‘যে জাতি যত বেশি শিক্ষিত, সে জাতি তত বেশি উন্নত’। এমনই এক প্রবাদ প্রচলন থাকলেও রাজবাড়ীতে সেই জ্ঞানের আলো খ্যাত শতবর্ষী পাবলিক লাইব্রেরিই এখন অবহেলিত।
অযন্ত্র-অবহেলা ও দীর্ঘদিন সংস্কারের অভাবে ভবনের কলাম ও বিমে ফাটল দেখা দিয়েছে। খসে পড়ছে ছাদের পলেস্তারা। ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় এখন পরিত্যক্ত লাইব্রেরির দ্বিতীয় তলাটি। নিচ তলায় হাতেগোনা কিছু পাঠক বসার ব্যবস্থা থাকলেও নেই সুপেয়সহ শৌচাগারের পানির ব্যবস্থা। এছাড়া নানা সমস্যার কারণে লাইব্রেরিটি খোলা থাকে মাত্র দুই ঘণ্টা। প্রায় ৩ বছর কেনা হয় না নতুন কোনো বই। তাছাড়া আলমারিগুলো পুরাতন ও নড়বড়ে হওয়ায় উইপোকা খেয়েছে গুরুত্বপূর্ণ অনেক বই। ফলে দিন দিন পাঠক সংখ্যা কমছে।
জানা গেছে, ১৯১৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় রাজবাড়ী পাবলিক লাইব্রেরি। শতবর্ষ প্রাচীন এই লাইব্রেরি এখন জরাজীর্ণ। এখানে দুর্লভ ও দেশি-বিদেশি বিভিন্ন লেখকের প্রায় সাড়ে ৫ হাজার বই রয়েছে। পর্যাপ্ত জায়গা ও আলমারির অভাবে অনেক বই রাখা হয়েছে উন্মুক্ত স্থানে। ফলে অনেক বই খেয়েছে উইপোকা ও তেলাপোকায়। দীর্ঘদিন ভবন সংস্কার না হওয়ায় কলাম-বিমে ফাটলসহ খসে পড়ছে ছাদের পলেস্তারা। ফলে পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে লাইব্রেরির দ্বিতীয় তলা।
এদিকে পদাধিকার বলে লাইব্রেরির সভাপতি জেলা প্রশাসক (ডিসি)। প্রতি দুই বছর পর পর নির্বাচনের মাধ্যমে সাধারণ সম্পাদকসহ অন্যান্য পদে সদস্য নির্বাচিত হওয়ার কথা থাকলেও প্রায় ৬ বছর হয় না কোনো নির্বাচন। এছাড়া মাত্র ৫ হাজার টাকা সম্মানি দেওয়া হয় সহকারী লাইব্রেরিয়ান, অফিস সহকারী ও সুইপারকে। যা দিয়ে তাদের পকেট খরচও মেটে না। দেওয়া হয় না পত্রিকা ও বিদ্যুৎতের বিল। যা সহকারী লাইব্রেরিয়ান নিজে পরিশোধ করেন। ফলে কোনো নিয়ম-নীতি অনুসরণ না করে ছুটির দিন ব্যতীত বিকেল ৫টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত লাইব্রেরিটি খোলা রাখা হয়।
কবি নেহাল আহম্মেদ ও পাঠক আফতাব হোসেন বলেন, রাজবাড়ীর সবচেয়ে প্রাচীন লাইব্রেরি হলেও এটার দিকে কারো নজর নেই। এরইমধ্যে দ্বিতীয় তলা পরিত্যক্ত হয়ে পড়েছে। নিচতলার অবস্থাও ভালো না। এখানে অনেক পুরাতন ও মূল্যবান বই থাকায় শিক্ষার্থী, চাকরি প্রত্যাশী, বই প্রেমীসহ অনেক পাঠক এলেও বই পড়ার ভালো ব্যবস্থা নেই। এছাড়া ইন্টারনেট ব্যবস্থা না থাকায় অনেকে তথ্য বা বইয়ের সন্ধান করতে পারেন না। সঠিক দেখভাল না থাকায় অনেক পুরাতন বই এখন খুঁজে পাওয়া যায় না। দ্রুত লাইব্রেরিটি সংস্কার, নতুন বই সংগ্রহসহ পানি ও ইন্টারনেটের ব্যবস্থা করা খুবই জরুরি হয়ে পড়েছে।
শিক্ষার্থী ফাতেমাতুজ জহুরা, বুলবুল আহমেদ, মনিরুল ইসলাম বলেন, বই পড়তে তারা এই লাইব্রেরিতে এলেও পরিবেশের কারণে ভালোভাবে পড়াশুনা করতে পারছেন না। এখানে বই পড়ার জন্য চেয়ার ও স্থানের সংকট আছে। বই রাখার আলমারি ও ওয়াশরুমের অবস্থা খুবই খারাপ। উন্মুক্তভাবে বই থাকায় অনেক বই চুরি হয়ে যাচ্ছে। পরিবেশ ভালো থাকলে পড়তেও ভালো লাগে।
সহকারী লাইব্রেরিয়ান মো. বদিউল আলম বুলবুল বলেন, এটা শতবর্ষী একটি লাইব্রেরি। পদাধিকার বলে জেলা প্রশাসক এটার সভাপতি এবং নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক দ্বারা লাইব্রেরিটি পরিচালিত হয়। ৬-৭ বছর কোনো নির্বাচন না হওয়া বা কমিটি না থাকায় বরাদ্দ পান না। বিধায় প্রায় ৩ বছর কোনো নতুন বই আনতে পারছেন না। বর্তমানে লাইব্রেরির দ্বিতীয় তলার অবস্থা খুব খারাপ। যেকোনো মুহূর্তে ভেঙে পড়তে পারে। এছাড়া ভবনের ফাটল দিয়ে নিচ তলার বইগুলোতে উই ধরেছে। যার কারণে অনেক মূল্যবান ও পুরাতন বই নষ্ট হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, এখানে সহকারী লাইব্রেরিয়ান, পিয়ন ও সুইপারসহ ৩ জন কর্মরত আছেন। কিন্তু ৩ জনকে দেওয়া হয় মাত্র ৫ হাজার টাকা করে সম্মানি। যা দিয়ে পকেট খরচ হয় না। বিদ্যুৎ ও পত্রিকার বিল তার নিজের পকেট থেকে দিতে হয়। লাইব্রেরির দিকে কেউ নজর না দেওয়ায় খুবই খারাপ অবস্থা।
রাজবাড়ী জেলা প্রশাসক সুলতানা আক্তার বলেন, লাইব্রেরিটির উন্নয়নের জন্য টিআর প্রকল্পের অর্থ থেকে একটি প্রকল্প গ্রহণ করা হবে। এর মাধ্যমে কিছুটা হলেও এই অবস্থার উন্নতি হবে এবং পরবর্তীতে প্রয়োজনে আরও প্রকল্প গ্রহণ করা হবে। পাশাপাশি লাইব্রেরি সংশ্লিষ্টদের ডেকে সভা আহ্বান করে সব সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করা হবে।
এফএ/এএসএম