শামসুল আলম আজাদের ‘দৃশ্যমান কাঠামো’

প্রকৃতিকে আমরা সাধারণত চোখে দেখি। নদী, পাহাড়, গাছ, মাটি কিংবা আকাশ ̶ এসবই আমাদের দৃশ্যমান পৃথিবীর অংশ। কিন্তু দৃশ্যমানতারও একটি অন্তর্জগৎ আছে। সেখানে রঙের নিচে জমে থাকে স্মৃতি, মাটির ভেতর লুকিয়ে থাকে সময়ের স্তর, আর প্রকৃতির নীরবতার মধ্যে অনুরণিত হয় জীবনের অদৃশ্য ছন্দ। সেই অনুচ্চারিত জগতকেই রঙ, রেখা ও টেক্সচারের বিমূর্ত ভাষায় ধরার চেষ্টা করেছেন সমকালীন বাংলাদেশের বিশিষ্ট চিত্রশিল্পী শামসুল আলম আজাদ। রাজধানীর ধানমন্ডির ঐতিহ্যবাহী শিল্পাঙ্গন গ্যালারি চিত্রকে শুরু হয়েছে তাঁর তৃতীয় একক চিত্রপ্রদর্শনী ‘দৃশ্যমান কাঠামো’ (Visible Structure)। আগামী ১৮ জুলাই ২০২৬ পর্যন্ত চলবে এই প্রদর্শনী। প্রতিদিন বিকেল ৫টা ৩০ মিনিট থেকে দর্শনার্থীদের জন্য এটি উন্মুক্ত থাকবে। দীর্ঘ বিরতির পর এই প্রদর্শনী কেবল একজন শিল্পীর প্রত্যাবর্তন নয়; বরং তাঁর বহু বছরের শিল্পসাধনার পরিণত প্রকাশ। নারায়ণগঞ্জ চারুকলা ইনস্টিটিউটের অধ্যক্ষ শামসুল আলম আজাদ সমকালীন বাংলাদেশের বিমূর্ত ও আধা-বিমূর্ত শিল্পচর্চার এক নিবেদিতপ্রাণ সাধক। প্রায় দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি প্রশাসনিক দায়িত্ব, শিক্ষকতা এবং শিল্পচর্চাকে একসঙ্গে

শামসুল আলম আজাদের ‘দৃশ্যমান কাঠামো’

প্রকৃতিকে আমরা সাধারণত চোখে দেখি। নদী, পাহাড়, গাছ, মাটি কিংবা আকাশ ̶ এসবই আমাদের দৃশ্যমান পৃথিবীর অংশ। কিন্তু দৃশ্যমানতারও একটি অন্তর্জগৎ আছে। সেখানে রঙের নিচে জমে থাকে স্মৃতি, মাটির ভেতর লুকিয়ে থাকে সময়ের স্তর, আর প্রকৃতির নীরবতার মধ্যে অনুরণিত হয় জীবনের অদৃশ্য ছন্দ। সেই অনুচ্চারিত জগতকেই রঙ, রেখা ও টেক্সচারের বিমূর্ত ভাষায় ধরার চেষ্টা করেছেন সমকালীন বাংলাদেশের বিশিষ্ট চিত্রশিল্পী শামসুল আলম আজাদ।

রাজধানীর ধানমন্ডির ঐতিহ্যবাহী শিল্পাঙ্গন গ্যালারি চিত্রকে শুরু হয়েছে তাঁর তৃতীয় একক চিত্রপ্রদর্শনী ‘দৃশ্যমান কাঠামো’ (Visible Structure)। আগামী ১৮ জুলাই ২০২৬ পর্যন্ত চলবে এই প্রদর্শনী। প্রতিদিন বিকেল ৫টা ৩০ মিনিট থেকে দর্শনার্থীদের জন্য এটি উন্মুক্ত থাকবে। দীর্ঘ বিরতির পর এই প্রদর্শনী কেবল একজন শিল্পীর প্রত্যাবর্তন নয়; বরং তাঁর বহু বছরের শিল্পসাধনার পরিণত প্রকাশ।

শামসুল আলম আজাদের ‘দৃশ্যমান কাঠামো’

নারায়ণগঞ্জ চারুকলা ইনস্টিটিউটের অধ্যক্ষ শামসুল আলম আজাদ সমকালীন বাংলাদেশের বিমূর্ত ও আধা-বিমূর্ত শিল্পচর্চার এক নিবেদিতপ্রাণ সাধক। প্রায় দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি প্রশাসনিক দায়িত্ব, শিক্ষকতা এবং শিল্পচর্চাকে একসঙ্গে বহন করেছেন। ২০০৩ সাল থেকে প্রতিষ্ঠান পরিচালনার ব্যস্ততার কারণে নিয়মিত একক প্রদর্শনী আয়োজন থেকে দূরে থাকলেও তাঁর ক্যানভাস কখনো নীরব হয়ে থাকেনি। বরং এই দীর্ঘ সময়জুড়ে রঙ, টেক্সচার, বিমূর্ত অভিব্যক্তি এবং প্রকৃতির অন্তর্নিহিত ভাষা নিয়ে তাঁর অনুসন্ধান আরও গভীর হয়েছে। সেই দীর্ঘ নীরব সাধনারই শিল্পিত প্রকাশ ‘দৃশ্যমান কাঠামো’।

প্রদর্শনীতে স্থান পাওয়া ১৮টি চিত্রকর্মের প্রতিটিই যেন প্রকৃতির সঙ্গে শিল্পীর দীর্ঘ সংলাপের দলিল। কোথাও বিস্তীর্ণ জলাভূমির স্মৃতি, কোথাও নদীর ভাঙন, কোথাও শ্যাওলাধরা পাথরের স্তব্ধতা, কোথাও আবার আকাশ থেকে দেখা কৃষিজমির জ্যামিতিক বিন্যাসের ইঙ্গিত। কিন্তু এসব দৃশ্য কোথাও সরাসরি আঁকা নয়। বিমূর্ত রঙের স্তরের ভেতর থেকে ধীরে ধীরে জন্ম নেয় প্রকৃতির এক মানসিক প্রতিচ্ছবি। ফলে দর্শক কোনো নির্দিষ্ট দৃশ্য দেখেন না; বরং নিজের অভিজ্ঞতা ও অনুভূতির আলোয় ছবিগুলোর অর্থ নির্মাণ করেন।

শামসুল আলম আজাদের ‘দৃশ্যমান কাঠামো’

‘দৃশ্যমান কাঠামো’ শিরোনামটিই এই প্রদর্শনীর শিল্পদর্শনের কেন্দ্রবিন্দু। প্রথম দর্শনে ক্যানভাসগুলো সম্পূর্ণ বিমূর্ত মনে হলেও কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলে রঙের স্তরের ভেতর থেকে ধীরে ধীরে প্রকাশ পায় এক অদৃশ্য বিন্যাস, এক অন্তর্লীন শৃঙ্খলা। শিল্পীর কাছে এই কাঠামো কোনো জ্যামিতিক অবয়ব নয়; বরং প্রকৃতি, সময়, স্মৃতি এবং মানুষের অনুভূতির গভীরে লুকিয়ে থাকা সম্পর্কের দৃশ্যমান রূপ।

এই শিল্পভাষার বীজ রোপিত হয়েছিল তাঁর ছাত্রজীবনেই। চারুকলায় পড়ার সময় কলাগাছ, কচুগাছ কিংবা লাউয়ের মাচা আঁকতে গিয়ে তিনি আবিষ্কার করেছিলেন সবুজের অসংখ্য রূপ। সবুজের ভেতরে লুকিয়ে থাকা গোলাপি, কমলা কিংবা হলুদাভ আভা তাঁকে রঙকে নতুনভাবে দেখতে শিখিয়েছিল। সেই উপলব্ধিই পরবর্তী সময়ে তাঁর শিল্পচিন্তার ভিত্তি হয়ে ওঠে।

শামসুল আলম আজাদের ‘দৃশ্যমান কাঠামো’

শিল্পী আজাদের শিল্পযাত্রায় গভীর প্রভাব রেখেছেন বাংলাদেশের আধুনিক চিত্রকলার দুই প্রবাদপ্রতিম শিল্পী ̶ মোহাম্মদ কিবরিয়া ও মাহমুদুল হক। কিবরিয়ার রঙের রহস্যময় ব্যবহার এবং মাহমুদুল হকের কাদা, মাটি ও জলের টেক্সচার তাঁকে বাস্তবধর্মী অঙ্কনের গণ্ডি পেরিয়ে বিমূর্ততার বিস্তৃত পরিসরে নিয়ে যায়। তবে তিনি তাঁদের অনুসরণ করেননি; বরং নিজের প্রকৃতিপাঠ, অভিজ্ঞতা ও জীবনবোধকে মিশিয়ে নির্মাণ করেছেন স্বতন্ত্র এক শিল্পভাষা।

প্রদর্শনীর চিত্রগুলোতে নীল, সবুজ, ধূসর ও মাটির রঙের সংযমী অথচ গভীর ব্যবহার বিশেষভাবে চোখে পড়ে। সবুজ এখানে শুধু বৃক্ষ বা প্রকৃতির রঙ নয়; এটি পুনর্জন্মের প্রতীক। নীল কখনো জল, কখনো নীরবতা, কখনো অসীমের অনুভূতি বহন করে। ধূসর রঙে ধরা পড়ে সময়ের ক্ষয়, স্মৃতি ও স্তরবিন্যাস। আবার কোথাও হঠাৎ জ্বলে ওঠা লালের ক্ষুদ্র উপস্থিতি নিস্তব্ধতার ভেতর প্রাণের স্পন্দন হয়ে ধরা দেয়।
শিল্পীর অন্যতম শক্তি তাঁর টেক্সচার নির্মাণ। কোথাও রঙ ঘন হয়ে উঠেছে, কোথাও তা ঘষে তুলে ফেলা হয়েছে, কোথাও আবার স্তরের পর স্তর বসিয়ে সৃষ্টি হয়েছে এমন এক পৃষ্ঠ, যা সময়ের মতোই গভীর ও বহুমাত্রিক। ফলে প্রতিটি ক্যানভাস কেবল একটি ছবি হয়ে থাকে না; বরং মনে হয় বহু বছরের জমাট স্মৃতি, ক্ষয়, পরিবর্তন ও পুনর্জন্মের নীরব দলিল।

শামসুল আলম আজাদের ‘দৃশ্যমান কাঠামো’

এই প্রদর্শনীর সবচেয়ে বড় শক্তি সম্ভবত এখানেই ̶ এটি কোনো দৃশ্যের পুনর্নির্মাণ নয়, বরং অনুভূতির পুনর্গঠন। একই চিত্র একজন দর্শকের কাছে নদীর স্মৃতি হয়ে উঠতে পারে, অন্যজনের কাছে পাহাড়ের স্তর, আবার কারও কাছে নিঃসঙ্গতার প্রতীক। শিল্পী কোনো নির্দিষ্ট অর্থ চাপিয়ে দেন না; বরং ব্যাখ্যার অসংখ্য সম্ভাবনা উন্মুক্ত রাখেন। এই বহুমাত্রিকতাই তাঁর বিমূর্ত শিল্পকে দর্শকের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত করে দেয়।

সমকালীন বাংলাদেশের বিমূর্ত শিল্পচর্চায় ‘দৃশ্যমান কাঠামো’ নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। শিল্পপ্রেমী, শিক্ষার্থী, গবেষক কিংবা সাধারণ দর্শক ̶ সবার জন্যই এই প্রদর্শনী একটি নতুন চাক্ষুষ অভিজ্ঞতার দ্বার খুলে দেয়। এখানে প্রতিটি ক্যানভাস দর্শককে শুধু দেখার আহ্বান জানায় না; বরং থেমে ভাবতে, অনুভব করতে এবং নিজের ভেতরের নীরব ভূদৃশ্যের সঙ্গে সংলাপে বসতে উদ্বুদ্ধ করে।

শামসুল আলম আজাদের ‘দৃশ্যমান কাঠামো’

প্রদর্শনীর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বরেণ্য শিল্পী রফিকুন ননী। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন শিল্পীর বড় ভাই, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও কবি শামসুদ্দোহা মিলন এবং শান্ত-মারিয়াম ইউনিভার্সিটি অব ক্রিয়েটিভ টেকনোলজির বোর্ড অব ট্রাস্টিজের চেয়ারম্যান শিল্পী অধ্যাপক মোস্তাফিজুল হক। অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন শিল্পী শামসুল আলম আজাদ, গ্যালারি চিত্রকের পরিচালক শিল্পী মনিরুজ্জামান, নাট্যব্যক্তিত্ব শংকর সাঁওজাল, শিল্পী জাহিদ মোস্তাফাসহ শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতি অঙ্গনের বিশিষ্টজনেরা।

শেষ পর্যন্ত ‘দৃশ্যমান কাঠামো’ কেবল একটি চিত্রপ্রদর্শনীর নাম নয়। এটি একজন শিল্পীর দীর্ঘ আত্মঅনুসন্ধান, নীরব সাধনা এবং প্রকৃতির অদৃশ্য প্রাণশক্তিকে রঙের ভাষায় অনুবাদ করার এক আন্তরিক প্রয়াস। এখানে রঙ কেবল রঙ নয়, রেখা কেবল রেখা নয়; প্রতিটি ক্যানভাস যেন দৃশ্যমান জগতের আড়ালে লুকিয়ে থাকা জীবনের নীরব কাঠামোকে স্পর্শ করার একটি আমন্ত্রণ। গ্যালারি চিত্রকের দেয়ালে ঝুলে থাকা এই শিল্পকর্মগুলো তাই শুধু চোখে ধরা দেয় না; ধীরে ধীরে প্রবেশ করে দর্শকের মনোজগতে, যেখানে দেখা, অনুভব ও স্মৃতি একাকার হয়ে যায়।

এইচআর/এএসএম

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow