যে দল ভেঙে গড়েছিলেন তৃণমূল, এখন সেই কংগ্রেসেই ফিরতে চান মমতা?

২৮ বছর আগে ভারতের সবচেয়ে পুরোনো রাজনৈতিক দল ভারতীয় কংগ্রেসের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে নিজের দল তৃণমূল কংগ্রেস (TMC) গড়েছিলেন পশ্চিমবঙ্গের ‘অগ্নিকন্যা’ মমতা ব্যানার্জী। রাজনীতির নিষ্ঠুর খেলায় মমতার সেই তৃণমূলেই আজ ভাঙনের সুর। দলের একের পর এক শীর্ষ নেতা হাত মেলাচ্ছেন কট্টর হিন্দুত্ববাদী বিজেপি শিবিরের সঙ্গে। অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে খোদ মমতার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ। এ অবস্থায় হঠাৎ গুঞ্জন উঠেছে- তবে কি আবার পুরোনো ঠিকানায় ফিরবেন মমতা ব্যানার্জী? রাজনীতির ক্যারিয়ার বাঁচাতে আবারও কংগ্রেসেই ফেরত যাবেন তৃণমূল সুপ্রিমো? দিল্লির বুকে কংগ্রেসের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে মমতা ব্যানার্জী ও অভিষেক ব্যানার্জীর দফায় দফায় রুদ্ধদ্বার বৈঠক এই জল্পনার আগুনে ঘি ঢেলেছে, যা ভারতের জাতীয় রাজনীতিতে এক বিশাল ভূকম্পনের আভাস দিচ্ছে। দিল্লির রুদ্ধদ্বার বৈঠক ও তীব্র জল্পনা ঘটনার সূত্রপাত গত মঙ্গলবার (৯ জুন) দিল্লিতে কংগ্রেস সংসদীয় দলের সভানেত্রী সোনিয়া গান্ধীর বাসভবনে মমতা ব্যানার্জীর দীর্ঘ বৈঠককে কেন্দ্র করে। তার পরদিনই সর্বভারতীয় তৃণমূলের সাধারণ সম্পাদক অভিষেক ব্যানার্জী কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীর সঙ্গে প্রায় দেড় ঘণ্টা বৈঠক ক

যে দল ভেঙে গড়েছিলেন তৃণমূল, এখন সেই কংগ্রেসেই ফিরতে চান মমতা?

২৮ বছর আগে ভারতের সবচেয়ে পুরোনো রাজনৈতিক দল ভারতীয় কংগ্রেসের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে নিজের দল তৃণমূল কংগ্রেস (TMC) গড়েছিলেন পশ্চিমবঙ্গের ‘অগ্নিকন্যা’ মমতা ব্যানার্জী। রাজনীতির নিষ্ঠুর খেলায় মমতার সেই তৃণমূলেই আজ ভাঙনের সুর। দলের একের পর এক শীর্ষ নেতা হাত মেলাচ্ছেন কট্টর হিন্দুত্ববাদী বিজেপি শিবিরের সঙ্গে। অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে খোদ মমতার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ। এ অবস্থায় হঠাৎ গুঞ্জন উঠেছে- তবে কি আবার পুরোনো ঠিকানায় ফিরবেন মমতা ব্যানার্জী? রাজনীতির ক্যারিয়ার বাঁচাতে আবারও কংগ্রেসেই ফেরত যাবেন তৃণমূল সুপ্রিমো?

দিল্লির বুকে কংগ্রেসের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে মমতা ব্যানার্জী ও অভিষেক ব্যানার্জীর দফায় দফায় রুদ্ধদ্বার বৈঠক এই জল্পনার আগুনে ঘি ঢেলেছে, যা ভারতের জাতীয় রাজনীতিতে এক বিশাল ভূকম্পনের আভাস দিচ্ছে।

দিল্লির রুদ্ধদ্বার বৈঠক ও তীব্র জল্পনা

ঘটনার সূত্রপাত গত মঙ্গলবার (৯ জুন) দিল্লিতে কংগ্রেস সংসদীয় দলের সভানেত্রী সোনিয়া গান্ধীর বাসভবনে মমতা ব্যানার্জীর দীর্ঘ বৈঠককে কেন্দ্র করে। তার পরদিনই সর্বভারতীয় তৃণমূলের সাধারণ সম্পাদক অভিষেক ব্যানার্জী কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীর সঙ্গে প্রায় দেড় ঘণ্টা বৈঠক করেন।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর সূত্রে খবর, দেশজুড়ে বিজেপিবিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’ (INDIA)-কে মজবুত করতে এবং মমতার রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগাতে কংগ্রেস হাইকমান্ডের পক্ষ থেকে তাকে জাতীয় সহ-সভাপতি (National Vice President) পদের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এমনকি তাকে এই বিরোধী মঞ্চের বড় কোনো যৌথ দায়িত্বে বা চেয়ারপারসন করার বিষয়েও গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে। তবে এর বিনিময়ে সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেসকে সম্পূর্ণভাবে বিলুপ্ত করে মূল কংগ্রেসের সাথে মিশিয়ে দিতে হবে— এমন একটি শর্ত নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে দরকষাকষি চলছে।

mamata
মমতা ব্যানার্জী/ ছবি: ফেসবুক@মমতা

ছাত্রনেতা থেকে অগ্নিকন্যা: মমতার উত্থান

মমতা ব্যানার্জীর রাজনৈতিক জীবনের শুরু সত্তরের দশকে কংগ্রেসের ছাত্র সংগঠন ‘ছাত্র পরিষদ’-এর হাত ধরে। অতি সাধারণ পরিবার থেকে উঠে আসা এই লড়াকু নেত্রী ১৯৮৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে যাদবপুর কেন্দ্রে কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিআইএম) হেভিওয়েট নেতা তথা লোকসভার তৎকালীন স্পিকার সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়কে পরাজিত করে দেশজুড়ে চমক সৃষ্টি করেন। রাতারাতি তিনি পরিচিতি পান ভারতীয় রাজনীতির ‘অগ্নিকন্যা’ হিসেবে।

নব্বইয়ের দশকে পশ্চিমবঙ্গের ৩৪ বছরের শক্তিশালী বামফ্রন্ট সরকারের বিরুদ্ধে রাজপথে অন্যতম প্রধান ও আক্রমণাত্মক বিরোধী মুখ হয়ে ওঠেন মমতা। রাজপথে আন্দোলনের জেরে একাধিকবার বামপন্থিদের শারীরিক নিগ্রহের শিকারও হতে হয়েছিল তাকে। কিন্তু দমে না গিয়ে সাধারণ মানুষের আবেগ ও ক্ষোভকে পুঁজি করে নিজের ভিত্তি মজবুত করতে থাকেন তিনি।

কংগ্রেস ভেঙে তৃণমূল গঠন

কংগ্রেসের অভ্যন্তরে থাকাকালীনই তৎকালীন রাজ্য কংগ্রেস নেতৃত্বের একাংশের ‘নরমপন্থি’ বা বামফ্রন্টের প্রতি ‘আপসকামী’ নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হন মমতা। বিশেষ করে তৎকালীন রাজ্য কংগ্রেস সভাপতি সোমেন মিত্রের সঙ্গে তার দূরত্ব তৈরি হয়। মমতার অভিযোগ ছিল, দিল্লির কংগ্রেস নেতৃত্ব বাংলায় সিপিআইএমের বিরুদ্ধে জোরালো আন্দোলন করতে দিচ্ছে না।

এই চরম মতবিরোধের জেরে ১৯৯৭ সালের শেষভাগে তিনি কংগ্রেস ত্যাগ করেন (অথবা দল থেকে বহিষ্কৃত হন)। এরপর ১৯৯৮ সালের ১ জানুয়ারি তিনি গঠন করেন ‘সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস’। সে সময় কংগ্রেসের বহু প্রভাবশালী নেতা যেমন— মুকুল রায়, অজিত পাঁজা, সুব্রত বক্সী এবং সুদীপ ব্যানার্জীসহ তরুণ ও যুব কংগ্রেসের সিংহভাগ কর্মী মমতার হাত ধরে নতুন দলে যোগ দেন। আক্ষরিক অর্থেই পশ্চিমবঙ্গে মূল কংগ্রেসের অস্তিত্ব বিপন্ন করে তৃণমূল কংগ্রেসই হয়ে ওঠে বামফ্রন্টবিরোধী প্রধান রাজনৈতিক শক্তি। দীর্ঘ লড়াইয়ের পর ২০১১ সালে ঐতিহাসিক পরিবর্তনের মাধ্যমে বাংলায় বাম শাসনের অবসান ঘটিয়ে মুখ্যমন্ত্রী হন মমতা ব্যানার্জী।

mamataমমতা ব্যানার্জী/ ছবি: ফেসবুক@মমতা

তৃণমূলে নজিরবিহীন ভাঙন

টানা ১৫ বছর পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতায় থাকার পর সাম্প্রতিক বিধানসভা নির্বাচনে বড়সড় ধাক্কা খায় তৃণমূল কংগ্রেস। নির্বাচনে পরাজয়ের পর থেকেই দলটির অভ্যন্তরে চরম বিশৃঙ্খলা ও নেতৃত্বের কোন্দল প্রকাশ্য রূপ নেয়।

দলের একাধিক হেভিওয়েট বিধায়ক, সাংসদ ও প্রথম সারির নেতারা বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। সম্প্রতি রাজ্যসভার সাংসদ সুখেন্দু শেখর রায় এবং সুস্মিতা দেবের মতো প্রভাবশালী নেতাদের পদত্যাগ তৃণমূলকে খাদের কিনারায় এনে দাঁড় করিয়েছে। দলের ভেতরের এই অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ ও একাধিক নেতার দলত্যাগের কারণে মমতা ব্যানার্জী তার নিজের তৈরি দলের ওপর নিয়ন্ত্রণ অনেকটাই হারিয়ে ফেলেছেন বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। এই চরম অস্তিত্ব সংকটের মুখেই নিজের এবং তার রাজনৈতিক উত্তরাধিকারী অভিষেক ব্যানার্জীর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করতে তিনি আবার দিল্লির দরবারে শরণাপন্ন হয়েছেন।

তৃণমূল-কংগ্রেস একীভূতকরণ গুঞ্জন: কী বলছেন রাজনৈতিক নেতারা?

মমতা ব্যানার্জীর কংগ্রেসে ফেরার এবং তৃণমূলের একীভূতকরণের (Merger) এই খবর প্রকাশ্যে আসতেই ভারতের জাতীয় ও আঞ্চলিক রাজনীতিতে ঝড় উঠেছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক শিবিরের শীর্ষ নেতারা এই বিষয়ে মিশ্র, তীক্ষ্ণ ও কূটনৈতিক প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন।

কংগ্রেস শিবির: স্বাগত ও সতর্কতার মিশ্র সুর

পশ্চিমবঙ্গ প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি শুভঙ্কর সরকার অত্যন্ত ইতিবাচক এবং রাজনৈতিকভাবে নমনীয় সুর ব্যক্ত করে বলেন, ‘রাজনীতি হলো সম্ভাবনার শিল্প। তাই আগামী দিনে যে কোনো কিছুই ঘটতে পারে ‘ তিনি ইঙ্গিত দেন যে, যারা রাহুল গান্ধীর নেতৃত্ব মেনে বিজেপির বিরুদ্ধে লড়াই করতে চান, কংগ্রেসের দরজা তাদের জন্য খোলা।

কংগ্রেসের প্রবীণ নেতা অধীর রঞ্জন চৌধুরী কিছুটা খোঁচা দিয়ে বলেছেন, নির্বাচনে পরাজয়ের পর নিজের অস্তিত্ব রক্ষার গরজেই মমতা এখন কংগ্রেসের দিকে হাত বাড়াচ্ছেন, এর আগে ক্ষমতার দম্ভে তিনি কখনো আসেননি।

আরেক বর্ষীয়ান কংগ্রেস নেতা আব্দুল মান্নান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘মমতা ব্যানার্জীর রাজনৈতিক আচরণের ওপর কেউ সম্পূর্ণ ভরসা রাখতে পারে না। জাতীয় রাজনীতিতে তার নির্ভরযোগ্যতা এখন তলানিতে।’

কংগ্রেস মুখপাত্র জয়রাম রমেশ অবশ্য জল্পনা কিছুটা প্রশমিত করে জানান, সোনিয়া গান্ধী ও মমতার বৈঠকটি অত্যন্ত আন্তরিক ছিল এবং সেখানে তাদের দীর্ঘদিনের ব্যক্তিগত সম্পর্কের খাতিরেই আলাপ হয়েছে, প্রাতিষ্ঠানিক সংযুক্তির খবরগুলো কেবলই জল্পনা।

mamata sonia
সোনিয়া গান্ধী ও মমতা ব্যানার্জী/ ছবি: পিটিআই

ভারতীয় জনতা পার্টি: ‘রাজনৈতিক দেউলিয়াত্ব’ ও আত্মসমর্পণ

এই গুঞ্জনকে মমতার চরম ব্যর্থতা হিসেবে উল্লেখ করেছেন বিজেপি (BJP) সংসদ সদস্য রাজু বিস্তা। তিনি বলেন, তৃণমূল যদি কংগ্রেসে ফিরে যায়, তবে সেটি ‘ঘরে ফেরা’ নয়, বরং মমতা ব্যানার্জীর রাজনৈতিক দেউলিয়াত্ব এবং সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ হিসেবে গণ্য হবে। এর ফলে তৃণমূল তার নিজস্ব রাজনৈতিক অস্তিত্ব হারাবে।

রাহুল গান্ধী ও অভিষেক ব্যানার্জীর বৈঠককে কটাক্ষ করে বিজেপি নেত্রী প্রিয়াঙ্কা টিবরেওয়াল বলেছেন, এটি এক যুবরাজের সঙ্গে আরেক যুবরাজের বৈঠক।’ তার দাবি, ‘ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে তারা যে কাউকেই জড়িয়ে ধরতে পারেন। কিন্তু কংগ্রেসের নিজেদেরই মাথার ওপর ছাদ নেই, তারা তৃণমূলকে কী আশ্রয় দেবে?’

তৃণমূল কংগ্রেস: ক্ষোভ ও অস্বীকৃতির সুর

তৃণমূলের বিদ্রোহী নেতা ঋতব্রত ব্যানার্জী দলের সংযুক্তির জল্পনা পুরোপুরি উড়িয়ে দিয়ে বলেছেন, ‘কংগ্রেসের সঙ্গে তৃণমূল একীভূত হচ্ছে না।’ পশ্চিমবঙ্গে এখনো তাদের ৬৪ জন বিধায়কের শক্তিশালী সমর্থন রয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।

দলের সিংহভাগ বড় নেতা এই খবরকে ‘সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও গুজব’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। তবে তারা স্বীকার করেছেন যে, ইন্ডিয়া জোটের অংশ হিসেবে বিজেপিবিরোধে লড়াইয়ে কংগ্রেসের সঙ্গে বৃহত্তর কৌশলগত সমন্বয় বজায় থাকবে।

ভবিষ্যৎ কোন দিকে?

ইতিহাসের এক অদ্ভুত আবর্তনে এসে দাঁড়িয়েছে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি। যে কংগ্রেসকে ‘সিপিআইএমের বি-টিম’ আখ্যা দিয়ে দল ভেঙে বেরিয়েছিলেন মমতা, আজ ২৮ বছর পর রাজনৈতিক অস্তিত্বের চরম সংকটে পড়ে সেই ‘হাত’ শিবিরের আশ্রয়েই তার ফেরার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

কংগ্রেস হাইকমান্ড এরই মধ্যে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে সব রাজ্যের নেতাদের নিয়ে জরুরি বৈঠক ডেকেছে। মমতা ব্যানার্জীও প্রস্তাবটি নিয়ে ভাবার জন্য কিছুটা সময় চেয়েছেন। শেষ পর্যন্ত যদি তৃণমূল সত্যিই কংগ্রেসে বিলীন হয়ে যায়, তবে তা হবে ভারতীয় রাজনীতির ইতিহাসের অন্যতম বড় পুনর্বিন্যাস এবং ভারতের প্রাচীনতম রাজনৈতিক দলটির জন্য এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা।

সূত্র: ইন্ডিয়া টুডে, এনডিটিভি, ডেকান হেরাল্ড, দ্য প্রিন্ট, দ্য হিন্দু
কেএএ/

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow