সন্তান পরীক্ষায় পাস করলে পাড়ায় মিষ্টি বিতরণ, আজ সোনালি অতীত
একসময় পরীক্ষার ফল প্রকাশের দিন মানেই ছিল অন্যরকম এক উৎসব। সকাল থেকেই পাড়ার অলিগলিতে ছড়িয়ে পড়ত উৎকণ্ঠা, দুপুর গড়াতেই আসত আনন্দের খবর। কারো ছেলে পাস করেছে, কারো মেয়ে স্ট্যান্ড মার্ক পেয়েছে, এই খবর যেন শুধু একটি পরিবারের থাকত না, হয়ে যেত পুরো পাড়া বা মহল্লার আনন্দ। বাড়ির সামনে প্রতিবেশীদের ভিড়, বড়দের আশীর্বাদ আর ছোটদের হাতে মিষ্টির প্যাকেট সব মিলিয়ে ফল প্রকাশের দিনটি ছিল সামাজিক উৎসবের মতো। এখন সময় বদলেছে। আজ এসএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশের দিনেও আনন্দ কমেনি, কিন্তু সেই আনন্দের ধরন বদলে গেছে। পাড়ায় পাড়ায় মিষ্টি বিতরণের সেই দৃশ্য যেন ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। ফল প্রকাশ মানেই একসময় পাড়ায় উৎসব আগের দিনে পরীক্ষার ফল জানার ব্যবস্থা ছিল অনেক সীমিত। অনলাইন ফলাফল তো দূরের কথা, মোবাইল ফোনও ছিল না অধিকাংশ পরিবারের হাতে। স্কুলের নোটিশ বোর্ডে ফল প্রকাশের পর শুরু হতো অপেক্ষা। কেউ স্কুল থেকে ফিরে সুখবর নিয়ে এলে মুহূর্তেই তা ছড়িয়ে পড়ত আশপাশের বাড়িতে। কোনো ছেলে বা মেয়ে ভালো ফল করলে প্রতিবেশীরা ছুটে আসতেন অভিনন্দন জানাতে। বাড়ির কর্তা বাজার থেকে মিষ্টি নিয়ে আসতেন। কারো সামর্থ্য একটু বেশি হলে রসগোল্লা, সন্দেশ বা
একসময় পরীক্ষার ফল প্রকাশের দিন মানেই ছিল অন্যরকম এক উৎসব। সকাল থেকেই পাড়ার অলিগলিতে ছড়িয়ে পড়ত উৎকণ্ঠা, দুপুর গড়াতেই আসত আনন্দের খবর। কারো ছেলে পাস করেছে, কারো মেয়ে স্ট্যান্ড মার্ক পেয়েছে, এই খবর যেন শুধু একটি পরিবারের থাকত না, হয়ে যেত পুরো পাড়া বা মহল্লার আনন্দ। বাড়ির সামনে প্রতিবেশীদের ভিড়, বড়দের আশীর্বাদ আর ছোটদের হাতে মিষ্টির প্যাকেট সব মিলিয়ে ফল প্রকাশের দিনটি ছিল সামাজিক উৎসবের মতো। এখন সময় বদলেছে। আজ এসএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশের দিনেও আনন্দ কমেনি, কিন্তু সেই আনন্দের ধরন বদলে গেছে। পাড়ায় পাড়ায় মিষ্টি বিতরণের সেই দৃশ্য যেন ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে।
ফল প্রকাশ মানেই একসময় পাড়ায় উৎসব
আগের দিনে পরীক্ষার ফল জানার ব্যবস্থা ছিল অনেক সীমিত। অনলাইন ফলাফল তো দূরের কথা, মোবাইল ফোনও ছিল না অধিকাংশ পরিবারের হাতে। স্কুলের নোটিশ বোর্ডে ফল প্রকাশের পর শুরু হতো অপেক্ষা। কেউ স্কুল থেকে ফিরে সুখবর নিয়ে এলে মুহূর্তেই তা ছড়িয়ে পড়ত আশপাশের বাড়িতে।
কোনো ছেলে বা মেয়ে ভালো ফল করলে প্রতিবেশীরা ছুটে আসতেন অভিনন্দন জানাতে। বাড়ির কর্তা বাজার থেকে মিষ্টি নিয়ে আসতেন। কারো সামর্থ্য একটু বেশি হলে রসগোল্লা, সন্দেশ বা দই; সামর্থ্য কম হলে ছোট্ট এক প্যাকেট মিষ্টি দিয়েই আনন্দ ভাগাভাগি হতো। কিন্তু মিষ্টির পরিমাণ নয়, গুরুত্বপূর্ণ ছিল আনন্দটা সবার সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া।
একটি পরিবারের সন্তান পাস করলে পাশের বাড়ির খালা, চাচি, কাকা কিংবা দাদারাও যেন নিজেদের সন্তানকে নিয়ে গর্ব করতেন। পরীক্ষায় ভালো ফল করা ছেলেমেয়েরা পাড়ার বড়দের কাছ থেকে আশীর্বাদ পেত, ছোটরা তাদের দেখে অনুপ্রাণিত হতো।
আজও আনন্দ আছে, কিন্তু বদলে গেছে উদযাপন
আজ এসএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশের দিন। সকাল থেকেই শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে ছিল ফল জানার ব্যস্ততা। মোবাইল ফোনে কয়েক মুহূর্তেই ফলাফল দেখা যাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফল প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই ভেসে উঠছে অভিনন্দন, ছবি, শুভেচ্ছা ও সাফল্যের গল্প।
কিন্তু আগের মতো পুরো পাড়া বা মহল্লাজুড়ে মিষ্টি বিতরণের দৃশ্য এখন খুব একটা চোখে পড়ে না। একটি পরিবারে সন্তান ভালো ফল করলে পরিবারের সদস্যরাই বেশি করে আনন্দ উদযাপন করছেন। কেউ আত্মীয়দের ফোন করছেন, কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সন্তানের ছবি দিচ্ছেন, আবার কেউ পরিবারের সদস্যদের নিয়ে বেরিয়ে পড়ছেন রেস্তোরাঁয়।অর্থাৎ আনন্দ আছে, উদযাপনও আছে শুধু তার পরিধি বদলে গেছে।
রেস্তোরাঁয় উদযাপন, সামাজিক মাধ্যমে অভিনন্দন
আগে সাফল্যের খবর পৌঁছে যেত প্রতিবেশীর দরজায়। এখন পৌঁছে যায় ফেসবুক, মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপ কিংবা ফোনে। আগে মিষ্টির বাক্স হাতে নিয়ে পাশের বাড়িতে যেতে হতো, এখন একটি পোস্টেই শত শত মানুষ অভিনন্দন জানাতে পারেন।
অনেক পরিবার সন্তানের ভালো ফল উদযাপন করতে পছন্দের রেস্তোরাঁয় যাচ্ছে। বাবা-মা, ভাই-বোন, দাদা-দাদি কিংবা কাছের আত্মীয়দের নিয়ে দুপুর বা রাতের খাবারের আয়োজন হচ্ছে। কেউ কেক কাটছেন, কেউ ছবি তুলছেন, কেউ আবার বিশেষ কোনো খাবারের আয়োজন করছেন।
এতে আনন্দের কোনো ঘাটতি নেই। বরং ব্যক্তিগতভাবে উদযাপনের সুযোগ বেড়েছে। কিন্তু এর সঙ্গে হারিয়ে গেছে সেই সম্মিলিত আনন্দের একটি অংশ, যেখানে একটি পরিবারের সাফল্য পুরো মহল্লার আনন্দের কারণ হয়ে উঠত।
কেন হারিয়ে গেল সেই মিষ্টি বিতরণ?
এর পেছনে সামাজিক পরিবর্তন বড় কারণ। শহরাঞ্চলে এখন মানুষ আগের তুলনায় বেশি ব্যস্ত। একই ভবনে বসবাস করেও অনেক প্রতিবেশীর সঙ্গে নিয়মিত দেখা হয় না। একসময় পাড়ার মানুষের মধ্যে যে ঘনিষ্ঠতা ছিল, অনেক জায়গায় তা কমেছে। নগরজীবনে ব্যক্তিগত পরিসরও বেড়েছে। কে কখন বাড়ি ফিরছেন, কার সন্তান কোন স্কুলে পড়ছে এসব জানার সুযোগ আগের মতো নেই। ফলে একটি পরিবারের পরীক্ষার ফল নিয়ে পুরো মহল্লার আগ্রহও কমেছে।
অন্যদিকে ফলাফল জানার প্রক্রিয়াও বদলে গেছে। আগে স্কুলে গিয়ে ফল জানতে হতো। সেখানে সহপাঠী, শিক্ষক, অভিভাবক ও এলাকার মানুষের সঙ্গে দেখা হতো। এখন ঘরে বসেই কয়েক সেকেন্ডে ফল জানা যায়। প্রযুক্তি সময় বাঁচিয়েছে, কিন্তু সেই সঙ্গে কমিয়েছে একসঙ্গে আনন্দ করার সুযোগও।
তবু স্মৃতিতে রয়ে গেছে মিষ্টির স্বাদ
যারা নব্বইয়ের দশক কিংবা তারও আগে পরীক্ষার ফলের দিন দেখেছেন, তাদের কাছে সেই সময়ের স্মৃতি এখনো আলাদা। কারও পাসের খবর শুনে পাশের বাড়ি থেকে ছুটে আসা, মিষ্টির বাক্স খুলে সবাইকে দেওয়া, বড়দের দোয়া আর ছোটদের কৌতূহল এসব স্মৃতি এখন নস্টালজিয়ার অংশ।
সেই মিষ্টি হয়তো খুব দামি ছিল না। কিন্তু তার সঙ্গে মিশে থাকত প্রতিবেশীর আন্তরিকতা। একটি ছোট্ট মিষ্টির টুকরো যেন বলত ‘তোমার আনন্দে আমরাও আনন্দিত।’ আজ সেই মিষ্টির জায়গা নিয়েছে রেস্তোরাঁর খাবার, কেক, ছবি, পোস্ট আর অনলাইন শুভেচ্ছা। উদযাপনের ধরন আধুনিক হয়েছে, দ্রুত হয়েছে, ব্যক্তিকেন্দ্রিকও হয়েছে।
সময়ের পরিবর্তন থামানো যাবে না। প্রযুক্তিও আমাদের জীবন থেকে চলে যাবে না। কিন্তু সামাজিক আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার অভ্যাসটি ফিরিয়ে আনা অসম্ভব নয়। আজ এসএসসির ফল প্রকাশের দিনে কোনো শিক্ষার্থী ভালো ফল করলে পরিবারের সঙ্গে আনন্দ করার পাশাপাশি পাশের বাড়ির মানুষটিকেও একটি মিষ্টি দেওয়া যেতে পারে। হয়তো পুরো মহল্লায় আর আগের মতো মিষ্টির বাক্স ঘুরবে না, কিন্তু একটি পরিবারের সাফল্য যে অন্যের কাছেও আনন্দের হতে পারে সেই সংস্কৃতিটুকু ফিরিয়ে আনা যায়।
কারণ পরীক্ষায় পাস করা শুধু একটি ফলাফল নয়, এটি একটি পরিবারের বহুদিনের পরিশ্রমের স্বীকৃতি। আর সেই আনন্দ যখন কয়েকটি ঘরের সীমানা পেরিয়ে পুরো পাড়ায় ছড়িয়ে পড়ে, তখন একটি ফলাফল হয়ে ওঠে সামাজিক উৎসব।
আজ হয়তো রেস্তোরাঁর টেবিলে বসেই উদযাপন হচ্ছে এসএসসির সাফল্য। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মুহূর্তেই আসছে শত অভিনন্দন। তবু কোথাও যেন মনে পড়ে সেই পুরোনো দিনের কথা ছেলে-মেয়ে পরীক্ষায় পাস করেছে, আর আনন্দে পুরো পাড়ায় বিলি হচ্ছে মিষ্টি। সেই দৃশ্য হয়তো আজ আর আগের মতো নেই। কিন্তু স্মৃতির পাতায় তার মিষ্টি স্বাদ এখনো অমলিন।
কেএসকে
What's Your Reaction?

