সাও গনসালো থেকে বিশ্বসেরা: ভিনিসিয়ুসের অনন্য উত্থানের গল্প

ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের ঐতিহ্যবাহী ‘জোগো বনিতো’র আধুনিক যুগের অন্যতম সেরা প্রতিনিধি ভিনিসিয়ুস জুনিয়র। মুখে সবসময় হাসি, পায়ে অসাধারণ জাদু আর গতি- এই তিনের সমন্বয়ে তিনি আজ বিশ্বের অন্যতম ভয়ংকর ফরোয়ার্ড। ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে ব্রাজিলের ২৪ বছরের শিরোপা খরা কাটানোর মিশনে সবচেয়ে বড় ভরসাগুলোর একজনও তিনি। কানাডা, মেক্সিকো ও যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিতব্য বিশ্বকাপে ষষ্ঠ শিরোপার স্বপ্ন দেখছে সেলেসাওরা, আর সেই স্বপ্ন পূরণে ভিনিসিয়ুসের কাঁধেই থাকবে বড় দায়িত্ব। রিও ডি জেনিরোর উপকণ্ঠের শহর সাও গনসালোতে জন্ম নেওয়া ভিনিসিয়ুস খুব ছোট বয়সেই ফুটসালে নিজের প্রতিভার জানান দেন। তার প্রতিভায় মুগ্ধ হয়ে ব্রাজিলের ঐতিহ্যবাহী ক্লাব ফ্ল্যামেঙ্গো তাকে নিজেদের একাডেমিতে নিয়ে আসে। ফুটসাল থেকে ঘাসের মাঠে এসে ধীরে ধীরে নিজেকে গড়ে তোলেন তিনি। ক্যারিয়ারের শুরু ও রিয়ালে আগমণ মাত্র ১৬ বছর বয়সে ফ্ল্যামেঙ্গোর সিনিয়র দলে অভিষেক ঘটে তার। এরপর ইউরোপের মঞ্চে পা রাখেন রিয়াল মাদ্রিদের জার্সিতে। স্প্যানিশ জায়ান্টদের হয়ে ইতোমধ্যে ৩০০-এর বেশি ম্যাচ খেলেছেন এবং ২০০-এর বেশি গোল ও অ্যাসিস্টে অবদান রেখেছেন। রিয়ালের হয়ে জিতেছেন তিনটি লা লিগা শিরোপা

সাও গনসালো থেকে বিশ্বসেরা: ভিনিসিয়ুসের অনন্য উত্থানের গল্প

ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের ঐতিহ্যবাহী ‘জোগো বনিতো’র আধুনিক যুগের অন্যতম সেরা প্রতিনিধি ভিনিসিয়ুস জুনিয়র। মুখে সবসময় হাসি, পায়ে অসাধারণ জাদু আর গতি- এই তিনের সমন্বয়ে তিনি আজ বিশ্বের অন্যতম ভয়ংকর ফরোয়ার্ড। ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে ব্রাজিলের ২৪ বছরের শিরোপা খরা কাটানোর মিশনে সবচেয়ে বড় ভরসাগুলোর একজনও তিনি। কানাডা, মেক্সিকো ও যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিতব্য বিশ্বকাপে ষষ্ঠ শিরোপার স্বপ্ন দেখছে সেলেসাওরা, আর সেই স্বপ্ন পূরণে ভিনিসিয়ুসের কাঁধেই থাকবে বড় দায়িত্ব।

রিও ডি জেনিরোর উপকণ্ঠের শহর সাও গনসালোতে জন্ম নেওয়া ভিনিসিয়ুস খুব ছোট বয়সেই ফুটসালে নিজের প্রতিভার জানান দেন। তার প্রতিভায় মুগ্ধ হয়ে ব্রাজিলের ঐতিহ্যবাহী ক্লাব ফ্ল্যামেঙ্গো তাকে নিজেদের একাডেমিতে নিয়ে আসে। ফুটসাল থেকে ঘাসের মাঠে এসে ধীরে ধীরে নিজেকে গড়ে তোলেন তিনি।

ক্যারিয়ারের শুরু ও রিয়ালে আগমণ

মাত্র ১৬ বছর বয়সে ফ্ল্যামেঙ্গোর সিনিয়র দলে অভিষেক ঘটে তার। এরপর ইউরোপের মঞ্চে পা রাখেন রিয়াল মাদ্রিদের জার্সিতে। স্প্যানিশ জায়ান্টদের হয়ে ইতোমধ্যে ৩০০-এর বেশি ম্যাচ খেলেছেন এবং ২০০-এর বেশি গোল ও অ্যাসিস্টে অবদান রেখেছেন। রিয়ালের হয়ে জিতেছেন তিনটি লা লিগা শিরোপা, দুটি উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, একটি কোপা দেল রে, তিনটি স্প্যানিশ সুপার কাপ, তিনটি ফিফা ইন্টারকন্টিনেন্টাল কাপ এবং দুটি উয়েফা সুপার কাপ। মোট ১৪টি বড় ট্রফি রয়েছে তার ক্যারিয়ারে।

চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ফাইনালের মতো বড় মঞ্চেও নিজের ছাপ রেখেছেন ভিনিসিয়ুস। ২০২২ সালে লিভারপুলের বিপক্ষে ফাইনালে জয়সূচক গোল করেন তিনি। ২০২৪ সালে বরুসিয়া ডর্টমুন্ডের বিপক্ষে ফাইনালেও গোল করে রিয়ালকে আরেকটি ইউরোপীয় শিরোপা এনে দেন।

২০২৪ সাল ভিনিসিয়ুসের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে স্মরণীয় বছরগুলোর একটি। ওই বছর তিনি ‘দ্য বেস্ট ফিফা মেনস প্লেয়ার’ পুরস্কার জিতে নেন। ২০০৭ সালে কাকার পর তিনিই প্রথম ব্রাজিলিয়ান হিসেবে এই সম্মান অর্জন করেন। পুরস্কার গ্রহণের সময় আবেগঘন কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘একসময় এটি অসম্ভব মনে হতো। সাও গনসালোর রাস্তায় খালি পায়ে খেলা একটি ছেলে আজ এখানে দাঁড়িয়ে আছে, এটি আমার জন্য অবিশ্বাস্য।’

পুরস্কার জয়ের মাত্র একদিন পরই ফিফা ইন্টারকন্টিনেন্টাল কাপের ফাইনালে পাচুকার বিপক্ষে এক গোল ও এক অ্যাসিস্ট করে রিয়াল মাদ্রিদকে ৩-০ ব্যবধানে জিততে সাহায্য করেন। সেই ম্যাচে তিনি গোল্ডেন বল এবং ম্যাচসেরার পুরস্কারও জেতেন।

ভিনিসিয়ুসের সবচেয়ে বড় শক্তি তার বিস্ফোরক গতি, দুর্দান্ত ড্রিবলিং এবং ম্যাচের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে পার্থক্য গড়ে দেওয়ার ক্ষমতা। প্রতিপক্ষ ডিফেন্ডারদের জন্য তিনি এক দুঃস্বপ্ন। তার অনিশ্চিত গতিবিধি এবং আক্রমণাত্মক মানসিকতা তাকে বিশ্বের সবচেয়ে ভয়ংকর উইঙ্গারদের একজন করে তুলেছে।

Vinisius

রিয়াল মাদ্রিদে তার অসাধারণ সাফল্যের পরও জাতীয় দলের জার্সিতে এখনও বড় কোনো শিরোপা জেতা হয়নি। ১৮ বছর বয়সে প্রথম ব্রাজিল জাতীয় দলে ডাক পান। এরপর থেকে সেলেসাওদের হয়ে করেছেন ৮ গোল এবং ৬ অ্যাসিস্ট। তবে এখন পর্যন্ত জাতীয় দলের হয়ে কোনো বড় ট্রফি জয়ের স্বাদ পাননি।

ভিনিসিয়ুসের ব্যক্তিগত অর্জন

 

  • কোপা সাও পাওলো দে ফুটেবোল জুনিয়র সেরা বাম উইঙ্গার: ২০১৭
  • দক্ষিণ আমেরিকা অনূর্ধ্ব-১৭ চ্যাম্পিয়নশিপের সেরা খেলোয়াড়: ২০১৭
  • লা লিগা মাসসেরা খেলোয়াড়: নভেম্বর ২০২১, মার্চ ২০২৪, নভেম্বর ২০২৪
  • লা লিগা মৌসুমের সেরা একাদশ: ২০২১–২২, ২০২২–২৩, ২০২৩–২৪, ২০২৪–২৫
  • উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ মৌসুমের সেরা একাদশ: ২০২১–২২, ২০২২–২৩, ২০২৩–২৪
  • উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগের সেরা তরুণ খেলোয়াড়: ২০২১–২২
  • উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগের সেরা খেলোয়াড়: ২০২৩–২৪
  • ইএসএম (European Sports Media) বর্ষসেরা একাদশ: ২০২৩–২৪
  • ফিফা ক্লাব বিশ্বকাপ গোল্ডেন বল: ২০২২
  • ফিফা ইন্টারকন্টিনেন্টাল কাপ গোল্ডেন বল: ২০২৪
  • ফিফপ্রো (FIFPRO) পুরুষদের বিশ্বসেরা একাদশ: ২০২৩, ২০২৪
  • সক্রেটিস অ্যাওয়ার্ড: ২০২৩
  • সাম্বা গোল্ড: ২০২৩
  • ব্যালন ডি’অর রানার-আপ: ২০২৪
  • দ্য বেস্ট ফিফা মেনস প্লেয়ার: ২০২৪
  • ফিফা পুরুষদের বিশ্বসেরা একাদশ: ২০২৪
  • আইএফএফএইচএস (IFFHS) পুরুষদের বিশ্বসেরা একাদশ: ২০২৪
  • গ্লোব সকার বর্ষসেরা খেলোয়াড়: ২০২৪
  • গ্লোব সকার সেরা ফরোয়ার্ড: ২০২৪

ভিনিসিয়ুস সম্পর্কে কিংবন্তীরা যা বলেন

 

ব্রাজিলিয়ান কিংবদন্তি নেইমার জুনিয়র তার সম্পর্কে বলেছেন, ‘আমি ভিনিকে খুব ভালোবাসি। ফুটবল আমাকে যে সেরা বন্ধুদের দিয়েছে, সে তাদের একজন। জীবনে অনেক কষ্টের মধ্য দিয়ে গেছে, কিন্তু সব সমালোচনা ও প্রত্যাশাকে ছাড়িয়ে গেছে। আজ সে আমাদের নায়ক।’

রিয়াল মাদ্রিদের সাবেক ও বর্তমানে ব্রাজিল কোচ কার্লো আনচেলত্তির ভাষায়, ‘এই মুহূর্তে বিশ্বের সবচেয়ে ম্যাচজয়ী ও সিদ্ধান্তমূলক খেলোয়াড় সে।’

কিলিয়ান এমবাপে বলেছেন, ‘সে অনেক ট্রফি ও ব্যক্তিগত পুরস্কার জিতেছে, কিন্তু আমি সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ তার বিনয়ে। সে সবসময় নিজের মানুষদের পাশে থাকে।’

ব্রাজিলিয়ান কিংবদন্তি রোনালদো মনে করেন, ‘তার প্রতিভা একাই ফিফা দ্য বেস্ট জেতার জন্য যথেষ্ট ছিল। কিন্তু মাঠের বাইরেও তার প্রভাব অসাধারণ।’

ক্যারিয়ারে যা যা অর্জন

চ্যাম্পিয়ন্স লিগে বর্তমানে ভিনিসিয়ুসের গোল সংখ্যা ৩২। ব্রাজিলিয়ানদের মধ্যে এ তালিকায় তিনি দ্বিতীয় স্থানে, তার সামনে আছেন শুধু নেইমার। পেছনে রয়েছেন রোনালদো, রোনালদিনহো এবং কাকার মতো কিংবদন্তিরা।

রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে বিভিন্ন ফাইনালে তার গোল সংখ্যা ১৬। এই পরিসংখ্যানে তিনি ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো, করিম বেনজেমা এবং ফেরেঙ্ক পুসকাসের সঙ্গে যৌথভাবে শীর্ষে রয়েছেন।

রিয়াল মাদ্রিদে যোগ দেওয়ার পর তিনি তিনটি জার্সি নম্বর ব্যবহার করেছেন। শুরুতে ২৮ নম্বর, পরে ২০ নম্বর এবং বর্তমানে কিংবদন্তি ৭ নম্বর জার্সি পরছেন। ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো, রাউল এবং এমিলিও বুত্রাগুয়েনোর মতো কিংবদন্তিদের পরা সেই নম্বরের মর্যাদাও তিনি ধরে রেখেছেন।

ব্রাজিলে তার ডাকনাম ‘মালভাদেজা’, যার অর্থ ‘দুষ্টু’ বা ‘নিষ্ঠুর’। কারণ বল পায়ে তিনি যেভাবে ডিফেন্ডারদের নাজেহাল করেন, সেটিই তাকে এই নাম এনে দিয়েছে।

বিশ্বকাপে ভিনিসিয়ুস

২০২২ কাতার বিশ্বকাপে প্রথমবার খেলেন ভিনিসিয়ুস। সার্বিয়ার বিপক্ষে বিশ্বকাপ অভিষেকে রিচার্লিসনের সেই বিখ্যাত গোলের অ্যাসিস্ট করেছিলেন তিনি। দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে শেষ ষোলোতে এক গোল ও এক অ্যাসিস্ট করে ম্যাচসেরা পারফরম্যান্স উপহার দেন। তবে কোয়ার্টার ফাইনালে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে ব্রাজিল টাইব্রেকারে হেরে বিদায় নেয়।

এবার ২০২৬ বিশ্বকাপে আরও বড় ভূমিকা পালনের অপেক্ষায় আছেন তিনি। কার্লো আনচেলত্তির অধীনে ব্রাজিল রয়েছে ‘সি’ গ্রুপে। তাদের প্রথম ম্যাচ মরক্কোর বিপক্ষে। এরপর প্রতিপক্ষ বিশ্বকাপে অভিষেক হওয়া হাইতি এবং পরিচিত প্রতিদ্বন্দ্বী স্কটল্যান্ড।

ব্রাজিলের লক্ষ্য একটাই- ২৪ বছর পর আবারও বিশ্বকাপ ট্রফি ঘরে তোলা। আর সেই স্বপ্ন পূরণে ভিনিসিয়ুস জুনিয়রই হতে পারেন সেলেসাওদের সবচেয়ে বড় অস্ত্র। তার গতি, দক্ষতা এবং বড় ম্যাচে পার্থক্য গড়ে দেওয়ার ক্ষমতা ব্রাজিলকে ইতিহাসের ষষ্ঠ বিশ্বকাপ শিরোপার দিকে নিয়ে যেতে পারে।

আইএইচএস/

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow