রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ হত্যার ঘটনায় দ্বিতীয় সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়েছে। ট্রাইব্যুনালে এনটিভির সিনিয়র রিপোর্টার হিসেবে রংপুরে কর্মরত একেএম মঈনুল হক তার সাক্ষ্য পেশ করেন। এরপর জেরা করেন মামলার আসামিপক্ষের আইনজীবীরা। আগামী ৭ সেপ্টেম্বর বাকি জেরার পর পরবর্তী সাক্ষ্যগ্রহণের দিন ঠিক করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।
বৃহস্পতিবার (২৮ আগস্ট) ট্রাইব্যুনাল-২’র চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেলে তার জবানবন্দি ও জেরা অনুষ্ঠিত হয়। ট্রাইব্যুনালের বাকি সদস্যরা হলেন- অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ মো. মঞ্জুরুল বাছিদ এবং জেলা ও দায়রা জজ নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।
এনটিভির সিনিয়র রিপোর্টার হিসেবে রংপুরে কর্মরত একেএম মঈনুল হক আবু সাঈদকে পুলিশের গুলি করার দৃশ্যের বিষয়ে বর্ণনা দেন ট্রাইব্যুনালে।
নিজের দেওয়া জবানবন্দিতে তিনি বলেন, ‘২০২৪ সালের ১৬ জুলাই দুপুর ২টার আগে থেকে আমি এবং আমার সহকর্মী স্টাফ ক্যামেরাম্যান আসাদুজ্জামান আরমান বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের এক নম্বর গেটের সামনে পেশাগত দায়িত্ব পালন করছিলাম। তখন কোটাবিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছাত্রদের একটি মিছিল রংপুর প্রেসক্লাব এলাকা থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক নম্বর গেটের সামনে আসে। এ সময় আন্দোলনকারী ছাত্ররা এক নম্বর গেটের সামনে একটি পথসভা করার চেষ্টা করলে সেখানে আগে থেকে অবস্থান নেওয়া পুলিশ এবং ছাত্রলীগ-যুবলীগ ও তাদের সমর্থকরা বাধা দেয়।’
জবানবন্দিতে সাংবাদিক মঈনুল বলেন, ‘আন্দোলনকারীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক নম্বর গেট দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে যেতে চায়। এ সময় পুলিশ এবং তাদের সাথে যারা ছিল তারা বাধা দেয়। এক পর্যায়ে আন্দোলনকারীদের ওপর পুলিশ লাঠিচার্জ শুরু করে। পুলিশের লাঠিচার্জ শুরু করলে আন্দোলনকারীরা কিছুটা পিছিয়ে পার্কের মোড় অর্থাৎ বর্তমান আবু সাঈদ চত্বরের দিকে অবস্থান নিয়ে নিজেরা জোটবদ্ধ হয়ে স্লোগান দিতে থাকে। এ সময় পুলিশ টিয়ার শেল নিক্ষেপ, রাবার বুলেট ও শর্টগানের গুলি বর্ষণ শুরু করে।’
তিনি বলেন, ‘তখন দুপুর ২টা পার হয়ে গেছে। এনটিভির দুপুর ২টার খবরও শুরু হয়ে গেছে। এ সময় ঘটনাস্থল থেকে আমি ও আমার সহকর্মী আসাদুজ্জামান আরমান লাইভ ভিডিও অফিসে প্রেরণ করতে থাকি। দুপুর ২টা ১৩ মিনিটের দিকে এনটিভির ঢাকা অফিস থেকে দুপুরের খবরে লাইভে যুক্ত হওয়ার জন্য আমাকে নির্দেশ দিলে আমরা লাইভ ভিডিওর মাধ্যমে দেশবাসীর কাছে ঘটনা তুলে ধরি এবং বর্ণনা দিতে থাকি। এনটিভির লাইভ সম্প্রচার চলাকালীন দুপুর ২টা ১৭ মিনিটের দিকে এক নম্বর গেটের সামনে রোড ডিভাইডারের একটি ছোট কাটা অংশ দিয়ে এগিয়ে এসে কালো টি শার্ট ও কালো প্যান্ট পরা এক যুবক রাস্তার ডিভাইডারের পাশে এসে দাঁড়িয়ে যায়। এ সময় সে দুদিকে দু হাত প্রসারিত করে দাঁড়িয়ে পড়ে। সেখান থেকে মাত্র কয়েক গজের দূরত্বে এক নম্বর গেটের সামনে অবস্থানরত পুলিশ এই যুবককে উদ্দেশ্য করে গুলি করে। এই দৃশ্য তখন এনটিভিতে লাইভ সম্প্রচার চলছিল।’
তিনি আরও বলেন, ‘পুলিশের গুলি এই যুবকের সামনের দিকে অর্থাৎ বুক ও পেটে লাগে। গুলিবিদ্ধ হওয়ার ওই যুবক কয়েক পা পিছিয়ে যান এবং বসে পড়েন। এ সময় তার অন্য সহযোগী কয়েকজন যুবক তাকে তুলে নিয়ে পার্কের মোড়ের দিকে নিয়ে যান। এরপর আমরা অন্য সহকর্মীদের মাধ্যমে ওই গুলিবিদ্ধ যুবককে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয় বলে জানতে পারি। এছাড়া জানতে পারি গুলিবিদ্ধ যুবক বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ১২তম ব্যাচের শিক্ষার্থী এবং তার নাম আবু সাঈদ। বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে আমরা জানতে পারি গুলিবিদ্ধ আবু সাঈদ মৃত্যুবরণ করেছেন।’
এফএইচ/বিএ/জিকেএস