‘রামিসা হত্যার দ্রুত বিচার সাধারণ মানুষের আস্থা ফেরানোর অগ্নিপরীক্ষা’

একটি সাত বছরের শিশুর স্বপ্ন কতটুকুই বা হতে পারে? দ্বিতীয় শ্রেণিতে প্রথম হওয়ার আনন্দ, বন্ধুদের সঙ্গে চকলেট-মিষ্টি ভাগ করে নেওয়ার অপেক্ষা, আর একটি সুন্দর আগামীর হাতছানি। কিন্তু রাজধানীর পল্লবীর মিরপুর-১১ এলাকার একটি স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির মেধাবী শিক্ষার্থী রামিসা আক্তারের সেই সরল স্বপ্নগুলো চিরতরে স্তব্ধ হয়ে গেছে। ক্লাসের রোল নম্বর এক এর শান্ত ও মেধাবী মেয়েটির বেঞ্চটি এখন শূন্য। তারা যে ভবনে থাকেন গত ১৯ মে সকালে সেই ভবনেরই একটি কক্ষে তাকে পাশবিক নির্যাতন ও নির্মম হত্যার শিকার হতে হয়েছে। ১৮ তারিখ যে মেয়েটি চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতার জন্য নিজ হাতে পরম মমতায় ছবি জমা দিয়েছিল, ১৯ তারিখেই তাকে পাড়ি জমাতে হলো পরপারে। রামিসার এই আকস্মিক ও নৃশংস বিদায়ে শুধু তার সহপাঠী বা শিক্ষকরাই নয়, পুরো সমাজব্যবস্থাই স্তব্ধ। এই বেদনার মাঝেই সবচেয়ে বেশি বুক কাঁপিয়ে দেয় রামিসার অসহায় বাবার একটি উক্তি, ‘দেশে বিচারের রেকর্ড নেই, দিন ১৫ পর বিষয়টি হারিয়ে যাবে, আমরা বিচার পাবো না।’ একজন আদালত প্রতিবেদক হিসেবে এই আক্ষেপ, এই অবিশ্বাস আমাকে ভীষণভাবে নাড়া দেয়। কেন একজন সন্তানহারা পিতাকে দেশের বিচার ব্যবস

‘রামিসা হত্যার দ্রুত বিচার সাধারণ মানুষের আস্থা ফেরানোর অগ্নিপরীক্ষা’

একটি সাত বছরের শিশুর স্বপ্ন কতটুকুই বা হতে পারে? দ্বিতীয় শ্রেণিতে প্রথম হওয়ার আনন্দ, বন্ধুদের সঙ্গে চকলেট-মিষ্টি ভাগ করে নেওয়ার অপেক্ষা, আর একটি সুন্দর আগামীর হাতছানি। কিন্তু রাজধানীর পল্লবীর মিরপুর-১১ এলাকার একটি স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির মেধাবী শিক্ষার্থী রামিসা আক্তারের সেই সরল স্বপ্নগুলো চিরতরে স্তব্ধ হয়ে গেছে। ক্লাসের রোল নম্বর এক এর শান্ত ও মেধাবী মেয়েটির বেঞ্চটি এখন শূন্য।

তারা যে ভবনে থাকেন গত ১৯ মে সকালে সেই ভবনেরই একটি কক্ষে তাকে পাশবিক নির্যাতন ও নির্মম হত্যার শিকার হতে হয়েছে। ১৮ তারিখ যে মেয়েটি চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতার জন্য নিজ হাতে পরম মমতায় ছবি জমা দিয়েছিল, ১৯ তারিখেই তাকে পাড়ি জমাতে হলো পরপারে। রামিসার এই আকস্মিক ও নৃশংস বিদায়ে শুধু তার সহপাঠী বা শিক্ষকরাই নয়, পুরো সমাজব্যবস্থাই স্তব্ধ।

এই বেদনার মাঝেই সবচেয়ে বেশি বুক কাঁপিয়ে দেয় রামিসার অসহায় বাবার একটি উক্তি, ‘দেশে বিচারের রেকর্ড নেই, দিন ১৫ পর বিষয়টি হারিয়ে যাবে, আমরা বিচার পাবো না।’

একজন আদালত প্রতিবেদক হিসেবে এই আক্ষেপ, এই অবিশ্বাস আমাকে ভীষণভাবে নাড়া দেয়। কেন একজন সন্তানহারা পিতাকে দেশের বিচার ব্যবস্থার ওপর আস্থা না রেখে এমন নিয়তি মেনে নেওয়ার কথা ভাবতে হবে? কেন আমাদের বারবার মনে করিয়ে দিতে হবে যে, সময় পেরিয়ে গেলেই অপরাধের ক্ষতগুলো সমাজের স্মৃতি থেকে মুছে যায়?

jagonews24.com

আমাদের বিচার ব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতা এবং অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়ার অতীত পরিসংখ্যানই রামিসার বাবার মনে এমন গভীর ক্ষোভ ও অবিশ্বাসের জন্ম দিয়েছে। আমাদের দেশে অনেক সময়ই দেখা যায়, কোনো একটি নৃশংস হত্যাকাণ্ড বা শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটলে তা নিয়ে প্রথম কয়েকদিন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি হয়। কিন্তু, সময়ের আবর্তনে, নতুন নতুন ঘটনার ভিড়ে সেই পুরোনো ঘটনার খোঁজ রাখার মানুষ কমে যায়। এই সুযোগে তদন্তে গাফেলতি, সাক্ষীর অভাব কিংবা প্রভাবশালী মহলের চাপে অনেক অপরাধীই পার পেয়ে যায় অথবা বছরের পর বছর ঝুলে থাকে মামলা।

আরও পড়ুন

রামিসার ক্ষেত্রে খুনি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং আসামি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দিয়েছেন।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই আইনি প্রক্রিয়া কি দ্রুততম সময়ের মধ্যে শেষ হবে? নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন এবং দণ্ডবিধির সংশ্লিষ্ট ধারায় মামলাটি এখন তদন্তাধীন। কিন্তু এই তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়া যদি বছরের পর বছর ধরে ঝুলে থাকে, তবে তা রামিসার পরিবারের ক্ষতে সর্বোচ্চ কেবল প্রলেপই দিতে পারবে। বিচারহীনতার এই সংস্কৃতি যদি ভাঙা না যায়, তবে অপরাধীরা আরও দুঃসাহসী হয়ে উঠবে এবং সমাজে রামিসাদের নিরাপত্তা চিরতরে বিলীন হবে।

রামিসার নির্মম হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে তার স্কুল প্রাঙ্গণে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ মানববন্ধনে অংশ নিয়ে খুনিদের জনসম্মুখে ফাঁসির দাবি জানিয়েছেন। এই ক্ষোভ কেবল একটি হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে নয়, এটি আসলে বিচার ব্যবস্থার শ্লথগতির বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের পুঞ্জীভূত প্রতিবাদের বহিঃপ্রকাশ।

jagonews24.com

দেশের একজন নাগরিক এবং আদালতের খবরাখবর কাছ থেকে দেখা সাংবাদিক হিসেবে আমি মনে করি, রামিসা হত্যার বিচার কেবল একটি সাধারণ মামলার নিষ্পত্তি নয়, এটি বিচার ব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনার এক অগ্নিপরীক্ষা। এই মামলার বিচার দ্রুত বিচার আইনের আওতায় এনে অতি দ্রুততম সময়ে সম্পন্ন করতে হবে। তদন্ত সংস্থাকে কোনো রকম ত্রুটি ছাড়া, নিরেট তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে দ্রুত চার্জশিট দাখিল করতে হবে, যেন আইনের কোনো ফাঁকফোকর গলে খুনিরা রেহাই পেতে না পারে।

সমাজ যখন দেখবে যে, একটি নিষ্পাপ শিশুকে হত্যার দায়ে অপরাধীকে দ্রুততম সময়ে সর্বোচ্চ ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ভোগ করতে হচ্ছে, তখনই কেবল রামিসার বাবার মতো হাজারও অভিভাবকের মন থেকে এই অবিশ্বাস দূর হবে।

পাশাপাশি, এই নির্মম ঘটনা আমাদের পারিবারিক ও সামাজিক নিরাপত্তার অভাবটিকেও আঙুল তুলে দেখিয়ে দেয়। আমাদের চারপাশের পরিবেশ আজ কতটা কলুষিত ও অনিরাপদ হয়ে উঠেছে, তা রামিসার এই ঘটনা আবারও প্রমাণ করলো। আমরা আমাদের সন্তানদের কতটা নিরাপদ আশ্রয়ে রাখছি, তা নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। অভিভাবকদের যেমন সচেতন থাকতে হবে এবং সন্তানদের সুরক্ষায় সর্বোচ্চ নজরদারি বজায় রাখতে হবে, ঠিক তেমনি চারপাশের মানুষকেও যে কোনো অন্যায় ও সন্দেহজনক আচরণের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে। তবে সামাজিক সচেতনতা তখনই পূর্ণতা পাবে, যখন রাষ্ট্র অপরাধীর দ্রুত ও কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করে সমাজে একটি ‘ডিটারেন্ট’ বা অপরাধ-প্রতিরোধক বার্তা দিতে পারবে।

আমরা চাই না রামিসার বাবার আশঙ্কাই সত্যি হোক; আমরা চাই না আর ১৫ দিন পর রামিসার নাম সমাজ ভুলে যাক। এই সমাজ ও রাষ্ট্রের দায়িত্ব রামিসার শূন্য বেঞ্চটির দিকে তাকিয়ে নিজেদের অপরাধী ভাবা এবং রামিসার পরিবারের পাশে দাঁড়িয়ে দ্রুততম সময়ে ‘জাস্টিস ফর রামিসা’ নিশ্চিত করা।

এএমএ

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow