সমসাময়িক বাংলা কবিতা : দুর্বোধ্যতার বর্ম ও গতানুগতিকতার আবর্তন
সমকালীন বাংলা কবিতার আঙিনায় ইদানীং এক অদ্ভুত আঁধার দানা বেঁধেছে। সেই আঁধারের নাম ‘দুর্বোধ্যতা’। একদল কবি যেন পণ করেছেন, কবিতা যত বেশি অবোধ্য হবে, তার মহিমা তত বেশি বৃদ্ধি পাবে। কিন্তু ট্র্যাজেডি হলো, এই আপাত-জটিল বিন্যাস ও শব্দজটের আড়ালে লুকিয়ে থাকছে অত্যন্ত চেনা, গতানুগতিক এবং ক্লিশে কিছু চিন্তা। গভীর দর্শনের অভাব ঢাকতেই কি তবে এই কৃত্রিম কুয়াশা তৈরির আয়োজন? আজকাল কবিতার শরীরজুড়ে বিমূর্ত শব্দের আস্ফালন দেখি আমরা। ‘শূন্যতা’, ‘অস্তিত্বের সংকট’, ‘পরাবাস্তব ছায়া’—এই শব্দগুলো এখন কবিদের জন্য একেকটি নিরাপদ আশ্রয়। অথচ এই শব্দগুলোর আড়ালে কবিতার যে মূল সুর—আবেগ ও সত্যের উচ্চারণ—তা প্রায়শই অনুপস্থিত। যখন কোনো কবি সরাসরি জীবনের কথা বলতে ভয় পান কিংবা নতুন কোনো বোধ নির্মাণে ব্যর্থ হন, তখনই তিনি দুর্বোধ্যতার এক দুর্ভেদ্য দেয়াল তুলে দেন। পাঠক সেই দেয়ালে মাথা ঠুকে রক্তাক্ত হন, আর কবি আড়াল থেকে নিজের ‘গভীরতা’র এক মেকি তৃপ্তি খোঁজেন। অথচ আমাদের চোখের সামনেই একদল কবি প্রমাণ করে দিচ্ছেন যে, সহজ ভাষায় কত অবিশ্বাস্য শক্তিশালী ও জটিল জীবনদর্শন ফুটিয়ে তোলা যায়। ইমতিয়াজ মাহমুদ যখন যাপিত জীবনের তুচ্ছাতিতুচ
সমকালীন বাংলা কবিতার আঙিনায় ইদানীং এক অদ্ভুত আঁধার দানা বেঁধেছে। সেই আঁধারের নাম ‘দুর্বোধ্যতা’। একদল কবি যেন পণ করেছেন, কবিতা যত বেশি অবোধ্য হবে, তার মহিমা তত বেশি বৃদ্ধি পাবে। কিন্তু ট্র্যাজেডি হলো, এই আপাত-জটিল বিন্যাস ও শব্দজটের আড়ালে লুকিয়ে থাকছে অত্যন্ত চেনা, গতানুগতিক এবং ক্লিশে কিছু চিন্তা। গভীর দর্শনের অভাব ঢাকতেই কি তবে এই কৃত্রিম কুয়াশা তৈরির আয়োজন?
আজকাল কবিতার শরীরজুড়ে বিমূর্ত শব্দের আস্ফালন দেখি আমরা। ‘শূন্যতা’, ‘অস্তিত্বের সংকট’, ‘পরাবাস্তব ছায়া’—এই শব্দগুলো এখন কবিদের জন্য একেকটি নিরাপদ আশ্রয়। অথচ এই শব্দগুলোর আড়ালে কবিতার যে মূল সুর—আবেগ ও সত্যের উচ্চারণ—তা প্রায়শই অনুপস্থিত। যখন কোনো কবি সরাসরি জীবনের কথা বলতে ভয় পান কিংবা নতুন কোনো বোধ নির্মাণে ব্যর্থ হন, তখনই তিনি দুর্বোধ্যতার এক দুর্ভেদ্য দেয়াল তুলে দেন। পাঠক সেই দেয়ালে মাথা ঠুকে রক্তাক্ত হন, আর কবি আড়াল থেকে নিজের ‘গভীরতা’র এক মেকি তৃপ্তি খোঁজেন।
অথচ আমাদের চোখের সামনেই একদল কবি প্রমাণ করে দিচ্ছেন যে, সহজ ভাষায় কত অবিশ্বাস্য শক্তিশালী ও জটিল জীবনদর্শন ফুটিয়ে তোলা যায়। ইমতিয়াজ মাহমুদ যখন যাপিত জীবনের তুচ্ছাতিতুচ্ছ বিষয়কে কবিতার মোড়কে আনেন, তখন তার ভেতর দিয়ে এক গভীর সামাজিক বা রাজনৈতিক সত্য বেরিয়ে আসে। আবার মাসুদার রহমান বা নিবারণ চক্রবর্তী যখন প্রেম, বিরহ বা দ্রোহের কথা বলেন, সেখানে কোনো মেকি পাণ্ডিত্য থাকে না। তাদের শব্দগুলো মেদহীন, নির্ভার—কিন্তু তার অন্তরালে লুকিয়ে থাকে এক আদিম হাহাকার বা তীক্ষ্ণ বিদ্রূপ। একইভাবে নির্মলেন্দু গুণ যখন তার কবিতায় লেখেন—
‘নেই তবু যা আছের মতো দেখায় / আমরা তাকে আকাশ বলে ডাকি, / সেই আকাশে যাহারা নাম লেখায় / তাদের ভাগ্যে অনিবার্য ফাঁকি!’—
তখন বোঝা যায় সহজ শব্দের কারুকার্যেও কতটা অসীম ব্যপ্তি তৈরি করা সম্ভব। তিনি প্রমাণ করেছেন যে, দর্শনের উচ্চতা বোঝাতে গোলকধাঁধার মতো শব্দের প্রয়োজন হয় না; অনুভূতির স্বচ্ছতাই যথেষ্ট।
জীবনানন্দ দাশ বা বিনয় মজুমদারের কবিতায় যে জটিলতা ছিল, তা ছিল মজ্জাগত। জীবনানন্দ দাশ যখন তাঁর ‘অন্ধকার’ কবিতায় লেখেন—
‘গভীর অন্ধকারের ঘুম থেকে নদীর চ্ছল চ্ছল শব্দে জেগে উঠলাম আবার; / তাকিয়ে দেখলাম পাণ্ডুর চাঁদ বৈতরণীর থেকে তার অর্ধেক ছায়া / গুটিয়ে নিয়েছে যেন / কীর্তিনাশার দিকে।’—
তখন সেই চিত্রকল্প পাঠককে এক অতীন্দ্রিয় গাম্ভীর্যে আবিষ্ট করে। সেখানে কোনো শব্দের কারিগরি নেই, আছে প্রাণের গহিন থেকে উঠে আসা এক দার্শনিক আর্তনাদ। একইভাবে বিনয় মজুমদার যখন লেখেন—
‘একটি উজ্জ্বল মাছ একবার উড়ে / দৃশ্যত সুনীল কিন্তু প্রকৃত প্রস্তাবে স্বচ্ছ জলে / পুনরায় ডুবে গেলো—’ —
তখন সেখানে বিজ্ঞানের নির্লিপ্ততা থাকলেও তা এক অতীন্দ্রিয় দর্শনের জন্ম দেয়। তাঁদের এই গভীরতা অর্জিত হয়েছিল জীবনবোধ থেকে, স্রেফ শব্দের কসরত থেকে নয়।
কিন্তু বর্তমান সময়ের অনেক কবির ক্ষেত্রে সেই জটিলতা স্রেফ কারিগরি। অহেতুক যতিচিহ্নের অনুপস্থিতি কিংবা জবরদস্তিমূলক কিছু বিমূর্ত রূপকের ব্যবহার করে যে ধাঁধা তৈরি করা হচ্ছে, তা আসলে কবিতার নিজস্ব চলন নয়, বরং এক ধরনের সাজানো নাটক। কবিরা যখন নিজের চারপাশের রক্ত-মাংসের পৃথিবী, মানুষের হাহাকার কিংবা দ্রোহের সরাসরি ভাষা ভুলে যান, তখনই তাঁরা এই বিমূর্ত গলিগুলোতে পথ হারান। ফলে যা তৈরি হচ্ছে, তাকে কবিতা না বলে ‘শব্দ-শ্রম’ বলাই শ্রেয়।
কবিতা চিরকালই কিছুটা ইঙ্গিতধর্মী, কিন্তু তা কখনোই সাধারণ সংযোগ বিচ্ছিন্ন কোনো সংকেত ছিল না। কবিতার কাজ আড়ালে থাকা সত্যকে প্রকাশিত করা, প্রকাশিত সত্যকে আড়ালে ঢেকে দেওয়া নয়। পাঠক আজ কবিতার কাছ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন, কারণ তাঁরা সেখানে নিজেদের যাপিত জীবনের ছায়া খুঁজে পাচ্ছেন না। কবিদের মনে রাখা প্রয়োজন, জটিলতা মহত্ত্বের লক্ষণ নয়। সহজভাবে কঠিন কথা বলতে পারাই হলো প্রকৃত শিল্পীর কাজ। নিজেদের তৈরি এই দুর্বোধ্য ছায়া থেকে বেরিয়ে আসতে না পারলে, কবিতা কেবল কবিদের ব্যক্তিগত ডায়েরিতেই সীমাবদ্ধ থেকে যাবে; মানুষের হৃদস্পন্দন ছোঁয়ার শক্তি হারাবে চিরতরে।
What's Your Reaction?