সামাজিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতা: আমাদের মনের স্বাস্থ্য কেমন আছে

দীর্ঘসময় ধরে সামাজিক অস্থিরতা থাকলে সমাজে যে সমষ্টিগত মানসিক আঘাত তৈরি হয়, তাতে পুরো সমাজের মানসিক পরিবেশ বদলে যেতে বাধ্য। এই সমষ্টিগত মানসিক আঘাত হলো এমন একটি পরিস্থিতি, যেখানে প্রাকৃতিক বা মনুষ্যসৃষ্ট বড় ধরনের বিপর্যয়, বা অন্যায়-অবিচারের ফলে একটি জাতি ও সমাজ আঘাত পায়, ভয় পায় এবং দুর্বল হয়ে পড়ে। এটি কোনো ব্যক্তির একার সমস্যা নয়; বরং একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর সব মানুষ একই সঙ্গে আতঙ্ক, ভয়, দুঃখ ও নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে। যেমনটা ঘটছে আমাদের ক্ষেত্রে। দেশে প্রতিদিন এমন সব নৃশংস ঘটনা ও দুর্ঘটনা ঘটছে, যা আমাদের কল্পনারও বাইরে ছিল; অথচ এখন তা স্বাভাবিকের চেয়েও স্বাভাবিক হয়ে উঠছে। পত্রিকা না পড়ে, খবর না দেখে, সামাজিক মাধ্যমে চোখ না রাখলেও এই সমাজে বসবাসের কারণে কোনোভাবেই রামিসার নৃশংস মৃত্যু, আবদুল্লাহকে বলাৎকারের পর ঝুলিয়ে রাখার খবর, প্রতিদিন হামে ১০–১৫ জন শিশুর মৃত্যু এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই। খারাপ খবর পেতে পেতে খারাপেই অভ্যস্ত হয়ে উঠছে আমাদের মন। ধীরে ধীরে কি একধরনের অভ্যস্ততাও তৈরি হচ্ছে নিজেদের অজান্তে? তা না হলে অপরাধের খবরগুলোই সবচেয়ে বেশি পড়ছে কেন মানুষ? খুন, মরদেহ টুকরো করা, ধর্ষণ, গণধর্ষণ,

সামাজিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতা: আমাদের মনের স্বাস্থ্য কেমন আছে

দীর্ঘসময় ধরে সামাজিক অস্থিরতা থাকলে সমাজে যে সমষ্টিগত মানসিক আঘাত তৈরি হয়, তাতে পুরো সমাজের মানসিক পরিবেশ বদলে যেতে বাধ্য। এই সমষ্টিগত মানসিক আঘাত হলো এমন একটি পরিস্থিতি, যেখানে প্রাকৃতিক বা মনুষ্যসৃষ্ট বড় ধরনের বিপর্যয়, বা অন্যায়-অবিচারের ফলে একটি জাতি ও সমাজ আঘাত পায়, ভয় পায় এবং দুর্বল হয়ে পড়ে। এটি কোনো ব্যক্তির একার সমস্যা নয়; বরং একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর সব মানুষ একই সঙ্গে আতঙ্ক, ভয়, দুঃখ ও নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে। যেমনটা ঘটছে আমাদের ক্ষেত্রে।

দেশে প্রতিদিন এমন সব নৃশংস ঘটনা ও দুর্ঘটনা ঘটছে, যা আমাদের কল্পনারও বাইরে ছিল; অথচ এখন তা স্বাভাবিকের চেয়েও স্বাভাবিক হয়ে উঠছে। পত্রিকা না পড়ে, খবর না দেখে, সামাজিক মাধ্যমে চোখ না রাখলেও এই সমাজে বসবাসের কারণে কোনোভাবেই রামিসার নৃশংস মৃত্যু, আবদুল্লাহকে বলাৎকারের পর ঝুলিয়ে রাখার খবর, প্রতিদিন হামে ১০–১৫ জন শিশুর মৃত্যু এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই।

খারাপ খবর পেতে পেতে খারাপেই অভ্যস্ত হয়ে উঠছে আমাদের মন। ধীরে ধীরে কি একধরনের অভ্যস্ততাও তৈরি হচ্ছে নিজেদের অজান্তে? তা না হলে অপরাধের খবরগুলোই সবচেয়ে বেশি পড়ছে কেন মানুষ? খুন, মরদেহ টুকরো করা, ধর্ষণ, গণধর্ষণ, ধর্ষণের পর হত্যার মতো ভয়ংকর অপরাধগুলো কি ক্রমশ সয়ে যাচ্ছে?
মনোবিজ্ঞানী ও অপরাধবিজ্ঞানীরা বলছেন, চলমান অপরাধ আমাদের মধ্যে একধরনের নেতিবাচক সহ্যক্ষমতা তৈরি করেছে, যার প্রভাব খুবই খারাপ। অপরাধপ্রবণতায় যে অতিরিক্ত হিংস্রতা যুক্ত হয়েছে, তাতে অপরাধীদের আচরণে মানসিক বিকৃতির লক্ষণ স্পষ্ট হয়ে উঠছে। হিংস্রতাপূর্ণ অপরাধ বারবার ঘটার কারণে সামাজিক সংবেদনশীলতা কমে যাচ্ছে, সমাজ নির্বিকার হয়ে পড়ছে এবং ব্যক্তির মধ্যে স্বার্থপরতা বাড়ছে। ব্যক্তি শুধুই নিজের ও স্বজনের নিরাপত্তার কথা ভাবছে, যা কোনোভাবেই সুস্থ, স্বাভাবিক সমাজের লক্ষণ নয়।

এর মানে হচ্ছে, আমরা মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি। ভালো থাকার কথা বলছি, সুস্থ থাকার কথা বলছি; কিন্তু আমরা আসলে ভালো নেই। অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক চাপ, অত্যাচার, নিপীড়ণ, অন্যায়, অবিচার ও দুর্নীতি সহ্য করতে করতে আমাদের পিঠ যখন দেয়ালে ঠেকে যায়, তখনও আমরা বুঝি না যে আমাদের মানসিক স্বাস্থ্য হুমকির মুখে।

কারণ এই সমাজের অধিকাংশ মানুষ ‘মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা’ বলতে ‘পাগল’ হওয়া বোঝে। আর যেহেতু পাগল হওয়া ও পাগলের চিকিৎসা খুবই লজ্জাজনক বলে মনে করা হয়, তাই এটা নিয়ে কথা বলা ও চিকিৎসকের কাছে গিয়ে সহায়তা নেওয়ার মতো মানুষের সংখ্যাও খুব কম। বাংলাদেশে অধিকাংশ রোগী এবং তাদের আশপাশের মানুষ বিশ্বাস করেন, ‘মানসিক রোগ’ বলে কিছু নেই।

অথচ খুব সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, বিশ্বে ২০২৩ সালে প্রায় ১২০ কোটি মানুষ বিভিন্ন মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত ছিলেন। ১৯৯০ সালের তুলনায় এ সংখ্যা বেড়েছে ৯৫ দশমিক ৫ শতাংশ। সিএনএন জানিয়েছে, চিকিৎসাবিষয়ক সাময়িকী ‘দ্য ল্যানসেট’-এ প্রকাশিত গবেষণায় দেখা গেছে, উদ্বেগ ও বিষণ্নতার হার সবচেয়ে বেশি বেড়েছে। তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে বিভিন্ন ব্যক্তিত্বজনিত মানসিক সমস্যা। গবেষকদের ভাষ্য, বিশ্বজুড়ে মানসিক সমস্যার বোঝা আরও উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছাচ্ছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ২০২১ সালে বলেছিল, ২০৩০ সাল নাগাদ পৃথিবীতে রোগের বোঝার এক নম্বর কারণ হবে বিষণ্নতা, আর সে সময় বছরে প্রায় ১৫ লাখ মানুষ আত্মহত্যা করে মারা যাবে। সেই সময়টা আসতে আর মাত্র চার বছর বাকি।

বাংলাদেশেও মানসিক স্বাস্থ্য পরিস্থিতি আশঙ্কাজনক। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ৩ কোটির বেশি মানুষ কোনো না কোনো মানসিক সমস্যা বা রোগে ভুগছেন। আক্রান্তের হার প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে প্রায় ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ এবং শিশু-কিশোরদের মধ্যে ১২ দশমিক ৬ শতাংশ। প্রতি পাঁচজনের মধ্যে অন্তত একজন মানুষ জীবনের কোনো না কোনো পর্যায়ে মানসিক সমস্যার সম্মুখীন হন।

সবচেয়ে ভয়াবহ তথ্য হচ্ছে, এই বিশাল জনগোষ্ঠীর ৯০ থেকে ৯২ শতাংশই কোনো না কোনোভাবে সঠিক চিকিৎসার বাইরে রয়েছেন। অজ্ঞতা ও কুসংস্কারের কারণে অনেকেই রোগের শুরুতে চিকিৎসা নেন না। দেশে বর্তমানে নিবন্ধিত মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞের সংখ্যা মাত্র ৩০০ থেকে ৩৫০ জনের মতো।

বিভিন্ন বয়স ও শ্রেণি-পেশার মানুষের, যাদের মানসিক সমস্যার চিকিৎসা দরকার, তাদের বাহ্যিকভাবে দেখে স্বাভাবিক মনে হলেও তারা কোনো না কোনো মানসিক সমস্যায় ভুগছেন। রোগীদের মধ্যে স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া শিক্ষার্থীরাও রয়েছেন।

সাম্প্রতিক বছরগুলোয় দেশে মানসিক রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। বিশেষ করে তরুণদের আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। পারিবারিক ও ব্যক্তিগত জীবনে সংকট, মাদকাসক্তি, সামাজিক সম্পর্কের অবনতি, উদ্বেগ, আতঙ্ক, বিনোদনের অভাব, দারিদ্র্য ও ডিজিটাল ডিভাইসে আসক্তিসহ বিভিন্ন কারণে নানা বয়সের মানুষ মানসিক রোগের ঝুঁকিতে রয়েছেন বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

যেকোনো মানুষকে সাহস, সংকল্প ও ধৈর্য দিয়ে মানসিক রোগের মুখোমুখি হতে হয়। আমরা পরিবারের সদস্য, বন্ধু ও সহকর্মী হিসেবে এই লড়াইয়ে তাদের পাশে থাকতে পারি। সরকারের উচিত মানসিক স্বাস্থ্যসেবাকে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার অংশ করা এবং বাজেট বাড়ানো। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, অফিস, কলকারখানা ও হাসপাতালের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো যদি নিজেদের উদ্যোগে মেন্টাল সাপোর্ট দেওয়ার জন্য ছোট পরিসরেও কার্যক্রম শুরু করতে পারে, তাহলে এর সুফল পাবে মানুষ। মানুষ যদি নিজের মনের ভাব প্রকাশ করতে না পারে, তখন সে নেতিবাচক মানসিকতার মানুষে পরিণত হতে পারে।

এমনকি শিশু-কিশোররাও মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত হচ্ছে। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের তথ্যমতে, দেশের শিশু-কিশোরদের মানসিক সমস্যার মধ্যে শীর্ষে আছে নিউরোডেভেলপমেন্ট ডিজঅর্ডার, যা এক ধরনের মানসিক ও স্নায়বিক সমস্যা। এই সমস্যা শিশু বয়সেই শুরু হয় এবং মস্তিষ্কের বিকাশ ও কার্যকারিতাকে প্রভাবিত করে। এরপর যথাক্রমে রয়েছে উদ্বেগজনিত রোগ।

কোনো বিপদ ঘটবে না তো? খারাপ কিছু হবে না তো? বাসা থেকে বের হওয়ার পর সবাই ঠিকমতো ঘরে ফিরবে তো? আমাদের সন্তান কি নিরাপদে আছে? দ্রব্যমূল্য কতটা বাড়ছে, সংসারের ব্যয় কতটা বাড়বে? চাকরি-ব্যবসা থাকবে তো?—যেকোনো বিষয় নিয়ে এ রকম নানা অনিশ্চয়তার শঙ্কা, ভয় বা উদ্বেগ সবারই হয়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মানুষের সবচেয়ে মৌলিক অনুভূতিগুলোর একটি হলো উদ্বেগ। হুমকি বা চ্যালেঞ্জিং কোনো পরিস্থিতিতে উদ্বেগ একটি স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া হলেও এই উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা যখন মাত্রাছাড়া হয়ে যায়, তখন মানুষ মানসিকভাবে এবং এর প্রভাবে শারীরিকভাবেও অসুস্থ হয়ে পড়েন।

যুক্তরাষ্ট্র ও ভিয়েতনামে মনোবিজ্ঞান ও শিক্ষা নিয়ে কাজ করেন ফুওং লে। তিনি বলেছেন, “উদ্বেগ এতটাই তীব্র হতে পারে যে অনেকে একে শারীরিক ব্যথার মতো অনুভব করেন। মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর এর গভীর প্রভাব পড়ে। এর থেকে স্বস্তি পাওয়ার জন্য প্রবল আকাঙ্ক্ষার বিষয়টিও বোঝা যায় তাদের মধ্যে।” (বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিস)

ফুওং লে বলেছেন, দীর্ঘমেয়াদি উদ্বেগ হৃদরোগ, হার্ট অ্যাটাক, উচ্চ রক্তচাপ এবং স্ট্রোকের মতো হৃদযন্ত্র-সংক্রান্ত সমস্যার ঝুঁকি বাড়ায়। ভবিষ্যতের ঘটনা নিয়ে যদি অতিরিক্ত বা অযৌক্তিক পরিমাণে ভয় কাজ করে এবং তা স্বাভাবিক কাজের ক্ষমতাকে বাধাগ্রস্ত করে, তবে এটি মনের ব্যাধির ইঙ্গিত হতে পারে।

‘মানসিক স্বাস্থ্য: বাংলাদেশের তথ্যচিত্র–২০২৫’-এ বলা হয়েছে, দেশের মানসিক রোগে আক্রান্ত প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে বিষণ্নতায় ভোগেন ৬ দশমিক ৭ শতাংশ, উদ্বেগজনিত রোগে আক্রান্ত ৪ দশমিক ৭ শতাংশ। এ ছাড়া আছে সোমাটিক সিম্পটম ডিজঅর্ডার (ব্যথা, দুর্বলতা, ক্লান্তি), অবসেসিভ কমপালসিভ ডিজঅর্ডার (ওসিডি), বাইপোলার ডিজঅর্ডার (মুড বা মনের অবস্থার ওঠানামা), সিজোফ্রেনিয়া ও মাদকাসক্তিতে আক্রান্ত মানুষ। এই গণনার বাইরেও রয়ে গেছেন আরও অসংখ্য মানুষ।

আমরা দেখছি, ১৪ থেকে ১৬ বছর বয়সীরা বেশি মানসিক সমস্যায় ভুগছে। কারণ এখন শিশুরা ডিভাইসের প্রতি বেশি আসক্ত। তাদের শারীরিক কার্যকলাপ ও খেলাধুলা কমে যাচ্ছে। অন্যান্য কারণও রয়েছে। (সূত্র: আঁচল ফাউন্ডেশন)

যে কারও, যেকোনো বয়সেই মানসিক সমস্যার লক্ষণ দেখা দিতে পারে। চিকিৎসকেরা বলেন, সমস্যা দেখা দেওয়া মাত্রই চিকিৎসা শুরু করা দরকার। পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে শিশু-কিশোরদের মানসিক অবস্থা নিয়ে আরও বেশি সচেতন হতে হবে। কিন্তু এই সমাজে কতজন অভিভাবকের পক্ষে সন্তানের মানসিক স্বাস্থ্যের দিকটিতে নজর দেওয়া সম্ভব? আমাদের দেশে রোগীর অবস্থা একেবারে ভয়াবহ না হলে চিকিৎসকের কাছেই নেওয়া হয় না; সেখানে মনের চিকিৎসকের কাছে নেওয়ার তো প্রশ্নই আসে না।

‘বাংলাদেশে মানসিক রোগে আক্রান্ত বিপুল সংখ্যক মানুষ প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসুবিধা থেকে বঞ্চিত। দেশে এ চিকিৎসাব্যবধান প্রায় ৯৪ শতাংশ, যা বিশ্ব গড় ৭০ শতাংশের চেয়েও অনেক বেশি। অন্যদিকে, এ গুরুতর সমস্যা সমাধানে জাতীয় স্বাস্থ্য বাজেটের ১ শতাংশেরও কম বরাদ্দ করা হয়।’ (সূত্র: বণিক বার্তা)

আমাদের দেশে যেকোনো ধরনের চিকিৎসা নেওয়াটাই বেশ ব্যয়বহুল। সেখানে মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টি বেশ অপরিচিত। প্রথমে মানসিক সমস্যাটাকে বুঝতে পারা, তারপর ট্যাবু ভেঙে চিকিৎসাসেবা নিতে চাওয়া এবং চিকিৎসকের কাছে পৌঁছানো ও খরচ যোগানো পর্যন্ত অনেকগুলো ধাপ রয়েছে। একটি নির্দিষ্ট শ্রেণির মানুষ মূলত চিকিৎসা নিতে যান। আর যারা চিকিৎসা নেন, তাদের মধ্যেও ধারাবাহিকতা থাকে না। অর্ধেক চিকিৎসার পর আর চালিয়ে যান না। খরচেরও একটি ব্যাপার থাকে। মানসিক চিকিৎসা এখনো অপরিচিত ও ব্যয়বহুল।

বিশ্বব্যাপী করা গবেষণায় দেখা গেছে, মানসিক সমস্যা এখন ক্রমেই মানুষের অক্ষমতার প্রধান কারণ হয়ে উঠছে। বিশেষ করে নারী ও ১৫ থেকে ৩৯ বছর বয়সীরা বেশি আক্রান্ত। ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সীদের মধ্যে মানসিক সমস্যার সর্বোচ্চ হার এবারই প্রথম দেখা গেছে। আগে সাধারণত মধ্যবয়সীদের মধ্যে এই প্রবণতা বেশি ছিল। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কৈশোর ও তরুণ বয়স মস্তিষ্কের বিকাশ এবং সামাজিক দক্ষতা গড়ে ওঠার গুরুত্বপূর্ণ সময়। এই সময়ে মানসিক সমস্যার প্রভাব দীর্ঘমেয়াদি হতে পারে।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও ঠিক তাই ঘটছে। অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, বিশ্বের চলমান যুদ্ধ, দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা, স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতা, পারিবারিক সহিংসতা, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, মাদক, পর্নোগ্রাফি, প্রযুক্তির অপব্যবহার, বৈষম্য ও পরিবেশগত ঝুঁকিসহ নানা কারণ মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে তুলছে।

বাংলাদেশে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা ব্যাপক হলেও সচেতনতা সীমিত, চিকিৎসাব্যবস্থা দুর্বল, সামাজিক স্টিগমা প্রবল; পেশাদার সহায়তা এখনও অনেকের নাগালের বাইরে। বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি দেখা যায় বিষণ্নতা ও উদ্বেগজনিত সমস্যা। আত্মহত্যা বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠছে। দেশে গড়ে প্রতিদিন প্রায় ৪০টি আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে। বাস্তব সংখ্যা এই অনুমানের চেয়েও বেশি হতে পারে।

এখানে সামাজিক কুসংস্কার ও “পাগল” ট্যাগ হওয়ার ভয় খুব সক্রিয়। মানসিক রোগ নিয়ে এখনও প্রচুর লজ্জা, ভয় ও ভুল ধারণা আছে। অনেক পরিবার মানসিক সমস্যাকে দুর্বলতা, আলস্য, জ্বিন-যাদুটোনা বা খারাপ বাতাস হিসেবে দেখে। ফলে মানুষ সাহায্য চাইতে ভয় পায়। গ্রামের মানুষ বা নিম্ন-মধ্যবিত্তদের জন্য নিয়মিত থেরাপি বা কাউন্সেলিং নেওয়া কঠিন। সরকারি হাসপাতালেও পর্যাপ্ত সেবা নেই। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশে মানসিক সমস্যা ও চিকিৎসাব্যবধান প্রায় ৯২ শতাংশ; অর্থাৎ যাদের চিকিৎসা দরকার, তাদের বিরাট অংশ চিকিৎসা পান না।

আমাদের দেশে এরকম বহু নারী-পুরুষ আছেন, যারা নিজেরাই নিজেদের মানসিক অবস্থা সম্পর্কে বুঝতে পারেন না। পরিবার ও সমাজও তাদের ভুল বোঝে এবং প্রায় একঘরে করে ফেলে। পরিবার ও সমাজ থেকে দূরত্ব তৈরি হওয়ার ফলে এই মানুষগুলো একসময় পরিবার ও সমাজের বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, স্বাস্থ্য বলতে একজন মানুষের শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক—এই তিন অবস্থার সমন্বয়কে বোঝায়। অথচ আমরা নিজেদের ও অন্যের মানসিক সমস্যাকে পুরোপুরি উপেক্ষা করি।

যেকোনো মানুষকে সাহস, সংকল্প ও ধৈর্য দিয়ে মানসিক রোগের মুখোমুখি হতে হয়। আমরা পরিবারের সদস্য, বন্ধু ও সহকর্মী হিসেবে এই লড়াইয়ে তাদের পাশে থাকতে পারি। সরকারের উচিত মানসিক স্বাস্থ্যসেবাকে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার অংশ করা এবং বাজেট বাড়ানো। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, অফিস, কলকারখানা ও হাসপাতালের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো যদি নিজেদের উদ্যোগে মেন্টাল সাপোর্ট দেওয়ার জন্য ছোট পরিসরেও কার্যক্রম শুরু করতে পারে, তাহলে এর সুফল পাবে মানুষ। মানুষ যদি নিজের মনের ভাব প্রকাশ করতে না পারে, তখন সে নেতিবাচক মানসিকতার মানুষে পরিণত হতে পারে।

২৬ মে, ২০২৬

লেখক : যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও কলাম লেখক।

এইচআর/এমএস

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow