পবিত্র মাহে রমজানের শেষ দশক মুসলমানদের জন্য বিশেষ মর্যাদা ও তাৎপর্যপূর্ণ। এ সময়ের মধ্যেই রয়েছে মহিমান্বিত রজনী লাইলাতুল কদর বা শবেকদর।
মহাগ্রন্থ আল কোরআনে এই রাতকে হাজার মাসের চেয়েও উত্তম বলা হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে, ‘তুমি কি জানো শবে কদর কী? শবে কদর এক হাজার মাস অপেক্ষাও শ্রেষ্ঠ। সে রাতে ফেরেশতাগণ ও রূহ প্রত্যেক কাজে তাদের প্রতিপালকের অনুমতিক্রমে অবতীর্ণ হয়। সে রাত (আদ্যোপান্ত) শান্তি ফজরের আবির্ভাব পর্যন্ত। (সুরা কদর : ১-৫)
ঠিক কোন রাতে শবেকদর কোরআনে তা নির্দিষ্ট করে বলা হয়নি। তবে কদর যে রমজান মাসে, তার নির্দেশ স্পষ্ট। সুরা বাকারায় বলা হয়েছে, কোরআন রমজান মাসে অবতীর্ণ হয়েছে (আয়াত : ১৮৭) এবং সুরা কদরে বলা হয়েছে, কোরআন কদরের রাতে নাজিল হয়েছে (আয়াত : ১)।
আর এই রাত যে রমজানের শেষ দশকে হবে, তা বহু হাদিসে বর্ণিত হয়েছে। এমনকি তা রমজানের শেষ দশকের বেজোড় রাতগুলোতে হওয়ার সম্ভাবনা বেশি বলেও হাদিসে এসেছে। (বোখারি : ২০২০)
এ কারণে রমজানের শেষ দশকে বিশেষভাবে ইবাদত-বন্দেগিতে মনোযোগী হওয়ার চেষ্টা করেন ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা। ইসলামি চিন্তাবিদদের মতে, কিছু সহজ আমলের মাধ্যমে লাইলাতুল কদরের ফজিলত লাভের চেষ্টা করা যেতে পারে।
১. শেষ দশকে ইবাদতে বেশি মনোযোগ
হাদিসে এসেছে, রমজানের শেষ দশক শুরু হলে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) নিজে বেশি ইবাদত করতেন এবং পরিবারকেও ইবাদতে উৎসাহিত করতেন। বর্ণিত আছে, ‘রমজানের শেষ দশক এলে তিনি রাত জেগে বেশি বেশি ইবাদত করতেন এবং পরিবারকেও জাগিয়ে দিতেন।’ (বোখারি : ২০২৪)
২. ইতিকাফ পালন
রমজানের শেষ দশকে মসজিদে অবস্থান করে ইবাদতে সময় কাটানোকে ইতিকাফ বলা হয়। মহানবী (সা.) নিয়মিত শেষ দশকে ইতিকাফ করতেন বলে হাদিসে বর্ণিত আছে। এর মাধ্যমে লাইলাতুল কদর পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে।
হাদিসে এসেছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লাইলাতুল কদর লাভের আশায় একবার রমজানের প্রথম দশ দিন ইতিকাফ করেন। এরপর কয়েকবার ইতিকাফ করেন মাঝের দশ দিন। এরপর একসময় শেষ দশ দিন ইতিকাফ করতে শুরু করেন এবং ইরশাদ করেন, তোমরা রমজানের শেষ দশকে লাইলাতুল কদর অন্বেষণ কর। (বোখারি : ২০২০, লাতাইফুল মাআরিফ : পৃষ্ঠা ৩৫৩)
আরেক হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমজানের মাঝের দশ দিন ইতিকাফ করতেন। এক বছর এভাবে ইতিকাফ করার পর যখন রমজানের ২১তম রাত এলো, তিনি ঘোষণা করলেন, যে ব্যক্তি আমার সঙ্গে ইতিকাফ করেছে সে যেন শেষ দশকে ইতিকাফ করে। কারণ আমাকে শবে কদর সম্পর্কে অবগত করা হয়েছিল (যে, তা শেষ দশকের অমুক রাত।) এরপর তা ভুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। ... সুতরাং তোমরা শেষ দশকে শবে কদর অন্বেষণ করো এবং প্রতি বেজোড় রাতে অন্বেষণ কর। (বোখারি : ২০২৭)
৩. বেজোড় রাতগুলোতে বিশেষ আমল
হাদিসের বর্ণনা অনুযায়ী, রমজানের শেষ দশকের বেজোড় রাতগুলোতে (২১, ২৩, ২৫, ২৭ ও ২৯) লাইলাতুল কদর হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা রমজানের শেষ দশকের বেজোড় রাতগুলোতে লাইলাতুল কদর অনুসন্ধান করো (বোখারি : ২০২০)। তাই এই রাতগুলোতে বেশি বেশি নফল আমলের মাধ্যমে শবেকদরের বরকত লাভ করা যেতে পারে।
৪. বেশি বেশি নফল নামাজ আদায়
রমজানের শেষ দশকের রাতগুলোতে ফরজ নামাজের পাশাপাশি নফল নামাজ, তাহাজ্জুদ এবং দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে ইবাদত করা অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ বলে হাদিসে উল্লেখ রয়েছে। বলা হয়েছে, ‘যে ব্যক্তি ঈমানের সঙ্গে সওয়াবের আশায় কদরের রাতে ইবাদতের মধ্যে রাত জাগবে, তার আগের গোনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে।’ (বোখারি : ৩৫)
৫. বেশি বেশি কোরআন তিলাওয়াত
রমজান মাসকে কোরআন নাজিলের মাস বলা হয়। তাই শেষ দশকে কোরআন তিলাওয়াত, অর্থ অনুধাবন এবং কোরআন নিয়ে বেশি সময় কাটানোকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আমল হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
৬. বেশি বেশি দোয়া ও ইস্তিগফার
হাদিসে এসেছে, লাইলাতুল কদরে একটি বিশেষ দোয়া পড়তে মহানবী (সা.) উৎসাহ দিয়েছেন। হজরত আয়েশা (রা.) নবীজিকে (সা.) জিজ্ঞাসা করেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ, যদি আমি জানতে পারি আজ লাইলাতুল কদর তাহলে আমি কী দোয়া করতে পারি? নবীজি (সা.) বললেন, তুমি বলো, اللّهُمّ إِنّكَ عُفُوّ تُحِبّ الْعَفْوَ ।فَاعْفُ عَنِّي
উচ্চারণ : আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুউন তুহিব্বুল আফওয়া ফা’ফু আননি।
অর্থ : হে আল্লাহ, আপনি অত্যন্ত ক্ষমাশীল। আপনি ক্ষমা করতেই ভালোবাসেন। সুতরাং আপনি আমাকে ক্ষমা করে দিন (তিরমিজি : ৩৫১৩)। শবেকদরের ফজিলত লাভে উল্লিখিত দোয়াসহ বেজোড় রাতগুলোতে যেকোনো ইসতেগফার করা যেতে পারে।
ইসলামি স্কলারদের মতে, লাইলাতুল কদরের নির্দিষ্ট তারিখ গোপন রাখার অন্যতম উদ্দেশ্য হলো, মুসলমানরা যেন পুরো শেষ দশকজুড়ে ইবাদতে মনোযোগী থাকে। তাই নিয়মিত নামাজ, কোরআন তিলাওয়াত, দোয়া, জিকির ও দান-সদকার মাধ্যমে এই মহিমান্বিত রাতের ফজিলত অর্জনের চেষ্টা করা যেতে পারে।