শিকড় হারিয়ে নিঃস্ব : বিষখালী নদী দখল‐দূষণমুক্তসহ ভাঙন রোধে সমন্বিত পদক্ষেপের দাবি

বিষখালী নদীর অব্যাহত ভাঙনে শিকড় (ঘরবাড়ি, জমি, জীবিকা) হারিয়ে নিঃস্ব বিষখালী নদী সংলগ্ন হাজারো পরিবার। যত স্রোত তত ভাঙা, বিষখালী নদী সংলগ্ন বাসিন্দাদের কপাল ভাঙা এমন চিত্রই এখানকার বাসিন্দাদের। নদীকে দখল ও দূষণ থেকে মুক্ত করা এবং ভাঙন ঠেকাতে সরকারসহ সংশ্লিষ্টদের সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি উঠেছে। নদী বাঁচাও, মানুষ বাঁচাও এ স্লোগানকে ধারণ করে পরিবেশ ও জলবায়ু বিষয়ক নাগরিক সংগঠন ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা), পাথরঘাটা উপকূল সুরক্ষা আন্দোলনের আয়োজনে শনিবার (১৪ মার্চ) পাথরঘাটা উপজেলার সদর পাথরঘাটা ইউনিয়নের বিষখালী নদী সংলগ্ন জিনতলায় স্থানীয় বাসিন্দারা নদী ভাঙনের বেদনার কথা তুলে ধরেন। পাশাপাশি নদী দখল দুষণমুক্তসহ ভাঙন রোধে সমন্বিত পদক্ষেপের দাবিতে অনশন করেন। নদীর পাড়ে বসে ভাঙনে বিলীন হওয়া ভূমিহীনদের বেদনার কথা তুলে ধরেন। এ সময় স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল জব্বার, হেমায়েত হোসেন, বেলায়েত মিয়া, রফিকুল ইসলাম, মো. শাহিন মিয়া, আ. জব্বার, সোহরাব হোসেন, নুর আলম, ইদ্রিস তালুকদার, ইসমাইল হোসেন, আ. কাদের মিয়ার বসত ভিটা নদী গর্ভে বিলীন হওয়ার বেদনার গল্প তুলে ধরেন। এ সময় তারা বলেন, বাপ-দাদার ভিটামাটি নদীতে ব

শিকড় হারিয়ে নিঃস্ব : বিষখালী নদী দখল‐দূষণমুক্তসহ ভাঙন রোধে সমন্বিত পদক্ষেপের দাবি

বিষখালী নদীর অব্যাহত ভাঙনে শিকড় (ঘরবাড়ি, জমি, জীবিকা) হারিয়ে নিঃস্ব বিষখালী নদী সংলগ্ন হাজারো পরিবার। যত স্রোত তত ভাঙা, বিষখালী নদী সংলগ্ন বাসিন্দাদের কপাল ভাঙা এমন চিত্রই এখানকার বাসিন্দাদের। নদীকে দখল ও দূষণ থেকে মুক্ত করা এবং ভাঙন ঠেকাতে সরকারসহ সংশ্লিষ্টদের সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি উঠেছে।

নদী বাঁচাও, মানুষ বাঁচাও এ স্লোগানকে ধারণ করে পরিবেশ ও জলবায়ু বিষয়ক নাগরিক সংগঠন ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা), পাথরঘাটা উপকূল সুরক্ষা আন্দোলনের আয়োজনে শনিবার (১৪ মার্চ) পাথরঘাটা উপজেলার সদর পাথরঘাটা ইউনিয়নের বিষখালী নদী সংলগ্ন জিনতলায় স্থানীয় বাসিন্দারা নদী ভাঙনের বেদনার কথা তুলে ধরেন। পাশাপাশি নদী দখল দুষণমুক্তসহ ভাঙন রোধে সমন্বিত পদক্ষেপের দাবিতে অনশন করেন। নদীর পাড়ে বসে ভাঙনে বিলীন হওয়া ভূমিহীনদের বেদনার কথা তুলে ধরেন।

এ সময় স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল জব্বার, হেমায়েত হোসেন, বেলায়েত মিয়া, রফিকুল ইসলাম, মো. শাহিন মিয়া, আ. জব্বার, সোহরাব হোসেন, নুর আলম, ইদ্রিস তালুকদার, ইসমাইল হোসেন, আ. কাদের মিয়ার বসত ভিটা নদী গর্ভে বিলীন হওয়ার বেদনার গল্প তুলে ধরেন।

এ সময় তারা বলেন, বাপ-দাদার ভিটামাটি নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। আমরা বছরের পর বছর ধরে নিঃস্ব এবং ভূমিহীন অবস্থায় আছি। প্রতিদিনই জোয়ারে বিষখালী নদীর পাড় ভেঙে যায়। প্রতিদিনই কোন না কোন বসতভিটা ভেঙে যায়। বিষখালী নদীর পাড়ে টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ, টেকসই সামাজিক বনায়ন, অবৈধ দখল ও দুষণমুক্ত করার দাবি করেন তারা। বিষখালী নদী যেমন জীবিকার উৎস, তেমনি এ নদীই তাদের নিঃস্ব করে বলেও মনে করেন নদী সংলগ্ন বাসিন্দারা।

এ সময় ৮৫ বছরের বৃদ্ধ আব্দুল জব্বার কান্নায় ভেঙে পড়েন এবং বলেন ‘বাবারে এডা মোগো কপাল, কেমন আর আছি। মোগো কপাল ভাঙার।’ তিনি বলেন, এইতো কয়েক বছর আগেও বাবার বসত বাড়ি ছিলো ওইখানে...। আমার এই বয়সে ৪ বার বেড়িবাঁধ (ওয়াপদা) দেখছি। ৪টি বেড়িবাঁধ বিষখালী নদীতে ডুইব্যা গ্যাছে। দেখলে মনে হবে ৫০ বছর আগে ভাইঙ্গা গ্যাছে। কোন ক্ষতিপূরণ পেয়েছেন কিনা এমন প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, আরে বাবা আগেই কইছি ওডা মোগো কপাল; নদীতে গ্যাছে জমি বসত বাড়ি। ৯ কুড়া জমি নদীতে শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু ক্ষতিপূরণ পাই নাই। এহন কোন রকম খাস জমিতে থাহি।’

বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ নদীগুলোর মধ্যে অন্যতম বিষখালী নদী। এ নদী যেমন জীবিকার অন্যতম ভাণ্ডার ও যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম, তেমনি প্রতি বছর নদীভাঙনের মাধ্যমে অসংখ্য মানুষকে ভূমিহীন করে দিচ্ছে। নদীর তীরবর্তী এলাকাগুলোতে বসবাসকারী মানুষের জন্য এটি এক দীর্ঘস্থায়ী মানবিক সংকটে পরিণত হয়েছে। বিষখালী নদীর তীরে অবস্থিত অনেক গ্রাম ইতোমধ্যেই আংশিক বা সম্পূর্ণভাবে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। 

বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে নদীর পানির স্রোত ও জোয়ারের কারণে ভাঙন তীব্র আকার ধারণ করে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে যাওয়ায় উপকূলীয় অঞ্চলে জলোচ্ছ্বাসের মাত্রা বেড়ে যাওয়ায় নদী ভাঙন বৃদ্ধিসহ লবণাক্ত পানি ঢুকে পড়ছে। ঘন ঘন জলোচ্ছ্বাসের ফলে নদী ভাঙনের সাথে সাথে উপকূল রক্ষাকবজ বেড়িবাঁধও ভেঙে যাচ্ছে। স্থানীয়দের মতে, কয়েক বছরের ব্যবধানে অনেক পরিবার তাদের বসতভিটা ও কৃষিজমি হারিয়েছে। ফলে তারা দ্রুত ভূমিহীন হয়ে পড়ছে। বিষখালী নদীর তীরবর্তী বাসিন্দাদের এমন চিত্র প্রতিদিনের।

ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা) পাথরঘাটা সমন্বয়কারী শফিকুল ইসলাম খোকন বলেন, ‘নদীতেই উপকূল মানুষের বসবাস, নদীতেই তাদের জীবিকা। জীবিকার জন্য নদীর উপর ভরসা থাকে তাদের। ভাঙা গড়ার খেলা জেনেও বসবাস করতে হচ্ছে উপকূলবাসীর। প্রতি বছর কমবেশি জমিজমা, বসত বাড়ি নদীর গর্ভে বিলীন হয়ে যায়। অনেক পরিবার ভূমিহীন হয়ে পড়ে।’

তিনি আরও বলেন, ‘সুদূরপ্রসারী টেকসই পরিকল্পনা করে উপকূল রার জন্য টেকসই বেড়িবাঁধ, টেকসই বনায়ন এবং ক্ষতিগ্রস্তদের টেকসই পুনর্বাসন করা দরকার। সে ক্ষেত্রে শুধু সরকারের একার দায়িত্ব নয়, স্থানীয় পর্যায়ের বাস্তবতার প্রেক্ষিতে চাহিদা অনুযায়ী সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।’

লেখক : সাংবাদিক, পাথরঘাটা, বরগুনা

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow