সমন্বয়হীনতা দূর না হলে ফল প্রক্রিয়াজাত শিল্প এগোবে না
গবেষণা প্রতিষ্ঠান, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, কৃষি বিপণন অধিদপ্তর ও উদ্যোক্তাদের মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ের অভাবে দেশে ফল প্রক্রিয়াজাত শিল্পের সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) পোস্ট-হারভেস্ট টেকনোলজি বিভাগের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. গোলাম ফেরদৌস চৌধুরী। গত শনিবার (২৭ জুন) সকালে রাজধানীর বাড্ডায় জাগো নিউজ কার্যালয়ে ‘ফল প্রক্রিয়াজাতকরণ: সমস্যা ও সম্ভাবনা’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে তিনি এ কথা বলেন। ড. গোলাম ফেরদৌস বলেন, গবেষকদের কাজ প্রযুক্তি উদ্ভাবন করা। আর সেই প্রযুক্তি মাঠপর্যায়ে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের। পাশাপাশি কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের দায়িত্ব বাজার তৈরি করা। কিন্তু এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতির কারণে উদ্ভাবিত প্রযুক্তি কৃষক ও উদ্যোক্তাদের কাছে যথাযথভাবে পৌঁছাচ্ছে না। ড. মো. গোলাম ফেরদৌস চৌধুরী/ছবি: বিপ্লব দিক্ষিৎ দেশে ফল উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন প্রকল্প থাকলেও ফল প্রক্রিয়াজাতকরণ নিয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কার্যক্রম এখনো খুবই সীমিত। ফলে গবেষণায় উদ্ভাবিত অনেক প্রযুক্তি বাণিজ্যিকভাব
গবেষণা প্রতিষ্ঠান, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, কৃষি বিপণন অধিদপ্তর ও উদ্যোক্তাদের মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ের অভাবে দেশে ফল প্রক্রিয়াজাত শিল্পের সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) পোস্ট-হারভেস্ট টেকনোলজি বিভাগের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. গোলাম ফেরদৌস চৌধুরী।
গত শনিবার (২৭ জুন) সকালে রাজধানীর বাড্ডায় জাগো নিউজ কার্যালয়ে ‘ফল প্রক্রিয়াজাতকরণ: সমস্যা ও সম্ভাবনা’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে তিনি এ কথা বলেন।
ড. গোলাম ফেরদৌস বলেন, গবেষকদের কাজ প্রযুক্তি উদ্ভাবন করা। আর সেই প্রযুক্তি মাঠপর্যায়ে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের। পাশাপাশি কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের দায়িত্ব বাজার তৈরি করা। কিন্তু এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতির কারণে উদ্ভাবিত প্রযুক্তি কৃষক ও উদ্যোক্তাদের কাছে যথাযথভাবে পৌঁছাচ্ছে না।
ড. মো. গোলাম ফেরদৌস চৌধুরী/ছবি: বিপ্লব দিক্ষিৎ
দেশে ফল উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন প্রকল্প থাকলেও ফল প্রক্রিয়াজাতকরণ নিয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কার্যক্রম এখনো খুবই সীমিত। ফলে গবেষণায় উদ্ভাবিত অনেক প্রযুক্তি বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করা যাচ্ছে না বলে মনে করেন তিনি।
বারি ইতোমধ্যে ফল প্রক্রিয়াজাতকরণে বহু প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে জানিয়ে এই গবেষক বলেন, শুকনো আম, ম্যাঙ্গো লেদার, কাঁঠালভিত্তিক বিভিন্ন খাদ্যপণ্যসহ দেড় শতাধিক প্রযুক্তি তৈরি করা হয়েছে। তবে উদ্যোক্তারা এসব প্রযুক্তি ব্যবহার করলেও অনেক সময় গবেষণা প্রতিষ্ঠানের অবদান স্বীকার করেন না, যা ভবিষ্যৎ গবেষণাকে নিরুৎসাহিত করে।

পাহাড়ে বিদেশি আম চাষে নতুন সম্ভাবনা
দেশে ফল প্রক্রিয়াজাত শিল্পের বড় দুটি চ্যালেঞ্জ হিসেবে বাজার সৃষ্টি ও বাজার অনুসন্ধানের বিষয়টি উল্লেখ করেন তিনি। বলেন, কোন দেশে কোন পণ্যের চাহিদা রয়েছে, কী ধরনের পণ্য রপ্তানি করা সম্ভব— এ নিয়ে পর্যাপ্ত গবেষণা নেই। ফলে রপ্তানি কার্যক্রম এখনো ব্যক্তিগত যোগাযোগনির্ভর হয়ে আছে।
ড. গোলাম ফেরদৌস বলেন, বাংলাদেশে ফল রপ্তানির পুরো সরবরাহ ব্যবস্থা নিয়ে সমন্বিত কোনো গবেষণা হয়নি। একটি ফল কৃষকের বাগান থেকে বিদেশের সুপারশপ পর্যন্ত পৌঁছাতে কোথায় কত সময় লাগে, কোথায় গুণগত মানের অবনতি হয় কিংবা বিদেশি ভোক্তাদের প্রতিক্রিয়া কী— এসব বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য না থাকায় রপ্তানিতে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি হচ্ছে না।
ভ্যাপার হিট ট্রিটমেন্ট (ভিএইচটি), কোয়ারেনটাইন ল্যাব ও মান নিয়ন্ত্রণের মতো গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো উৎপাদন এলাকার কাছাকাছি স্থাপন করা প্রয়োজন জানিয়ে বলেন, বর্তমানে এসব সেবা দূরে হওয়ায় রপ্তানিকারকদের সময় ও ব্যয় দুটোই বেড়ে যাচ্ছে। অথচ ফল অত্যন্ত দ্রুত নষ্ট হওয়ার পণ্য হওয়ায় এ ধরনের বিলম্ব রপ্তানির জন্য বড় বাধা।
গোলটেবিল আলোচনায় বক্তারা
তিনি বলেন, শুধু প্লেনে নয়, সমুদ্রপথেও ফল রপ্তানির সুযোগ রয়েছে। গবেষণায় দেখা যায়, সঠিক প্যাকেজিং ও ১০ থেকে ১২ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা নিশ্চিত করতে পারলে আম পাঁচ থেকে ছয় সপ্তাহ পর্যন্ত সংরক্ষণ করা সম্ভব। এতে কম খরচে সমুদ্রপথে রপ্তানির সুযোগ তৈরি হবে।
দেশে কৃষিভিত্তিক শিল্পের বিকাশে বিশেষায়িত ‘অ্যাগ্রো প্রসেসিং জোন’ প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানিয়ে ড. গোলাম ফেরদৌস বলেন, দেশের উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চলে অন্তত চার থেকে আটটি অ্যাগ্রো প্রসেসিং জোন গড়ে তুলতে হবে। সেখানে মান পরীক্ষাগার, প্যাকহাউজ, কোল্ড স্টোরেজ, ওয়্যারহাউজ, প্যাকেজিং ও রপ্তানির সব ধরনের সুবিধা একসঙ্গে থাকতে হবে।
আম, কাঁঠাল, আনারসসহ প্রধান ফলগুলোর জন্য আলাদা বোর্ড গঠন করা প্রয়োজন বলে মনে করেন ড. গোলাম ফেরদৌস। তিনি বলেন, এসব বোর্ডে গবেষক, উদ্যোক্তা, বিপণন বিশেষজ্ঞ ও সরকারি কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে বিশেষজ্ঞ দল থাকলে উৎপাদন থেকে শুরু করে প্রক্রিয়াজাতকরণ, বিপণন ও রপ্তানি পর্যন্ত সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করা সহজ হবে।
তিনি বলেন, মৌসুমে যেসব ফল বেশি উৎপাদিত হয়ে নষ্ট হয়, সেসব ফল প্রক্রিয়াজাতকরণে সরকার যদি তাৎক্ষণিক নগদ প্রণোদনা বা ভর্তুকি দেয়, তাহলে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই এই শিল্পে বড় ধরনের বিনিয়োগ আসবে এবং বিপুল পরিমাণ মূল্য সংযোজন সম্ভব হবে।
ড. গোলাম ফেরদৌস জানান, বারি ইতোমধ্যে ফল প্রক্রিয়াজাতকরণে ১৫০টিরও বেশি প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে এবং উদ্যোক্তা তৈরির বিভিন্ন কর্মসূচিতে প্রযুক্তিগত সহায়তা দিচ্ছে।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান, সরকারি সংস্থা ও বেসরকারি উদ্যোক্তাদের মধ্যে শক্তিশালী অংশীদারত্ব গড়ে উঠলে আগামী পাঁচ থেকে ছয় বছরের মধ্যে দেশের ফল প্রক্রিয়াজাত শিল্পে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
গোলটেবিল বৈঠকটি সঞ্চালনা করেন জাগো নিউজের সম্পাদক কে. এম. জিয়াউল হক। এসময় উপস্থিত থেকে আলোচনায় অংশ নেন ইউনিভার্সিটি অব গ্লোবাল ভিলেজের সাবেক উপাচার্য, গবেষক ও কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম খান, বছরব্যাপী ফল উৎপাদন প্রকল্পের সাবেক প্রকল্প পরিচালক ও ফল বিশেষজ্ঞ ড. মো. মেহেদী মাসুদ, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের রপ্তানিযোগ্য আম উৎপাদন প্রকল্পের পরিচালক মোহাম্মদ আরিফুর রহমান, বিএসটিআইয়ের উপপরিচালক (খাদ্য ও কৃষি) এনামুল হক, প্রাণ গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ইলিয়াছ মৃধা, হাসেম ফুডস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আবুল হাসেম, বাংলাদেশ অ্যাগ্রো-প্রসেসরস অ্যাসোসিয়েশনের (বাপা) সাবেক সাধারণ সম্পাদক মো. ইকতাদুল হক, ক্যাবের ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন, কাজু অ্যান্ড কফি অ্যাগ্রোর নির্বাহী পরিচালক মো. মাহাতাব আলী, চাঁপাইনবাবগঞ্জের কৃষি উদ্যোক্তা ইসমাইল খান শামীম ও নওগাঁর কৃষি উদ্যোক্তা সোহেল রানা।
ইএইচটি/এএসএ/ এমএফএ
What's Your Reaction?
