শিশুদের মধ্যে হঠাৎ কেন হামের প্রকোপ, কী ব্যবস্থা নিচ্ছে সরকার?

দেশে হঠাৎ করে উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে শিশুদের মধ্যে হামের প্রকোপ। টিকাদানের ঘাটতি, অপুষ্টি ও ভাইরাসের ধরনে পরিবর্তনসহ বেশ কিছু কারণকে দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা। স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্যমতে, সাধারণত সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) আওতায় শিশুদের ৯ মাস ও ১৫ মাস বয়সে দুটি টিকা দেওয়া হয়। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে দেখা যাচ্ছে, আক্রান্ত শিশুদের প্রায় ৩৩ শতাংশের বয়সই ৯ মাসের কম, যা চিকিৎসকদের ভাবিয়ে তুলছে। বিগত বছরগুলোতে করোনা মহামারি এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে প্রতি চার বছর অন্তর যে বিশেষ হাম নির্মূল ক্যাম্পেইন হওয়ার কথা ছিল, তা নিয়মিত না হওয়ায় শিশুদের বড় একটি অংশ সুরক্ষার বাইরে থেকে গেছে। এছাড়া দীর্ঘদিনের পুরনো টিকার কার্যকারিতা এবং ভাইরাসের নতুন কোনো রূপান্তর ঘটেছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। শিশুদের মায়ের বুকের দুধ পর্যাপ্ত না খাওয়ানো এবং কৃমিনাশক ওষুধের অভাবজনিত অপুষ্টি এই সংক্রমণকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে। হাম একটি অত্যন্ত ছোঁয়াচে ভাইরাসজনিত রোগ, যা থেকে নিউমোনিয়া বা ডায়রিয়ার মতো জটিলতা তৈরি হয়ে শিশুর মৃত্যুঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। বিশেষ করে রাজশাহী, ময়মনসিংহ, ঢাকা এবং কক্সবাজারের রোহিঙ্গা

শিশুদের মধ্যে হঠাৎ কেন হামের প্রকোপ, কী ব্যবস্থা নিচ্ছে সরকার?

দেশে হঠাৎ করে উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে শিশুদের মধ্যে হামের প্রকোপ। টিকাদানের ঘাটতি, অপুষ্টি ও ভাইরাসের ধরনে পরিবর্তনসহ বেশ কিছু কারণকে দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা।

স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্যমতে, সাধারণত সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) আওতায় শিশুদের ৯ মাস ও ১৫ মাস বয়সে দুটি টিকা দেওয়া হয়। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে দেখা যাচ্ছে, আক্রান্ত শিশুদের প্রায় ৩৩ শতাংশের বয়সই ৯ মাসের কম, যা চিকিৎসকদের ভাবিয়ে তুলছে।

বিগত বছরগুলোতে করোনা মহামারি এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে প্রতি চার বছর অন্তর যে বিশেষ হাম নির্মূল ক্যাম্পেইন হওয়ার কথা ছিল, তা নিয়মিত না হওয়ায় শিশুদের বড় একটি অংশ সুরক্ষার বাইরে থেকে গেছে। এছাড়া দীর্ঘদিনের পুরনো টিকার কার্যকারিতা এবং ভাইরাসের নতুন কোনো রূপান্তর ঘটেছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। শিশুদের মায়ের বুকের দুধ পর্যাপ্ত না খাওয়ানো এবং কৃমিনাশক ওষুধের অভাবজনিত অপুষ্টি এই সংক্রমণকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে।

হাম একটি অত্যন্ত ছোঁয়াচে ভাইরাসজনিত রোগ, যা থেকে নিউমোনিয়া বা ডায়রিয়ার মতো জটিলতা তৈরি হয়ে শিশুর মৃত্যুঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। বিশেষ করে রাজশাহী, ময়মনসিংহ, ঢাকা এবং কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে এই রোগের প্রকোপ বেশি দেখা যাচ্ছে।

ময়মনসিংহে আরও দুটি শিশুর হামে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। ঢাকাসহ বিভিন্ন জায়গায় হাসপাতালগুলোয় হাম সন্দেহে ভর্তির ভিড় বাড়ছে। মার্চ মাস জুড়ে এখন পর্যন্ত সারাদেশে হামের কারণে অন্তত ২০টি শিশুর মৃত্যুর তথ্য এসেছে দেশের সংবাদমাধ্যমে।

অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, প্রয়োজনীয় আইসিইউ বা ভেন্টিলেশন সুবিধার অভাবে আক্রান্ত শিশুদের সঠিক চিকিৎসা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ছে। এই পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার প্রায় ৬০০ কোটি টাকা নতুন করে টিকার জন্য বরাদ্দ দিয়েছে।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, গত আট বছর ধরে নিয়মিত বিশেষ ক্যাম্পেইন না হওয়ার কারণেই এই সংকট তৈরি হয়েছে। বর্তমানে রাজধানীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালসহ বড় দশটি মেডিকেল কলেজে হামের রোগীদের জন্য আলাদা ওয়ার্ড ও বিশেষ আইসিইউর ব্যবস্থা করা হয়েছে।

এবার আক্রান্ত রোগীদের উপসর্গ বিবেচনা করে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে এবং তাতে তারা সুস্থ হচ্ছেন বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।

স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, তারা আগামী জুলাই-অগাস্টে বিশেষ ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে দেশজুড়ে শিশুদের হামের টিকা দেওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে।

‘ইতোমধ্যেই ভ্যাকসিন চলে আসছে। আরও যা যা লাগবে সেটি টিকার জন্য গঠিত বৈশ্বিক জোট গ্যাভিকে অবহিত করা হয়েছে। তারা মে থেকে জুলাইয়ের মধ্যে ২ কোটি সিরিঞ্জ দেবে। সবকিছু এক হলেই আমরা ক্যাম্পেইন (বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি) শুরু করবো,’  বলেছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক শাহরিয়ার সাজ্জাদ।

স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তা ও শিশু চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, শিশুদের মায়ের বুক দুধ ঠিকমতো পান না করানো, প্রয়োজনীয় কৃমিনাশক ঔষধ না খাওয়ানো এবং অপুষ্টির কারণেই নতুন করে হামের এই প্রকোপ শুরু হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।

এছাড়া হামের জন্য যে টিকা দেওয়া হচ্ছে সেই টিকার মান এবং দীর্ঘদিন ধরে টিকা দেওয়ার কারণে ভাইরাসের ধরণে কোনো পরিবর্তন নতুন করে হামের প্রকোপে ভূমিকা রেখেছে কি-না সেই প্রশ্নও উঠছে।

চিকিৎসকদের পরামর্শ, হামের লক্ষণ যেমন তীব্র জ্বর, কাশি, চোখ লাল হওয়া বা শরীরে র‍্যাশ দেখা দিলে শিশুকে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন করতে হবে। যেহেতু ৯ মাসের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে সংক্রমণ বাড়ছে, তাই টিকার বয়সসীমা এগিয়ে আনা যায় কি না, সে বিষয়েও বিশেষজ্ঞরা মত দিচ্ছেন। বর্তমানে আক্রান্তদের উপসর্গ অনুযায়ী চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে এবং টিকাদান কার্যক্রম জোরদার করার মাধ্যমে এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চলছে।

শিশু বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক সঞ্জয় কুমার দে বলেন, ভাইরাসের সংস্পর্শে আসার এক থেকে দুই সপ্তাহের মধ্যে হামের লক্ষণ দেখা যায়। আর একজন হাম আক্রান্ত ব্যক্তি থেকে আরও অন্তত ১৮ জন সংক্রমিত হতে পারে।

তিনি বলেন, ‘এর প্রথম পর্যায়ে অনেক জ্বর, কাশি, নাক দিয়ে পানি পড়া, চোখ লাল ও আলো সহ্য করতে না পারা (চোখ ওঠা)র মতো উপসর্গ দেখা দেয়। এটি একটি ভাইরাল ও খুবই ছোঁয়াচে রোগ। এতে আক্রান্ত হলে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যেতে পারে। তখন শিশু নিউমোনিয়া ও লুজ মোশনে আক্রান্ত হতে পারে। আবার এসব হলে পুষ্টিহীনতা দেখা দেয়। সব মিলিয়ে শিশুর জীবনকে ঝুঁকিতে ফেলতে পারে এই রোগ।’

চিকিৎসকদের মতে, বেশিরভাগ সময় হামে আক্রান্ত শিশুকে হাসপাতালে আলাদা ব্যবস্থাপনায় রেখে চিকিৎসা দিতে হয়। তবে রোগটিকে প্রতিরোধযোগ্য উল্লেখ করে সঞ্জয় কুমার দে বলেন, সময়মত টিকা নিলে এ রোগ থেকে শিশুকে সুরক্ষা দেওয়া সম্ভব।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল বলেছেন, মিজেলসের (হাম) রোগী অনেক বেড়েছে। আট বছর আগে মিজেলসের ভ্যাকসিন দেওয়া হয়েছে এবং এরপর ভ্যাকসিন কোনো সরকার দেয়নি।

‘গত ১৫ দিনে হামের প্রবণতা বেড়েছে। তবে এখনো আমাদের সক্ষমতা রয়েছে। সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। পাশাপাশি ডিএনসিসি হাসপাতালে হামের জন্য আলাদা কর্নার করা হয়েছে। সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে আইসিইউ রেডি করা হয়েছে, উইথ ভেন্টিলেটর,’ রোববার (২৯ মার্চ) রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের বলেন তিনি।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিচালক (হাসপাতাল) আবু হোসেইন মো. মইনুল আহসান বলেন, সুনির্দিষ্ট কিছু এলাকায় বেশি আক্রান্ত হলেও কমবেশি সারাদেশেই হামে আক্রান্ত হওয়ার তথ্য পাচ্ছেন তারা।

‘বড় দশটি মেডিকেল কলেজে আলাদা ওয়ার্ড খোলা হয়েছে। সব আইসিউতে এসব রোগীকে চিকিৎসা দেওয়া যায় না। তাই আলাদা করে আইসিউর ব্যবস্থা করা হচ্ছে সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে,’ বলেছেন তিনি।

তথ্যসূত্র: বিবিসি বাংলা

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow