচের আগে থেকেই আটলান্টার বাতাসে ছিল চরম উত্তেজনা। ১৯৮২ সালের ফকল্যান্ড যুদ্ধের রাজনৈতিক বৈরিতা এবং ১৯৮৬ বিশ্বকাপে ম্যারাডোনার সেই কিংবদন্তিতুল্য পারফরম্যান্সের স্মৃতি উসকে দিয়ে ম্যাচটি রূপ নিয়েছিল এক মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধে। প্রথমার্ধে ফুটবলের চেয়ে মাঠের ফাউল আর শারীরিক শ

ম্যারাডোনা-মেসি এক সুতোয় গাঁথা
ইতিহাসের চাকা যেন ঘুরল দীর্ঘ ৪০ বছর পর। ১৯৮৬ সালে মেক্সিকোর মাটিতে ইংল্যান্ডকে চূর্ণ করে আর্জেন্টিনাকে বিশ্বকাপের ফাইনালে তোলার রূপকার ছিলেন দিয়েগো আরমান্দো ম্যারাডোনা। ২০২৬ সালে এসে উত্তর আমেরিকার মাটিতে সেই ইংল্যান্ডকেই কাঁদিয়ে আলবিসেলেস্তেদের টানা দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের ফাইনালে তুললেন লিওনেল মেসি। সময়ের ব্যবধান চার দশকের হলেও, চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী থ্রি লায়ন্সদের বিপক্ষে মহাকাব্যিক লড়াইয়ের প্রেক্ষাপট যেন একই সুতোয় গেঁথে দিল আর্জেন্টিনার এই দুই ফুটবল ঈশ্বরকে। ম্যারাডোনার সেই বিখ্যাত ২-১ ব্যবধানের জয়কেই যেন গত রাতে আটলান্টায় ফিরিয়ে আনলেন ৩৯ বছর বয়সী মেসি। আর এর মাধ্যমেই আবারও প্রমাণিত হলো- নাম ম্যারাডোনা হোক কিংবা মেসি, আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাস আসলে এক অনন্য গৌরবের সুতোয় গাঁথা। ম্যারাডোনার ছায়া ও ফকল্যান্ডের আবহ ম্যাচের আগে থেকেই আটলান্টার বাতাসে ছিল চরম উত্তেজনা। ১৯৮২ সালের ফকল্যান্ড যুদ্ধের রাজনৈতিক বৈরিতা এবং ১৯৮৬ বিশ্বকাপে ম্যারাডোনার সেই কিংবদন্তিতুল্য পারফরম্যান্সের স্মৃতি উসকে দিয়ে ম্যাচটি রূপ নিয়েছিল এক মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধে। প্রথমার্ধে ফুটবলের চেয়ে মাঠের ফাউল আর শারীরিক শক্তির প্রদর্শনীই বেশি দেখা গেছে, যা দর্শকদের মনে করিয়ে দিচ্ছিল সেই পুরোনো বৈরিতার কথা। ১৯৮৬ সালের কোয়ার্টার ফাইনালে ম্যারাডোনার সেই ‘হ্যান্ড অব গড’ এবং পাঁচ ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে করা ‘শতাব্দীর সেরা গোল’ যেমন ইংল্যান্ডকে স্তব্ধ করেছিল, ২০২৬-এর সেমিফাইনালে মেসিও তৈরি করলেন এক নতুন রূপকথা। ইংলিশদের বিপক্ষে মেসির প্রথম ও ঐতিহাসিক ম্যাচ আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের দীর্ঘ পথ চলায় এবারই প্রথম বিশ্বকাপের মঞ্চে ইংল্যান্ডের মুখোমুখি হয়েছিলেন লিওনেল মেসি। এর আগে ২০০৫ সালে লাল কার্ডের নিষেধাজ্ঞার কারণে ইংলিশদের বিপক্ষে খেলা হয়নি তার। ৩৯ বছর বয়সে এসে ক্যারিয়ারের সায়াহ্নে দাঁড়িয়ে যখন প্রত্যাশার পাহাড়, ঠিক তখনই জ্বলে উঠলেন এই জাদুকর। নিজে গোল না পেলেও দলের দুটি গোলেরই উৎস ছিলেন তিনি। ১৯৬৬ সাল থেকে বিশ্বকাপের পরিসংখ্যান রাখা শুরু হওয়ার পর মেসিই প্রথম ফুটবলার, যিনি বিশ্বকাপের কোনো নকআউট ম্যাচে ৯টি সফল ড্রিবলিংয়ের পাশাপাশি ২টি গোল তৈরি করেছেন। জয়ের পর মাঠেই হাঁটু মুড়ে বসা মেসির সেই আবেগঘন উদ্যাপন কোটি ভক্তের হৃদয়ে ম্যারাডোনার স্মৃতিকেই মনে করিয়ে দেয়। ম্যাচের প্রথমার্ধ গোলশূন্য থাকার পর বিরতির ঠিক পরপরই ৫৫ মিনিটে মর্গান রজার্সের ক্রস থেকে গোল করে ইংল্যান্ডকে এগিয়ে দেন অ্যান্থনি গর্ডন। ১৯৬৬ সালের পর প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠার স্বপ্ন দেখতে শুরু করে টমাস টুখেলের শিষ্যরা। পিছিয়ে পড়ার পর চারজন সেন্ট্রাল ডিফেন্ডার নিয়ে রক্ষণভাগ নিরেট করে ফেলেছিল ইংল্যান্ড। কিন্তু শেষ বাঁশি বাজার আগে হাল না ছাড়ার অদম্য মানসিকতা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে আর্জেন্টিনা। ম্যাচের শেষ দিকে উইং ব্যবহার করে ইংলিশ ডিফেন্স ভেঙে ফেলেন মেসিরা। ৮৫ মিনিটে লিওনেল মেসির নিখুঁত পাস থেকে বক্সের বাইরে থেকে এক দুর্দান্ত শটে গোল করে আর্জেন্টিনাকে সমতায় ফেরান এনজো ফার্নান্দেজ। অতিরিক্ত সময়ে (৯০+২ মিনিট) মেসির করা নিখুঁত ক্রস থেকে দুর্দান্ত হেডে জয়সূচক গোলটি করেন বদলি হিসেবে নামা লাওতারো মার্তিনেজ। ইংল্যান্ডকে ২-১ গোলে হারিয়ে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা এখন ফাইনালে। নিউ জার্সিতে আগামী রোববার রাতে শিরোপার লড়াইয়ে মেসিদের প্রতিপক্ষ ইউরোপের পরাশক্তি স্পেন। এই জয়ের ফলে ইতিহাসের তৃতীয় দল হিসেবে টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপ জয়ের সোনালী সুযোগ এখন আর্জেন্টিনার সামনে। ১৯৮৬ সালে ইংল্যান্ডকে হারিয়ে ম্যারাডোনা আর্জেন্টিনাকে এনে দিয়েছিলেন বিশ্বকাপ। আর ২০২৬-এ এসে সেই ইংল্যান্ডকে বিদায় করে মেসি দলকে নিয়ে গেলেন ফাইনালে। ফুটবল বিশ্ব তাই আজ অকপটে স্বীকার করছে- যুগ কেটে গেলেও আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাসে ম্যারাডোনা ও মেসি আসলে একই সুতোয় গাঁথা দুই মহানায়ক।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow