শ্বেত বিপ্লবের নেপথ্যে: খামারিদের ঘাম ও দুগ্ধ শিল্পের ভবিষ্যৎ
বিবি শাহীজান একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের টেকসই উন্নয়ন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং জনস্বাস্থ্যের সামগ্রিক সূচক কেমন হবে, তা বহুলাংশে নির্ভর করে সেই দেশের পুষ্টি নিরাপত্তার ওপর। পুষ্টির এই বিশাল এবং অপরিহার্য চাহিদার একটি সিংহভাগ পূরণ করে দুগ্ধ শিল্প। বিগত কয়েক দশকে বাংলাদেশের গ্রামীণ জনপদে এবং কৃষি অর্থনীতিতে যে নীরব অথচ অভূতপূর্ব বিপ্লব ঘটে গেছে, তাকে অনায়াসেই ‘শ্বেত বিপ্লব’ বলে আখ্যায়িত করা যায়। একসময়ের তীব্র পরনির্ভরশীল এবং আমদানিমুখী এই খাতটি আজ স্বয়ংসম্পূর্ণতার এক সোনালি দ্বারে এসে দাঁড়িয়েছে। গ্রামীণ অর্থনীতির চাকা সচল রাখা, গ্রামীণ নারীদের আর্থিক স্বাবলম্বিতা ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বেকারত্ব দূরীকরণে এই শিল্প এখন দেশের এক অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। কিন্তু এই চোখধাঁধানো সাফল্যের চকচকে এবং জমকালো পর্দার আড়ালে রয়েছে মাঠপর্যায়ের লাখো খামারির হাড়ভাঙা খাটুনি, প্রতিনিয়ত লোকসানের দীর্ঘশ্বাস এবং এক চরম অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। আন্তর্জাতিক দুগ্ধ দিবসের এই বিশেষ লগ্নে আমাদের ডেইরি শিল্পের এই বিপুল সম্ভাবনা যেমন জাতীয় পর্যায়ে উদযাপনের দাবি রাখে, তেমনি এর ভেতরে লুকিয়ে থাকা গভীর সংকটগুলোকে অত্যন্
বিবি শাহীজান
একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের টেকসই উন্নয়ন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং জনস্বাস্থ্যের সামগ্রিক সূচক কেমন হবে, তা বহুলাংশে নির্ভর করে সেই দেশের পুষ্টি নিরাপত্তার ওপর। পুষ্টির এই বিশাল এবং অপরিহার্য চাহিদার একটি সিংহভাগ পূরণ করে দুগ্ধ শিল্প। বিগত কয়েক দশকে বাংলাদেশের গ্রামীণ জনপদে এবং কৃষি অর্থনীতিতে যে নীরব অথচ অভূতপূর্ব বিপ্লব ঘটে গেছে, তাকে অনায়াসেই ‘শ্বেত বিপ্লব’ বলে আখ্যায়িত করা যায়।
একসময়ের তীব্র পরনির্ভরশীল এবং আমদানিমুখী এই খাতটি আজ স্বয়ংসম্পূর্ণতার এক সোনালি দ্বারে এসে দাঁড়িয়েছে। গ্রামীণ অর্থনীতির চাকা সচল রাখা, গ্রামীণ নারীদের আর্থিক স্বাবলম্বিতা ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বেকারত্ব দূরীকরণে এই শিল্প এখন দেশের এক অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। কিন্তু এই চোখধাঁধানো সাফল্যের চকচকে এবং জমকালো পর্দার আড়ালে রয়েছে মাঠপর্যায়ের লাখো খামারির হাড়ভাঙা খাটুনি, প্রতিনিয়ত লোকসানের দীর্ঘশ্বাস এবং এক চরম অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ।
আন্তর্জাতিক দুগ্ধ দিবসের এই বিশেষ লগ্নে আমাদের ডেইরি শিল্পের এই বিপুল সম্ভাবনা যেমন জাতীয় পর্যায়ে উদযাপনের দাবি রাখে, তেমনি এর ভেতরে লুকিয়ে থাকা গভীর সংকটগুলোকে অত্যন্ত নির্মোহভাবে ব্যবচ্ছেদ করা এবং সমাধানের পথ খোঁজা আজ সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
বাংলাদেশের গ্রামীণ সমাজ ও সামগ্রিক অর্থনীতির ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, কৃষির পরেই ডেইরি বা দুগ্ধ খামারের অবস্থান এখন সবচেয়ে শক্তিশালী। দেশের লাখ লাখ প্রান্তিক, ভূমিহীন ও ক্ষুদ্র চাষি এখন শুধু চিরাচরিত ফসলি জমির ওপর নির্ভর না করে দুগ্ধ খামারকে তাদের জীবিকার প্রধান বা অন্যতম সহযোগী মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছেন। বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি পরিসংখ্যান স্পষ্ট সাক্ষ্য দেয় যে, দেশের বাজারে সরবরাহকৃত মোট তরল দুধের সিংহভাগই উৎপাদিত হয় এই প্রান্তিক ও পারিবারিক ক্ষুদ্র খামারগুলো থেকে।
বিগত এক দশকে দেশের হাজার হাজার শিক্ষিত বেকার যুবক বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে অথবা নিজেদের জমানো স্বল্প পুঁজি খাটিয়ে ছোট-বড় দুগ্ধ খামার গড়ে তুলেছেন। এটি গ্রামীণ যুবসমাজের কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে এবং তাদের স্বাবলম্বী করে তুলতে এক যুগান্তকারী ও অভাবনীয় ভূমিকা পালন করছে। একই সঙ্গে গ্রামীণ নারীদের একটি বিশাল অংশ এই খামার ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সরাসরি এবং ওতপ্রোতভাবে যুক্ত। ঘরের নিত্যদিনের কাজের পাশাপাশি গবাদি পশুর যত্ন নেওয়া, দুধ দোহন এবং খামারের দেখভাল করে তারা সংসারে সরাসরি আর্থিক অবদান রাখছেন। এই প্রক্রিয়াটি গ্রামীণ সমাজে নারীর সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা, পারিবারিক মর্যাদা ও সামাজিক ক্ষমতায়ন বহুগুণ বৃদ্ধি করেছে। সামগ্রিক জাতীয় জিডিপিতে এই খাতের অবদানকে কেবল গাণিতিক সংখ্যার বিচারে পরিমাপ করা সম্ভব নয়, কারণ এটি গ্রামীণ দারিদ্র্য বিমোচনের সবচেয়ে বড় এবং কার্যকর হাতিয়ার হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করেছে।
অথচ এই শ্বেত বিপ্লবের মূল কারিগর ও রূপকার যারা, সেই সাধারণ খামারিদের বাস্তব জীবনের গল্পটা মোটেও মসৃণ, রোমাঞ্চকর বা সুখকর নয়। যখন পুরো শহর এবং গ্রামীণ জনপদের মানুষ গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন থাকে, ঠিক তখন ভোররাতের তীব্র শীতে কিংবা বর্ষার কর্দমাক্ত আবহাওয়ায় একজন খামারিকে গোয়ালঘরে গিয়ে কাজ শুরু করতে হয়। রোদ, বৃষ্টি, ঝড় কিংবা যে কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ-কোনো কিছুই তাদের এই কঠোর দৈনিক রুটিনকে এক মুহূর্তের জন্যও থামাতে পারে না।
কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, দিনশেষে এই অমানুষিক পরিশ্রম এবং ত্যাগের বিপরীতে তারা যে আর্থিক পারিশ্রমিক বা নিট মুনাফা ঘরে তোলেন, তা চরমভাবে হতাশাজনক এবং অনেক ক্ষেত্রে অপমানজনক। বর্তমানে দেশের দুগ্ধ শিল্পের সবচেয়ে বড়, তীব্র এবং শ্বাসরোধকারী সংকট হলো গো-খাদ্যের লাগামহীন ও অনিয়ন্ত্রিত মূল্যবৃদ্ধি। খৈল, গম ও চালের ভুষি, খড়, অ্যাংকর ডাল এবং অন্যান্য পুষ্টিকর দানাদার খাবারের দাম বাজারে যেভাবে জ্যামিতিক হারে এবং প্রতিনিয়ত বাড়ছে। সেইসঙ্গে খামারিদের উৎপাদিত কাঁচা দুধের বিক্রয়মূল্যের কোনো ধরনের ন্যূনতম সামঞ্জস্য নেই। এক কেজি ভালো মানের দানাদার খাদ্যের দাম যেখানে দুধের লিটার প্রতি বাজারমূল্যকে অনায়াসে ছাড়িয়ে যায়, সেখানে খামার টিকিয়ে রাখাই খামারিদের জন্য এক দুঃসাধ্য লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে। ফলে অনেক ক্ষুদ্র ও মাঝারি খামারি তাদের শেষ সম্বলটুকু হারিয়ে, পুঁজিশূন্য হয়ে খামার বন্ধ করে দিতে বাধ্য হচ্ছেন, যা এই উদীয়মান শিল্পের টেকসই পথচলার ক্ষেত্রে একটি বিশাল লাল সংকেত।
গো-খাদ্যের এই তীব্র সংকটের পাশাপাশি খামারিদের আরেকটি বড় মানসিক ও আর্থিক উদ্বেগের কারণ হলো গবাদি পশুর উন্নত ও আধুনিক চিকিৎসাসেবা এবং মানসম্মত ওষুধের চরম অভাব। দেশের গ্রামাঞ্চলগুলোতে এখনো পশু চিকিৎসাসেবা পর্যাপ্ত, আধুনিক এবং সাধারণ মানুষের জন্য সহজলভ্য হয়ে ওঠেনি। সরকারি পর্যায়ে উপজেলা বা ইউনিয়ন পর্যায়ে যে পশু হাসপাতাল বা উপ-কেন্দ্রগুলো রয়েছে, সেগুলোর তীব্র জনবল সংকট, ডাক্তারদের কর্মস্থলে অনুপস্থিতি এবং প্রয়োজনীয় সরকারি ওষুধের অপ্রাতুলতা সর্বজনবিদিত। ফলে কোনো আকস্মিক মহামারি, ওলান পাকা রোগ, ক্ষুরারোগ বা অন্য কোনো মারাত্মক রোগবালাই দেখা দিলে প্রান্তিক খামারিদের চড়া মূল্যে বেসরকারি ও অপ্রাতিষ্ঠানিক চিকিৎসকদের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভর করতে হয়। অনেক সময় তারা নকল, ভেজাল ও মানহীন ওষুধের খপ্পরে পড়ে সর্বস্বান্ত হন।
একটি মধ্যবিত্ত বা দরিদ্র পরিবারের একটি ভালো জাতের উন্নত দুগ্ধবতী গাভী যদি কোনো কারণে মারা যায় বা রোগাক্রান্ত হয়ে দুধ উৎপাদন একেবারে কমিয়ে দেয়, তবে সেই পরিবারটি এক নিমেষেই ঋণের সাগরে ডুবে পথে বসে যায়। এই ধরনের বড় ও আকস্মিক আর্থিক ঝুঁকি কমানোর জন্য উন্নত দেশগুলোর মতো আমাদের দেশে এখনো কোনো কার্যকর, সহজ এবং সর্বজনীন গবাদিপশু বিমা ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি, যা দেশের খামারিদের প্রতিনিয়ত এক চরম নিরাপত্তাহীনতা ও আতঙ্কের মধ্যে রাখে।
বাজারজাতকরণ প্রক্রিয়া, কোল্ড চেইন লজিস্টিকস এবং বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এই শিল্পের আরেকটি অত্যন্ত অন্ধকার এবং হতাশাজনক দিক। দুধ একটি অতি পচনশীল তরল দ্রব্য। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে এটিকে যথাযথ তাপমাত্রায় সংরক্ষণ বা বাজারজাত করতে না পারলে তা সম্পূর্ণ নষ্ট বা টক হয়ে যায়, যা আর কোনো কাজে আসে না। কিন্তু আমাদের দেশের অধিকাংশ প্রত্যন্ত এবং মূল উৎপাদনকারী অঞ্চলে এখনো আধুনিক কোল্ড চেইন বা দুধ সংরক্ষণের কোনো বৈজ্ঞানিক অবকাঠামো গড়ে ওঠেনি।
দেশে যে কয়েকটি চিলিং সেন্টার বা শীতলীকরণ কেন্দ্র রয়েছে, সেগুলোর প্রায় সবকটিই বড় বড় বেসরকারি দুগ্ধ প্রক্রিয়াজাতকারী শিল্প গ্রুপ বা সমবায়ের নিয়ন্ত্রণে এবং সেগুলো নির্দিষ্ট কিছু ভৌগোলিক অঞ্চলেই সীমাবদ্ধ। এর ফলে দূরদূরান্তের বা চরাঞ্চলের অসহায় খামারিরা বাধ্য হয়ে স্থানীয় ঘোষ, ফড়িয়া বা মধ্যস্বত্বভোগী সিন্ডিকেটের কাছে পানির দরে দুধ বিক্রি করতে বাধ্য হন। অনেক সময় দেখা যায়, বিশ্ববাজারে গুঁড়া দুধের দাম কমলে বা দেশে এর আমদানি অবাধ হলে, কিংবা স্থানীয় মিষ্টির দোকান বা হোটেলগুলোতে দুধের চাহিদা সাময়িক কমে গেলে, স্থানীয় বাজারে তরল দুধের দাম এক ধাক্কায় অবিশ্বাস্য রকম নিচে নেমে যায়। অথচ দেশের খুচরা বাজারে এবং শহরাঞ্চলে ভোক্তাপর্যায়ে তরল দুধের দাম কিন্তু কখনোই এক পয়সাও কমে না। এই যে প্রান্তিক উৎপাদক এবং চূড়ান্ত ভোক্তার মাঝখানের বিশাল ও আকাশচুম্বী মূল্যের ব্যবধান, এর পুরো ফায়দা লুটে নেয় মধ্যস্বত্বভোগী ও দালাল চক্র, আর লোকসানের পুরো বোঝা এককভাবে টানতে হয় রক্তপানি করা খামারিকে।
দুগ্ধ শিল্পের এই বহুমাত্রিক এবং দীর্ঘস্থায়ী সংকটগুলোর যদি দ্রুত ও স্থায়ী কোনো সমাধান রাষ্ট্রীয়ভাবে করা না যায়, তবে অদূর ভবিষ্যতে সামগ্রিক জাতীয় অর্থনীতিতে এর অত্যন্ত মারাত্মক এবং দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। প্রথমত, খামারিরা যদি লোকসানের নির্মম বাস্তবতার কারণে বাধ্য হয়ে এই পেশা চিরতরে ছেড়ে দেন, তবে দেশে তরল দুধের উৎপাদন এক ধাক্কায় মারাত্মকভাবে হ্রাস পাবে। এর ফলে দেশের শিশু ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের পুষ্টির চাহিদা মেটাতে আমাদের আবার বিপুল পরিমাণ কষ্টার্জিত বৈদেশিক মুদ্রা বা ডলার খরচ করে বিদেশ থেকে গুঁড়া দুধ আমদানির ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল হয়ে পড়তে হবে, যা দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্বের জন্য চরম ক্ষতিকর। দ্বিতীয়ত, গ্রামীণ অর্থনীতিতে বিগত দুই দশকে কর্মসংস্থানের যে বিশাল ও আশাব্যঞ্জক জোয়ার তৈরি হয়েছিল, তাতে হঠাৎ করেই তীব্র ভাটা পড়বে। হাজার হাজার খামার বন্ধ হয়ে গেলে গ্রামীণ বেকারত্ব আবার জ্যামিতিক হারে বাড়বে এবং কর্মহীন মানুষেরা দলে দলে শহরাঞ্চলে পাড়ি জমাবে, যার ফলে বড় শহরগুলোর ওপর জনসংখ্যার চাপ ও সামাজিক অস্থিরতা বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।
তবে এতসব দৃশ্যমান সংকট, প্রতিবন্ধকতা এবং সীমাবদ্ধতার মাঝেও এই খাতের ভেতরের মূল সম্ভাবনা কিন্তু এখনো ফুরিয়ে যায়নি। যদি সঠিক, দূরদর্শী ও বাস্তবমুখী পরিকল্পনা এবং সরকারি ও বেসরকারি খাতের একটি অত্যন্ত সুসমন্বিত ও আন্তরিক যৌথ উদ্যোগ নেওয়া যায়, তবে এই দুগ্ধ শিল্পই হতে পারে আগামী দিনে দেশের অন্যতম প্রধান ও শক্তিশালী অর্থনৈতিক স্তম্ভ। এই লক্ষ্য অর্জনে এবং সংকট উত্তরণে সর্বপ্রথম প্রয়োজন দেশের গো-খাদ্যের বাজারকে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা এবং মিলার ও আমদানিকারকদের সিন্ডিকেট ভেঙে দেওয়া।
রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে খামারিদের জন্য সরাসরি ও বিশেষ ভর্তুকি মূল্যে সুষম দানাদার খাদ্য সরবরাহের স্থায়ী ব্যবস্থা চালু করতে হবে। পাশাপাশি, দেশে উন্নত জাতের উচ্চ ফলনশীল নেপিয়ার বা অন্যান্য ঘাস চাষের জন্য সরকারি পতিত জমি, রাস্তার ধার বা রেললাইনের পাশের জমি ব্যবহার করার অনুমতি দেওয়া যেতে পারে। খামারিদের আধুনিক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে সাইলৈজ বা ঘাস সংরক্ষণ প্রযুক্তিতে উদ্বুদ্ধ ও প্রশিক্ষিত করতে হবে, যা দানাদার খাদ্যের ওপর তাদের চড়া ও ব্যয়বহুল নির্ভরতা অনেকটাই কমিয়ে আনবে।
একইসঙ্গে, তৃণমূল ও প্রত্যন্ত পর্যায়ে আধুনিক পশু চিকিৎসাসেবা ও কৃত্রিম প্রজনন সুবিধা বিনামূল্যে বা নামমাত্র মূল্যে পৌঁছে দিতে হবে। সরকারি ভেটেরিনারি সার্জনদের তদারকি বাড়াতে হবে এবং প্রতিটি উপজেলায় ভ্রাম্যমাণ বা মোবাইল ভেটেরিনারি ক্লিনিকের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়াতে হবে, যাতে খামারিরা এক কলেই তাদের দোরগোড়ায় সেবা পান। খামারিদের আধুনিক খামার ব্যবস্থাপনা, জৈব নিরাপত্তা এবং রোগ প্রতিরোধ বিষয়ে নিয়মিত বিনামূল্যে প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা এখন সময়ের দাবি। গবাদিপশু বিমা প্রথাকে আমলাতান্ত্রিক জটিলতামুক্ত করে সহজীকরণ করতে হবে এবং রাষ্ট্রীয় সহায়তায় প্রিমিয়ামের একটি অংশ সরকার বহন করলে খামারিরা বড় ধরনের আকস্মিক প্রাকৃতিক বা রোগজনিত আর্থিক বিপর্যয় থেকে রক্ষা পাবেন।
বাজার ব্যবস্থার আমূল সংস্কার ও আধুনিকায়নই এই খাতের সামগ্রিক ভাগ্য সম্পূর্ণ বদলে দিতে পারে। সরকারি উদ্যোগে এবং সমবায়ের ভিত্তিতে প্রতিটি প্রধান দুগ্ধ উৎপাদনকারী অঞ্চলে ও গ্রামে গ্রামে আধুনিক চিলিং সেন্টার বা শীতলীকরণ বুথ স্থাপন করা অত্যন্ত জরুরি। প্রান্তিক খামারিরা যেন কোনো মধ্যস্বত্বভোগী ছাড়াই সরাসরি বড় প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠান, সুপার শপ বা বড় শহরের পাইকারি বাজারে তাদের উৎপাদিত দুধ ন্যায্য মূল্যে পৌঁছে দিতে পারেন, তার জন্য বিশেষায়িত কোল্ড ভ্যান বা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত পরিবহন ব্যবস্থার নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে হবে। কেবল তরল দুধ বিক্রির ওপর নির্ভর না করে, দুগ্ধজাত বিভিন্ন উচ্চমূল্যের এবং দীর্ঘস্থায়ী পণ্য যেমন-উন্নত মানের পনির, ঘি, মাখন, দই, ছানা এবং শিশুখাদ্য হিসেবে গুঁড়ো দুধ দেশীয় কারখানায় বড় পরিসরে বিশ্বমানের প্রযুক্তিতে উৎপাদনের ব্যাপক উদ্যোগ নিতে হবে। এতে করে শীতকাল বা অতিরিক্ত উৎপাদনের সময়ে উদ্বৃত্ত দুধ কোনোভাবেই নষ্ট বা অপচয় হবে না এবং খামারিরা সারা বছর জুড়েই দুধের একটি অত্যন্ত স্থিতিশীল ও লাভজনক দাম পাবেন।
আমাদের নীতিনির্ধারক ও সমাজকে খুব গভীরভাবে মনে রাখতে হবে যে, শ্বেত বিপ্লব কেবল মাত্র কাগজে-কলমে বা পরিসংখ্যানে দুধের উৎপাদন বাড়ানোর কোনো যান্ত্রিক বিষয় নয়; এটি মূলত কোটি কোটি গ্রামীণ মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন, তাদের মুখে দুমুঠো অন্ন জোগানো এবং দেশের প্রতিটি ভবিষ্যৎ নাগরিকের মেধা ও পুষ্টি নিশ্চিত করার এক মহান সামাজিক ও জাতীয় লড়াই। আমাদের প্রান্তিক খামারিদের মাথার ঘাম পায়ে ফেলা শ্রম, সততা আর ত্যাগের ওপর ভর করেই কিন্তু এই শিল্প আজ শূন্য থেকে এই গৌরবময় পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে। তাদের এই নীরব ও মহৎ অবদানকে কোনোভাবেই অবহেলা বা খাটো করে দেখে দেশের টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন কখনোই সম্ভব নয়। তাই এবারের আন্তর্জাতিক দুগ্ধ দিবসের মূল অঙ্গীকার, স্লোগান এবং চেতনা হওয়া উচিত খামারিদের ন্যায্য অধিকার রক্ষা, গো-খাদ্যের মূল্য হ্রাস এবং তাদের জন্য একটি বৈষম্যহীন, স্বচ্ছ ও লাভজনক বাজার কাঠামো নিশ্চিত করা। সরকারের উচ্চপর্যায়ের নীতিনির্ধারক, বেসরকারি শিল্পোদ্যোক্তা এবং সচেতন সমাজকে আজ যৌথভাবে ও কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এগিয়ে আসতে হবে, যাতে মাঠপর্যায়ের খামারিদের মলিন মুখে স্বস্তির হাসি ফোটে। কারণ আমাদের এই চরম সত্যটি মেনে নিতেই হবে যে-খামারি বাঁচলে খামার বাঁচবে, আর খামার যদি সুরক্ষিত থাকে, তবেই দেশের পুষ্টি, স্বাস্থ্য এবং সামগ্রিক জাতীয় অর্থনীতি এক নিরাপদ, সুদৃঢ় ও উজ্জ্বল ভবিষ্যতের দিকে বীরদর্পে এগিয়ে যাবে।
- আরও পড়ুন
২০০ বছর আগের এক দুর্ঘটনা থেকেই দেয়াশলাইর আবিষ্কার
কোরবানির ত্যাগ, শিক্ষা, মহানুভবতা-তরুণরা কীভাবে দেখছেন
কেএসকে
What's Your Reaction?