লতিফ জোয়ার্দারের কবিতা : কিছুই হইনি আমি! কিছু হতে পারিনি

 কিছুই হইনি আমি! কিছু হতে পারিনি  কোথাও কোনো আগুন নেই। অথচ পুড়ে যাচ্ছি আমি। কত সহস্র তীর ঘেষে দিগন্তে জমে উঠেছে রাজ্যের আগাছা। ফুলের রেণুর মতো একটি আন্তঃনগর ট্রেনের স্টপেজ যেন আমি। কোলাহল থেমে গেলে ঝরে পড়া পাপড়ি হবো। অতঃপর আজ দীর্ঘদিন পর তোমাকে দেখে মনে হলো, তুমি যেন আমার দীর্ঘ আরও একটি কবিতা। দীর্ঘ সময়। দীর্ঘ বছর। তুমি যেন আমার শরৎ, হেমন্ত,শীত,বসন্ত। তুমি যেন দীর্ঘ বর্ষায় নদীর প্লাবন। তুমি উচ্ছ্বাস আমার। উৎকণ্ঠা আমার। পেয়ারা পাতার প্রিয় পড়শি আমার। তুমি খোলা চুলে আমার মেঘের আকাশ। তোমাকে দেখলেই আমি প্রতিদিন কবি হই। তুমি প্রতিদিন কবিতা হও আমার। এভাবেই আমি একটি বেনসন সিগারেট ফেলে ছুটে যাই গারো পাহাড়ে নীল প্রজাপতি হয়ে। বর্ণিল প্রকৃতির রূপ দেখে দেখে একটা তুমি যেন দ্বিখণ্ডিত সত্তা আজ আমার । তুমিই তো! দূর অশ্বত্থের ছায়া হয়ে আছো আমার হৃদয়ে। অনিশ্চিত গন্তব্যের খোঁজে পথিক যেমন হারিয়ে ফেলে কত কত পিছন স্মৃতি। আজ আবার সারাটা দিন শেষে আকাশের রঙ হয়ে জেগে উঠবো আমরা। হাতের রেখায় লিখবো মহাকালের ঠিকানা।  সাদা অন্ধকার সাদা অন্ধকারে শতবর্ষী একটা স্টেশন ডুবে গেলে, কুয়াশায় হারিয়ে যায় মধ্যরাতের লোকাল ট্র

লতিফ জোয়ার্দারের কবিতা : কিছুই হইনি আমি! কিছু হতে পারিনি

 কিছুই হইনি আমি! কিছু হতে পারিনি 

কোথাও কোনো আগুন নেই। অথচ পুড়ে যাচ্ছি আমি। কত সহস্র তীর ঘেষে দিগন্তে জমে উঠেছে রাজ্যের আগাছা। ফুলের রেণুর মতো একটি আন্তঃনগর ট্রেনের স্টপেজ যেন আমি। কোলাহল থেমে গেলে ঝরে পড়া পাপড়ি হবো। অতঃপর আজ দীর্ঘদিন পর তোমাকে দেখে মনে হলো, তুমি যেন আমার দীর্ঘ আরও একটি কবিতা। দীর্ঘ সময়। দীর্ঘ বছর। তুমি যেন আমার শরৎ, হেমন্ত,শীত,বসন্ত। তুমি যেন দীর্ঘ বর্ষায় নদীর প্লাবন। তুমি উচ্ছ্বাস আমার। উৎকণ্ঠা আমার। পেয়ারা পাতার প্রিয় পড়শি আমার। তুমি খোলা চুলে আমার মেঘের আকাশ। তোমাকে দেখলেই আমি প্রতিদিন কবি হই। তুমি প্রতিদিন কবিতা হও আমার। এভাবেই আমি একটি বেনসন সিগারেট ফেলে ছুটে যাই গারো পাহাড়ে নীল প্রজাপতি হয়ে। বর্ণিল প্রকৃতির রূপ দেখে দেখে একটা তুমি যেন দ্বিখণ্ডিত সত্তা আজ আমার । তুমিই তো! দূর অশ্বত্থের ছায়া হয়ে আছো আমার হৃদয়ে। অনিশ্চিত গন্তব্যের খোঁজে পথিক যেমন হারিয়ে ফেলে কত কত পিছন স্মৃতি। আজ আবার সারাটা দিন শেষে আকাশের রঙ হয়ে জেগে উঠবো আমরা। হাতের রেখায় লিখবো মহাকালের ঠিকানা। 


সাদা অন্ধকার


সাদা অন্ধকারে শতবর্ষী একটা স্টেশন ডুবে গেলে, কুয়াশায় হারিয়ে যায় মধ্যরাতের লোকাল ট্রেন। তবুও প্লাটফর্মের যাত্রী ছাউনির নিচে দাঁড়িয়ে থাকে মাঘের শীত। আজ হয়তো কোনো একজন কবির বিষণ্নতার মতো রেললাইনগুলো ছুটে চলে গেছে গন্তব্য রেখে। দূর আকাশের তারাদের সাথে কথা বলে যদি রাত শেষ হয় আজ। আবার সবুজ মটরশুঁটি খেতের আইলের নির্জনতায় ফিরে তাকাবো আমি। নতুন করে একটা মধ্য রাতের লোকাল ট্রেন জন্য, যে একবার কবি অথচ বারবার দুরন্ত পাঠক।

কবি


আমাকে একদিন ক্লাস টিচার একটা দেশের ছবি আঁকতে বললেন, আর আমি আঁকলাম তোমার ছবি। তারপর থেকে আমার হৃদয়ে অনন্ত অসুখ। আর দিনে দিনে আমি হয়ে গেলাম কবি!

রঙ বদলের রহস্য


আজও নিজেকে পরিত্যক্ত রেলস্টেশন মনে হয় আমার । বনবীথিকা যেমন। নিরবতার অলস দুপুর। মনে পড়ে তোমার পা থেকে খসে পরেছিলো একদিন রূপার নূপুর। যা বলার ছিলো। বলা হয়নি সে কথা। তার উত্তাপে সরস গল্পগাছা নির্বোধ এলোবেলায় চুল শুকানো রোদের মতো, কবে কখন চলে গেছে সেই বেলা। কতদিন ছিলো দীর্ঘ যাত্রায় অপরিচিত বালকবেলার কথোপকথনের মতো। ভিড়ের মাঝে আজও তো কত কাছাকাছি থাকি। পঙক্তি পর পঙক্তি সাজাই। আবার ডিলিট অপশন হাতের মুঠোয় নিয়ে চুপচাপ বসে থাকি। দুর্দান্ত মেঘের আগুনের রঙ বদলের রহস্য হতে পারি। তবুও প্রতিদিন অসংখ্য ব্যথার আয়নায় দেখি, তোমার আমার সেই চিরচেনা আড়ি।

নস্টালজিক ভাবনা


চিনিকলের চিমনির ধোঁয়ার মতো উড়ে যাচ্ছে মেঘ, রোদের গন্ধ ছুঁয়ে মেঠোপথ ধরে গাংমাথাল গ্রাম থেকে দূরে।  প্রকৃতি নিস্তব্ধ হলে বেদনার পাহাড় সমান মনে হয় নিজেকে। অতঃপর তুমি যেমন অদৃশ্য আড়ালে উঁকি দাও একা। মনে করো, আমাদের কত বছর আগে একদিন হয়েছিলো দেখা। আন্তঃনগর ট্রেন চলে গেলে নীরবতার বরফও গলে যেতেই পারে। সকল অবহেলায় বারবার জ্বলে উঠুক নস্টালজিক ভাবনায় তোমার প্রিয়মুখ।

শান্ত রমণীর ছায়া


দ্বি-তলা বাড়ির প্রশস্ত ছাদে, লাইলন দড়িতে কাপড় শুকচ্ছে এক মধ্য বয়সী দুপুর । অথচ আমি খোলা জানালায় তাকিয়ে আছি দৃষ্টি সীমানা প্রাচীরের নিকট থেকে। আর তুমি সিঁড়িতে পায়ের চিহ্ন রেখে হেঁটে যাচ্ছো ছাদের রেলিঙের দিকে। আজ দৈনিকের সাহিত্য পাতার অসংখ্য কবিতার ভিড়ে তোমাকে বিষণ্ন অণুগল্প মনে হলো আমার। সাদা শালিকের ওড়াউড়ি আর মৌসুমি ফুলের টবে জল শুকিয়ে যাওয়ার কষ্টগলো চুলের বেণির বুননে রেখে, উদাস আকাশের কোলে একটুকরো মেঘে ঢেকে রেখেছো সমস্ত হৃদয়ের কাশবন। যদি বলি, পুরো শহরের বড় বড় বাড়িগুলোকে আজ রেইনট্রি কড়ই বৃক্ষ মনে হচ্ছে আমার। অথচ তুমি এক শান্ত রমণীর ছায়ার মতো করে, অনবদ্য বাদনে কণ্ঠে তুলে নিচ্ছো রবীন্দ্র গীতি।

তোমাকে চাই


তোমাকে পাওয়ার চেয়ে, চাওয়াতে অন্যরকম পুলকিত হই। এক অন্যরকম আনন্দে অবগাহন করি। তোমার জন্য লিখি, নিশিযাপন করি। তোমাকে পাঠ করি মেরিগোল্ড ফুলের মতো। তোমাকে দেখলে যেমন মুগ্ধ মায়ায় ডুবে যাই। তুমি হেঁটে গেলে সাগর জলের গল্প হয়ে যায় আমাদের। আবার আমার বুকে আছড়ে পড়ে দুরন্ত রাঙা জলরাশি। কতটা পাশাপাশি আছি। কতটা পাশাপাশি হেঁটে যাই। তোমার ফুলের বাগান হই। বারান্দায় কাপড় হয়ে ঝুলে থাকি। ছাদবাগানের সিঁড়ি হই। আর তোমার মধ্যরাতের দীর্ঘশ্বাস চুরি করে কবিতা লিখি। পৌষের শীতের শেষে আবার নতুন করে তোমাকে চাই।


আবু হাসান শাহরিয়ার 


নদীর কঙ্কাল নিয়ে দাড়িয়াবান্ধা মাঠের পাশে দাঁড়িয়ে আছে শীত। আর একটু এগিয়ে গেলে হয়তো খুঁজে পাবে    প্রচলিত সঙ্গীত। দূরে নিস্তব্ধ মনের অলিগলি ভিতর রঙ করা পুকুর। আমাদের সবুজ মনের মিটাফোরে আজও বাজে সেই সুর। অব্যাহত থাকবে দরপতনের ভয় আজ দৈনিকের পাতার ভাঁজে। এখনো জেগে আছে নিষিদ্ধ রাত দু'জনার বুকের মাঝে। কাঁচের শহর ভেঙে যাচ্ছে বলে পাইনিকো আজও একটুও ব্যথা। একদিন তার ও তাহার কবিতার সাথে আমার হয়েছিলো দেখা। সে কবিরাজ নয় আমাদের কবি আবু হাসান শাহরিয়ার। তার এক চোখে জ্বলে আগুন আরেক চোখে নীলজল প্রিয়ার।


আমিনুল ইসলাম 


একদিন প্রত্নতত্ত্ব আঁধারে বরেন্দ্রভূমির সন্তান, আমিনুল ইসলাম এর সাথে দেখা হয়েছিল আমার । নীল কোটের পকেটে তার ছিলো অদ্ভুত সবুজ আলোর লিপি। অসংখ্য ব্যথার আয়নায় দেখি, হেঁটে বেড়াচ্ছে পালরাজ্যের পুথি। প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে দূরে নিস্তব্ধ অলিগলিতে ছিলো আমাদের আনাগোনা। অতঃপর একদিন লোকাল ট্রেনে কমলাপুর স্টেশনে নেমে। হেঁটে যাচ্ছি মতিঝিল অফিসার কলোনির দিকে । মাঝপথে তাকিয়ে দেখি কত গল্প, কবিতারা ঘুরে বেড়াচ্ছে দুপুর পোড়া রোদে। আর একটু এগুলে ইট পাথরের সব বহুতল বড় বড় পাহাড়। কখনও কোনদিন মনে হয়নি, এই অস্থির মলিন নগরী আর বইতে পারছে না সবটুকু বেদনার ভার ।

সালেহীন শিপ্রা 


প্রতিদিন উপেক্ষার প্রহর শেষে বেহালার নিঃসঙ্গ সুর হয়ে দেখেছি, প্রতিটি অপেক্ষার কাতরতায় উচ্ছ্বাস হারানোর বেদনার ভিতর কত হৃদ- যন্ত্রণার হাতছানি। প্রতিদিন প্রতিটি অবহেলা শেষে আবার নতুন করে ঘুরে দাঁড়িয়ে বাঁচতে চেয়েছি আমরা। বিশ্বাস হারানো পাখির মতো মুক্তির স্বাদ ভুলে ফিরে গেছি আবারও। প্রান্তজন হয়ে তোমার আকাশের সিড়ি হয়েছি বারবার । বহেরা গাছের নীচে অদ্ভুত নেশায় ডুবে থেকেছি কত কত দিন। যেদিন তোমার হাত ছুঁয়ে দেবার উল্লাসে মাতোয়ারা ছিলো বনবিলাশের ঝোপ। সেদিনও একজন তুমি'র বড় প্রয়োজন ছিলো আমার। আজ দু'জনার ভিন্ন ভুবন। ভিন্ন তৈলচিত্রের ছবি। তবুও তো আজ সালেহীন শিপ্রা তুমি আমাদের কবি।

শফিক হাসান

 
আজ নীল ফড়িং এর মতো উড়ে যাচ্ছে ধূসর রাত । পাশের বাড়ির হাসনাহেনা ফুলের মউ মউ গন্ধে ভরা ছিলো প্রতিটি নিঃশ্বাস। অ্যান্ড্রয়েড ফোনের বাটন চাপতেই ঝাপসা হয়ে এলো চোখের আলো। সেই কবেকার কথা। কবে কবিতার জন্য নোয়াখালী থেকে শাহবাগে পদচিহ্ন এঁকেছিলো কবি শফিক হাসান। তারপর কত কত দিন, কথাসাহিত্যে সে দিয়েছিলো হাত। একদিন তার সাথে আমার হয়েছিলো হঠাৎ সাক্ষাৎ। তার প্রতিটি কথায় ছিলো জাদুবাস্তবতা। মিথ ভেঙে সে একদিন গড়েছিলো কবিতায় আধুনিকতা। বেঁচে আছি মোটামুটি ঠিক তার মতো। হৃদয়ে পুষে রাখি এক দুর্দান্ত ক্ষত।


সুমন শামস


কত শ্বেতশুভ্র আলোয় পুড়ে যাচ্ছে নক্ষত্র। কত রাত অনন্ত হয়ে যায়। জরির পোশাক হবার কত সম্ভাবনা হারিয়ে, এক নগর যন্ত্রণা নিয়ে বেঁচে আছি আমরা। না পাওয়া বিষণ্ন পথের যাত্রী হয়ে। কত নিষিদ্ধ নেশায় ডুবে যাচ্ছে চারপাশ। ভাবনার স্মারক খুঁজে খুঁজে হাজার দিগন্তের ওপারে চলে গেছে যারা। নিস্তব্ধ মনের অলিগলি থেকে দূরে। আমিও ছিলাম হয়তো মিথের চাদর পরে দাঁড়িয়ে। লজিং মাস্টারের মতো কোনো এক বয়সী বিকেল বেলায়। ডেকেছিলাম তোমায় ছুটির আমন্ত্রণে। বিপ্লব ব্যর্থ হলে সফল কবি সুমন শামস হয়ে যাই আমরা।

সাফিনা আক্তার

 
কোনো এক সন্ধ্যাবেলার অনশনে, কাঠ কয়লার আগুনে পুড়ে যাচ্ছে কবি ও কবিতার যৌবন। মৌসুমী পাখির মতো পথের ক্লান্তি নিয়ে চোখে, নতুন ফুলের রেণুর শব যেন ব্লাকহোলে মিলিত রসায়নে নতুন সৃষ্টির উৎসব। মঙ্গলের চাঁদের দুপুর হেঁটে যাচ্ছে বিছিন্ন বেহায়া অন্ধকার। তবুুও আজ বন বাঁদুরের মতো ঝোপ ঝাড়ের সাথে কথা বলি একা একা । সোঁদা মাটির সাথে ফসলের আলোচনা সভায় বলি হৃদয় ভেঙে যাওয়ার ইতিহাস। বর্নিল ব্যথার আয়নায় দেখি আগামী দিনের কবি সাফিনা আক্তার এর মুখছবি ।

মুজিব ইরম 


আটমুটি আর বইতির শাক। কাউন যব আর চিনি। দেউরি ঘরের কথা মনে আছে নিশ্চয়। পাটখড়ির বেড়া। বাহির বাড়ির ফসল শুকানোর গোবর লেপা খোলা। টিলার মতো করে দাঁড়িয়ে থাকা পোয়ালের পালা। টাপ্পুর তোলা গরুর গাড়ি আর আলপথে বসে পান্তা ফুরানোর গল্প। রোপা আমনের মৌ মৌ গন্ধ। ধান ও চৈতালি ফসলের গোলাঘর। পালতোলা নৌকায় নাইওর বাড়ি। লাঙ্গল, জোয়াল,নাংলি, মই আর টোনার কথা। সেই দিনের গ্রামের কথা মনে হলেই এখনও আমার প্রবাসী বাংলাদেশি কবি মুজিব ইরমের কথা মনে পড়ে।


মউ সুমাত্রা 


কোনো এক মধ্যবয়সী বিকেল বেলায় বলেছিলাম কথা তার সাথে। দেখা না হবার সকল সম্ভাবনা পিছনে ফেলে। মুখ তার যেন কলমিলতা ফুল। চোখ যেন তার শাপলা দীঘি। ঠোঁট জোড়া ছিলো ভেজা ফুলের পাপড়ির মতো। কত দিন পর। কত বিনম্র বিষাদে ডুবে মনে হলো, সে আমার মুগ্ধমাঠের সোনালু ধানখেত। বিরাট জনস্রোতের মিছিলের কবিতা। তাকে পাঠ করে আমি ব্যাকরণ ভেঙে, নতুন ধারায় লিখি শ্বেত সারসের অভিসার। কল্পনার আঁচড়ে যে ছিলো সে আমাদের কবি মউ সুমাত্রা। 

হাসনাইন হীরা


একদিন কবি হাসনাইন হীরাকে বলেছিলাম, শালপাতার বিড়ি খেয়ে দেখেছো! অরণ্যে আগুন লেগে পুড়ে যাচ্ছে বুকের জমিন। মাঠের পর মাঠ সোনালি ধানের কীর্তন আর অগ্রহায়ণ জুড়ে গ্রামে গ্রামে উৎসব। ছিলো যাত্রা আর পালা গান। আজও মনে হয় সংসারও ঠিক যেন শালপাতার বিড়ির মতো। এক বিছানায় একসাথে জেগে থেকেও পুড়ে যায় দুজনার মন । অথচ ভিন্ন ভাবনায় কখনো কখনো তোলপাড় হয় দুজনার জাগ্রত কোষ। কারো সাথে হয় না কখনো মনের অন্তমিল। জীবন এমনই এক সাথে ঘুমুলেও। চোখের আড়ালে জেগে থাকে কত শত বছরের অমিল।

হোসেন দেলওয়ার


এখনো মনে হয় অপ্রকাশিত কবিতার আড়ালে ডুবে থাকি। দেখা অথবা না দেখা একটা তোমার মতো মুখছবি খুঁজি ফিরি বারবার । অনন্ত অনুভবে অন্তঃকরণ ছুঁয়ে । বিষাদ অথবা বিভাজনে প্রগাঢ় অভিলাষ নিয়ে । তোমাকেই খুঁজে খুঁজে অসংখ্য শরৎ, হেমন্ত, শীত,বসন্ত চলে গেছে। বিন্দু বিন্দু শিশিরের স্নিগ্ধ শান্তিময় পরিবেশ থেকে শুরু করে। অজানা ঠিকানার দিকে চেয়ে থেকেছি কত কত দিন। কত কত বছর। কোথাও পাইনিকো তুমি অথবা তোমাকে। ফেরিওয়ালা হয়ে ছুটেছি নগর থেকে গ্রামে। দেশ থেকে দেশান্তরে। কবি হোসেন দেলওয়ার এর কবিতার চিত্রকল্প হয়ে।

মামুন রশীদ 


চাঁদের দুপুরে জোছনার ফেরিওয়ালা হয়ে। মধ্যমাঠে কাকতাড়ুয়া হয়ে দাঁড়িয়ে আছি। শীলকড়ই বৃক্ষের পাতার পড়শি হয়ে। ক্ষীণ বিজলী বাতির আলোয়, উইপোকার সুইসাইড স্কোয়াড থেকে দূরে নিস্তব্ধতা মাড়িয়ে হেঁটে যাচ্ছে নন্দন চিন্তাগুলো। বিলাসী বসন্ত আসবে বলে আশা জাগানিয়া স্বপ্নের হাতছানি এখনও আমাদের চারপাশে। বিলুপ্ত সভ্যতার ইতিহাস খুঁজে খুঁজে কবিতার খাতায় লিখেছি কবি মামুুন রশীদ এর নাম। সে আমার বন্ধু ছিলো। আজও আছে, এক পাহাড় সমান।

শামীম নওরোজ

 
তিন পেগ মদের টাকা জোগাড় করতে পারিনি। অথচ বউ হাতে ধরিয়ে দিলো বাজারের ব্যাগ। আমার তো এমনই হয়। ইচ্ছে কোষগুলো নিষ্ক্রিয় থাকতে থাকতে মরে যায় একদিন। ভাবনাগুলোর আর বিস্তার ঘটেনা। অনন্ত সম্ভাবনা নিয়ে যারা পৃথিবীতে এসেছে। তাদের সৌভাগ্যের রশির দিকে চোখ মিলে তাকিয়ে থাকি। কোথায় যেন একটা বাংলা কবিতা দেখে সেই কবির খোঁজে, একদিন পদ্মা গড়াই কপোতাক্ষ পেরিয়ে নবগঙ্গা'র কাছে গিয়েছিলাম। দিগন্ত  বিস্তত সবুজে হাত রেখে বলেছিলাম কথা কবি শামীম নওরোজ এর সাথে।


কবির কথন : এমন একটা পরিবারে জন্ম আমার, যে পরিবারে উচ্চ শিক্ষিত কেউ ছিলো না। অল্প বয়সেই বাবাকে মৃত্যু ভয় পেয়ে বসেছিলো বলে, সে ধার্মিকতার দিকে ধাবিত হয়েছিলো। সংসারে তার কোনো মন ছিলো না। দেশ-বিদেশ তাবলিক জামাত করে বেড়াতো সে। সেই বাবাকে হারালাম মাত্র দুই বছর বয়সে। আমার বড় আরো অনেকগুলো ভাই-বোন ছিলো। সেই বাবার কোনো স্মৃতি নেই আমার কাছে। মা ছিলো বড় লোক বাবার একমাত্র মেয়ে। তার বাবার ছিলো ৯০০ বিঘা জমি। কিন্তু সেই মা আমার ছোটবেলায় বাবাকে হারানোর সাথে সাথে প্রায় সব জমি হারায়ে ফেলেছিলো।

অতঃপর আমাদের ভাই-বোনদের বেশ কষ্ট সহকারেই মানুষ করেছিলো। মনে পড়ে, আমার কোনো ভাই আমাকে কোনদিন একটা চকলেট হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলেনি,কোনো বিলাসী ভাবনার কবিতা। আমার চারপাশে আমার বয়সি যারা ছিলো, তারা কত সুন্দর সুন্দর পোষাক পড়ে স্কুল যেতো। আর আমি চেয়ে চেয়ে দেখতাম। তাদের কেউ কেউ ১০ পয়সায় লাল আইচক্রীম কিনে খেতো। আমার তখন বড্ড দুধ মালাই খেতে ইচ্ছে করতো। চোখের সামনেই দেখতাম খান বাড়ির ছেলে-মেয়েরা আইচক্রীম খেতে খেতে শার্টের বুক পকেট ভিজিয়ে ফেলেতো। আমি শুধুই সবকিছু চেয়ে চেয়ে দেখতাম। আর আমার জীবনের ভুল অংকগুলোর হিসেব করতাম। কোনদিন আমায় দাঁড়িয়াবান্ধা মাঠ ডাকেনি! কোনদিন আমায় ফুটবল মাঠ ডাকেনি। কেন জানি না! কেউ আমায় খেলার মাঠে ডাকেনি। কেউ আমায় খেলার জন্য ডাকেনি।


মনে পড়ে, মা আমায় খেলার মাঠে যেতে দিতো না। পুকুরঘাটে যেতে দিতো। আমার বড় এক ভাই জলে ডুবে মরেছিলো বলে, আমার মা সব সময় ভয়ে ভয়ে থাকতো। আশে-পাশের সব বাড়িতে যাওয়া ছিলো আমার জন্য বারণ ছিলো। কেন কী কারণে মা আমার কারো বাড়িতে যেতে দিতো না! আর কিছুই জানতে পারিনি আমি। 


কত কত অভাবের পথ পাড়ি দিয়ে বড় হয়েছি আমি। কত কত স্বপ্ন মাড়িয়ে বড় হয়েছি আমি। রাখালবালকের সাথে গরু চড়াতে চড়াতে ফিরে এসেছি আমি। মাঠে-ঘাটে তেপান্তর থেকে ফিরে এসেছি আমি। এক স্বপ্নবালক হবার অভিলাষ নিয়ে ফিরে এসেছি আমি। একমাত্র কবিতার কারণে আবার ঘুমহীন রাত্রী শেষে ফিরে এসেছি আমি। 

পরিচিতি 
লতিফ জোয়ার্দার (কবি ও কথাসাহিত্যিক)
জন্ম : ১মার্চ ১৯৭০ খ্রি.
পিতা : মৃত ইয়াকুব আলী জোয়ার্দার 
মাতা : মফেজান বেওয়া 
ভাই-বোন : ছয় ভাই, ছয় বোন
জন্মস্থান : গ্রাম : ফরিদপুর পোস্ট : মুলাডুলি, উপজেলা : ঈশ্বরদী, জেলা : পাবনা।

লেখাপড়া : প্রাথমিক : মুলাডুলি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মুলাডুলি ও রাজাপুর  সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, রাজাপুর, বড়াইগ্রাম, উচ্চ বিদ্যালয় : সাড়া মাড়োয়ারী উচ্চ বিদ্যালয়, ঈশ্বরদী ও রাজাপুর উচ্চ বিদ্যালয়, বড়াইগ্রাম, নাটোর। কলেজ+বিশ্ববিদ্যালয় :  এডওয়ার্ড কলেজ, পাবনা।
লেখালেখি শরু : পঞ্চম শ্রেণিতে পড়াকালীন ১৯৮০ সালে। প্রথম প্রকাশিত কবিতা : ১৯৮৩ সাপ্তাহিক জংশন। জাতীয় প্রত্রিকা :  দৈনিক বার্তা ১৯৮৬ সাপ্তাহিক ছুটি ১৯৮৭ 
সম্পাদনা শুরু : ত্রৈমাসিক কমলা- ১৯৮৬,সেতু-১৯৮৮   

প্রকাশিত গ্রন্থ : 
কাব্যগ্রন্থ :
এক সুন্দরের অপমৃত্যু, ছুঁয়ে দিবো জলের শরীর, আহত আঁধার, যে শহরে তুমি নেই সে শহর অন্ধ বধির, মন এক বেদনার কারখানা, এক রাজসিক কীর্তির কথা মনে পড়ে, নির্বাচিত ১০০ কবিতা, নিষিদ্ধ প্রিয়ার চুম্বন, পোয়াতি ধানের ব্যাকরণ,সুখগুলো সাদা শার্টের বুক পকেটে রাখি, তাপসী পাহান     

ছোটগল্প : তীব্র আলোর শহর, কিছু কিছু সুখ অথবা অসুখ,ভাত ও ভাতারের গল্প, প্যারিস রোড,সুবর্ণ কঙ্কন পরা ফর্সা রমণীরা, ইঞ্জিন চালিত মানুষ 


উপন্যাস : নো মিসকল, আজ বৃষ্টির মন ভালো নেই, যে কথা হয়নি বলা, কান পেতে রই, প্রথম প্রেম দ্বিতীয় বিরহ, ফতোয়ানামা, সোনাপাখি, নন্দিত অসুখ, যাও পাখি বলো তারে,বাউণ্ডুলে মন, সুগন্ধি রুমাল 
 

শিশুতোষ : ভূত বড় অদ্ভুত, ড্রাগন এলো দেশে  
 

সম্পাদনা : শূন্যের গল্প
 

সম্পাদিত ছোটকাগজ : সবুজস্বর্গ, চৌকাঠ, গল্প-২১


 

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow