রাষ্ট্র সংস্কারে বিএনপি: প্রতিশ্রুতি বনাম বাস্তবতা
বাংলাদেশের নির্বাচনী রাজনীতিতে ইশতেহার দীর্ঘদিন ধরেই মূলত প্রতিশ্রুতির দলিল হিসেবে বিবেচিত হয়েছে, যেখানে আকাঙ্ক্ষা থাকলেও বাস্তবায়নের কাঠামো প্রায়ই অস্পষ্ট। অথচ বর্তমান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা যেমন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ওপর আস্থার সংকট, কাঠামোগত অর্থনৈতিক চাপ এবং সামাজিক বৈষম্য, ইশতেহারকে কেবল নির্বাচনী ঘোষণার বাইরে গিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার নীতিগত দিকনির্দেশনা হিসেবে মূল্যায়নের প্রয়োজন তৈরি করেছে। এই প্রেক্ষাপটে বিএনপির সর্বশেষ নির্বাচনী ইশতেহার তার ব্যপকতা ও কাঠামোগত উচ্চাকাঙ্ক্ষার জন্য দৃষ্টি আকর্ষণ করে। তবে মূল প্রশ্ন হলো, এই উচ্চাকাঙ্ক্ষা কতটা বাস্তবায়নযোগ্য। এই লেখার উদ্দেশ্য সমর্থন বা বিরোধিতা নয়; বরং ইশতেহারের নীতিগত যৌক্তিকতা ও বাস্তবায়নের সম্ভাবনা নিরপেক্ষভাবে পর্যালোচনা করা। রাষ্ট্র সংস্কার ও শাসনব্যবস্থা: নীতিগত ঐকমত্যের সন্ধান ও বাস্তবায়নযোগ্যতা: বিগত দু’দশক ধরে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা ও স্বচ্ছতা নিয়ে বাংলাদেশের নাগরিক সমাজে, গবেষণা সংস্থায় এবং আন্তর্জাতিক সূচকে ধারাবাহিক বিরূপ প্রতিবেদন এসেছে। ট্রান্সপ্যারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল–এর বিশ্ব দুর্নীতি সূচকে বাংল
বাংলাদেশের নির্বাচনী রাজনীতিতে ইশতেহার দীর্ঘদিন ধরেই মূলত প্রতিশ্রুতির দলিল হিসেবে বিবেচিত হয়েছে, যেখানে আকাঙ্ক্ষা থাকলেও বাস্তবায়নের কাঠামো প্রায়ই অস্পষ্ট। অথচ বর্তমান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা যেমন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ওপর আস্থার সংকট, কাঠামোগত অর্থনৈতিক চাপ এবং সামাজিক বৈষম্য, ইশতেহারকে কেবল নির্বাচনী ঘোষণার বাইরে গিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার নীতিগত দিকনির্দেশনা হিসেবে মূল্যায়নের প্রয়োজন তৈরি করেছে। এই প্রেক্ষাপটে বিএনপির সর্বশেষ নির্বাচনী ইশতেহার তার ব্যপকতা ও কাঠামোগত উচ্চাকাঙ্ক্ষার জন্য দৃষ্টি আকর্ষণ করে। তবে মূল প্রশ্ন হলো, এই উচ্চাকাঙ্ক্ষা কতটা বাস্তবায়নযোগ্য। এই লেখার উদ্দেশ্য সমর্থন বা বিরোধিতা নয়; বরং ইশতেহারের নীতিগত যৌক্তিকতা ও বাস্তবায়নের সম্ভাবনা নিরপেক্ষভাবে পর্যালোচনা করা।
রাষ্ট্র সংস্কার ও শাসনব্যবস্থা: নীতিগত ঐকমত্যের সন্ধান ও বাস্তবায়নযোগ্যতা: বিগত দু’দশক ধরে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা ও স্বচ্ছতা নিয়ে বাংলাদেশের নাগরিক সমাজে, গবেষণা সংস্থায় এবং আন্তর্জাতিক সূচকে ধারাবাহিক বিরূপ প্রতিবেদন এসেছে। ট্রান্সপ্যারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল–এর বিশ্ব দুর্নীতি সূচকে বাংলাদেশ ২০১২ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত প্রায় সববছরেই দুর্নীতি গ্রাফে নিম্নমুখী, বিচার বিভাগের স্বাধীনতার ওপর World Justice Project–এর সূচকেও বাংলাদেশ তুলনামূলকভাবে নিচের দিকেই অবস্থান করছে। এই প্রেক্ষাপটেই বিএনপি ইশতেহারে রাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থার সংস্কারের কথাকে কেন্দ্রীয় অবস্থানে স্থাপন করেছে। ইশতেহারটি বিচার বিভাগ, প্রশাসন, পুলিশ, নির্বাচন ব্যবস্থা ও স্থানীয় সরকারের মতো পাঁচটি মূল স্তম্ভে সংস্কারের দাবি করেছে। এর যৌক্তিকতা তথ্যে প্রতিফলিত হয়, উদাহরণস্বরূপ, ২০২০–২০২৩ সময়কালে আন্তর্জাতিক ও দেশীয় বেশ কয়েকটি গবেষণা দেখিয়েছে (যেমন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানিং অ্যান্ড এভালুয়েশন), বিচার বিভাগের মামলার নিষ্পত্তি ও কার্যকারিতা পরিস্থিতি উন্নতির বদলে স্থিতিশীল বা ধীর গতির পর্যায়ে আছে। একইভাবে, Asian Barometer Survey–তে প্রতি বার দেখানো হয়েছে বাংলাদেশের নাগরিকদের একটি বড় অংশই প্রশাসনিক ও আইন প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ অনুভব করে। এই বাস্তবতার আলোকে দেখলে বিএনপি ইশতেহারের রাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থার সংস্কারের কাজটি একটি নীতিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক পুনর্গঠনের ঘোষণা কেবল রাজনৈতিক বা ব্যানার ভিত্তিক নয়। এখানে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তম্ভকে তার আইনি ও সাংবিধানিক কাঠামোর ভেতর থেকেই স্বয়ংসম্পূর্ণ, স্বাধীন ও নিরপেক্ষ করা।
তবে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বড় প্রশ্ন রয়ে যায়, এই ঘোষিত সংস্কার কি শুধু ইশতেহারের শব্দবন্ধে সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি তা বাস্তবিকভাবে একটি কার্যকর রূপ পাবে? বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ মূলত তিনটি স্তরে বিন্যস্ত। প্রথমত, সাংবিধানিক কাঠামোর পরিবর্তন: বিচার বিভাগের নিয়োগ, প্রচলিত আইন, নির্বাচন কমিশনের গঠনতন্ত্র, এসব ক্ষেত্রে যদি শুধু কার্যনির্বাহী আদেশ বা সরকারী নীতির মাধ্যমে পরিবর্তন হয়, তাহলে তা টেকসই ও নিরপেক্ষ হতে পারে না। আন্তর্জাতিক উদাহরণ দেখলে, যেমন দক্ষিণ আফ্রিকা ও ইন্দোনেশিয়া, যেখানে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও নির্বাচন কমিশনের স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করতে সংশোধনী ও নতুন আইন গৃহীত হয়েছে, এই ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তন প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক ঐকমত্য ও অংশগ্রহণ: শুধু ক্ষমতায় থাকা দলই নয়, বিরোধী দল, নাগরিক সমাজ ও বিচারিক/আইনগত বিশেষজ্ঞদের সমন্বিত অংশগ্রহণ ছাড়া কোনো সংস্কার বাস্তবায়ন স্থায়ী হবে না। বিএনপি ইশতেহারটি একপক্ষে এই দাবি তুলেছে; কিন্তু বাস্তবায়নযোগ্যতার দিক থেকে পরামর্শ হচ্ছে, এটি একটি রোডম্যাপ হিসেবে প্রকাশিত হোক, যেখানে সময়সীমা, দায়িত্বপত্র, নির্দিষ্ট আইন/সংশোধন সংশ্লিষ্ট ধাপগুলো স্পষ্টভাবে নির্ধারিত থাকবে। তৃতীয়ত, তদন্ত ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার স্বচ্ছতা: পুলিশ ও প্রশাসনে রাজনৈতিক প্রভাব কমিয়ে আনতে যদি স্বাধীন পর্যবেক্ষক, অন্তর্ভুক্তি–ভিত্তিক নিয়োগ ব্যবস্থা ও প্রকৃত বিচারপ্রক্রিয়ার সক্ষমতা তৈরি হয়, তবে অনুসন্ধান ও অপরাধ নিরসনে রাষ্ট্রীয় বিভাগগুলোর প্রতি জনবিশ্বাস ফেরানো সম্ভব। ২০১৯–২০২৩ মেয়াদে বাংলাদেশ পুলিশকে নিয়ে যে জনমতের ফল প্রকাশ হয়েছে, তার মধ্যে প্রায় ৪৫% নাগরিকই পুলিশিকে “রাজনৈতিকভাবে পক্ষপাতদুষ্ট” বলে অভিহিত করেছে। এই অবস্থানের পরিবর্তন ছাড়া শাসনব্যবস্থায় আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার কাজ অসম্পূর্ণ থাকবে। বিএনপি ইশতেহারটি যদি শুধু প্রতিশ্রুতির নথি থেকে ওঠে এবং একে রাজনৈতিক ঘোষণার চেয়ে বেশি করে একটি বাস্তবায়নযোগ্য কাঠামো হিসেবে গড়ে তোলা যায়, তবে তা বাংলাদেশের শাসনব্যবস্থা ও রাষ্ট্রীয় আস্থার পুনর্গঠনে একটি দীর্ঘমেয়াদি ভূমিকা রাখতে পারে। এই সম্ভাব্যতা অন্যান্য রাজনৈতিক দলের সাধারণ ঘোষণার তুলনায় এটিকে তুলনামূলকভাবে এগিয়ে রাখে, তবে সাফল্য নির্ভর করবে রাজনৈতিক সংস্কৃতি, আইনি সংস্কার ও নাগরিক অংশগ্রহণের বাস্তব প্রতিশ্রুতি তৈরি করার ওপর।
অর্থনীতি: উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও বাস্তবতার টানাপোড়েন: বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারের সবচেয়ে ব্যপকতা ও নীতিগতভাবে উচ্চাভিলাষী অধ্যায় নিঃসন্দেহে অর্থনীতি। শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, ব্যাংকিং ও আর্থিক খাত সংস্কার, রাজস্ব ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়ন এবং রপ্তানি বৈচিত্র্য-প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ইস্যুই এখানে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এই অগ্রাধিকার নির্ধারণের যৌক্তিকতা বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতা থেকেই স্পষ্ট। বাংলাদেশ বর্তমানে একদিকে নিম্ন-মধ্যম আয়ের ফাঁদে আটকে পড়ার ঝুঁকিতে, অন্যদিকে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ চাপ এবং কর্মসংস্থানের গুণগত সংকট একযোগে মোকাবিলা করছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল ও বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণেও বারবার উঠে এসেছে, বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি টেকসই করতে হলে এখন আর কেবল অবকাঠামো বা ভোগনির্ভর প্রবৃদ্ধি নয়, বরং গভীর কাঠামোগত সংস্কার অপরিহার্য।
এই প্রেক্ষাপটে বিএনপির ইশতেহারে অর্থনীতিকে কেন্দ্রীয় আলোচনায় আনা একটি বাস্তববাদী অবস্থান। বিশেষ করে ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা নিয়ে যে স্বীকারোক্তি ইশতেহারে প্রতিফলিত হয়েছে, তা বাংলাদেশের নির্বাচনী রাজনীতিতে তুলনামূলকভাবে বিরল। বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থনীতিবিদদের বিশ্লেষণে দেখা যায়, খেলাপি ঋণ দীর্ঘদিন ধরেই আর্থিক খাতের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি। রাষ্ট্রীয় ব্যাংকগুলোর পরিচালনা কাঠামো, পুনঃতফসিল সংস্কৃতি এবং রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে এই সংকট কেবল অর্থনৈতিক নয়, বরং প্রাতিষ্ঠানিক আস্থার সংকটে রূপ নিয়েছে। এই বাস্তবতায় বিএনপির ইশতেহারে ব্যাংকিং সংস্কারকে একটি আলাদা ও গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হিসেবে চিহ্নিত করা পরিকল্পনার যৌক্তিকতাকে শক্তিশালী করে। তবে বাস্তবায়নের প্রশ্নে এখানেই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ নিহিত। ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ কমানো বা রাজস্ব ব্যবস্থা শক্তিশালী করা কেবল নীতিগত ঘোষণার মাধ্যমে সম্ভব নয়। বিগত অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে যতক্ষণ পর্যন্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কার্যকর স্বাধীনতা, স্বচ্ছ নিয়োগ ব্যবস্থা এবং রাজনৈতিক হস্তক্ষেপমুক্ত আর্থিক শাসন নিশ্চিত না হয়, ততক্ষণ সংস্কারের উদ্যোগ বারবার সীমাবদ্ধতার মুখে পড়বে। বিএনপির ইশতেহার এখানে যে জায়গায় তুলনামূলকভাবে শক্ত, তা হলো এই প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের ওপর জোর। অর্থনৈতিক সংকটকে তারা নৈতিক বিচ্যুতি বা একক গোষ্ঠীর ব্যর্থতা হিসেবে নয়, বরং ব্যবস্থাগত দুর্বলতার ফল হিসেবে উপস্থাপন করেছে।
শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির ক্ষেত্রেও একই ধরনের বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হবে। গত এক দশকে অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগ বাড়লেও কর্মসংস্থানের গুণগত উন্নয়ন সে অনুপাতে হয়নি, বিশেষ করে তরুণ ও শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর মধ্যে বেকারত্ব একটি নীরব সংকটে পরিণত হয়েছে। বিএনপির ইশতেহারে রপ্তানি বৈচিত্র্য, এসএমই খাত ও বেসরকারি বিনিয়োগের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, যা নীতিগতভাবে যথার্থ। তবে এসব উদ্যোগ তখনই বাস্তবায়নযোগ্য হবে, যখন নীতির ধারাবাহিকতা, আইনের শাসন এবং প্রশাসনিক জটিলতা কমানোর বিষয়ে রাজনৈতিক সদিচ্ছা দৃশ্যমান হবে। এই প্রেক্ষাপটে অর্থনৈতিক অংশকে বাস্তবায়নযোগ্য করতে হলে বিএনপির ইশতেহারকে কয়েকটি ক্ষেত্রে আরও স্পষ্ট কাঠামোর দিকে যেতে হবে। প্রথমত, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা ও ব্যাংকিং নিয়ন্ত্রণব্যবস্থাকে আইনি ভিত্তিতে শক্তিশালী করার একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, রাষ্ট্রীয় ব্যাংকগুলোর পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনায় পেশাদারিত্ব নিশ্চিত না হলে খেলাপি ঋণ সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। তৃতীয়ত, রাজস্ব ব্যবস্থায় কর-জিডিপি অনুপাত বাড়াতে হলে কর প্রশাসনের ডিজিটাল সংস্কার ও হয়রানিমুক্ত কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। চতুর্থত, কর্মসংস্থান ও শিল্পায়নের লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নকে অর্থনৈতিক নীতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করা জরুরি। সব মিলিয়ে বলা যায়, অর্থনীতি বিষয়ে বিএনপির ইশতেহার উচ্চাকাঙ্ক্ষী হলেও পুরোপুরি কল্পনাপ্রসূত নয়। এটি নৈতিক বা আদর্শিক পরীক্ষার চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ও বাস্তব কাঠামোর ওপর, যা একে অন্যান্য রাজনৈতিক দলের অনেক ইশতেহার থেকে আলাদা করে। তবে এই উচ্চাকাঙ্ক্ষা বাস্তবে রূপ নেবে কি না, তা শেষ পর্যন্ত নির্ভর করবে রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা এবং ক্ষমতার ব্যবহারে সংযম প্রদর্শনের ওপর। অর্থনৈতিক সংস্কার তখনই কাগজের প্রতিশ্রুতি ছাড়িয়ে বাস্তবতায় রূপ নেবে, যখন তা রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও প্রশাসনিক আচরণে প্রতিফলিত হবে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও অবকাঠামো: সংখ্যার বাইরে দক্ষতার প্রশ্ন: বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও অবকাঠামো খাতকে উন্নয়ন এজেন্ডার একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি, জ্বালানি উৎসের বৈচিত্র্য এবং নবায়নযোগ্য শক্তিতে অগ্রসর হওয়ার কথা ইশতেহারে স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে। পরিকল্পনার যৌক্তিকতা এখানে প্রশ্নাতীত; কারণ গত এক দশকে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা সংখ্যাগতভাবে বাড়লেও সরবরাহের স্থায়িত্ব, উৎপাদন ব্যয় এবং ভোক্তা পর্যায়ে মূল্য নিয়ন্ত্রণ- এই তিনটি ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত দক্ষতা অর্জিত হয়নি। অর্থাৎ সমস্যাটি এখন আর শুধু কত মেগাওয়াট উৎপাদন করা হলো’, সে প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নয়; বরং কীভাবে, কোন শর্তে এবং কতটা টেকসইভাবে’ বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ করা হচ্ছে, সেটিই মূল ইস্যু। এই বাস্তবতায় বিএনপির ইশতেহারে দক্ষতা ও স্বচ্ছতার ওপর জোর দেওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি। বিদ্যুৎ খাতে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিভিত্তিক দায়, বিশেষ করে ক্যাপাসিটি চার্জ এবং জ্বালানি আমদানিনির্ভর উৎপাদন কাঠামো যে রাষ্ট্রীয় অর্থনীতির ওপর বড় ধরনের ভর্তুকি চাপ তৈরি করেছে, এটি এখন কেবল রাজনৈতিক বিতর্ক নয়, বরং অর্থনৈতিক বাস্তবতা। বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকির বোঝা প্রতিবছর জাতীয় বাজেটে উল্লেখযোগ্য অংশ দখল করে, যা শিক্ষা, স্বাস্থ্য বা সামাজিক সুরক্ষার মতো খাতে ব্যয় সংকুচিত করে। এই প্রেক্ষাপটে ইশতেহারে চুক্তি পুনর্মূল্যায়ন ও স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনার কথা বলা পরিকল্পনার যৌক্তিকতাকে শক্তিশালী করে।
তবে বাস্তবায়নের প্রশ্নে এখানেই সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা রয়ে যায়। বিদ্যুৎ খাতের চুক্তিভিত্তিক দায় কমানো কেবল প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের বিষয় নয়; এটি রাজনৈতিক সাহস, আন্তর্জাতিক চুক্তি পুনর্বিবেচনা এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত। বিএনপির ইশতেহারে দক্ষতা ও স্বচ্ছতার কথা বলা হলেও, কীভাবে বিদ্যমান চুক্তিগুলো পুনর্মূল্যায়ন করা হবে, ভর্তুকি ধাপে ধাপে কমানো হবে, কিংবা জ্বালানি আমদানিনির্ভরতা থেকে বেরিয়ে আসা হবে, এসব বিষয়ে নির্দিষ্ট রোডম্যাপ তুলনামূলকভাবে কম স্পষ্ট। ফলে এই অংশটি বাস্তবায়নযোগ্য হলেও তাৎক্ষণিকভাবে সহজ নয়।
নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রশ্নে ইশতেহারের অবস্থান নীতিগতভাবে সময়োপযোগী। জলবায়ু পরিবর্তন, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং বৈদেশিক মুদ্রার চাপ, এই তিনটি ইস্যুই নবায়নযোগ্য শক্তিতে বিনিয়োগের প্রয়োজনীয়তাকে জোরালো করে তুলেছে। তবে বাস্তবতায় দেখা গেছে, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে আগ্রহ ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে বাস্তব বিনিয়োগ ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা গড়ে ওঠেনি। এখানে বিএনপির ইশতেহারের শক্তি হলো, নবায়নযোগ্য শক্তিকে বিকল্প নয়, বরং ভবিষ্যৎ জ্বালানি কৌশলের অংশ হিসেবে উপস্থাপন করা। দুর্বলতা হলো-এ খাতে বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য কী ধরনের নীতিগত প্রণোদনা বা কাঠামো প্রয়োজন, সে বিষয়ে বিস্তারিত দিকনির্দেশনার অভাব। অবকাঠামো উন্নয়নের ক্ষেত্রেও একই ধরনের টানাপোড়েন লক্ষ্য করা যায়। গত এক দশকে বাংলাদেশে বড় আকারের অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে; কিন্তু এসব প্রকল্পের অর্থনৈতিক দক্ষতা, ব্যয়–লাভ বিশ্লেষণ এবং দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে বিভিন্ন গবেষণা ও নিরীক্ষায়। বিএনপির ইশতেহারে অবকাঠামোকে উন্নয়নের চালিকা শক্তি হিসেবে দেখা হলেও, ভবিষ্যতে অবকাঠামো বিনিয়োগের ক্ষেত্রে দক্ষতা, প্রয়োজনীয়তা ও স্বচ্ছতা-এই তিনটি মানদণ্ডকে কতটা অগ্রাধিকার দেওয়া হবে, তা বাস্তবায়নের সময়েই পরীক্ষিত হবে।
এই প্রেক্ষাপটে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতকে কেবল উন্নয়ন পরিসংখ্যানের বাইরে এনে দক্ষতা ও টেকসই ব্যবস্থাপনার আওতায় আনতে হলে বিএনপির ইশতেহারকে কয়েকটি ক্ষেত্রে আরও স্পষ্ট হতে হবে। প্রথমত, বিদ্যুৎ খাতের চুক্তিগুলোর একটি স্বাধীন ও পেশাদার পুনর্মূল্যায়ন ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন, যাতে রাষ্ট্রীয় স্বার্থ সুরক্ষিত থাকে। দ্বিতীয়ত, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগের জন্য দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত নিশ্চয়তা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা গড়ে তুলতে হবে। তৃতীয়ত, অবকাঠামো উন্নয়নে প্রকল্প বাছাইয়ের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক অগ্রাধিকারের বদলে অর্থনৈতিক কার্যকারিতা ও সামাজিক প্রয়োজনকে প্রাধান্য দিতে হবে। সব মিলিয়ে বলা যায়, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও অবকাঠামো বিষয়ে বিএনপির ইশতেহার সংখ্যার রাজনীতি থেকে দক্ষতার রাজনীতিতে যাওয়ার একটি নীতিগত ইঙ্গিত দেয়। এটি অন্য অনেক রাজনৈতিক দলের তুলনায় বেশি বাস্তববাদী অবস্থান। তবে এই অবস্থান বাস্তবে রূপ নেবে কি না, তা নির্ভর করবে রাজনৈতিক ধারাবাহিকতা, চুক্তিভিত্তিক স্বার্থের সঙ্গে মোকাবিলা করার সাহস এবং দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি কৌশলের প্রতি অঙ্গীকারের ওপর। উন্নয়ন তখনই অর্থবহ হবে, যখন তা দক্ষতা, স্বচ্ছতা ও টেকসই ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত হবে।
আঞ্চলিক ও অঞ্চলভিত্তিক উন্নয়ন: বৈষম্য নিরসনের বাস্তব পথ: বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারের একটি তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী ও সময়োপযোগী দিক হলো অঞ্চলভিত্তিক উন্নয়নের প্রতি সুস্পষ্ট মনোযোগ। উত্তরাঞ্চল, উপকূলীয় এলাকা, হাওর-বাঁওড়, পার্বত্য অঞ্চল এবং শহর–গ্রাম বৈষম্য , এই ভৌগোলিক ও সামাজিক বাস্তবতাগুলোকে আলাদা করে চিহ্নিত করা হয়েছে। পরিকল্পনার যৌক্তিকতা এখানে বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক; কারণ বাংলাদেশের উন্নয়ন দীর্ঘদিন ধরেই রাজধানী ও কিছু নির্দিষ্ট নগরকেন্দ্রিক অঞ্চলে কেন্দ্রীভূত থেকেছে। বিভিন্ন জাতীয় পরিকল্পনা ও গবেষণায় দেখা যায়, ঢাকা ও তার আশপাশের অঞ্চলের সঙ্গে উত্তরাঞ্চল বা উপকূলীয় এলাকার আয়, কর্মসংস্থান ও অবকাঠামোগত সুযোগের পার্থক্য ক্রমেই প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে। এই বাস্তবতার আলোকে বিএনপির ইশতেহারে অঞ্চলভিত্তিক উন্নয়নকে কেবল সামাজিক ন্যায়ের প্রশ্ন হিসেবে নয়, বরং রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন কৌশলের একটি কাঠামোগত উপাদান হিসেবে দেখা হয়েছে। বিশেষ করে কৃষি, যোগাযোগ, শিল্প ও কর্মসংস্থানকে অঞ্চলভিত্তিক বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত করার যে ইঙ্গিত ইশতেহারে পাওয়া যায়, তা পরিকল্পনার দিক থেকে বাস্তবসম্মত। উত্তরাঞ্চলের মৌসুমি দারিদ্র্য, উপকূলের জলবায়ু ঝুঁকি, হাওরের অবকাঠামোগত বিচ্ছিন্নতা কিংবা পার্বত্য অঞ্চলের যোগাযোগ ও প্রশাসনিক জটিলতা, এসব সমস্যাকে একক জাতীয় নীতির ভেতরে সমাধান করা সম্ভব নয়; বরং অঞ্চলভিত্তিক নীতি ও বাজেট বরাদ্দ প্রয়োজন।
তবে বাংলাদেশের উন্নয়ন অভিজ্ঞতা বলছে অঞ্চলভিত্তিক উদ্যোগ প্রায়ই প্রকল্পনির্ভর হয়ে পড়ে, যা রাজনৈতিক মেয়াদ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কার্যকারিতা হারায়। বিএনপির ইশতেহারে এই ঝুঁকি এড়ানোর একটি সম্ভাব্য দিক হলো প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ ও স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করার ওপর জোর। এটি অন্য অনেক রাজনৈতিক দলের ইশতেহারের তুলনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য তৈরি করে। বিএনপি উন্নয়নের প্রশ্নটিকে প্রশাসনিক ক্ষমতা ও অবকাঠামোগত বিনিয়োগের সঙ্গে যুক্ত করেছে। তবে এই প্রস্তাব বাস্তবায়নযোগ্য করতে হলে স্থানীয় সরকারকে কেবল দায়িত্ব নয়, বাস্তব ক্ষমতাও দিতে হবে। স্থানীয় সরকারের আর্থিক স্বায়ত্তশাসন, নিজস্ব রাজস্ব ব্যবস্থাপনা এবং উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণের ক্ষমতা ছাড়া অঞ্চলভিত্তিক উন্নয়ন টেকসই হবে না। বর্তমানে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো কেন্দ্রীয় বাজেট ও প্রশাসনের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল, যা স্থানীয় চাহিদা অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতাকে সীমিত করে। বিএনপির ইশতেহারে বিকেন্দ্রীকরণের কথা থাকলেও, বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে এই নির্ভরশীলতা কীভাবে কমানো হবে সেটিই বড় প্রশ্ন।
এই প্রেক্ষাপটে অঞ্চলভিত্তিক উন্নয়নকে কার্যকর করতে হলে বিএনপির ইশতেহারকে তিনটি ক্ষেত্রে আরও স্পষ্ট কাঠামো উপস্থাপন করতে হবে। প্রথমত, অঞ্চলভিত্তিক উন্নয়ন পরিকল্পনাকে পাঁচ বছর মেয়াদি প্রকল্পের বাইরে এনে দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর আওতায় আনতে হবে। দ্বিতীয়ত, স্থানীয় সরকারকে আর্থিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতা দেওয়ার পাশাপাশি জবাবদিহির শক্তিশালী ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যাতে বিকেন্দ্রীকরণ দুর্নীতির নতুন ক্ষেত্র না হয়ে ওঠে। তৃতীয়ত, জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ ও প্রান্তিক অঞ্চলের জন্য আলাদা নীতি ও বাজেট কাঠামো নির্ধারণ করা প্রয়োজন, যা জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনার সঙ্গে সমন্বিত থাকবে।
ধর্ম, সমাজ ও সংস্কৃতি: সংযত সহাবস্থানের নীতিগত অবস্থান: বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে ধর্ম, সমাজ ও সংস্কৃতির প্রশ্নটি যে ভঙ্গিতে উপস্থাপিত হয়েছে, তা বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তুলনামূলকভাবে সংযত ও ভারসাম্যপূর্ণ। ধর্মীয় স্বাধীনতা, সামাজিক সংহতি এবং সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদ, এই তিনটি বিষয়কে তারা রাষ্ট্রীয় ধর্মনিরপেক্ষতার সাংবিধানিক কাঠামোর ভেতরেই ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছে। এখানে ধর্মকে রাষ্ট্র পরিচালনার সরাসরি নীতিগত ভিত্তি হিসেবে নয়, বরং নাগরিক জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক বাস্তবতা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। এই অবস্থান পরিকল্পনার দিক থেকে বাস্তবসম্মত; কারণ বাংলাদেশের সমাজ ঐতিহাসিকভাবে বহুধর্মীয়, এবং রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে সহাবস্থান ও সহনশীলতার নীতি ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা অর্জন করা কঠিন। তবে বাস্তবায়নের প্রশ্নে এখানেও বড় চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। ধর্মীয় সহাবস্থান কেবল নীতিগত ঘোষণার মাধ্যমে নিশ্চিত করা যায় না; বরং তা নির্ভর করে রাষ্ট্রের আইনি ও প্রশাসনিক আচরণের ওপর। সাম্প্রতিক দশকগুলোতে বিভিন্ন সময়ে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা, ধর্মীয় স্থাপনার সুরক্ষা এবং সাম্প্রদায়িক সহিংসতা রোধে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার দুর্বলতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এই বাস্তবতার আলোকে বিএনপির ইশতেহারে ধর্মীয় স্বাধীনতার কথা বলা গুরুত্বপূর্ণ হলেও, এর সফল বাস্তবায়নের জন্য আইনের শাসন ও নিরপেক্ষ প্রশাসনের কার্যকর উপস্থিতি অপরিহার্য।
সমাজ ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও বিএনপির অবস্থান তুলনামূলকভাবে অন্তর্ভুক্তিমূলক। ক্রীড়া, সংস্কৃতি, গণমাধ্যম ও নাগরিক পরিসরকে সামাজিক সংহতির উপাদান হিসেবে দেখা হয়েছে, যা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইশতেহারে সবসময় স্পষ্টভাবে উঠে আসে না। তবে এখানেও বাস্তবায়নের বড় প্রশ্ন হলো রাজনৈতিক সহিংসতা, মতপ্রকাশের সীমাবদ্ধতা এবং দলীয়করণ কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হবে। সংস্কৃতি ও গণমাধ্যম তখনই সামাজিক সংহতির ভূমিকা রাখতে পারে, যখন সেগুলো রাষ্ট্রীয় বা দলীয় চাপ থেকে তুলনামূলকভাবে মুক্ত থাকে।
এই প্রেক্ষাপটে ধর্ম, সমাজ ও সংস্কৃতির বিষয়ে বিএনপির ইশতেহারকে বাস্তবায়নযোগ্য করতে হলে কয়েকটি বিষয়ে সুস্পষ্ট অবস্থান প্রয়োজন। প্রথমত, সংখ্যালঘু নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনি প্রতিকার ও দ্রুত বিচার ব্যবস্থাকে কার্যকর করতে হবে, যাতে সহিংসতা বা বৈষম্যের ঘটনায় দৃষ্টান্তমূলক জবাবদিহি প্রতিষ্ঠিত হয়। দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক সহিংসতা ও ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহার রোধে দলীয় আচরণবিধি ও আইন প্রয়োগে কঠোরতা দেখাতে হবে। তৃতীয়ত, সংস্কৃতি ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত না হলে সামাজিক সংহতির ধারণা কেবল নীতিগত বক্তব্যে সীমাবদ্ধ থাকবে।
ক্রীড়া, গণমাধ্যম ও নাগরিক পরিসর: সামাজিক শক্তি ও রাষ্ট্রীয় ভারসাম্যের প্রশ্ন: বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে ক্রীড়া, গণমাধ্যম ও নাগরিক পরিসরকে যেভাবে সামাজিক শক্তি হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে, তা বাংলাদেশের নির্বাচনী রাজনীতিতে তুলনামূলকভাবে নতুন ও তাৎপর্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি। সাধারণত রাজনৈতিক ইশতেহারে এসব ক্ষেত্রকে আনুষঙ্গিক বা বিনোদনমূলক বিষয় হিসেবে দেখা হলেও, বিএনপি এগুলোকে সামাজিক সংহতি, নাগরিক অংশগ্রহণ ও গণতান্ত্রিক চর্চার সহায়ক উপাদান হিসেবে বিবেচনা করেছে। পরিকল্পনার যৌক্তিকতা এখানেই নিহিত, কারণ ক্রীড়া, গণমাধ্যম ও উন্মুক্ত নাগরিক পরিসর একটি সমাজের রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও গণতান্ত্রিক স্বাস্থ্য নির্ধারণে নীরব কিন্তু গভীর ভূমিকা রাখে।
ক্রীড়ার ক্ষেত্রে ইশতেহারের অবস্থান নীতিগতভাবে ইতিবাচক। ক্রীড়াকে শুধু আন্তর্জাতিক সাফল্যের মাপকাঠিতে নয়, বরং তরুণদের সম্পৃক্ততা, শৃঙ্খলা ও সামাজিক সংহতির মাধ্যম হিসেবে দেখার প্রবণতা এখানে লক্ষণীয়। বাংলাদেশের বাস্তবতায়, যেখানে তরুণ জনগোষ্ঠী একটি বড় জনসংখ্যাগত শক্তি, সেখানে ক্রীড়ার প্রাতিষ্ঠানিক বিকাশ কর্মসংস্থান, সামাজিক অন্তর্ভুক্তি এবং অপরাধপ্রবণতা হ্রাসে ভূমিকা রাখতে পারে। তবে বাস্তবায়নের প্রশ্নে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ক্রীড়া প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয়করণ ও প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ থেকে মুক্ত রাখা। অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, ক্রীড়া খাত রাজনৈতিক প্রভাবের শিকার হলে দক্ষতা ও প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ নষ্ট হয়, যা ইশতেহারের ঘোষিত লক্ষ্য অর্জনে বাধা সৃষ্টি করে।
গণমাধ্যম বিষয়ে বিএনপির অবস্থান তুলনামূলকভাবে সংযত ও নীতিগত। গণমাধ্যমকে সামাজিক জবাবদিহি ও মতপ্রকাশের মাধ্যম হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে, যা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মৌলিক শর্ত। পরিকল্পনার যৌক্তিকতা এখানেও স্পষ্ট; কারণ স্বাধীন ও দায়িত্বশীল গণমাধ্যম ছাড়া দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার বা নীতিগত ব্যর্থতা জনসমক্ষে আসা সম্ভব নয়। তবে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে স্বাধীনতা ও নিয়ন্ত্রণের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে গিয়ে যেন দায়িত্বহীনতা বা তথ্যের অপব্যবহার না ঘটে, আবার নিয়ন্ত্রণের নামে যেন মতপ্রকাশের স্বাধীনতা খর্ব না হয়। এই সূক্ষ্ম ভারসাম্য রক্ষা করা রাষ্ট্রের জন্য একটি কঠিন কিন্তু অপরিহার্য কাজ।
নাগরিক পরিসরের প্রশ্নটি এই আলোচনায় বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। বিএনপির ইশতেহারে নাগরিক পরিসরকে সামাজিক সংলাপ, মতবিনিময় ও গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণের ক্ষেত্র হিসেবে দেখার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। এটি পরিকল্পনার দিক থেকে তাৎপর্যপূর্ণ; কারণ নাগরিক পরিসর সংকুচিত হলে গণতন্ত্র কেবল নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। তবে বাস্তবতায় দেখা গেছে, রাজনৈতিক সহিংসতা, দলীয় দখলদারিত্ব এবং মতপ্রকাশের ওপর অঘোষিত সীমাবদ্ধতা নাগরিক পরিসরের কার্যকারিতা কমিয়ে দিয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে ইশতেহারের নীতিগত অবস্থান বাস্তবায়নযোগ্য করতে হলে প্রশাসনিক আচরণ ও রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে মৌলিক পরিবর্তন প্রয়োজন। এই অংশে বিএনপির ইশতেহারকে অন্য অনেক রাজনৈতিক দলের তুলনায় তুলনামূলকভাবে আধুনিক বলা যায়। যেখানে অনেক দল ক্রীড়া ও গণমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণের বিষয় হিসেবে দেখে, বিএনপি সেগুলোকে সামাজিক শক্তি হিসেবে দেখার চেষ্টা করেছে। তবে এই দৃষ্টিভঙ্গি বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে ক্ষমতায় এলে দলীয় স্বার্থের বাইরে গিয়ে এসব খাতে স্বায়ত্তশাসন ও পেশাদারিত্ব নিশ্চিত করার সদিচ্ছার ওপর। এই প্রেক্ষাপটে ক্রীড়া, গণমাধ্যম ও নাগরিক পরিসরকে কার্যকর সামাজিক শক্তিতে রূপ দিতে হলে বিএনপির ইশতেহারকে কয়েকটি ক্ষেত্রে আরও স্পষ্ট হতে হবে। প্রথমত, ক্রীড়া প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচালনায় রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ রোধে স্বচ্ছ ও স্বাধীন প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। দ্বিতীয়ত, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি নৈতিকতা ও পেশাদার মান বজায় রাখতে স্বনিয়ন্ত্রিত কাঠামোকে উৎসাহিত করতে হবে। তৃতীয়ত, নাগরিক পরিসর সুরক্ষায় শান্তিপূর্ণ সমাবেশ, মতপ্রকাশ ও সংগঠনের অধিকার বাস্তবে কার্যকর করার জন্য আইন প্রয়োগে সংযম ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা জরুরি।
বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারকে যদি কেবল রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির দলিল হিসেবে দেখা হয়, তবে তা নিঃসন্দেহে অতিরিক্ত উচ্চাকাঙ্ক্ষী বলে মনে হতে পারে। কিন্তু যদি এটিকে একটি রাষ্ট্র পুনর্গঠনের নীতিগত কাঠামো হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তাহলে এটি বাংলাদেশের রাজনীতিতে তাৎক্ষণিক নির্বাচনী হিসাবের বাইরে গিয়ে রাষ্ট্র ও শাসনব্যবস্থা নিয়ে একটি গভীর আলোচনার ক্ষেত্র তৈরি করে। এই ইশতেহার রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, অর্থনীতি, আঞ্চলিক বৈষম্য ও সামাজিক সহাবস্থানের প্রশ্নগুলোকে বিচ্ছিন্নভাবে নয়, বরং একটি সমন্বিত কাঠামোর মধ্যে দেখার চেষ্টা করেছে, যা বাংলাদেশের নির্বাচনী রাজনীতিতে তুলনামূলকভাবে বিরল। এই ইশতেহারের প্রধান শক্তি হলো, এটি স্বপ্ন দেখানোর পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় কাঠামো, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ও বাস্তবতার সীমাবদ্ধতাকেও স্বীকার করে। এই লক্ষ্যগুলো কতটা কার্যকর হবে, তা অনেকাংশেই নির্ভর করবে সরকার গঠনের পর বাস্তবায়ন রোডম্যাপ, সময়সীমা এবং রাজনৈতিক ঐকমত্য গঠনের প্রক্রিয়া কীভাবে রূপ পায় তার ওপর। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, কাগজে লেখা সংস্কার বাস্তবে সফল হয় তখনই, যখন তা দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে প্রাতিষ্ঠানিক ধারাবাহিকতা ও গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত হয়। শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি তাই ইশতেহারের ভাষা নিয়ে নয়, বরং রাজনৈতিক আচরণ ও রাষ্ট্র পরিচালনার দর্শন নিয়ে। বিএনপির ইশতেহার যদি ক্ষমতার পালাবদলের দলিল না হয়ে রাষ্ট্র পুনর্গঠনের একটি সর্বজনীন রূপরেখায় পরিণত হতে পারে, তাহলেই এটি কেবল নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি নয়, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি অর্থবহ দলিল হিসেবে বিবেচিত হবে।
লেখক:
ড. মো: হাছান উদ্দীন
অধ্যাপক
ফিন্যান্স এন্ড ব্যাংকিং বিভাগ
পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]
জেএইচ/এএসএম
What's Your Reaction?