শত শত কোটি টাকা খরচ করেও কেন নিয়ন্ত্রণে আসছে না ডেঙ্গু?

দেশে প্রথম বড় আকারে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব দেখা দেয় ২০০০ সালে। এরপর থেকে বাড়ছে ডেঙ্গুর প্রকোপ। ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসা ও মশক নিধনে সরকারের ব্যয় শত শত কোটি টাকারও বেশি। কিন্তু দৃশ্যমান ফল নেই। উল্টো প্রতি বছরই দীর্ঘ হয় মৃত্যুর মিছিল। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক বছরগুলোর পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০২৩ সালে ডেঙ্গুতে রেকর্ড এক হাজার ৭০৫ জনের মৃত্যু হয়, যা ২০২৪ সালে ৫৭৫ এবং ২০২৫ সালে ৪১৩ জনে নেমে আসে।  ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, গত নয় বছরে মশক নিধন, ওষুধ ও যন্ত্রপাতি কেনা বাবদ সরকারের ব্যয় হয়েছে ৭০০ কোটিরও বেশি টাকা। এমনকি সাম্প্রতিক বাজেটগুলোতে মশক নিধনের জন্য শত শত কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসায় সরকারি হাসপাতালগুলোতে জনপ্রতি ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ হয়। শুধু ২০২৩ সালেই সরকারি হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসায় সরকারের ৪০০ কোটি টাকার বেশি ব্যয় হয়েছিল। এত টাকা ব্যয়ের পরও পুরো স্বাস্থ্যখাতে প্রাতিষ্ঠানিক স্থায়িত্ব আসেনি। দক্ষ জনবল ও উপকরণের অভাবে প্রতি বছর নতুন করে শূন্য থেকে প্রস্তুতি শুরু করতে হয়। আরও পড়ুন ডেঙ্গু প্রতিরোধে দেশজুড়ে বিশেষ অভিযা

শত শত কোটি টাকা খরচ করেও কেন নিয়ন্ত্রণে আসছে না ডেঙ্গু?

দেশে প্রথম বড় আকারে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব দেখা দেয় ২০০০ সালে। এরপর থেকে বাড়ছে ডেঙ্গুর প্রকোপ। ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসা ও মশক নিধনে সরকারের ব্যয় শত শত কোটি টাকারও বেশি। কিন্তু দৃশ্যমান ফল নেই। উল্টো প্রতি বছরই দীর্ঘ হয় মৃত্যুর মিছিল।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক বছরগুলোর পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০২৩ সালে ডেঙ্গুতে রেকর্ড এক হাজার ৭০৫ জনের মৃত্যু হয়, যা ২০২৪ সালে ৫৭৫ এবং ২০২৫ সালে ৪১৩ জনে নেমে আসে। 

ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, গত নয় বছরে মশক নিধন, ওষুধ ও যন্ত্রপাতি কেনা বাবদ সরকারের ব্যয় হয়েছে ৭০০ কোটিরও বেশি টাকা। এমনকি সাম্প্রতিক বাজেটগুলোতে মশক নিধনের জন্য শত শত কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসায় সরকারি হাসপাতালগুলোতে জনপ্রতি ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ হয়। শুধু ২০২৩ সালেই সরকারি হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসায় সরকারের ৪০০ কোটি টাকার বেশি ব্যয় হয়েছিল।

এত টাকা ব্যয়ের পরও পুরো স্বাস্থ্যখাতে প্রাতিষ্ঠানিক স্থায়িত্ব আসেনি। দক্ষ জনবল ও উপকরণের অভাবে প্রতি বছর নতুন করে শূন্য থেকে প্রস্তুতি শুরু করতে হয়।

২৭ বছর ধরে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমে বাজেট ও ব্যয় বাড়লেও এটি নিয়ন্ত্রণে না আসার পেছনে মূলত দুটি বড় ‘গ্যাপ’ বা ঘাটতি রয়েছে বলে মনে করেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের উপ-প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. নিশাত পারভীন।

