শৈশবের ঘুড্ডি কাটাকাটির মেলা
রাজীব কুমার সাহা বাঙালির সর্বজনীন উৎসব পহেলা বৈশাখ। বাংলা নববর্ষের প্রথম দিন হিসেবে এটি আমাদের জীবনে নতুন আশা, নতুন স্বপ্ন ও নতুন উদ্দীপনার বার্তা নিয়ে আসে। শৈশবে পহেলা বৈশাখ মানেই ছিল সীমাহীন আনন্দ, উৎসব আর উচ্ছ্বাসের দিন। দিনটি ঘিরে আমাদের মনে যে আনন্দের জোয়ার বয়ে যেত, তা ভাষায় প্রকাশ করা দুরূহ। বৈশাখের আগমনের কয়েকদিন আগে থেকেই মনে আনন্দের ঢেউ উঠতে শুরু করতো। আক্ষরিকভাবেই মন হয়ে উঠতো বৈশাখী আনন্দে উৎসবমুখর। শৈশব মানুষের জীবনের সবচেয়ে নির্মল ও আনন্দঘন সময়। জীবনের নানা ব্যস্ততা, দুঃখ-কষ্ট ও সংগ্রামের ভিড়ে মানুষ যখন ক্লান্ত হয়ে পড়ে; তখন সে ফিরে যেতে চায় তার ফেলে আসা সোনালি শৈশবের দিনগুলো। শৈশবের প্রতিটি স্মৃতি যেন হৃদয়ের গহিনে লুকিয়ে থাকা একেকটি অমূল্য সম্পদ। এই শৈশবের আনন্দময় স্মৃতির ভান্ডারে পহেলা বৈশাখ এক উজ্জ্বল ও বর্ণিল অধ্যায় হয়ে চিরস্মরণীয় হয়ে আছে। কালের পরিক্রমায় বদলে গেছে প্রকৃতি। এর সাথে সাথে গ্রামীণ নানান আচার-অনুষ্ঠানও। সময়ের হাত ধরে পাল্টে যাচ্ছে অনেক কিছুই। তবে বর্ষবরণের দিনে আমার জন্মজেলা কিশোরগঞ্জের বাজিতপুরে ‘বান্নি’ বসছে ঠিক আগের মতোই। এখানে এ বান্নি ‘ঘুড্ডি কাটাকাটির
রাজীব কুমার সাহা
বাঙালির সর্বজনীন উৎসব পহেলা বৈশাখ। বাংলা নববর্ষের প্রথম দিন হিসেবে এটি আমাদের জীবনে নতুন আশা, নতুন স্বপ্ন ও নতুন উদ্দীপনার বার্তা নিয়ে আসে। শৈশবে পহেলা বৈশাখ মানেই ছিল সীমাহীন আনন্দ, উৎসব আর উচ্ছ্বাসের দিন। দিনটি ঘিরে আমাদের মনে যে আনন্দের জোয়ার বয়ে যেত, তা ভাষায় প্রকাশ করা দুরূহ। বৈশাখের আগমনের কয়েকদিন আগে থেকেই মনে আনন্দের ঢেউ উঠতে শুরু করতো। আক্ষরিকভাবেই মন হয়ে উঠতো বৈশাখী আনন্দে উৎসবমুখর।
শৈশব মানুষের জীবনের সবচেয়ে নির্মল ও আনন্দঘন সময়। জীবনের নানা ব্যস্ততা, দুঃখ-কষ্ট ও সংগ্রামের ভিড়ে মানুষ যখন ক্লান্ত হয়ে পড়ে; তখন সে ফিরে যেতে চায় তার ফেলে আসা সোনালি শৈশবের দিনগুলো। শৈশবের প্রতিটি স্মৃতি যেন হৃদয়ের গহিনে লুকিয়ে থাকা একেকটি অমূল্য সম্পদ। এই শৈশবের আনন্দময় স্মৃতির ভান্ডারে পহেলা বৈশাখ এক উজ্জ্বল ও বর্ণিল অধ্যায় হয়ে চিরস্মরণীয় হয়ে আছে। কালের পরিক্রমায় বদলে গেছে প্রকৃতি। এর সাথে সাথে গ্রামীণ নানান আচার-অনুষ্ঠানও। সময়ের হাত ধরে পাল্টে যাচ্ছে অনেক কিছুই। তবে বর্ষবরণের দিনে আমার জন্মজেলা কিশোরগঞ্জের বাজিতপুরে ‘বান্নি’ বসছে ঠিক আগের মতোই। এখানে এ বান্নি ‘ঘুড্ডি কাটাকাটির মেলা’ নামে এখনো প্রচলিত।
কিশোরগঞ্জের হাওর অঞ্চলে নববর্ষে অনুষ্ঠিত মেলাগুলোর মধ্যে ‘ঘুড্ডি কাটাকাটির মেলা’ সবচেয়ে প্রাচীন, ঐতিহ্যবাহী ও বৈচিত্র্যময়। বাজিতপুর পৌর শহরের বাঁশমহালে মূল মেলা বসে। এতে পাওয়া যায় গ্রামের মেয়েদের বিচিত্র সব প্রসাধন, কাঠ ও মাটির খেলনা, তৈজসপত্র। ঘুড়ির মেলা বসে বড় সড়কে। অনেক আগে থেকেই ঘুড়িওয়ালাদের প্রস্তুতি শুরু হয়। কাচ গুঁড়া করে আঠার মিশ্রণে রিল রিল সুতা ‘মাঞ্জা’ দিয়ে ধারালো করা হয়। ঘুড়ি কাটাকাটি শুরু হলে আকাশজুড়ে শত শত ঘুড়ি একটি অন্যটিকে ধাওয়া করে। হঠাৎ সুতা কেটে গিয়ে একেকটি ঘুড়ি আকাশের সঙ্গে যেন মিশে যায়। কেটে যাওয়া ঘুড়ি কবজা করতে কঞ্চি, এমনকি কঞ্চিসুদ্ধ আস্ত বাঁশ নিয়ে খোলা হাওরজুড়ে ছেলেমেয়েরা দৌড়ায়!
আগে মূল মেলা দুই-তিন দিন চললেও ঘুড়ি কাটাকাটি হতো সাত দিন ধরে। কথিত আছে, একসময় কলকাতা থেকে শৌখিন ঘুড়িওয়ালারা এসে এ মেলায় অংশ নিতেন। একসময় নানা ধরনের ঘুড়ি ওড়ানো হতো। এর মধ্যে ছিল সাপঘুড়ি, মাছঘুড়ি, প্রজাপতিঘুড়ি, চোঙঘুড়ি, ঢোপঘুড়ি, চিলঘুড়ি, ফিংগিঘুড়ি, উড়োজাহাজঘুড়ি, মানুষঘুড়ি, কোয়াড়ে বা সংঘুড়ি। এখন এতটা বৈচিত্র্য না থাকলেও গাছে বাঁধা ‘ঢাউস’ ঘুড়িও চোখে পড়ে।
শৈশবের পহেলা বৈশাখের সবচেয়ে আনন্দঘন মুহূর্ত ছিল বৈশাখী মেলায় যাওয়া। মা-বাবার হাত ধরে মেলায় যাওয়ার স্মৃতি আজও হৃদয়ে জাগিয়ে তোলে অপার ভালোবাসা ও আনন্দ। মেলায় সারি সারি দোকানে রঙিন খেলনা, মাটির পুতুল, কাগজের ফুল, বাঁশি, মুখোশ এবং নানা ধরনের মিষ্টি সাজানো থাকতো। শিশুমন তখন আনন্দে আত্মহারা হয়ে পড়তো। মেলার কোলাহল, মানুষের ভিড়, নাগরদোলার ঘূর্ণন আর হকারদের ডাক—সব মিলিয়ে এক স্বপ্নিল পরিবেশের সৃষ্টি হতো। বন্ধুদের সঙ্গে মেলায় ঘুরে বেড়ানো, খেলনা কেনা, মিষ্টি খাওয়া—এসবই ছিল পহেলা বৈশাখের বিশেষ আকর্ষণ। পহেলা বৈশাখে ঘরে ঘরে বিশেষ খাবারের আয়োজনও শৈশবের আনন্দকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিতো। মা নিজহাতে তৈরি করতেন নানারকম সুস্বাদু খাবার। পরিবারের সবাই একসঙ্গে বসে আনন্দের সঙ্গে খাওয়া-দাওয়া করতাম। সেই মুহূর্তগুলো পারিবারিক ভালোবাসা ও আন্তরিকতার বন্ধনকে আরও দৃঢ় করে তুলতো।
মেলার অন্যতম আকর্ষণ হলো টকজাতীয় পাকা গাব ও বেতফলের সারি সারি খুচরা বিক্রেতা। লোভনীয় এই বেতফলকে স্থানীয়রা ‘বেতগুডা’ বলে। বেতগুডা এ অঞ্চলে প্রচুর জন্মায়। মেলায় ৪০-৫০ টাকায় এক থোকা বেতফল পাওয়া যায়। আরও মেলে আলতা, লাল-নীল ফিতে, খেলনা লঞ্চ, লবডংকা, খেলনাগাড়ি, কাঠের ঘোড়া, কাগজের কুমির, চরকা, বেলুনবাঁশি, প্লাস্টিকের সাপ, মাটির তৈরি জন্তু-জানোয়ার, ফলমূল, ব্যাংক, সেইসাথে তিল্লা, উখরা, খেলনা, বিন্নি, খই প্রভৃতি। কয়েক বছর আগেও মেলায় পুতুলনাচের আসর দেখা যেত। কিন্তু এখন পুতুলনাচ না থাকলেও নাগরদোলা আসে। মাঝেমধ্যে লাঠিখেলাও চোখে পড়ে।
বাজিতপুর বাজারের ব্যবসায়ীরা বিপুল উৎসাহে ‘শুভ হালখাতা’ পালন করেন। বাজিতপুরের ঘুড়ির মেলার গোড়াপত্তন ঠিক কবে হয়েছে, তা সুনির্দিষ্ট করে কেউ বলতে না পারলেও অন্তত ৩০০ বছর ধরে এ মেলা প্রচলিত রয়েছে। অত্র অঞ্চলে নাগরিক আমেজের পান্তা-ইলিশ না খেলেও গ্রামের মানুষ আমভর্তা, গিমা-পাটশাক-সজনেপাতা ভাজা ও সজনে-ডাল খায়। বর্তমান সময়ে এ মেলার প্রাচুর্য কিছুটা হ্রাস পেলেও হাওর জনপদে এ উৎসব প্রতি বছর ভিন্ন আমেজ নিয়ে আসে।
আজ সময়ের আবর্তে শৈশব অনেক দূরে হারিয়ে গেছে। জীবনের ব্যস্ততা বেড়েছে, দায়িত্ব বেড়েছে কিন্তু শৈশবের সেই পহেলা বৈশাখের স্মৃতি আজও মনকে আলোড়িত করে। এখনো বৈশাখ এলেই মনে পড়ে যায় নতুন পোশাকের গন্ধ, মেলার কোলাহল, মিষ্টির স্বাদ আর পরিবারের সঙ্গে কাটানো আনন্দঘন মুহূর্তগুলো। বাঙালির ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সঙ্গে মিশে থাকা এই উৎসব আমাদের হৃদয়ে আজীবন স্মরণীয় হয়ে থাকবে। শৈশবের স্মৃতিতে পহেলা বৈশাখ যেন এক চিরসবুজ আনন্দের প্রতীক, যা অজর-অমর-অক্ষয়।
লেখক: সহকারী সম্পাদক, অভিধান ও বিশ্বকোষ উপবিভাগ, গবেষণা, সংকলন এবং অভিধান ও বিশ্বকোষ বিভাগ, বাংলা একাডেমি।
এসইউ
What's Your Reaction?