ভারতের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের ৫০ শতাংশ শুল্ক কার্যকর হয়েছে। রাশিয়া থেকে সস্তায় তেল কিনেই যুক্তরাষ্ট্রকে এই সুযোগ করে দিয়েছে ভারত। চলতি মাসের শুরুতে ভারতীয় পণ্যের ওপর ২৫ শতাংশ মার্কিন শুল্ক কার্যকর হয়েছিল। কিন্তু রাশিয়া থেকে দিল্লির সস্তায় তেল কেনার কথা উল্লেখ করে এই হার দ্বিগুণ করার পরিকল্পনা ঘোষণা করেন ট্রাম্প। হোয়াইট হাউজের অভিযোগ, রাশিয়া থেকে তেল কিনে পরোক্ষভাবে ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়াকে অর্থায়ন করছে ভারত। ব্রিটিশ গণমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে দ্বিতীয় বারের মতো মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে ক্ষমতা গ্রহণ করেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। ওভাল অফিসের দায়িত্ব নিয়েই বিশ্বের বেশিরভাগ দেশের পণ্যের ওপর উল্লেখযোগ্য হারে শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন তিনি। এতে মিত্র ও প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কে টানাপড়েন দেখা দেয় এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ভারত ছাড়া ব্রাজিলই একমাত্র দেশ যাদের ওপর এত বেশি শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। ভারতের মন্ত্রীরা বলছেন, রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্কের কারণে এমন পদক্ষেপ গ্রহণযোগ্য নয়। কর্মকর্তারা এটাও বলছেন যে, তারা সম্ভবত মস্কো এবং বেইজিংয়ের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করবেন। এতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের দূরত্ব আরও বেড়ে যেতে পারে।
বাণিজ্য বিশেষজ্ঞদের ধারণা, ট্রাম্পের নতুন শুল্ক কার্যকর হলে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্রে ভারতের পণ্য রপ্তানির মূল্য আগের অর্থবছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাবে। গ্লোবাল ট্রেড রিসার্চ ইনিশিয়েটিভ-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ভারতের পণ্য রপ্তানি গত অর্থবছরের প্রায় ৮৭ বিলিয়ন ডলার থেকে কমে ২০২৬ অর্থবছরে ৪৯.৬ বিলিয়ন ডলারে নেমে আসতে পারে।
ভারতের মার্কিন রপ্তানির প্রায় ৩০ শতাংশ (২০২৫ অর্থবছরে যার মূল্য ছিল ২৭.৬ বিলিয়ন ডলার) শুল্ক থেকে মুক্ত থাকবে। কারণ ফার্মাসিউটিক্যালস, ইলেকট্রনিকস এবং পেট্রোলিয়াম পণ্যের মতো কিছু সামগ্রীকে ট্রাম্পের শুল্ক থেকে ছাড় দেওয়া হয়েছে।
এই আকাশছোঁয়া শুল্কের কারণে মার্কিন বাজারে ভারতের পণ্য রপ্তানিকারকরা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়বেন। হাতে গোনা কয়েকটি দেশের সঙ্গেই ভারতের বাণিজ্য উদ্বৃত্ত রয়েছে, যার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র অন্যতম। অন্যদিকে, চীন, রাশিয়া এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো শীর্ষ বাণিজ্য অংশীদারদের সঙ্গে ভারতের তীব্র বাণিজ্য ঘাটতি রয়েছে।
মার্কিন উচ্চ শুল্কের কারণে যেসব পণ্য সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে সেগুলোর মধ্যে রয়েছে পোশাক ও বস্ত্র, রত্ন ও গহনা, চিংড়ি, যন্ত্রাংশ, কিছু ধাতু (যেমন- ইস্পাত, অ্যালুমিনিয়াম, তামা), জৈব রাসায়নিক, কৃষি ও প্রক্রিয়াজাত খাবার, চামড়া ও জুতো, হস্তশিল্প, আসবাবপত্র এবং কার্পেট।
মার্কিন বাজারের ওপর নির্ভরশীলতা বেশি হওয়ায় চিংড়ি রপ্তানিকারকদের আয়ের ৪৮ শতাংশ আসে মার্কিন বাজার থেকে। যার ফলে সামুদ্রিক খাদ্য রপ্তানি খাতেও বিক্রি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেতে পারে।
জিটিআরআই-এর সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতের মার্কিন রপ্তানির ৩০ শতাংশ শুল্কমুক্ত থাকবে এবং ৪ শতাংশ পণ্যে ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপিত হবে। তবে বেশিরভাগ পণ্য যেমন- পোশাক, বস্ত্র, রত্ন ও গহনা, চিংড়ি, কার্পেট এবং আসবাবপত্রের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক কার্যকর হওয়ায় সেগুলো প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারবে না। এই খাতগুলোর রপ্তানি ৭০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গিয়ে ১৮.৬ বিলিয়ন ডলারে নেমে আসতে পারে। এতে যুক্তরাষ্ট্রে সামগ্রিক রপ্তানি ৪৩ শতাংশ হ্রাস পাবে এবং লাখ লাখ চাকরি ঝুঁকির মুখে পড়বে।
এদিকে যে ঘটনাকে কেন্দ্র করে ভারতকে এমন শাস্তি দিচ্ছেন ট্রাম্প তা নিয়ে যেন কোনো মাথা ব্যথাই নেই মোদী সরকারের। দেশটির সরকার রাশিয়ার তেল কেনা বন্ধ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ভারতীয়দের স্থানীয় তেল কেনার আহ্বান জানিয়েছেন।
দিল্লির দাবি, রাশিয়া থেকে তেল কেনার চুক্তি দীর্ঘ মেয়াদি। হুট করে এই চুক্তি থেকে সরে আসা সম্ভব নয়। অপরদিকে নরেন্দ্র মোদী তার দেশের মানুষকে বলছেন, সবার কেবল ‘ভারতে তৈরি’ পণ্য কেনা উচিত। আমাদের ওপর চাপ বাড়তে পারে, তবে আমরা তা সহ্য করব।
তিনি বলেন, আমাদের আত্মনির্ভরশীল হওয়া উচিত- হতাশা থেকে নয়, বরং গর্ব থেকে। তিনি বলেন, বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক স্বার্থপরতা বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং আমাদের অসুবিধাগুলো নিয়ে বসে থাকলে চলবে না। অবশ্যই সামনে এগোতে হবে এবং কেউ যেন আমাদেরকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারে।
এরপর থেকে কমপক্ষে দুটি জনসভায় একই ধরনের মন্তব্যের পুনরাবৃত্তি করেছেন তিনি। মোদীর এই অবস্থানকে অনেকেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভারতের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপের কঠোর পদক্ষেপের বিরুদ্ধে লড়াই হিসেবেই দেখছেন।
গোল্ডম্যান শ্যাক্সের প্রধান ভারতীয় অর্থনীতিবিদ শান্তনু সেনগুপ্ত সতর্ক করে বলেছেন যে, ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপের ফলে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশ কমে যেতে পারে।
এদিকে নতুন শুল্ক কার্যকর হওয়ায় এর সবচেয়ে বড় প্রভাব দেখা যাচ্ছে ভারতের বস্ত্রখাতে। জানা গেছে, দেশের অনেক বড় শহরে বস্ত্র উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে। ফেডারেশন অব ইন্ডিয়ান এক্সপোর্ট অর্গানাইজেশনের সভাপতি এস সি রালহান বলেন, ক্রমবর্ধমান ব্যয় বৃদ্ধি এবং প্রতিযোগিতার কারণে বস্ত্র উৎপাদকরা তিরুপুর, নয়ডা এবং সুরাটে উৎপাদন বন্ধ করে দিয়েছে। ভিয়েতনাম ও বাংলাদেশে কম খরচে তৈরি হচ্ছে পোশাক। আমরা এসব প্রতিদ্বন্দ্বীদের চেয়ে পিছিয়ে আছি।
- আরও পড়ুন:
- ৫০ শতাংশ শুল্কারোপ, বন্ধ হয়ে গেছে ভারতের বড় শহরের বস্ত্র উৎপাদন
- আজ থেকেই ভারতের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের ৫০ শতাংশ শুল্ক কার্যকর
- ট্রাম্পের শুল্কে বেশি ঝুঁকিতে ভারতের যেসব খাত
তিনি আরও বলেন, সামুদ্রিক খাবার বিশেষ করে চিংড়ি রপ্তানিতে বড় ধাক্কা আসছে। যেহেতু ভারতের সামুদ্রিক খাদ্য রপ্তানির প্রায় ৪০ শতাংশই যুক্তরাষ্ট্র নির্ভর তাই শুল্কের জেরে সরবরাহ শৃঙ্খল ব্যাহত হওয়া এবং মাছচাষীদের দুর্দশার মতো অনেক ঝুঁকি রয়েছে। রালহান আরও বলেন, চীন, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, ফিলিপাইন এবং দক্ষিণ-পূর্ব ও দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর তুলনায় ভারতীয় পণ্য প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে রয়েছে।
সূত্র: বিবিসি, দ্য গার্ডিয়ান
টিটিএন