তিনি জাগো নিউজকে বলেন, প্রথমত, ডেঙ্গুবিরোধী নিবিড় কার্যক্রম কেবল ঢাকার উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনেই বেশি সীমাবদ্ধ থাকে, যা সারা দেশের অন্যান্য সিটি করপোরেশন ও পৌরসভাগুলোতে সমভাবে হচ্ছে না। ফলে ঢাকায় ডেঙ্গু কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এলেও ঢাকার বাইরে সারা দেশে এর প্রকোপ বাড়ছে। দ্বিতীয়ত, সিটি করপোরেশন রাস্তাঘাট বা বাড়ির আশেপাশে ওষুধ ছেটাতে পারলেও ঘরের ভেতরে গিয়ে কাজ করতে পারে না; অথচ এডিস মশা ও লার্ভা সবচেয়ে বেশি জন্মায় ঘরের ভেতরেই। বিশেষজ্ঞদের দ্বারা পরীক্ষিত মশার ওষুধ শতভাগ কার্যকর হলেও তা কেবল বাইরের মশা নিয়ন্ত্রণে কাজ করে।

তাই ডেঙ্গু পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনতে হলে শুধু সরকারের ওপর ভরসা না করে জনসচেতনতা সবচেয়ে বেশি জরুরি। সিটি করপোরেশনের পাশাপাশি দেশের প্রতিটি নাগরিককে নিজ উদ্যোগে সচেতন হতে হবে এবং নিজ ঘরে বা আশেপাশে কোথাও তিন দিনের বেশি পানি জমতে দেওয়া যাবে না। পানি পরিষ্কার রাখলে মশার ডিম থেকে লার্ভা হতে পারবে না, ফলে মশার বংশবৃদ্ধি ঠেকানো সম্ভব হবে। মূলত সারা দেশে একইভাবে ডেঙ্গুবিরোধী কাজ পরিচালনা করা এবং জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার মাধ্যমেই কেবল ডেঙ্গুমুক্ত সমাজ গঠন করা সম্ভব।

সমন্বয়হীনতা ও তথ্যের ঘাটতি

এদিকে ডেঙ্গু বাড়লে করণীয় কী হতে পারে- এ নিয়ে গত ১ জুন মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে বৈঠক করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেনের সভাপতিত্বে এতে প্রতিমন্ত্রী ডা. এম এ মুহিত, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, অতিরিক্ত মহাপরিচালক এবং একাধিক পরিচালক, ইউনিসেফের প্রতিনিধি ও সোসাইটি অব মেডিসিনের নেতারা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের শীর্ষ কর্তারা মাঠপর্যায়ে কী পরিমাণ স্যালাইন বা ফ্লুইড মজুত আছে কিংবা কী পরিমাণ লাগবে—তার কোনো সঠিক তথ্য দিতে পারেননি।

বৈঠকে সোসাইটি অব মেডিসিনের আহ্বায়ক অধ্যাপক ডা. মনির-উজ-জামান বলেন, ‘যিনি ডেঙ্গু ব্যবস্থাপনার ট্রেনিং পেয়েছেন, তাকে অন্যত্র বদলি করা হয়, আর নতুনদের দেওয়া হয় রোগীর দায়িত্ব।’

এই সংকট কাটাতে ইউনিসেফের অর্থায়নে জাতীয় পর্যায়ে দুটি ও বিভাগীয় পর্যায়ে সাতটি ট্রেইনার্স ট্রেনিং দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। এছাড়া প্রতিটি হাসপাতালে ‘ফিভার ক্লিনিক’ স্থাপন এবং একটি সুনির্দিষ্ট গাইডলাইন তৈরির তাগিদ দেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক শাহাবুল হুদা।

বাংলাদেশ জার্নাল অব মেডিসিনের ভয়াবহ তথ্য

২০২৩ সালের ১৫টি হাসপাতালের ৯৪টি মৃত্যুর কেস বিশ্লেষণ করে ‘বাংলাদেশ জার্নাল অব মেডিসিন’-এ একটি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়। মৃতদের মধ্যে ১১ দশমিক ৮ শতাংশ শিশু, ৬৫ দশমিক ৬ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক এবং ২২ দশমিক ৬ শতাংশ প্রবীণ ছিলেন, যাদের অনেকেরই ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপের মতো জটিলতা ছিল।

গবেষণার মূল তথ্য

গাইডলাইন অবহেলা: মাত্র ৩৫ দশমিক ১ শতাংশ রোগী জাতীয় গাইডলাইন অনুযায়ী আইভি ফ্লুইড (স্যালাইন) চিকিৎসা পেয়েছেন। ৪৭ দশমিক ৯ শতাংশ রোগী গাইডলাইন অনুযায়ী চিকিৎসা পাননি।

ফলো-আপের অভাব: মাত্র ১২ দশমিক ৮ শতাংশ রোগীর ক্ষেত্রে গাইডলাইন অনুযায়ী নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হয়েছিল।

ওষুধের অপপ্রয়োগ: চিকিৎসায় পরামর্শ দেওয়া হয়নি এমন ওষুধ ৩৩ দশমিক ৩ শতাংশ, স্টেরয়েড ২৮ শতাংশ এবং অ্যান্টিবায়োটিকের ৩৯ দশমিক ৮ শতাংশ ব্যবহার দেখা গেছে।

ভর্তিতে বিলম্ব: লক্ষণ প্রকাশের পর হাসপাতালে ভর্তি হতে গড়ে তিন দিন সময় লেগেছিল এবং রোগীরা ভর্তি থাকার সুযোগ পান গড়ে মাত্র একদিন।

মৃত্যুর মূল কারণ: ডেঙ্গু শক সিন্ড্রোম (৩৬ শতাংশ) এবং এক্সপ্যান্ডেড ডেঙ্গু সিন্ড্রোম (২৩ শতাংশ) সবচেয়ে বেশি মৃত্যুর জন্য দায়ী ছিল।

বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণ

বিশিষ্ট মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ও ইমেরিটাস অধ্যাপক ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহ জানান, ডেঙ্গুর কোনো কার্যকর গণ-টিকা না থাকায় প্রতিরোধই একমাত্র পথ। এটা একা কারো পক্ষে সম্ভব নয়। সরকার ও জনগণকে যৌথভাবে প্রতিরোধে এগিয়ে আসতে হবে।

তিনি ঘরের ভেতর ও বাইরে (টব, টায়ার, এসি-ফ্রিজের নিচে) জমে থাকা পানি পরিষ্কার রাখা এবং দিনের বেলাও মশারি ব্যবহারের পরামর্শ দেন।

২৭ বছরের দীর্ঘ ডেঙ্গু ব্যবস্থাপনার পরও রোগটি কেন নিয়ন্ত্রণে আসছে না, সে বিষয়ে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. তারেকুল ইসলাম লিমন বলেন, ডেঙ্গু এখন আর কোনো একক সংস্থার একক দায়িত্বের বিষয় নয়, বরং এটি একটি বহুমাত্রিক সংকটে রূপ নিয়েছে। দীর্ঘ এই সময়ে ডেঙ্গুর প্রকোপ কমার বদলে জটিল হওয়ার পেছনে জলবায়ু পরিবর্তন ও অপরিকল্পিত নগরায়ণের পাশাপাশি আমাদের সনাতন মশা নিধন পদ্ধতি এবং প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণার ঘাটতিই প্রধানত দায়ী।

ডা. তারেকুল ইসলাম লিমন জানান, আগে ডেঙ্গুকে শুধু বর্ষাকালের রোগ মনে করা হলেও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এখন সারা বছরই এর সংক্রমণ দেখা যাচ্ছে। দীর্ঘায়িত বর্ষা, ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা এডিস মশার প্রজননের জন্য আদর্শ পরিবেশ তৈরি করছে। সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, এডিস মশা এখন তার আচরণ বদলেছে; আগে এটি শুধু পরিষ্কার পানিতে জন্মাত, কিন্তু এখন ময়লা ও অপরিষ্কার পানিতেও এর বংশবিস্তার লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ডেঙ্গু ভাইরাসের জেনোমিক গঠনে কোনো পরিবর্তন এসেছে কি না, তা নিয়ে আমাদের দেশে বড় ধরনের গবেষণার ঘাটতি রয়েছে। নিয়মিত ‌‘টাইম সিরিজ অ্যানালিসিস’ এবং প্রজাতির মূল্যায়ন না হওয়ায় সেই অনুযায়ী কার্যকর প্রতিরোধ ব্যবস্থা বা ইন্টারভেনশন তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে না।

jagonews24

ডা. তারেকুল ইসলাম লিমন আরও বলেন, এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আমাদের ত্রুটিপূর্ণ ও সনাতন ভেক্টর কন্ট্রোল বা মশা নিধন পদ্ধতি। মশা নিধনে যে ওষুধ ব্যবহার করা হচ্ছে, তার সঠিক নিয়ম বা প্রসিডিউর মানা হচ্ছে কি না, তা নিয়ে বড় প্রশ্ন রয়েছে। মশার সুনির্দিষ্ট জোন বা হটস্পটগুলো চিহ্নিত না করে বর্তমানে গণহারে যে কোনো এক জায়গায় স্প্রে করার যে সংস্কৃতি চালু রয়েছে, তা কোনো কাজে আসছে না। ফলে মশার মূল জোনগুলো ওষুধের বাইরেই থেকে যাচ্ছে। পাশাপাশি অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে তৈরি হওয়া পরিবেশ এবং একটু বৃষ্টিতেই শহরের দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করছে।

সবশেষে তিনি নাগরিকদের আচরণগত সমস্যা ও উদাসীনতাকে অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তিনি মনে করেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে শুধু সরকার বা সিটি করপোরেশনের ওপর দায় চাপালে চলবে না। সাধারণ মানুষের নিজেদের ঘরবাড়ি ও আশপাশ নিয়মিত পরিষ্কার না রাখার মানসিকতা এবং যেখানে-সেখানে ময়লা-আবর্জনা ফেলে কৃত্রিম প্রজননক্ষেত্র তৈরি করার অভ্যাস মশার বংশবৃদ্ধি আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। তাই প্রাতিষ্ঠানিক ও বৈজ্ঞানিক পদক্ষেপের পাশাপাশি নাগরিক সচেতনতার আমূল পরিবর্তন ছাড়া এই বহুমাত্রিক সংকট থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব নয়।

আরও পড়ুন

বংশ এখন আতঙ্ক

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ডেঙ্গুর সম্ভাব্য প্রকোপ থেকে জাতিকে রক্ষা করতে দেশজুড়ে চিরুনি অভিযান, ভ্রাম্যমাণ আদালত এবং চিকিৎসার বিশেষ প্রটোকলসহ ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছি আমরা। কয়েক দিনের মধ্যে সারা দেশে মোবাইল টিম কাজ শুরু করবে। কোনো বাসা-বাড়ি বা প্রতিষ্ঠানে এডিস মশার লার্ভা পাওয়া গেলে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা ও জরিমানা করা হবে। এবার পরিত্যক্ত ওয়াশরুম, ছাদ ও গ্যারেজে জমে থাকা পানিতে মশার লার্ভা ধ্বংসে বিশেষ রাসায়নিক ব্যবহার করা হবে।

এসইউজে/এমআইএইচএস/এমএমএআর

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow