যে সনদ কখনো ছিল না, তা দিয়েই চলছিল শিক্ষকতা!

কক্সবাজারের উখিয়ার থাইংখালী উচ্চ বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের চেয়ারে বসে প্রতিদিন ক্লাস পরিচালনা করেন মো. মোস্তফা কামাল। শিক্ষার্থীরা তাকে স্যার বলে ডাকে, সহকর্মীরা তার নির্দেশ মানেন। কিন্তু যে সনদের জোরে তিনি এই পদে এসেছেন, সেই সনদই এখন প্রশ্নের কাঠগড়ায়। সরকারি নিরীক্ষায় বেরিয়ে এসেছে- সনদটি জাল। ফলে ফেরত দিতে হচ্ছে প্রায় ২১ লাখ টাকা। মোস্তফা কামালের বিরুদ্ধে জাল সনদে চাকরির অভিযোগ প্রথম আলোচনায় আসে 'বিডি২৪ লাইভের' একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের সূত্র ধরে। প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হলে এলাকায় ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয় এবং বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরে আসে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের নিরীক্ষা কমিটি বিষয়টি আমলে নিয়ে তদন্ত শুরু করে। সেই তদন্তেই শেষ পর্যন্ত অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হয় এবং মোস্তফা কামালের নাম ওঠে জাল সনদধারীদের জাতীয় তালিকায়। পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর (ডিআইএ) সম্প্রতি সারা দেশের স্কুল-কলেজের জাল ও ভুয়া সনদধারী শিক্ষক-কর্মচারীদের একটি তালিকা প্রকাশ করেছে। সেই তালিকায় ১৮৭ জনের নাম রয়েছে। ৩৭ নম্বরে আছেন কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার

যে সনদ কখনো ছিল না, তা দিয়েই চলছিল শিক্ষকতা!

কক্সবাজারের উখিয়ার থাইংখালী উচ্চ বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের চেয়ারে বসে প্রতিদিন ক্লাস পরিচালনা করেন মো. মোস্তফা কামাল। শিক্ষার্থীরা তাকে স্যার বলে ডাকে, সহকর্মীরা তার নির্দেশ মানেন। কিন্তু যে সনদের জোরে তিনি এই পদে এসেছেন, সেই সনদই এখন প্রশ্নের কাঠগড়ায়। সরকারি নিরীক্ষায় বেরিয়ে এসেছে- সনদটি জাল। ফলে ফেরত দিতে হচ্ছে প্রায় ২১ লাখ টাকা।

মোস্তফা কামালের বিরুদ্ধে জাল সনদে চাকরির অভিযোগ প্রথম আলোচনায় আসে 'বিডি২৪ লাইভের' একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের সূত্র ধরে। প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হলে এলাকায় ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয় এবং বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরে আসে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের নিরীক্ষা কমিটি বিষয়টি আমলে নিয়ে তদন্ত শুরু করে। সেই তদন্তেই শেষ পর্যন্ত অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হয় এবং মোস্তফা কামালের নাম ওঠে জাল সনদধারীদের জাতীয় তালিকায়।

পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর (ডিআইএ) সম্প্রতি সারা দেশের স্কুল-কলেজের জাল ও ভুয়া সনদধারী শিক্ষক-কর্মচারীদের একটি তালিকা প্রকাশ করেছে। সেই তালিকায় ১৮৭ জনের নাম রয়েছে। ৩৭ নম্বরে আছেন কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার থাইংখালী উচ্চ বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. মোস্তফা কামাল।

সূত্র বলছে, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর সারা দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্মরত শিক্ষকদের জমা দেওয়া কম্পিউটার প্রশিক্ষণ সনদের সত্যতা যাচাইয়ের উদ্যোগ নেয়। প্রতিটি সনদের তথ্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ডেটাবেইস ও অফিশিয়াল রেকর্ডের বিপরীতে মেলানো হয়। যেগুলোর তথ্য মেলেনি, সেগুলোকে জাল বা ভুয়া হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

এই যাচাইয়েই ধরা পড়েন মোস্তফা কামাল। তিনি চাকরিতে যোগ দেওয়ার সময় বগুড়াভিত্তিক জাতীয় কম্পিউটার প্রশিক্ষণ ও গবেষণা একাডেমি-সংক্ষেপে নেকটার- এর নামে একটি কম্পিউটার প্রশিক্ষণ সনদ জমা দিয়েছিলেন। কিন্তু নিরীক্ষায় দেখা যায়, ওই সনদের কোনো বৈধ রেকর্ড নেকটারের ডেটাবেইসে নেই। প্রতিষ্ঠানটির কোনো অফিশিয়াল নথিতেও মোস্তফা কামালের নাম বা নিবন্ধন তথ্য খুঁজে পাওয়া যায়নি।

নিরীক্ষা-সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এই একটি সনদের ওপর ভর করেই তিনি শিক্ষকতা পেশায় প্রবেশ করেন এবং পর্যায়ক্রমে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের পদ পর্যন্ত উঠে আসেন।

ডিআইএর তালিকায় শুধু নাম নয়, সঙ্গে রয়েছে আর্থিক দায়ও। জাল সনদে দীর্ঘদিন সরকারি বেতন-ভাতা তুলে নেওয়ার অভিযোগে মোস্তফা কামালকে ২০ লাখ ৯৭ হাজার ৪৩০ টাকা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রফেসর এম এম শহিদুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হয়েছে।

স্থানীয় একজন অভিভাবক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, 'প্রতিবেদন বেরোনোর পর আমরা ভেবেছিলাম কিছু একটা হবে। কিন্তু দেখলাম সব চাপা পড়ে গেল। তিনি আগের মতোই স্কুলে আসছেন।'

সেই অভিযোগ এখন আর কারও ব্যক্তিগত দাবি নয়- সরকারি নিরীক্ষার সিলমোহর পড়েছে তাতে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, মোস্তফা কামালের নিজের 'মোস্তফা কম্পিউটার' নামে একটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। স্থানীয় একাধিক সূত্রের অভিযোগ, এই প্রতিষ্ঠান থেকে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন ধরনের জাল ও ভুয়া প্রশিক্ষণ সনদ তৈরি করা হতো। অনেক চাকরিপ্রার্থী ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকার বিনিময়ে সেখান থেকে সনদ সংগ্রহ করেছেন বলেও দাবি করেন তারা। তবে এই অভিযোগগুলো এখনো আনুষ্ঠানিক তদন্তের আওতায় আসেনি। যদি তদন্ত হয়, এবং অভিযোগ প্রমাণিত হয়, তাহলে শুধু মোস্তফা কামালের চাকরি নয়- গোটা একটি জাল সনদ-ব্যবসার নেটওয়ার্ক সামনে আসার আশঙ্কা রয়েছে।

ডিআইএর তালিকায় নাম আসার পর থেকেই মোস্তফা কামাল তৎপর হয়ে উঠেছেন। একাধিক সূত্র জানিয়েছে, চাকরি বাঁচাতে তিনি শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও বিভাগীয় বিভিন্ন দপ্তরে যোগাযোগ শুরু করেছেন। প্রভাবশালী মহলের কাছে ধরনা দেওয়ারও চেষ্টা করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

বিষয়টি জানতে তার মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। কিন্তু তিনি ফোন ধরেননি।

চট্টগ্রাম জেলা ও দায়রা জজ আদালতের আইনজীবী মাহমুদ ইসলাম সুমন বলেন, জাল সনদ ব্যবহার করে সরকারি চাকরিতে প্রবেশ করা কেবল প্রশাসনিক অনিয়ম নয়- এটি ফৌজদারি অপরাধ। বাংলাদেশ দণ্ডবিধির ৪২০ ধারায় প্রতারণার, ৪৬৭ ধারায় দলিল জালিয়াতির এবং ৪৬৮ ধারায় প্রতারণার উদ্দেশ্যে জালিয়াতির বিধান রয়েছে। এ ধরনের অপরাধে কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের পাশাপাশি চাকরিচ্যুতির বিধানও আছে।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow