ময়মনসিংহ অঞ্চলে শিশুদের মধ্যে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে অত্যন্ত সংক্রামক রোগ হাম (মিজলস)। উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া শিশুদের নমুনা পরীক্ষায় ইতোমধ্যেই হামের উপস্থিতি নিশ্চিত হয়েছে। শুধু ময়মনসিংহ বিভাগ নয়, আশপাশের বিভিন্ন জেলা থেকেও আক্রান্ত শিশুদের ভর্তি করা হচ্ছে হাসপাতালে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তিনটি পৃথক মেডিকেল টিম গঠন করেছে এবং চালু করেছে বিশেষ ‘হাম/মিজলস কর্ণার’। ২৪ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত ১০৬ জন শিশু হাম আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। বর্তমানে তিনটি ওয়ার্ডে ৬৬ জন শিশু চিকিৎসাধীন রয়েছে।
এই হাসপাতালে ময়মনসিংহ জেলা ছাড়াও শেরপুর, জামালপুর, নেত্রকোনা, টাঙ্গাইল, কুড়িগ্রাম, কিশোরগঞ্জ ও গাজীপুরের কিছু অংশ থেকে রোগী ভর্তি করা হয়।
এর মধ্যে পাঁচ শিশুর মৃত্যু হয়েছে যার মধ্যে রয়েছে— ওয়াজকুরুনী (৪), তনুসা (৩), সামিয়া (২), নুরুন্নবী (৬), লিয়ন(৭)।
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মার্চের মাঝামাঝি থেকে হামের রোগী বাড়তে শুরু করে, সাথে বাড়ছে মৃত্যুর সংখ্যাও। শিশু ওয়ার্ডে তিনটি পৃথক কক্ষ হাম আক্রান্তদের জন্য নির্ধারণ করা হলেও রোগীর চাপ এত বেশি যে সেখানে পর্যাপ্ত জায়গা হচ্ছে না। ১০ শয্যার কক্ষে ২-৩ জন করে রোগীকে একই বিছানায় চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। ফলে অনেক ক্ষেত্রে অন্যান্য রোগীর সঙ্গেও হাম আক্রান্ত শিশুদের রাখতে হচ্ছে।
অভিভাবকদের উদ্বেগ ওয়ার্ডে দেখা যায়, জামালপুর সদর থেকে আসা ৬ মাস বয়সী রিমা আক্তারকে নিয়ে উদ্বিগ্ন মা জান্নাত আক্তার বসে আছেন। তিনি জানান, ঈদের আগে থেকে জ্বর থাকলেও স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়নি। জন্মের পর কিছু টিকা দিলেও পরবর্তী টিকাগুলো দেওয়া হয়নি।
নেত্রকোনার মদন থেকে আসা আমেনা খাতুন বলেন, তার ১০ মাস বয়সী মেয়ে আগে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত ছিল। পরে বাড়ি নেওয়ার পর হাম দেখা দেয়। তিন যাবত মেয়েকে নিয়ে হাসপাতালে আছি।
কুড়িগ্রাম জেলার রৌমারীর আনোয়ারা বেগম জানান, তার সন্তানের সব টিকা দেওয়া হয়েছে, তবুও হাম রোগে আক্রান্ত হয়েছে।
কিশোরগঞ্জের ইটনা থেকে আসা এক দম্পতি জানান, নির্ধারিত সময়ে হামের টিকা না দেওয়ার কারণে তাদের জমজ দুই সন্তান আক্রান্ত হয়েছে।
জটিলতা ও ঝুঁকি চিকিৎসকদের মতে, হাম একটি অত্যন্ত ছোঁয়াচে ভাইরাসজনিত রোগ। আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি-কাশি বা সরাসরি সংস্পর্শের মাধ্যমে এটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
হামের জটিলতায় নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, অপুষ্টি জনিত রোগ ও চোখ মস্তিষ্কে প্রদাহসহ মারাত্মক সমস্যা দেখা দিতে পারে, যা শিশুদের মৃত্যুঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।
ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা যায়, হাসপাতালের ৩০ ও ৩১ নম্বর ওয়ার্ডে শয্যা, মেঝে ও বারান্দা—সব জায়গাতেই রোগীর ভিড়। ৬০ শয্যার বিপরীতে এখানে প্রায় ৪০০-৫০০ রোগী ভর্তি থাকে বলে জানান চিকিৎসকরা।
শিশু বিভাগের সহকারী রেজিস্ট্রার ডা. মাজহারুল আমিন বলেন, হামের টিকা নিয়েছে এবং নেয়নি দুই ধরনের রোগীই আমরা পাচ্ছি। এখন পর্যন্ত কোনো রোগীকে আইসিইউতে পাঠানোর মতো পরিস্থিতি হয়নি। কয়েকমাস ধরে এক-দুজন রোগী পাওয়া গেলেও এ মাসেই বেশি রোগী পাওয়া যাচ্ছে। তিনটি পৃথক কর্ণার করা হলেও সেখানে রোগী না ধরায় হাম আক্রান্ত রোগীদের শতভাগ আইসোলেশনে রাখা যাচ্ছে না। এ ছাড়া অন্য রোগীদেরও চাপ রয়েছে।
শিশু বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ডা. অধ্যাপক আক্তারুজ্জামান বলেন, হাম আক্রান্ত রোগীদের আলাদা করে রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে রোগীর চাপের কারণে শতভাগ আইসোলেশন সম্ভব হচ্ছে না।
তিনি আরও জানান, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) প্রতিনিধি দল হাসপাতালে এসে নিয়মিত নমুনা সংগ্রহ করছে। তবে হঠাৎ করে সংক্রমণ বৃদ্ধির সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো নিশ্চিত নয়, যদিও টিকাদানে ঘাটতি একটি বড় কারণ হতে পারে। আক্রান্ত রোগী থেকে অন্যদের দূরে রাখতে হবে ও সাবধানে থাকতে হবে। এই রোগটি অত্যন্ত ছোঁয়াছে।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন), ময়মনসিংহ মহানগর শাখার সম্পাদক আলী ইউসুফ বলেন, দীর্ঘদিন পর হঠাৎ করে হাম রোগের প্রকোপ বেড়ে গেছে, ফলে শিশুমৃত্যুও বৃদ্ধি পাচ্ছে। তিনি উল্লেখ করেন, গত ডিসেম্বর মাসে সারাদেশে হামের টিকার ঘাটতি দেখা দেয়। সময়মতো শিশুদের টিকা প্রদান না হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে।
তিনি আরও বলেন, হামে আক্রান্ত হওয়া ও শিশু মৃত্যুর পেছনে স্বাস্থ্য বিভাগের দায় রয়েছে এবং এ দায়ভার তাদেরকেই নিতে হবে।
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) মোহাম্মদ মাইনউদ্দিন খান বলেন, হাম আক্রান্ত রোগী হঠাৎ করে বেড়েছে আগে এ ধরণের রোগী এতো বেশি দেখা যায়নি। ধারণা করা হচ্ছে করোনা পরিস্থিতি ও ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে স্বাস্থ্য সহকারীরাও আন্দোলনের কারণে টিকাদান সঠিকভাবে না হওয়ায় এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। সারা দেশেই হামের প্রকোপ বেড়েছে। টিকা সঠিকভাবে হলে হাসপাতালে রোগী দেখা যেতে না।
তিনি আরও বলেন, আমরা তিনটি আলাদা কর্ণার চালু করেছি, যাতে সাধারণ রোগীদের সংস্পর্শে না যায়। প্রকোপ ধীরে ধীরে কমে আসুক আমরা সেটা চাই। ব্যাপকভাবে হলে আমাদের জায়গা না থাকলেও আইসোলেশনের জায়গাটি বাড়ানো হবে।
ময়মনসিংহ বিভাগের পরিচালক (স্বাস্থ্য) ডা. প্রদীপ কুমার সাহা বলেন, জেলার ১৩টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আলাদা বেডের ব্যবস্থা করা হয়েছে। বহির্বিভাগে শিশুদের জন্য ডেডিকেটেড ফেভার ক্লিনিক চালুর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী—শিশুদের সময়মতো টিকা দিতে হবে। হাম রোগে আক্রান্তদের আলাদা রাখতে হবে। হাঁচি-কাশির সময় সতর্কতা মানতে হবে। তবে ডিসেম্বর মাসে সারাদেশে হামের টিকার ঘাটতি দেখা দেয়। পরবর্তীতে জানুয়ারি মাসে সেই ঘাটতি পূরণ করা হয়।